নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নির্যাতিতের দীর...
  • সিয়ামুজ্জামান মাহিন
  • মৃত কালপুরুষ
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সলিম সাহা

নতুন যাত্রী

  • মোঃ হাইয়ুম সরকার
  • জয় বনিক
  • মুক্তি হোসেন মুক্তি
  • সোফি ব্রাউন
  • মুঃ ইসমাইল মুয়াজ
  • পাগোল
  • কাহলীল জিব্রান
  • আদিত সূর্য
  • শাহীনুল হক
  • সবুজ শেখর বেপারী

আপনি এখানে

বিষাক্ত রাজনীতি:- একাদশ পর্ব-



দিনটি ছিল 27 শে ফেব্রুয়ারি সালটি ছিল 2002 অর্থাৎ 27 শে ফেব্রুয়ারি, 2002। এই দিনটি ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন; এই দিন যা ঘটেছিল তা ভারতবর্ষের ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ওই দিনের নৃশংসতা আজও আমাদের সভ্য সমাজকে কাঁপিয়ে দেয় এবং তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে আমরা যা পায় তা সভ্য সমাজের জন্য কলঙ্ক! আমরা সর্বদা আশাকরি ওইরকম ঘটনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসাবেই থাকুক, এরূপ ঘটনার আর যেন কখনও পুনরাবৃত্তি না ঘটে! কি হয়েছিল সেদিন?

বহুল চর্চিত ওই দিন উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা থেকে কিছু 'কারসেবক' 'সাবরমতি এক্সপ্রেস' করে 'গুজরাটের গোধরা' স্টেশনে এসে পৌঁছয়। ওই স্টেশনটি ছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে কারসেবকরা যেহেতু অযোধ্যা থেকে আসছিল তাই বেশকিছু কারসেবক যারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের টার্গেট করা হয়, তবে ঘটনার সূত্রপাত হয় কারসেবকরা চা খেয়ে পয়সা না দেওয়ার তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তাই ট্রেনটি স্টেশন থেকে কিছু দূর গিয়ে উপস্থিত হলে ট্রেনের চেন টেনে থামানো হয়। যেস্থানে ট্রেনটি থামে সেটি ছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, তাই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা এসে ট্রেনটিকে ঘিরে ফেলে। ট্রেনে পাথর ছুড়তে থাকে এবং ট্রেনের S-6 বগিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সকাল 7.43 মিনিটে এই নারকীয় হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। এই পৈশাচিক বর্বরতায় 23 জন পুরুষ,15 জন মহিলা ও 20 জন শিশু সমেত মোট 58 জন হিংসার বলি হয়। একজন মানুষ যে এদের বাঁচাতে যায় সেও এই হিংসার বলি হয়ে মারা যায়। তাই মোট(23+15+20+1=59) জন মানুষ এই হিংসায় জীবন বিসর্জন দেন।

এই ঘটনাটি যখন চারিদিকে প্রসারিত হয় তখন গোটা গুজরাট ময় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চারিদিকে এই কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে যে- 'গোধরাতে মুসলমানরা হিন্দুদের পুড়িয়ে মেরেছে; তাই তাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে!' প্রকৃতপক্ষে গুজরাটের পরিস্থিতি সেই সময় ছিল উত্তপ্ত; এই ধরণের যে কোন নরসংহার নিন্দনীয়। প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে হিংসা থেকে রাজ্যকে রক্ষা করতে পারত। আসলে দোষীদের আইনানুগ শাস্তির মাধ্যমে এই ধরণের অন্যায়ের সুবিচার সম্ভব। এই ঘটনার জন্য প্রায় 1500 মানুষকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে থাকে। 2011 সালে নিম্ন আদালতের রায়ে 11 জনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় ও 20 জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়; যদিও উচ্চ আদালতে এই মামলার আইনি লড়াই এখনও অনেক বাকি।

গোধরা কান্ডের পর গোটা গুজরাটের পরিস্থিতি ছিল খুব উত্তেজক; গোধরা কান্ডের প্রতিবাদ স্বরূপ বিশ্বহিন্দু পরিষদ পরের দিন গোটা রাজ্যে বনধ ডাকে। তাই পরিস্থিতির অভিমুখ কোন দিকে যাবে এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ওই দিন সন্ধ্যায় তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ক্যাবিনেট মিটিং হয়। ওই মিটিংয়ে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা অবশ্যই আজও বিতর্কের বিষয়। আইপিএস অফিসার সঞ্জীব ভট বলেছিলেন ওই বৈঠকে মোদী বলেছিলেন- "যদি হিন্দুদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তাহলে তা যেন হতে দেওয়া হয়"। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো বিষয়টি তদন্তের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্ট SIT(special investigation team) গঠন করে। এই তদন্ত টিম উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে মোদীকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে।

তবে ওই দিন ক্যাবিনেটে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি ছিল- 'লাশগুলিকে আমেদাবাদে নিয়ে যাওয়া হবে।' মোদী মন্ত্রীসভার অন্যতম মন্ত্রী হারিন পান্ডিয়া এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। তিনি মনে করেন এই লাশগুলি আমেদাবাদে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে। একই যুক্তিতে তৎকালীন আমেদাবাদ পুলিশ কমিশনার পি পি পান্ডিয়া এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। যদিও মোদী মন্ত্রীসভার অন্যান্য মন্ত্রীরা লাশগুলি আমেদাবাদে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের অনেকেরই অভিমত ছিল এই রকম- 'লাশগুলিকে আমেদাবাদে নিয়ে গেলে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে তাতে আগামী দিনের নির্বাচনে বিজেপি সুফল পাবে।' সত্যি রাজনীতির লাভ লোকসানের জন্য ধর্মের বিষাক্ত ছোবলকে কিভাবে ব্যবহার করা হয়; এটি ছিল তার উজ্জ্বল নিদর্শন! প্রতিবাদী মন্ত্রী হারিন পান্ডিয়ার পরবর্তীকালে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, পান্ডিয়ার মৃত্যুর জন্য তাঁর বাবা তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দায়ী করেন। তবে এই অভিযোগের যথার্থতা আজও প্রমাণিত হয় নি।

পরের দিন 28 শে ফেব্রুয়ারির সকালে 'গোধরা কান্ডে দগ্ধ লাশগুলিকে ট্রাকে করে আমেদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়।' লাশগুলিকে তাদের পরিজনদের দেওয়ার পরিবর্তে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের দেওয়া হয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের যুক্তি ছিল যেহেতু তারা কারসেবক ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাই বিশ্বহিন্দু পরিষদকে আগে লাশগুলি হস্তান্তর করা উচিত। লাশগুলি স্মরণ সভার নামে ষোলোটি জায়গায় কারসেবকদের পরিজনদের দেওয়া হয় এবং এই লাশগুলি নিয়ে বাকি আমেদাবাদ শহরে ঘোরানো হয়। এর ফলে পরিস্থিতি খুব উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আমেদাবাদে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। গোধরা কান্ডের প্রতিবাদ স্বরূপ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ গুজরাট বন্ধের ডাক দেয়; এর সর্বাধিক প্রভাব দেখা যায় আমেদাবাদে। সকাল দশটা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল কোথাও কোন সমস্যা ছিল না কিন্তু এরপর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। হঠাৎ হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা এসে জায়গায় জায়গায় আগুন লাগাতে থাকে এবং বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়ি ও দোকানের উপর আক্রমণ করা হয়। যেভাবে আক্রমণ গুলি সংগঠিত হয় তা পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া প্রায় অসম্ভব। পুলিশ যেন নির্লিপ্ত থাকে এবং দাঙ্গাকারিরা যা ইচ্ছা করার স্বাধীনতা পায়। আমেদাবাদ পুলিশ কমিশনার পি পি পান্ডিয়ার উপর অভিযোগ আসে তিনি দাঙ্গা কারীদের উপর যথার্থ ব্যবস্থা নেন নি। তবে একথা স্বরণে রাখা প্রয়োজন ইনিই কিন্তু গোধরার দগ্ধ লাশ আমেদাবাদে নিয়ে আসার বিরোধীতা করেছিলেন। তবে তিনি দাঙ্গাকারীদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা কেন নিতে পারেন নি, তা আজও বহুল চর্চিত বিষয়। গুজরাটের সর্বত্র অবশ্য এই অবস্থা ছিল না যেমন- সুরাটের পুলিশ কমিশনার বিনীত গুপ্তা শক্তহাতে দাঙ্গা প্রতিরোধ করেছিলেন। বস্তুত গুজরাটের বহু শহরে বহু সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার শক্ত হাতে এই মর্মান্তিক ভাতৃঘাতি দাঙ্গাকে রুখে দিয়ে ছিল।

যে সব অঞ্চলে সর্বাধিক ভয়াবহ দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হল আমেদাবাদের নারোদা পাটিয়া অঞ্চল। এই নারদা পাটিয়া ছিল সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। এই অঞ্চলে বিহার, উওরপ্রদেশ ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা প্রায় দুই হাজার শ্রমজীবী মানুষ থাকতেন। এই নারোদা পাটিয়াকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে নৃশংস হত্যাকান্ড চালনা করা হয়। এই পৈশাচিক বর্বরতায় মোট সাতানব্বই জন মানুষ নিজের জীবন আহুতি দেয়। এই ঘটনায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা বাবু বজরঙ্গিকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গণহত্যার সঙ্গে সঙ্গে এক গর্ভবতী মহিলার পেটে ছুরি চালিয়ে তার গর্ভস্থ শিশুকে পর্যন্ত হত্যা করে উদ্দাম নৃত্য শুরু করে এই নরপিশাচ! এই ঘটনাটি ভারতের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের কলঙ্ক স্বরূপ। এই ঘটনার ফলে বর্হিবিশ্বে ভারতের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়।

এই ঘটনায় প্রকৃত উস্কানিদাতা হিসাবে স্থানীয় বিধায়ক মায়া বেন কোডনানিকে দোষী সাব্যস্ত করে আমেদাবাদের বিশেষ আদালত দুই চরণে মোট 28 বছরের সাজার রায় ঘোষণা করে। বিচারক রায় দেওয়ার সময় মায়া বেন কোডনানিকে "king pin of violence" বলে অভিহিত করেন। নারোদা পাটিয়া এই গণহত্যার রায় দিতে গিয়ে আমেদাবাদের বিশেষ আদালত তাৎপর্যপূণ্য মন্তব্য করে- "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সমাজের জন্য ক্যান্সার স্বরূপ। আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এখানে এই রকম দাঙ্গাকে সহ্য করা সম্ভব নয়। সমস্ত দোষীরা জঘন্য অপরাধ করেছে। নির্দোষ মানুষদের জ্বালিয়ে হত্যা করে এর মধ্যে এক কুড়ি দিনের শিশুও ছিল।" তবে সাম্প্রতিক গুজরাট হাইকোর্টের রায়ে মায়া বেন কোডনানিকে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয়। গুজরাট হাইকোর্টের মতে প্রত্যক্ষদর্শীরা যে সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়েছে তাতে, কোডনানির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি। তাই 'বেনিফিট অফ ডাউট' এর ভিত্তিতে তাকে এই অভিযোগ থেকে মুক্ত করা হয়। স্বভাবতই বিভিন্ন মহল থেকে আদালতের এই রায়ের উপর বিভিন্ন প্রশ্ন চিন্হ ও দেখা যাচ্ছে। গুজরাট দাঙ্গা পীড়িতদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন লড়াই করা সমাজকর্মী তিস্তা সেতলওয়াড় টুইট করে মন্তব্য করেন-'গণহত্যায় প্রধান ষড়যন্ত্রীকে চক্রান্তের অভিযোগ থেকে আজ মুক্ত করা হল। যিনি জনতাকে হিংসায় প্ররোচনা দিয়ে তাদের মধ্যে তলোয়ার বিলি করেছিলেন।' অন্যদিকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী জাভেদ আনন্দ মন্তব্য করেন- "12 জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছিল তা সত্ত্বেও কেন হাইকোর্টের নির্দোষ মনে হল কোডনানিকে এটা দেখা দরকার।" অন্যদিকে বাবু বজরঙ্গিকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে ও সাজা কমিয়ে 21 বছরে নামিয়ে আনে। তবে এই মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে এখন ও বহু আইনি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এছাড়া এই দাঙ্গায় আর এক বহু চর্চিত গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছিল আমেদাবাদের গুলবার্গ সোসাইটিতে। এই গুলবার্গ সোসাইটিতে কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরি থাকতেন। সাংসদ স্ত্রী জাকিয়া জাফরির মতে- "বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বনধ ডাকেছিল তাই দোকান বাজার সব বন্ধ ছিল কোথাও কোন সমস্যা ছিল না। সকাল দশটা পর্যন্ত কোন সমস্যা ছিল না এরপর চার পাঁচ হাজার মানুষের ভিড় সোসাইটিকে ঘিরে ধরে। এই জন্মত্ত জনতাকে রোখার জন্য এহসান জাফরি বার বার মুখ্যমন্ত্রী ভবনে ফোন করেন কিন্তু কেউ ফোন ধরেন নি। বার বার পুলিশকে ফোন করেন কিন্তু কোন সাহায্য পায় নি। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজে ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, সেখানে দাঙ্গাকারীরা এহসান জাফরিকে পুড়িয়ে হত্যা করেন। দেখে মনে হয় সবকিছুই পরিকল্পনা মাফিক হয়েছিল।" এই গুলবার্গ সোসাইটিতে এহসান জাফরি সমেত মোট 69 জনকে দাঙ্গাকারীরা হত্যা করেন। এছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহু ছোটখাটো দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল। তবে বরোদার বেস্ট বেকারি গণহত্যা নিয়েও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে দাঙ্গাকারীরা এই বেকারিকে জ্বালিয়ে দেয় এর ফলে মোট 16 জনের মৃত্যু হয়। যার অধিকাংশই ছিল মুসলমান ও অল্প বয়স্ক শ্রমিক (অধিংশেরই বয়স 14-25 এর মধ্যে ছিল)।

এপ্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর অভিজ্ঞতা বলি। বন্ধুটি আমাকে জানায় গুজরাটের দাঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলের কাছে তার বাড়ি, দাঙ্গার সময় সে ছিল শিশু। পরে সে জেনেছে এই দাঙ্গার সময় কি হয়েছিল। তার মতে- 'দাঙ্গার সময় মুসলিমদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়। তাদের লাশ কেটে কেটে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। মুসলিম মহিলাদের রাস্তায় উলঙ্গ করে গণধর্ষণ করা হয়।' তাহলে বোঝা যায় সেদিন মানুষ কতটা ধর্মান্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন কতটা হিংসা মানুষের মননে ছাপ ফেলে। শুধু তাই নয় এই দাঙ্গাতে মহিলারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল এ দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় না তবে এক্ষেত্রে এটি সংঘঠিত হয়েছিল। মহিলারা তাদের বাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার প্রতিবেশি মুসলমানদের বাড়িতে নিক্ষেপ করেছিল এবং পুরুষদের সর্বোতভাবে সাহায্য করেছিল। সত্যি বলতে কি বন্ধুটি আমাকে হিন্দু ভেবে মনের গোপন কথাগুলি খুলে বলেছিল, তবে আমি এক মানব সন্তান হয়ে আপনাদের কাছে সেই সত্যটি প্রকাশ করলাম।

তবে এটাও খুব সত্য কথা এই দাঙ্গায় শুধুমাত্র মুসলমানরা আক্রান্ত হয়েছিল এমন নয় বহু স্থানে বড় নির্মমভাবে হিন্দু অঞ্চল গুলিতে আক্রমণ করা হয় এবং তাদের নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। বহু অঞ্চলেই হিন্দু বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া ও তাদের নারীদের উপর গণধর্ষণের অভিযোগ আসে। তবে এটাও ঠিক এই দাঙ্গায় তুলনামূলক ভাবে মুসলমানরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই বিভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বলি হন মোট 1044 জন মানুষ (790 জন মুসলমান ও 254 জন হিন্দু) 223 জন মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায় ও 2500 এর অধিক মানুষ আহত হয়। তবে বেসরকারি সূত্রমতে মৃতের সংখ্যা ছিল 2000 এর অধিক। এই হিংসার বলি হয়ে লক্ষাধিক মানুষ ঘর বাড়ি ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে অনেক সময় আমরা ধর্মের মোহে এতটা অন্ধ হয়ে যায় যে আমরা ভাবি হিন্দু বা মুসলমান মারা গেল কিন্তু দিনের শেষে আমরা যে এক মানুষ, অন্য মানব সন্তানকে হত্যা করলাম সে বোধ লুপ্ত হয়ে যায়। বাঘ ও বাঘের মাংস খায় না কিন্তু মানুষই একমাত্র সর্বউৎকৃষ্ট জীব যে অন্য মানব সন্তানের রক্ত পান করতে দ্বীধা করে না!

এই দাঙ্গার সময় গুজরাট সরকারের উপর অভিযোগ আসে তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে কাজ করছে না। সরকারের উপর গুরুতর অভিযোগ আসে তারা হিন্দুদের সুবিধা করে দিচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী গুজরাটে এসে নরেন্দ্র মোদীকে 'রাজধর্ম পালনের' কথা মনে করিয়ে দেন। ভারতবর্ষে এই দাঙ্গা ছিল এমন প্রথম দাঙ্গা যা মানুষ শুধু খবরের কাগজের মাধ্যমেই পড়েন নি বরং স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাধ্যমে এই দাঙ্গার প্রতিটি খবর বাড়িতে বসে মানুষ দেখতে পেয়েছিল তাই মানব মননে এই দাঙ্গার ভয়াবহ প্রভাব ছিল অনেক বেশি। শুধু তাই নয় প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে এই দাঙ্গার প্রতিটি খবর দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে পৌঁছেছিল এর ফলে ভারতের মর্যাদা অনেকাংশেই ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী যথার্থই বলেছিলেন- "গুজরাট গণহত্যা আমার মাথার উপর কলঙ্ক, আমি কি করে বিদেশে মুখ দেখাবো।" তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গভীর থেকে গভীরতর ক্ষত ও শুকিয়ে যায় আস্তে আস্তে গুজরাট ও স্বাভাবিক হতে থাকে।

এরপর মোদী সময়ের আগেই গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন করায় এই নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকারে ফিরে আসে। এরপর মোদী রাজ্যে শিল্পায়নের দিকে নজর দেয় এবং পরপর মোদী তিন বার বিধানসভা ভোটে জয়ী হন। অন্যদিকে দাঙ্গার পর রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে ও বিপুল ভোটে বিজেপি জয়ী হয়। তাই বাজপেয়ীর কাজের উপর নির্ভর করে বিজেপি 2004 সালে লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এই নির্বাচনে 'India shining' এই শ্লোগান নিয়ে বিজেপি মাঠে নামে, সমস্ত ওপিনিয়ন পোলে বিজেপির জয়লাভের কথা বলা হয়। তবে নির্বাচনে দেখা যায় বিজেপি খারাপ ভাবে হারে। এই নির্বাচনে হারার কারণে বাজপেয়ী এক জায়গায় বলেন- "গুজরাট আমাদের হারিয়ে দিল।" এথেকেই প্রমাণিত দেশ, সমাজ, রাজনীতিতে এই দাঙ্গার প্রভাব কত সুতীব্র ছিল।

গুজরাট গণহত্যার জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দায়ী করা হয়। এই উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে special investigation team বা SIT গঠন করা হয় কিন্তু কোথাও প্রমাণিত হয়নি যে গুজরাট গণহত্যার জন্য নরেন্দ্র মোদী সরাসরি জড়িত ছিল। যদিও মোদীর ভূমিকা কি ছিল তা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। এরপর সাবরমতি দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে পরপর তিন মেয়াদে জয়ী হয়ে পনেরো বছর মুখ্যমন্ত্রীত্ব ধরে রাখেন নরেন্দ্র মোদী। ভাইব্রেন্ট গুজরাটের মডেলে গুজরাট ভারতের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্য। তবে মোদীর মধ্যে ও বহু পরিবর্তন দেখা যায় মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে কথা বলেন না মোদী উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। গুজরাট দাঙ্গা মোদীর রাজত্বের সবচেয়ে কালো অধ্যায় হলেও এ সত্যও মাথায় রাখা প্রয়োজন; যে গুজরাটে প্রায় প্রতি বছর ছোট বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগেই থাকত গুজরাট দাঙ্গার পর গত পনেরো বছরে সেখানে আর একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়নি এটিই মনে হয় মোদীর নেতৃত্বের প্রধান গুণাবলি। গুজরাট আজ এক সমৃদ্ধ শিল্পন্নত রাজ্য, এটি ও মোদীর নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। যদিও গুজরাট আগে থেকেই শিল্প উন্নত রাজ্য ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও মোদী আমলে তা এক নতুন উচ্চতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।

বহু ঘাত প্রতিঘাতের পরে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আজ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী। এক চা বিক্রেতার সন্তান যে দেশের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে তা মোদীর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত। 130 কোটি ভারতবাসীর প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি আজ সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেন তিনি বলেন- 'সবকা সাথ সবকা বিকাশ'। তার আমলে কতটা কাজ হয়েছে, দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে কি অবনতি হয়েছে, সহিষ্ণুতা বেড়েছে না কমেছে, মানুষের সমৃদ্ধি হয়েছে কি না সবই বিতর্কের বিষয় এবং এগুলির সঠিক মূল্যায়ন দেশের জনগণ করবে। তবে মোদী যেভাবে তিন তালাকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয় অন্যদিকে ধর্মনিরপক্ষে দলগুলি মুসলিম ভোটের লোভে সমাজের মুসলিম কট্টরপন্থীদের সমর্থন করছে যা সাধারণ মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর এবং দেশের স্বার্থ বিরোধী। কিছু দিন আগে ভারতে শরিয়া আদালত গড়ে তোলার ও প্রচেষ্টা শুরু হয় এই ভন্ড ধর্মনিরপক্ষেতার ধ্বজাধারী দল গুলি প্রচ্ছন্নে এদের সমর্থন করে যা দেশের জন্য বিপদজনক। যদিও আমাদের ভাগ্য ভালো আমাদের গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা সুপ্রিম কোর্ট এই দাবীকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করেছে। অন্যদিকে বিজেপিই একমাত্র দল যারা খুব দৃপ্ত কন্ঠে একথা ঘোষণা করতে পারে ভারত এক ধর্মনিরপক্ষে দেশ এখানে শরিয়তি আদালত গড়ে তোলার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের আজ দুর্ভাগ্য যে মুসলিম মহিলাদের অধিকার নিয়ে কথা বলা ও দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার্থে আজ আমাদের হিন্দুত্ববাদীদের উপরই ভরসা করতে হচ্ছে! আমরা আশাবাদী শত বাধা বিপত্তি ও পুরানো ক্ষতকে কাটিয়ে উঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতবর্ষকে বিশ্বের দরবারে এক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি তার অভীষ্ট লক্ষ্যে সফল হবেন কি না তার উত্তর দেবে একমাত্র সময়!

চলবে...

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এবিপি নিউজ।
3. আজতক নিউজ।
4. জি টিভি।
5. এই সময়।
6. আনন্দবাজার পত্রিকা।
7. ইন্টারনেট ও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রক্তিম বিপ্লবী
রক্তিম বিপ্লবী এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 59 min ago
Joined: মঙ্গলবার, আগস্ট 29, 2017 - 3:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর