নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মৃত কালপুরুষ
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সিয়ামুজ্জামান মাহিন
  • সলিম সাহা
  • নির্যাতিতের দীর...
  • সুখ নাই

নতুন যাত্রী

  • মোঃ হাইয়ুম সরকার
  • জয় বনিক
  • মুক্তি হোসেন মুক্তি
  • সোফি ব্রাউন
  • মুঃ ইসমাইল মুয়াজ
  • পাগোল
  • কাহলীল জিব্রান
  • আদিত সূর্য
  • শাহীনুল হক
  • সবুজ শেখর বেপারী

আপনি এখানে

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক উপন্যাস: মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয় নাই (প্রথম খণ্ড—তৃতীয় পর্ব)


মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক উপন্যাস:
মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয় নাই
(প্রথম খণ্ড—তৃতীয় পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

অধ্যাপক লিটু মিয়া ধীরেসুস্থে আবার বলতে লাগলেন:

“পাকিস্তানরাষ্ট্রের শয়তানপুত্রদের তালিকা তোমাদের হাতে তুলে দিয়েছি। তোমরা এগুলো সারাজীবন মনে রাখবে। আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তির কাছে এসব তথ্য বারবার তুলে ধরবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সবার কাছে প্রচার করতে হবে। নতুনপ্রজন্মকে আরও বেশি-বেশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সকল তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। এবার তোমরা জেনে নাও—পাকিস্তান নামক একটি শয়তানীরাষ্ট্র কীভাবে, কাদের স্বার্থে, কেন গঠিত হয়েছিলো। আর এই শয়তানরাষ্ট্রটি গঠনের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল:

প্রথমত; পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিলো কতিপয় সাক্ষাৎ শয়তানের প্ররোচনায় ও প্রচেষ্টায়। পাকিস্তানপ্রেমী এই শয়তানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক-কবি ইকবাল, ধর্মহীন-তাগুত ও শয়তানপুত্র মোহাম্মদ আলী জিন্না, শয়তানপুত্র লিয়াকত আলী খান, শয়তানপুত্র খাজা নাজিমউদ্দীন, ইংরেজদের দালাল: নবাব সলিমুল্লাহ ও শয়তানপুত্র আবুল আলা মওদুদী ইত্যাদি। এইসব শয়তান ইসলামীরাষ্ট্রের নামে কতিপয় মদ্যপ ও ব্যভিচারীর সমন্বয়ে গড়ে তোলে পাকিস্তান নামক একটি শয়তানরাষ্ট্র তথা পাপরাষ্ট্র। আর এইসব ও এইজাতীয় আরও কতিপয় শয়তানের শয়তানী-চক্রান্তে, গভীর ষড়যন্ত্রে ও পাকিস্তানীদের সম্মিলিত রাজনৈতিক শয়তানী-ষড়যন্ত্রের কাছে পরাস্ত হয়ে আমাদের পবিত্র বাংলাদেশভূমি সেদিন পাকিস্তান নামক একটি পাপরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগিতায় সেদিন পাকিস্তানীরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের সুন্দর রাষ্ট্রকে, শয়তানীরাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশীদার করে নেয়। কারণ, আমাদের সম্পদের প্রতি আগে থেকে পাকিস্তানী-জানোয়ারগোষ্ঠীর ছিল সীমাহীন লোভ। তারা আমাদের রাষ্ট্রকে তাদের শোষণের কলোনী বানিয়ে চিরদিন আমাদের সম্পদ ভোগদখল করতে চেয়েছিলো। পাকিস্তানের সামরিকজান্তারা আমাদের চিরদিনের জন্য গোলাম বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। কারণ, ওদের দেশের চেয়ে আমাদের বাংলাদেশে সম্পদের পরিমাণ ছিল বেশি।
দ্বিতীয়ত; পাকিস্তানের লম্পট-মদ্যপ-স্বৈরাচার-ব্যভিচারী সামরিকজান্তারা পবিত্র ইসলামধর্মের নামে বিবিধ শয়তানী করতো। আর ওরা নিজেরা অমুসলিম হয়েও আমাদের ভারতের দালাল বলে তিরস্কারপূর্বক শয়তানের পাকিস্তানে ইসলামীশাসনের নামে বাংলাদেশকে চিরদিনের জন্য তাদের করদরাজ্য বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। এজন্য তারা এদেশীয় কিছুসংখ্যক দালালকে হাত-করেছিলো। আর তারা নিজেদের পাকিস্তানের স্বার্থে বাংলাদেশবিরোধী একটি দালালশ্রেণীসৃষ্টি করেছিলো।
তৃতীয়ত; পাকিস্তানের দুশ্চরিত্রবান-লম্পট শাসকরা জানতো ভোটে বা সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি-জাতির সঙ্গে জিততে পারবে না। তাই, তারা সবসময় ছলে-বলে-কলে-কৌশলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাদখল করতো। তারা ভুলবশত ১৯৭০ সালের নির্বাচন দিয়ে ফেলেছিলো। আর এতে তাদের ভরাডুবি হয়। তারা সমগ্র বাঙালি-জাতির প্রতিনিধিদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর না-করে জোরপূর্বক ১৯৭১ সালে, আমাদের উপর অন্যায়ভাবে অন্যায়যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে আমরা আত্মরক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি। ১৯৭১ সালে, পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী নামক জানোয়ারবাহিনী আমাদের চিরতরে দমন তথা সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছিলো। তারা আমাদের স্বাধীনতাকামী সকল মানুষকে হত্যা করে শুধু তাদের দালাল—জারজপুত্রদের বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। ১৯৭১ সালে, পাকিস্তান আমাদের বাংলাদেশরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ১৯৭১ সালে, আমরা বাঙালিরা জয়লাভ করায় ওদের সমস্ত শয়তানী ভেস্তে যায়। ওরা আজও আমাদের বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী শয়তানীঅপকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছে।
মূলত পাকিস্তান নামক একটি শয়তানরাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিলো ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতাসৃষ্টি, বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটিকে শোষণ ও জঙ্গিবাদের সম্প্রসারণ করার জন্য। এছাড়া, এই পাকিস্তানের আর-কিছু নাই। আর সংক্ষেপে এই হলো মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলার সঠিক ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস আরও করুণ। আর সেটি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলার ইতিহাস। তা আরেকদিন বলবো।”

ওরা সবাই এতোক্ষণ নীরবে অধ্যাপক লিটু মিয়ার কথা মনোযোগসহকারে শুনছিলো। তারা জানে যে, লিটু মিয়ার প্রতিটি কথাই সত্য। কারণ, এই বাংলাদেশে লিটু মিয়া একজন সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক-গবেষক ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধাপরাধীদের যুদ্ধাপরাধবিশেষজ্ঞ। আর তাই, দীর্ঘসময় যাবৎ তন্ময় হয়ে তার বক্তব্যশ্রবণপূর্বক তাদের মধ্যে একধরনের দেশপ্রেমমূলক প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো।

বিশেষ করে নবপ্রজন্মের দেশপ্রেমিক আবীর হাসান আর চুপ করে বসে থাকতে পারলো না। সে একদৃষ্টিতে পরমভক্তিতে লিটু মিয়ার দিকে চেয়ে বলে ফেললো: “স্যার, আপনার মুখ থেকে আমরা এতোক্ষণ যাবৎ যা শুনলাম তাতে আমাদের আজ মনে হচ্ছে: একাত্তরের পাকিস্তানীযুদ্ধাপরাধী-হানাদারবাহিনী ও তাদের এদেশীয় বেজন্মা দোসর—শান্তিকমিটির সদস্য, রাজাকার, আলবদর, আলশামসগং তো মানুষও না—মুসলমানও না। এদের বিচার এখনই হওয়া উচিত। আর এই দেশে আজ থেকে একটি যুদ্ধাপরাধীদেরও ক্ষমা করা যাবে না। এদের বিচার করতেই হবে। কিন্তু ইদানীং আমরা লক্ষ্য করছি, এই দেশেরই কিছুসংখ্যক লোক—মানে, মুখচেনা শয়তান: কথিত মুক্তিযোদ্ধা, কথিত সাংবাদিক, কথিত রাজনীতিক, কথিত আলেম আর কথিত আইনজীবীনামধারী ব্যক্তিবর্গ দেশের ভিতরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কাজ করছে। এরা কেন এমন করছে? আর এরা কারা? কী এদের পরিচয়? স্যার, যদি দয়া করে এদের পরিচয়সম্পর্কে একটু বলতেন!”

লিটু মিয়া ওর কথা শুনে মোলায়েম হাসিতে বললেন, “তাহলে তো এবার তোমাদের কাছে আরেকটি সত্যঘটনা খুলে বলতে হয়। এবারও তোমরা খুব মনোযোগ দিয়ে এগুলো শুনবে: এটি এই স্বাধীন-সার্বভৌম-পবিত্র বাংলাদেশের আরেক দুঃখের ইতিহাস। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে: বিশ্বাসঘাতকরা কখনও-কোনোদিন ভালো হয় না। আর যাদের রক্তে বিশ্বাসঘাতকতা আছে, তারা সময়-সুযোগ বুঝে ও সুযোগ খুঁজে একদিন-না-একদিন এই দেশ ও এই দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও চূড়ান্ত বেঈমানী করবেই-করবে। তার জলন্ত প্রমাণ: এই বাংলাদেশে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর একসময়কার চার-খলিফাখ্যাত ‘চার-খলিফা’র মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক: একমাত্র আব্দুল কুদ্দুস মাখন শুধু দেশপ্রেমিক ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই ঈমান বজায় রেখে দেশকে ভালোবেসে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর বাকি তিনটা এখনও দেশের ভিতরে বিবিধ শয়তানীঅপকর্মে ব্যস্ত। এই তিন-শয়তান হচ্ছে—নব্যরাজাকার, নব্যমীরজাফর আসম আব্দুর রব; নব্যরাজাকার, নব্যমীরজাফর সাজাহান সিরাজ; আরেকটা ভণ্ড, নব্যরাজাকার, নব্যমীরজাফর নুরে আলম সিদ্দিকী। এরা অতিমাত্রায় ভণ্ডশয়তান, বিশ্বাসঘাতক ও কুলাঙ্গার। এরা বর্তমানে একেবারে নীতিহীন, নীতিভ্রষ্ট, পথভ্রষ্ট ও অর্থলোভী। আর এরা প্রত্যেকে-একেকটা নরপিশাচ। এরা একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য এখন তাদের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের বখশিস তথা উৎকোচগ্রহণপূর্বক তাদের পক্ষে বহুবিধ শয়তানী করে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে আরও কতকগুলো জাতীয় শয়তান এবং জাতীয় বিশ্বাসঘাতক। আর বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এইসব শয়তানের মধ্যে রয়েছে: যুদ্ধাপরাধীদের দালাল ড. কামাল হোসেন; আওয়ামীলীগ থেকে চিরবহিষ্কৃত সন্ত্রাসী মোস্তফা মহসীন মন্টু; মুক্তিযোদ্ধানামধারী বিশ্বাসঘাতক ও মীরজাফর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী; জাতীয় শয়তান ও জাতীয় কুলাঙ্গার মাহমুদুর রহমান মান্না; জাতীয় কুলাঙ্গার ও মীরজাফর সাবেক পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী; সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, জাতীয় শয়তান ও জাতীয় কুলাঙ্গার ড. আকবর আলী খান; ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের পতিতশিক্ষক, শয়তানপুত্র ও জাতীয় লম্পট ড. আসিফ নজরুল; আমেরিকা ও পাকিস্তানের দালাল, জাতীয় শয়তান ও জাতীয় কুলাঙ্গার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন; জাতীয় মীরজাফর ও সুবিধাবাদীচক্রের দালাল ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ; লেখকনামধারী শয়তানপুত্র হাসনাত আব্দুল হাই; জাতীয় বিভ্রান্তব্যক্তি ব্যারিস্টার রফিকুল হক ইত্যাদি। এরা সবাই আমাদের দেশের ভিতরে নানাবিধ শয়তানী করার উদ্দেশ্যে একজোট হয়েছে। এর মধ্যে শয়তানপুত্র মাহমুদুর রহমান মান্না ও আইনজীবীনামধারী ব্যারিস্টার রফিকুল হকের নেতৃত্বে অতিসম্প্রতি বিশ্বশয়তানীর উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে নাগরিকআন্দোলন তথা ‘নাগরিকঐক্য’ নামে একটা শয়তানীসংগঠন। দেশের ভিতরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বানচাল করার উদ্দেশ্যেই এইসব জাতীয় শয়তান আজ একজোট হয়েছে। আর এই শয়তানরা দেশপ্রেমের ভান করে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তাদের আদর্শিক যুদ্ধাপরাধীপিতাদের মুক্ত করার এক ঘৃণ্য অভিপ্রায়ে শয়তানীষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। কিন্তু এই শয়তানদের আমাদেরই রুখতে হবে। এদের কেউই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র আদর্শ ও চেতনার প্রতি বিশ্বস্ত নয় এবং এতে বিশ্বাসীও নয়। এরা অর্থলোভী-নরপিশাচ। তাই, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তাবৎ শয়তানীঅপশক্তির পক্ষে কাজ করাই এদের একমাত্র লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি। এদেরই একটা বহুদিনের পুরাতন তথা অভিজ্ঞ শয়তান হচ্ছে: বিকৃতমস্তিষ্কের অধিকারী নুরে আলম সিদ্দিকী। সে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভিন্নমাত্রার, তৃতীয়মাত্রার, তৃতীয়শক্তির উত্থান ঘটিয়ে ভিন্নমাত্রার শয়তানী করার জন্য জাতির সামনে হাস্যকরভাবে সম্পূর্ণ অসৎ ও শয়তানী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘প্রাক্তন ছাত্রলীগ-ফাউন্ডেশন’। এই নামে একটা শয়তানীসংগঠন এতোকাল পরে আজ হঠাৎ প্রতিষ্ঠা করার কী প্রয়োজন পড়লো? এর সঙ্গে কে-বা-কারা আছে? এটাতো একটা প্যাডসর্বস্ব ‘এক বৃহৎ শয়তানী-উদ্দেশ্যসাধনে’র শয়তানের চিলেকোঠা। এটি এতোকাল পরে কাদের টাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নিশ্চয় তোমাদের নতুন জাতভাই যুদ্ধাপরাধীরা টাকা দিয়েছে! তাই, আজকাল হঠাৎ-হঠাৎ বাংলাদেশের উর্বরমৃত্তিকাভূমিতে গজিয়ে উঠছে এমন সব বিজাতীয় ও শয়তানী সংগঠন। এদের মা-বাপ কে? নিশ্চয়ই পাকিস্তানের মদদপ্রাপ্ত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীবংশজাত সব পাপিষ্ঠসন্তান। তাই, এইজাতীয় সকল শয়তানের হাত থেকে আমাদের নিজপ্রচেষ্টায় বাঁচতে হবে। আর আজ-এখন আর এইমুহূর্ত থেকে একটা ছোট-বড় শয়তানকেও ছোটো করে দেখা যাবে না। আর তাই, এদেশের সমস্ত শয়তানকে এবং এদের সমস্ত শয়তানীকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা-না-হলে এই অসুরশক্তির তাণ্ডবে আমাদের মহান জাতিসত্তার কষ্টার্জিত মহৎকর্মসমূহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আজ আমাদের সবাইকে সেই প্রতিজ্ঞাই করতে হবে। এই অপশক্তিজোট আজ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে একেবারে মরীয়া হয়ে মাঠে-ময়দানে কোনো জনসমর্থন না পেয়ে, এমনকি সেখানে জনগণের ধোলাই খাওয়ার ভয়ে খুব সাবধানে পা ফেলে, ঘরে বসে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার সামনে বিবিধ শয়তানী-কথাবার্তা বলে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করতে চাইছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মাথা ঠিক আছে। তারা এইজাতীয় শয়তানদের চিরতরে পরিত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশের চিরবিশ্বস্ত বাংলাদেশআওয়ামীলীগের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। তাই, এরা সেখান থেকে পিঠটান দিয়ে দেশের ভিতরে নিজেদের মতো আরও কিছু ‘জাতীয় শয়তান’ তৈরি করার লক্ষ্যে এখন নিয়মিত একশ্রেণীর শয়তানী ‘প্রাইভেট ও জারজ’ টিভিচ্যানেলের সামনে বসে সরকারের সমালোচনার নামে রাজাকারদের পক্ষে সাফাই গাচ্ছে। আর এরাই এখন জনে-জনে, দলে-দলে, পালে-পালে বিভক্ত হয়ে একশ্রেণীর ‘প্রাইভেট ও জারজ’ টিভিচ্যানেলের একেবারে ভিতরে ঢুকে, ভিতরে বসে বাংলাদেশবিরোধী-জারজশয়তানগোষ্ঠীর নির্দেশে টকশো, রঙশো, ঢঙশো, তৃতীয়মাত্রা, চতুর্থমাত্রা, পঞ্চমমাত্রা, ষষ্ঠমাত্রা, ভিন্নমাত্রা, অতিমাত্রা, চাপামাত্রা, গোলটেবিলবৈঠক, সুশীলবৈঠক, বুদ্ধিজীবীবৈঠক, বিশিষ্ট নাগরিকবৈঠক, নগ্নবৈঠক, জারজবৈঠক ইত্যাদি নামে একের-পর-এক শয়তানীঅনুষ্ঠানের জন্ম দিয়ে দেশে বিচারাধীন-যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে যারপরনাই শয়তানীপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একজোট হয়ে এইসব ‘টকশো-তৃতীয়মাত্রা’ জাতীয় যাবতীয় শয়তানী ও জারজ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শয়তানী ও জারজ বক্তব্য প্রদান করে দেশের সার্বিক স্থিতিশীল পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে সেই ঘোলাপানিতে নিজেদের স্বার্থহাসিলের শয়তানী-মাছশিকার করতে চাচ্ছে। কিন্তু বাংলার জনগণ এইসব পাষণ্ড আর নিত্যনতুন গজিয়ে উঠা এইসব নতুনধাঁচের পুরাতনজাতের অথচ নতুনচেহারার দুর্বৃত্তকে তা করতে দিবে না। আর আমি মনে করি: আস্তে-আস্তে এইসব মুখচেনা দুর্বৃত্তকে একদিন আমাদের বাংলাদেশের বুকে সরাসরি ‘জাতীয় শয়তান’ হিসাবে ঘোষণা করা হবে। কারণ, সুনির্দিষ্ট-প্রমাণসাপেক্ষে এরা আমাদের রক্তভেজা সোনার বাংলাদেশের ‘জাতীয় শয়তান’ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাই, এদের প্রাপ্য সম্মান এদের এখনই বুঝিয়ে দেওয়া ভালো। আর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দিনের-পর-দিন এইজাতীয় শয়তানদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির জোগান দিয়ে প্রতিপালন করার কোনো মানেই হয় না। এদের এখনই নির্মূল করতে হবে। দেশের শত্রুকে প্রতিপালন করার জন্য আমরা আর কতোকাল দেশের খাদ্যশস্যের জোগান দেবো? এইবার এই শয়তানদের দমন করতে হবে। আর এদের দমন করার দায়িত্ব আমাদের এই রাষ্ট্রের।

বাংলার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্বনামধন্য গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘কাদের সিদ্দিকী’ নামকাওয়াস্তে এক মুক্তিযোদ্ধা। আসলে, সে চুক্তিযোদ্ধা। তাই, সে টাকার বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। ১৯৭১ সালে, সে সরাসরি কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। আর সে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর স্নেহভালোবাসাকে পুঁজি করে নিজের ইমেজ-আখের গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু প্রতিদানে সে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের জন্য কিছুই করেনি। সে টাঙ্গাইলের কোনো মুক্তিযোদ্ধার জন্যও কখনও কিছু করেনি। বরং তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালেই মুক্তিযোদ্ধানিধনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বীরমুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মুক্তিযোদ্ধা ও মানুষহত্যা করতে তার ভালো লাগে। তাই, সে বাংলাদেশের হত্যাকারীদের শিরোমণি জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসে। মূলত আজ কাদের সিদ্দিকী মানে এক চূড়ান্ত ভণ্ডামি।
এই আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ওরফে ‘গামছাসিদ্দিকী’ ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১০ই জানুআরি পর্যন্ত অত্যন্ত নগ্নভাবে বিএনপি-জামায়াত নামক চারদলীয় রাজাকারজোটসরকারের দালালি করে শত-শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বর্তমানেও সে বিএনপি-জামায়াতের বিশ্বস্ত দালাল। তাই, সে সম্পূর্ণ অসৎউদ্দেশ্যে রাজনীতির নামে গঠন করেছে এক শয়তানী রাজনৈতিক দল: ‘কৃষক-শ্রমিক-জনতা-লীগ’ তথা ‘জাতীয় গামছাপার্টি’ তথা ‘শয়তান-দালাল-লীগ’। এই তথাকথিত ও শয়তানী রাজনৈতিক দলের ভালো কোনো উদ্দেশ্য নাই। শুধু মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র সপক্ষশক্তি: বাংলাদেশআওয়ামীলীগের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্যই এখানে কতিপয় ‘জাতীয় শয়তান’ আজ রাজনৈতিক ছদ্মাবরণে একতাবদ্ধ হয়েছে। আর বর্তমানে একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের নিকট থেকে শত-শত কোটি টাকা ঘুষ খেয়ে তাদের বাঁচাতে সে বর্তমানে গলায় গামছা বেঁধে নানান শয়তানী করে বেড়াচ্ছে। এই কাদের সিদ্দিকী অতিসম্প্রতি টাঙ্গাইলের কতিপয় পাপিষ্ঠদের এক জনসভায় বলেছে: ‘শেখ হাসিনা অহেতুক যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে... বঙ্গবন্ধুইতো রাজাকারদের-যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন... ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচার জাতীয়ভাবে হতে পারে না... আমি যদি রাজাকার হই তাহলে বঙ্গবন্ধু রাজাকারের কমান্ডার...।’ কাদের সিদ্দিকী সরাসরি সাঈদীর পক্ষে কথা বলেছে। তার এইসব অপকাণ্ডের জন্যই লোকজন এখন তাকে ‘রাজাকার’ বলে।
সে তার বর্তমান দেশবিরোধীঅপকাণ্ডের দায়ে জনগণকর্তৃক প্রদত্ত এবং নিজের পাপে অর্জিত ‘রাজাকারে’র খেতাব ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে একের-পর-এক নানান ধরনের শয়তানী-কথাবার্তা বলেছে এবং এখনও বলছে। কিন্তু এসব শয়তানীকথার মানে কী? কাদের সিদ্দিকীর কথার মানে হচ্ছে—যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দাও।
ওরা যেন তার বাপ হয়। আর সে তার বাপদের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ খেয়ে তাদের বাঁচাতে এখন হিমশিম খাচ্ছে। কারণ, দেশের জনগণ এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অনড় ও অটল। তাই, সে ভীতসন্ত্রস্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে বারবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে আর একের-পর-এক এইজাতীয় শয়তানী, ফাহেশা, আজেবাজে ও আবোলতাবোল কথা বলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে: স্বার্থের জন্য এরা একেকটা এখন স্বঘোষিত বিশ্বাসঘাতক ও নব্যরাজাকার। আর এদের কখনও ক্ষমা করা যাবে না। সবসময় আরও মনে রাখবে: আমৃত্যু যে-ব্যক্তি বা যে-মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা সারাজীবন ধারণ করতে পারবেন তিনিই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আর তিনি বা তাঁরাই সমগ্র জাতির নমস্য।
কিন্তু কাদের সিদ্দিকীরা স্বার্থের জন্য এখন পতিতক্ষেতে পরিণত হয়েছে। আর পতিতক্ষেতে শুধু আগাছা-পরগাছাই জন্মে থাকে। সেখানে কখনও ফসল উৎপাদিত হয় না। এরা নিজে নষ্ট হয়ে এখন জাতির চরিত্রহননের অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। এদের এখন শায়েস্তা করতে হবে। আর এদের চিরদিনের মতো শায়েস্তা করতে হলে—এদের সবাইকে অনতিবিলম্বে ধরে নিয়ে যেতে হবে গুলিস্তানের সেই ঐতিহাসিক কামানের কাছে। তারপর এদের সবাইকে একে-একে গুলিস্তানের কামানের সঙ্গে বেঁধে পালাক্রমে মাত্র তিন থেকে সাতদিন কয়েক ঘণ্টা যাবৎ একটুখানি বেধড়ক পেটালেই এদের মাথা থেকে এইজাতীয় শয়তানী-বদমাইশী করার শয়তানীভূতটা একনিমিষে নেমে যাবে। আর আমাদেরই এই কাজটা করতে হবে। আর কোনো দেশবিরোধীশয়তানকে ছাড় দেওয়া যাবে না। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা-নামধারী বহু ‘চুক্তিযোদ্ধা’ আমাদের সামনে এভাবেই হাজির হতেই থাকবে। এরা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের নিকট থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগলাভ করেছে। আর যুদ্ধাপরাধীদের হারাম টাকার স্বাদগ্রহণপূর্বক এদের একেকটা হয়ে উঠছে চরম বেপরোয়া ও সীমাহীন বেআদব। এরা নিজেদের কী ভাবে? এরা একেকটা কী? এরা এই দেশের কী যে এদের কথায় আমাদের চলতে হবে। এরা স্পষ্টভাবে মৌলবাদীদের দোসর। আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত দালাল। এবার একাত্তরের চিহ্নিত সর্বস্তরের যুদ্ধাপরাধী-দালালদের সঙ্গে এদেরও বিচার করতে হবে। ইনশা আল্লাহ, এদের বিচারও কেউ ঠেকাতে পারবে না। এই কাদের সিদ্দিকী কয়েক মাস আগে দেশের সংবিধান-সংশোধনের সময় আওয়ামীলীগের বিরোধিতার নামে বাংলাদেশের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের চিরশত্রু: একাত্তরের ঘাতক-দালালদের পক্ষে নির্লজ্জভাবে দালালি করেছে। আর সে দেশবিরোধীশয়তানের মতো বলেছে: ‘দেশে এখন ইসলাম নাই! দেশ থেকে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম উঠে গেছে! দেশে মুসলমানিত্ব নাই ইত্যাদি!’ দেশের মৌলবাদীশয়তানদের মতো দালালি আর শয়তানী করতেই এদের এখন ভালো লাগে। তাই, এরা জনসমর্থন হারিয়ে এখন শয়তানীপ্রাইভেট টিভিচ্যানেলের শয়তানীঅফিসে বসে শয়তানী-টকশো’র নামে ধাপে-ধাপে ক্রমান্বয়ে একের-পর-এক বিভিন্নরকমের শয়তানী করে যাচ্ছে। কিন্তু আর নয়। এরা আর কতো শয়তানী করবে? সব শয়তানীর তো একটা শেষ আছে। তাই, এদের এখানেই থামিয়ে দিতে হবে। কেউ-কেউ এখন টকশো-ব্যবসার কাজে নামার আগে নামের সঙ্গে একখানা মুক্তিযোদ্ধাশব্দ ও সনদ লাগিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে গলাবাজি করতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করে না। আরে, এদের সামান্যতম লজ্জাবোধ থাকলে তো এরা লজ্জাবোধ করবে! এরা আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শত্রু। এরাও পাকিস্তানের দালাল। এদের বিচারের দাবিতেও আমাদের আস্তে-আস্তে সোচ্চার হতে হবে। এই বাংলাদেশ আজ থেকে নতুন-পুরাতন কোনো দালালকে আর পুষতে পারবে না। তা সে, যেই হোক না কেন। এই দেশে কোনো দালালের ঠাঁই হবে না। এই কাদের সিদ্দিকী সবসময় মিথ্যাকথা বলে থাকে। আর মিথ্যাকথা বলতে তার নাকি খুব ভালো লাগে। তাই, সে ইদানীং অহরহ মিথ্যাকথা বলেই যাচ্ছে। সে বঙ্গবন্ধুর প্রতি মিথ্যাভালোবাসার অভিনয় করে থাকে। সেইজন্য সেদিন, সে টাঙ্গাইলের কথিত একটা জনসভা নামক শয়তানী-আলোচনাসভায় বলেছে: বঙ্গবন্ধু নাকি রাজাকারদের ক্ষমা করে দিয়েছেন! এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট, ভিত্তিহীন, ধৃষ্টতাপূর্ণ, অশালীন, বেআদবিপূর্ণ, কুরুচিপূর্ণ, শিষ্টাচার ও সৌজন্যবহির্ভূত একধরনের শয়তানী-কথাবার্তা। আর এভাবে সে প্রতিনিয়ত আমাদের বঙ্গবন্ধুর নামে মিথ্যা-কলঙ্কলেপন করে একাত্তরের পরাজিতগোষ্ঠী রাজাকার-শয়তানদের কালোহাতকে শক্তিশালী করার ব্যর্থপ্রচেষ্টা গ্রহণপূর্বক নিজের শয়তানী-ইমেজকে বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে। আজ থেকে তোমরা মনে রাখবে: যে বা যারা আমাদের বঙ্গবন্ধুকে গালি দেয় বা দিবে—তারা নিশ্চিতভাবে রাজাকার। আর এরা কে, কোন বংশের সন্তান তা আমাদের দেখার কোনো প্রয়োজন নাই। কারও পূর্বঅভিজ্ঞতাকে আমলে না নিয়ে বর্তমানের পারফরম্যান্সকে প্রাধান্য দিতে হবে। আরে, শয়তানতো শয়তানই। তার আবার বংশপরিচয় কী? শুনেছি, ইবলিশশয়তান নাকি ছয় লক্ষ বছর যাবৎ মহান আল্লাহর কথিত ইবাদত করেছিলো। আর সে দুনিয়ার কোথাও সিজদাহ দিতে নাকি বাকি রাখেনি। কিন্তু তার মনে ছিল শয়তানী। তাই, সে ধরা পড়ে গেল। আর শেষমেশ তার লাভ কী হলো? সে এখন বিশ্বের আদি-আসল একমাত্র ও একনাম্বার শয়তান। তাই, শয়তানের পতন অনিবার্য। শয়তান কোনোদিন নায়ক কিংবা মহানায়ক হতে পারবে না। আর শয়তান একদিন-না-একদিন ধরে পড়ে যায়। যেমন, ধরা পড়ে গেছে আমাদের দেশের এইসব শয়তান!
এই কাদের সিদ্দিকীরা ২০১৩ সালের ৫ই মে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শত্রু ও পাকিস্তানের দালালগোষ্ঠী ‘হেফাজতে ইসলাম’ ওরফে ‘হেফাজতে শয়তানে’র সঙ্গে কোলাকুলি করেছে। তারা বাংলাদেশবিরোধী এই ‘হেফাজতে শয়তানে’র সঙ্গে হাতমিলিয়ে সেদিন এই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করতে চেয়েছিলো। এদের সঙ্গে আরও ছিল বিএনপি-জামায়াতসহ দেশের কুখ্যাত ষড়যন্ত্রকারী মাহমুদুর রহমান মান্না; রাজাকারদের চিরকালীন মুখপাত্র ও বিকল্পধারার সভাপতি ডাক্তার একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী; সাবেক স্বৈরাচার ও সামরিকজান্তা এরশাদ; পাকিস্তানপন্থী এলডিপি’র সভাপতি কর্নেল অলি আহমেদ; ‘আমার দেশ’ পাকিস্তান নামক পত্রিকার সম্পাদকনামধারী শয়তানের জারজপুত্র মাহমুদুর রহমান ইত্যাদি। সেদিন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশরাষ্ট্র ধ্বংস করতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলাচত্বরে আগত এই ‘হেফাজতে শয়তানে’র নেতা-কর্মীদের ঢাকা-শহরের গাবতলী নামক স্থানে পানি পান করিয়েছে একটা কাদের সিদ্দিকী! এই হলো এদের মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়! এখন তোমরাই বলো এই কাদের সিদ্দিকী ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হয় কীভাবে? আর সে কীসের মুক্তিযোদ্ধা? এখানেই শেষ নয়, কাদের সিদ্দিকী এখন বিএনপিদের অন্যতম মুখপাত্র। আর বিএনপি-জামায়াত নামক চারদলীয় রাজাকারজোট-সরকার ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ১০ই জানুআরি পর্যন্ত বাংলাদেশে যে নারকীয় ও কাফেরি শাসন চালিয়েছিলো তারও সমর্থক ছিল এই কাদের সিদ্দিকী। সে বিএনপিদের সঙ্গে তৎকালীন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নানারকম শয়তানীবক্তব্য দিতো, আর কুখ্যাত স্বৈরাচার ও সামরিকজান্তা জিয়াউর রহমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো। আর সবখানে সে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে দিনরাত ফায়দা লুটতো। সে কখনও তৎকালে বিএনপি-জামায়াতের সেই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি। ২০১৩ সালে, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের শাহবাগে গড়ে উঠা ঐতিহাসিক গণজাগরণমঞ্চ-সম্পর্কেও এই কাদের সিদ্দিকী নানারকম শয়তানী ও লাগামহীন কথাবার্তা বলেছে। সে এখন একখান মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের জোরে দেশের ভিতরে একের-পর-এক লাগামহীন ও শয়তানী কথাবার্তা বলছে, এবং সে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। অথচ, এই কাদের সিদ্দিকীকে আমাদের বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে নিজপুত্র বলে স্বীকার করে তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। আর সে আজ এভাবেই পিতৃঋণশোধ করছে!
এদের সঙ্গে রয়েছে আরও দুই শয়তান: এর একটা হলো দৈনিক প্রথম শয়তানের আলো পত্রিকার কথিত সম্পাদক, রাজাকারসমর্থক ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক মতিউর রহমান এবং অপরটি হলো ‘দি ডেইলি স্টার’ নামক একটা শয়তানীপত্রিকার কথিত সম্পাদক, মুসলিমলীগপরিবারের কুখ্যাত সন্তান মাহফুজ আনাম। এই দুই শয়তানসম্পর্কে পরে আরও বিস্তারিতভাবে বলা হবে।

কাদের সিদ্দিকী আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর নামে মিথ্যাকথা বলেছে এবং এখনও বলছে ওই যুদ্ধাপরাধীদের স্বার্থে। কারণ, যুদ্ধাপরাধীরা তার পকেট ভরে দিয়েছে শত-শত কোটি টাকার মাধ্যমে। আর আসল সত্য হচ্ছে: আমাদের জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতালাভের পর নিতান্ত সাধারণ রাজাকারদের—যারা মানুষখুন, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, পাশবিকতা ইত্যাদি মানবতাবিরোধীঅপকর্মে নিয়োজিত হয়নি—শুধু তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমাঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও প্রকৃত রাজাকার ও প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের—যারা পাকবাহিনীর পদলেহন করতে-করতে নির্বিচারে মানুষখুন, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি পাপাচারে ও মানবতাবিরোধীঅপকর্মে নিয়োজিত হয়েছিলো—তাদের কখনও ক্ষমা করেননি। বরং তিনি ১৯৭২ সালে, দালালআইন প্রণয়ন করে ১৯৭৩ সালে তা বাস্তবায়নপূর্বক ৭৩টি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একাত্তরের চিহ্নিত ও কুখ্যাত ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কাজ শুরু করেছিলেন। আর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দুই সহস্রাধিক যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ অতিদ্রুত শুরু হয়েছিলো। সেই সময় ছয়টা যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডসহ ৭৫২জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও হয়েছিলো। কিন্তু ১৯৭৫ সালে, আমাদের, বাঙালি-জাতির ইমামনেতা: হজরত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করে খুনীচক্র। এইসময় এজিদবংশীয় নেতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে দখল করে বঙ্গবন্ধু-সরকারের প্রবর্তিত ১৯৭৩ সালের দালালআইন বাতিল করে জেলখানা থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়। আর তাদের নিয়ে বিশ্বশয়তানীর উদ্দেশ্যে ১৯৭৮ সালে রাজাকারদের আশ্রয়ভূমি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে শয়তানের দুর্গ—বিএনপি। আর বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের নেতা, পাকিস্তানীনাগরিক গোলাম আযমকে স্পেশাল বিমান পাঠিয়ে তাকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে এনে আবার তাকে দিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানকে’ সংগঠিত করতে থাকে। এই জিয়াউর রহমানই শয়তানীপ্রক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা আন্তঃজেলা-ডাকাতদলের মতো সশস্ত্র কায়দায় দখলপূর্বক ১৯৭১ সালের বীরমুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে থাকে। সে জানতো, এরা তার পথের কাঁটা। তাই, সে অভিজ্ঞশয়তানের মতো কূটকৌশলে একের-পর-এক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে থাকে। এই জিয়াউর রহমানই নিজের রাষ্ট্রক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য শুধু সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে চাকরিত তিন হাজার অফিসারসহ দশ হাজার সাধারণ সৈনিককে হত্যা করেছে। এই জিয়াউর রহমানই বীরউত্তম-খেতাবধারী পঙ্গুমুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে এক প্রহসনমূলক বিচারের নামে শয়তানীকায়দায় তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অথচ, আজ অনেকে এই জিয়াউর রহমানকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে থাকে। তবে কথাটা আংশিক সত্য। ১৯৭১ সালে, জিয়াউর রহমান মেজরপদপ্রাপ্ত আর্মি-অফিসার হওয়ার সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১নাম্বার সেক্টরের কমান্ডার হিসাবে কিছুদিন দায়িত্বপালন করেছিলো সত্য। কিন্তু সে এই সেক্টর-কমান্ডার থাকাকালীন সময় একদিনও কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। এই হচ্ছে জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ! আরে, সেই সময় দেশে আর্মি-অফিসারের অভাব ছিল বলেই তার মতো একটা মেজরকে এতোবড় একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু জিয়াউর রহমান এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানই ‘রাজাকারদের পিতা’। আর এই রাজাকারদের পিতা একটা জিয়াই আজকের কাদের সিদ্দিকীর মতো পথভ্রষ্টদের আদর্শপিতা। তাই, সে ক্রমাগতভাবে বিএনপিদের পক্ষে দালালি করে খাচ্ছে। আর একটা কাদের সিদ্দিকী ১৯৭১ সালের কথিত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে তাদের পক্ষে দালালি করতে সরাসরি মাঠে নেমেছে! কিন্তু কাদের সিদ্দিকীসাহেব! ফাঁকামাঠে গোল দিয়ে নেতা হওয়ার সুযোগ এখন আর নাই। ১৯৯৬ সালে, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আমাদের জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের সরকার গঠিত হলে টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে কাদের সিদ্দিকী আওয়ামীলীগের টিকিটে-সমর্থনে এম.পি. নির্বাচিত হয়। এম.পি. নির্বাচিত হয়েই সে দলীয় নিয়মশৃঙ্খলাভঙ্গ করে মাস্তানী শুরু করে দেয়। সে দলীয়পরিচয়ে তৎকালে ব্যাপক লুটপাট, সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতি শুরু করতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমাদের জাতির জনকের কন্যা তাকে সে সুযোগ না দেওয়ায় সে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশআওয়ামীলীগের উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একসময় দলের ভিতরে সে কোনো সুবিধা করতে না পেরে তার কিছুসংখ্যক চামচাগামছা নিয়ে আওয়ামীলীগ থেকে বেরিয়ে যায়। এখন এভাবেই চলছে তার অভিভাবকহীন বেপরোয়া জীবন। আশা করি, সে একসময় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। বটবৃক্ষ থেকে ক্রমান্বয়ে অসংখ্য পাতা ঝরে পড়ে। কিন্তু তাতে বটবৃক্ষের কিছুই আসে যায় না—পাতাগুলোই শুধু নষ্ট হয়ে যায়। আর মনে রেখো: গাছ থেকে সেইসব পাতাই ঝরে যায় যাদের আর টিকে থাকার কোনো সামর্থ্য থাকে না। গাছের নষ্টপাতাই ঝরে যায়। কোনো মরাপাতা গাছে থাকতে পারে না। গাছে থাকে শুধু তরতাজা পাতা। এভাবে, মাঝে-মাঝে গাছ থেকে দুই-একটা পাতা ঝরে গেলে গাছের কিছুই হয় না। আর যুগ-যুগ ধরে শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী বটবৃক্ষরা বটবৃক্ষই থাকে। তাই, এরাও শয়তানী করে আমাদের কিছুই করতে পারবে না। ইনশা আল্লাহ, এই দেশের পবিত্র মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। আর সঙ্গে-সঙ্গে যারা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দালালি করছে, একদিন তাদেরও বিচার হবে, ইনশা আল্লাহ। এদের শাস্তি অবধারিত, ইনশা আল্লাহ।

এই দেশে বর্তমানে সুশীলসমাজের নামে একটি চিহ্নিত জারজগোষ্ঠী সরাসরি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী তথা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীঘাতকচক্রের পক্ষাবলম্বন করেছে। এরা একেকটা নিজেদের সবসময় সুশীলসমাজের প্রতিনিধির পরিচয়ে একশ্রেণীর দেশবিরোধীজারজ প্রাইভেট রেডিও, টেলিভিশনচ্যানেলে, পত্রপত্রিকায় যা-খুশি তা-ই বলছে। এরা মনে করে: এরা যা বোঝে—তা আর কেউ বোঝে না! আর এরা নিজেদের সবসময় সবজান্তা মনে করে থাকে। তাই, এরা রাতের আঁধারে বাংলাদেশের মাটিতে ভুঁইফোঁড়ের মতো গজিয়ে উঠা একশ্রেণীর ‘জারজ-প্রাইভেট’ রেডিও-টেলিভিশনে ‘টকশো’ অথবা ‘তৃতীয় মাত্রা’ কিংবা ‘চতুর্থ মাত্রা’ কিংবা ‘স্ট্রেইট লাইনে’র নামে জনগণের সামনে লাগামহীন বক্তব্য দিয়ে দেশের ভিতরে একটি জারজচক্রকে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর জন্য ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এই জারজচক্রই নিজেদের আসল পরিচয় আড়াল করে একাত্তরের মতো দেশের ভিতরে একটি গোলোযোগসৃষ্টির উদ্দেশ্যে দিনরাত ‘টকশো’ নামে এক ‘জারজশো’র অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে। এইসব জারজ নিজেদের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য নামের আগে কখনও-কখনও সাংবাদিক, ডাক্তার, ডক্টর, সাবেক ভিসি, অধ্যাপক, অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, মাওলানা, মুফতী, আল্লামা, মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী, গবেষক, কথিত ভাষাসৈনিক, কথিত মুক্তিযোদ্ধা, কথিত অর্থনীতিবিদ, কথিত উন্নয়নকর্মী, কথিত পরিবেশবিদ, কথিত নগরপরিকল্পনাবিদ, কথিত অপরাধবিশেষজ্ঞ ইত্যাদিপরিচয়ে নিজেদের মনগড়া জারজ-জারজ বক্তব্য দিয়ে দেশের ভিতরে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলাসৃষ্টির তথা অশুভপাঁয়তারাসৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। এদের দেখামাত্রই যেখানে-সেখানে জুতাপেটা করা দরকার। আর আজ থেকে মনে রাখবে: এই বাংলাদেশে যে বা যারা বা যে-গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শচেতনার বিরুদ্ধে কথা বলবে তারা সরাসরি জারজসন্তান—তাদের জন্মের কোনো ঠিক নাই। আর বাঙালি-জাতি এই জারজদের ধ্বংস চায়। আমাদের দেশের স্বার্থে এই জারজদের ধ্বংস করতেই হবে। এরা আমাদের সমগ্র জাতিসত্তার প্রধান শত্রু।
আমরা মানুষ। আমরা মুসলমানও। আমরা পবিত্র ইসলামধর্মেও বিশ্বাসী। আর আমরা নিজেদের সবসময় মানুষ ও বাঙালি ভাবতেই বেশি ভালোবাসি। আমরা সবসময় মানুষ আর মানবতার পক্ষে। অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর স্বাধীনবাংলাদেশে নবগঠিত বিএনপি ও তাদের দোসর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের ধর্ম হচ্ছে—মানুষখুনধর্ম। আর এরা সবাই মিলেমিশে খুনের মাধ্যমেই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখলপূর্বক বাংলাদেশে ইসলামধর্ম-বিকৃতিসহ বাংলাদেশের ইতিহাসবিকৃতিও শুরু করে দেয়। পরবর্তীতে এরা বাংলাদেশে কুকৌশলে এজিদতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনা করে দেশটাকে আবার শয়তানের পাকিস্তান বানাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এরা আবার একদলীয় একজোটে পরিণত হয়েছে। এবারও সম্মিলিতভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে। আর সেইসঙ্গে এদের নতুন-নতুন দালালদেরও রেহাই দেওয়া যাবে না। আর জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই বাংলাদেশ থেকে নতুন-পুরাতন সকল রাজাকারকে নির্মূল করতেই হবে। এই হোক আমাদের সবার আজকের অঙ্গীকার।”

এরপর লিটু মিয়া একটু থামলেন। আর চারিদিকে তাকিয়ে তার শ্রোতৃমণ্ডলীর পরিস্থিতি ও বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন: এরা তার নিকট থেকে আরও কিছু শোনার জন্য একেবারে উদগ্রীব হয়ে আছে। লিটু মিয়া তাদের নিরাশ করতে চাইলেন না।

অধ্যাপক লিটু মিয়া একটু পরে বললেন, “এবার তোমরা আরও মনোযোগ দিয়ে এই কথাগুলো শুনবে। এবার আমি একাত্তরের পাকিস্তানীদের ও তাদের এদেশীয় দালাল তথা যুদ্ধাপরাধীদের ভয়াবহ নৃশংসতাসম্পর্কে কিছুকথা বলবো। আমার দৃষ্টিতে পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো সেনাবাহিনী এতোটা নৃশংসতার পরিচয় দেয়নি। আর পৃথিবীর সর্বকালের সর্বকুখ্যাত সেনাবাহিনী হচ্ছে—পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। আর সেনাবাহিনীর পরিচয়ে এরা এক ভয়াবহ বেজন্মাবাহিনী।”

কক্ষের ভিতরে অবস্থানরত এবার সকলে নড়েচড়ে বসলো। তাদের চোখেমুখে এসব শোনার ভীষণ আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ একটুখানি নড়াচড়ার প্রয়োজন অনুভব করলেও সহজে নড়তে চাচ্ছে না। কারণ, পাছে এতে কারও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

অধ্যাপক লিটু মিয়া ধীরস্থিরভাবে একসময় আবার বলতে শুরু করলেন:

“এবার তোমাদের সামনে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনীর প্রধান দোসর জামায়েতে ইসলামী পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন শান্তিকমিটি, রাজাকারবাহিনী, আলবদরবাহিনী ও আলশামসবাহিনীর নৃশংস শয়তানী এবং চূড়ান্ত বর্বরতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আর এই কথাগুলো তোমরা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করবে। কারণ, এই কথাগুলোই আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে হবে। আর এগুলোই বাংলার আদি-আসল ইতিহাস। আর বাংলার এই চিরসত্য ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের জন্মপরিচয়কে ভুলে যাওয়া। তাছাড়া, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বর্বরতার দৃষ্টান্ত আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯৭১ সালে, কথিত ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানীরা নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো—আর সাঁঝের শূয়রের মতো। একদিকে সাক্ষাৎ শয়তান পাকবাহিনী অপরদিকে ইবলিশশয়তানের প্রধান দোসর রাজাকারবাহিনী। আর এদের মুখে ছিল ধর্মের কথিত বাণী। ১৯৭১ সালের রাজাকারগোষ্ঠীর তুলনা চলে একমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংসজীব হায়েনার সঙ্গে। এমনকি এরা তখন রক্তলোলুপ হায়েনাকেও হার মানিয়েছিলো। এদের হাত থেকে কেউই বাঁচতে পারেনি। এমন কোনো অপরাধ নাই যে, তারা করেনি। আর এসব করেছিলো তারা লোকদেখানো মিথ্যা ধর্মের দোহাই দিয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫-এ মার্চের কালরাত্রিতে অতর্কিতে আমাদের সমগ্র ঘুমন্ত জাতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানীরা যে শয়তানী ও যে জারজ আগ্রাসন চালিয়েছিলো—তার নজির পৃথিবীতে নাই। আর তারা এরই নাম দিয়েছিলো ‘অপারেশন সার্চলাইট’! তোমরা সবসময় মনে রেখো: আমরা সমগ্র জাতি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এরা আমাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায়। এদের ভিতরে বিন্দুপরিমাণ মানবতাবোধ ছিল না। বস্তুতঃ এরা ছিল ক্ষমতালোভী নৃশংস ও ঘৃণ্য জীব। বাংলাদেশে রাজাকারবাহিনী তথা শান্তিকমিটির প্রধান আমীর ছিল: শয়তানপুত্র গোলাম আযম। আর তার অধীনে তালিকাভুক্ত রাজাকার ছিল কমপক্ষে ৬০হাজার। এই রাজাকারদের মধ্যে আবার রেজিস্টার্ড ও ননরেজিস্টার্ড ভাগ ছিল। এগুলো ছাড়াও সারাদেশে এদের সাহায্যকারী-সহযোগী আরও ষাট-সত্তর হাজার রাজাকার ছিল। আর এই রাজাকাররা বাংলাদেশের খেয়েপরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ও নাশকতা শুরু করে। আর এইসব রাজাকারের মদদদাতা ছিল শয়তানের জারজপুত্র গোলাম আযম। এভাবে, সে এবং তার অধীনস্থ রাজাকাররা ১৯৭১ সালে, মহান আল্লাহ-রাসুলকে বাদ দিয়ে তদস্থলে শয়তান-পাকিস্তানীদের একমাত্র প্রভু মেনে তাদের সেবায় লেগে পড়ে। শয়তানের জারজপুত্র গোলাম আযমের অধীনে সারাদেশে তার ছিল কয়েক ডজন বিশেষ সহকারী-সহযোগী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—চাঁদপুর-জেলার ফরিদগঞ্জের মাওলানা-লকবধারী ও শয়তানের জারজপুত্র আব্দুল মান্নান; বগুড়ার তথা জয়পুরহাটের কুখ্যাত পাকিস্তানীগোলাম আব্বাস আলী খান; বগুড়ার কুখ্যাত আরেক রাজাকার আব্দুল আলীম; খুলনার শয়তানের জারজপুত্র শাহ আজিজুর রহমান; যশোরের কুলাঙ্গার মশিউর রহমান যাদু মিয়া; পাবনার সর্বকুখ্যাত শয়তান মতিউর রহমান নিজামী; পাবনার আরেক শয়তানপুত্র আব্দুস সোবহান; ফরিদপুরের কুখ্যাত শয়তান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ; ফরিদপুরের আরেক কুলাঙ্গার শয়তান আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার; পিরোজপুরের কুখ্যাত রাজাকার ও ভ-শয়তান দেলোয়ার হোসেন সাঈদী; ঢাকার মিরপুরের কসাইখ্যাত শয়তানের জারজপুত্র আব্দুল কাদের মোল্লা; চট্টগ্রামের কুখ্যাত রাজাকার ও শয়তানের জারজপুত্র ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং তদীয় নাজায়েজপুত্র ও রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী; শেরপুরের কুখ্যাত রাজাকার কামারুজ্জামান ইত্যাদি। অন্যান্য অঞ্চলের কুখ্যাত রাজাকাররা হচ্ছে: মীর কাশেম আলী, মাওলানা ওবায়দুল হক, মাওলানা মহীউদ্দীন খান, আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ ওরফে একেএম ইউসুফ, ইংল্যান্ডে পলাতক আলবদরবাহিনীর অন্যতম দুই কমান্ডার: চৌধুরী মাইনুদ্দীন ও লুৎফর রহমান ইত্যাদি।

এবার শুনে নাও: ১৯৭১ সালে, পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনীর প্রধান সহযোগীসংগঠন জামায়াতে ইসলামী পূর্বপাকিস্তান ও তাদের ইসলামীছাত্রসংঘ, মুজাহিদবাহিনী এবং তাদের অপরাপর সমমনা দলগুলো কী-এক ভয়ংকরভাবে বেপরোয়া হয়ে কী জঘন্য অপকর্ম করেছিলো। আমি তোমাদের সামনে এবার খুব সংক্ষেপে তা তুলে ধরছি:

১. ১৯৭১ সালে, এই রাজাকারগোষ্ঠী পাকিস্তানী-আর্মিদের সরাসরি সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করতো। এরা পাকিস্তানী-আর্মিদের নবী-রাসুল কিংবা ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি মান্য ও ভক্তি করতো। পাকিস্তানী-আর্মিরা ছিল এদের বাপের চেয়েও ‘বড়বাপ’। তাই, এরা সেদিন, বাংলাদেশের অসহায় মানুষের বুকে লাথি মেরে পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী নামক জানোয়ার-বাহিনীর প্রতি আনুগত্যপ্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। এরা ১৯৭১ সালে, বাঙালি-জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানী-কাফেরবাহিনীকে সবরকমের সাহায্য-সহযোগিতা করতো। বাংলাদেশের মানুষকে এরা ভালো না বেসে—এরা ভালোবেসেছিলো সেদিনের কাফের ও শয়তান পাকিস্তানীদের। তাই, এরা আমাদের বীরমুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য সবসময় পাকবাহিনীর আগে-আগে কিংবা পিছনে-পিছনে চলতো। আর এভাবে তারা আমাদের নিরস্ত্র বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়িগুলো তাদের নিজস্বপিতা ভয়ংকর পাকবাহিনীকে দেখায়ে দিতো। রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী দিনের বেলা কিংবা রাতের আঁধারে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো পাকিস্তানী-আর্মি আমাদের—মানে, বাঙালিদের বাড়িঘর চিনতো না। এরা কখনও চিনতো না—কে মুক্তিযোদ্ধা, আর কে আওয়ামীলীগার। আর এরা কখনও জানতো না, কে পাকিস্তান-শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু সেই সময় পাকবাহিনীকে এসব চিনিয়ে দিতো ইবলিশশয়তানের খাসমুরীদ, পাকআর্মিদের চিরদোসর, বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এইসব জাতীয় কুলাঙ্গার—রাজাকারবাহিনী। আসলে, এদের কোনো ধর্ম ছিল না। এরা সেদিন, পবিত্র ইসলামধর্মের দোহাই দিয়ে তখনকার কাফের, সামরিকজান্তা আর শয়তানের বংশধর পাকবাহিনীর পক্ষে নিজদেশ, নিজজাতি তথা বাঙালি-জাতির বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধী-মানবতাবিরোধী আগ্রাসন চালাতে এতটুকু ইতস্ততঃ করেনি। ১৯৭১ সালে, এদের মুখে ছিল বিসমিল্লাহ আর দাড়ি। আর মাথায় ছিল সাদা টুপি। আর পরনে ছিল ধবধবে সাদা—আর সাদার চেয়ে আরও সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। ব্যস, এই ছিল সেদিনের পাকিস্তানী-দালালদের ধর্ম। আর এরা এইভাবে পবিত্র ইসলামধর্মের দোহাই দিয়ে আর কথিত ধর্মীয় লেবাসের খোলসে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ-মুসলমানদের হত্যা করতো। ঊনিশশ’ একাত্তরে নামাজরত মুসল্লীদেরও হত্যা করেছে এই রাজাকারবাহিনীর সদস্য নামক পাকিস্তানের দালালরা। পাকিস্তানীশয়তানরা একাত্তর সালে আমাদের বলতো অমুসলমান, হিন্দু, বিধর্মী ইত্যাদি। অথচ, পবিত্র কুরআন-হাদিসের আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ১৯৭১ সালে এই পাকবাহিনী আর রাজাকারবাহিনী ছিল সরাসরি কাফের। কারণ, মহান আল্লাহ মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্টভাষায় বলেছেন: ‘আর কেউ কোনো মু’মীনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে, তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহর গজব ও লা’নত তার প্রতি, তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন তার জন্য মহাশাস্তি।’ মহান আল্লাহ আরও বলেন: ‘আমি বনীইসরাঈলের প্রতি বিধান দিয়েছিলাম যে, যদি কেউ কাউকে হত্যা করে নরহত্যা কিংবা দুনিয়ায় ফাসাদসৃষ্টি করা ছাড়া সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করলো। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে, সে যেন সব মানুষেরই প্রাণ রক্ষা করলো।’ আমাদের প্রিয়নবী—মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়; জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল কোন্ ব্যক্তি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার অত্যাচার হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ অপর হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই, সে তার প্রতি অত্যাচার করবে না।’ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র আরও বলেন, ‘সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলমান, যার মুখ ও হাত হতে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ কিন্তু ১৯৭১ সালে, আমরা বাস্তবে কী দেখেছি? আর তখন আমাদের উপর অত্যাচারনির্যাতন করার জন্য একদিকে ছিল পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী অপরদিকে ছিল নরপশু রাজাকারবাহিনী। তারা আমাদের উপর যে অমানুষিক ও অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে তার দৃষ্টান্ত এই পৃথিবীতে নাই। তাই, এরা মুসলমান হয় কীভাবে? এরা ছিল ফিরআউন, নমরুদ, সাদ্দাদ, হামান ও এজিদশয়তানের মতো কোনো কুখ্যাত কাফেরশয়তান।
২. ১৯৭১ সালের রাজাকাররা পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনীর পশুদের মতো সবসময় পরিকল্পিতভাবে বাংলার নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করতো। তাদের মূল টার্গেট ছিল: মুক্তিযোদ্ধা আর আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী। বাংলাদেশের ৮৬হাজার গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধা-ভাইয়েরা। তাঁরা আমাদের এই পবিত্র মাটির একটি কণাও পাকিস্তানী-নরপশুদের দখলে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম দিকে প্রায় খালি হাতেই রুখে দাঁড়িয়েছিলো। পরে তাঁদের হাতেও অস্ত্র এলো। আর তাঁরা কৌশলগত কারণে শুরু করলো পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গেরিলাযুদ্ধ। এতে বাঙালি-জাতি অভাবিত সাফল্যলাভ করতে লাগলো। কিন্তু আমাদের এই সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়ালো পাকিস্তানের পা-চাটা-কুকুরগুলো তথা সর্বস্তরের রাজাকারবাহিনী। তারা তাদের পাকিস্তানীপিতাদের তথা পাকিস্তানীআর্মিদের আমাদের গ্রামগুলো চিনিয়ে দিলো। তারা আমাদের পায়ে হাঁটা মেঠোপথও চিনিয়ে দিতে লাগলো। এইসব নীরবপথে নীরবে হেঁটে-হেঁটেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধপরিচালনা করতো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। আর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলো থাকতো আমাদের লোকালয়ের গাছপালাপরিবেষ্টিত লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাই, কেউ সহজে তাঁদের খোঁজখবর জানতো না। কিন্তু একাত্তরের রাজাকার-কুলাঙ্গারগুলো তো এই মাটিরই জারজসন্তান—তারা কৌশলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলো খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে খবর দিতো তাদের পাকিস্তানীপিতাদের ক্যাম্পে। অনেক সময় খুব ভালোমানুষ সেজেও রাজাকাররা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলো চিনে ফেলতো। দেখা যেতো, একটা রাজাকার কথিত নামাজ পড়ে রাস্তায় বের হয়েছে, এমন সময় তার সঙ্গে দেখা হলো কতিপয় কিংবা একজন মুক্তিযোদ্ধার। তাঁকে বা তাঁদের সামনে পেয়ে রাজাকারটি কতো ভালোমানুষ সেজে বলতো: ‘আহা, বাবা কোথায় থাকো? কতোদিন তোমাদের দেখি না? আর পাকিস্তানী-কাফেররা যে-ভাবে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এর একটা বিহিত করা উচিত।’ আর তখন ওর কথা শুনে হয়তো সেই মুক্তিযোদ্ধা-ছেলেটি খুশি হয়ে তাকে সালাম দিয়ে ভালোমানুষের মতো বলে ফেলতো: ‘চাচা, আপনে কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সবসময় তৈরি আছি।’ তখন সেই কপটাচারী-নীরবঘাতক, মুসলমানের পরিচয়ে, নামাজীর বেশধারী, আপাদমস্তকভণ্ড বলতো, ‘তা বাবা, তোমরা কোথায় ক্যাম্প করেছো? একটু সাবধানে থাকবে। আর পাকিস্তানী-কাফেররা যেন ঠিক না পায়। ওদের এই দেশের মাটি থেকে তাড়াতেই হবে।’ তার কথা শুনে ছেলেটি হয়তো খুব খুশি হয়ে, আর কমান্ডারের আদেশ ভুলে একসময় বলে ফেললো: ‘চাচা, আমরা পাকশী-স্কুলে ক্যাম্প করেছি। সময় পেলে আসবেন।’ আর হ্যাঁ, ওই রাজাকার একদিন সময় করেই ওর একাধিক পিতা পাকিস্তানীআর্মিদের সঙ্গে নিয়েই অতর্কিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আক্রমণ করতো। এই ছিল এই শয়তানদের ধর্মবোধ। তাই, এরা মানুষ কিনা—মুসলমান কিনা, তা তোমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে না। তোমরা শুধু ওদের ওই অতীত-ইতিহাসটা, একাত্তরের অপকর্মের চিত্রটা একবার আত্মস্থ করে দেখো আর নীরবে ভাবো: এরা সত্যি-সত্যি কী? আর নিশ্চয় সরাসরি জবাব পাবে: এরা এই বাংলার সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট পশু।
৩. শুনেছি, পশুদেরও নাকি ধর্ম থাকে। কিন্তু আমার জানামতে, ঊনিশশ’ একাত্তরের রাজাকারদের কোনো ধর্ম ছিল না। বাইরে তারা ধর্মীয় ভাব দেখায়ে নিজেদের মুসলমান-দাবি করেছিলো ঠিকই—কিন্তু ভিতরে-ভিতরে তারা এজিদের মতো সীমাহীন অধর্ম কায়েম করেছিলো। আর কিছু হলেই তারা সবসময় ধর্মের দোহাই দিয়ে থাকে। আর তারা নিজেদের খুব ধার্মিক ভাবে। আর তারা নিজেদের খুব মুসলমান মনে করে। আসলে, তারা কেউই মুসলমান ছিল না বলে তারা পাকিস্তানীদের সঙ্গে লোমহর্ষক গণহত্যায় অংশ নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। তারা পাকবাহিনীর সঙ্গে নিজেরা নিজহাতে এই বাংলার নিরীহ ভালোমানুষদের হত্যা করেছে। পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী তাদের হাতে তুলে দিতো রাজাকারি-পোশাক ও রাজাকারি-শক্তিবৃদ্ধির জন্য স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। এই রাইফেলের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের অসহায় মানুষের ঘরবাড়ি নির্ভয়ে লুট করতো। এরা এইসব জঘন্য কাজ করে নিজেদের খুব বীর ভাবতো। আর এই শয়তানী ও জঘন্য কাজকে তারা জায়েজ মনে করে এবং শয়তানীকাজের মাধ্যমে অর্জিত ও লুণ্ঠিত মানুষের সম্পদকে তারা ‘গনীমাতের মাল’ বলে প্রচার করতো। আর কোনো ঘরবাড়ি লুট করতে না পারলে তারা তাতে আগুন ধরিয়ে দিতো। তারা বেছে-বেছে সবসময় মুক্তিযোদ্ধাদের ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামীলীগারদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতো। কারণ, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ও আওয়ামীলীগারদের পাকিস্তানের প্রধান শত্রু মনে করতো। আর সেই সময় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানকে চিরতরে কবর দিতে সদাতৎপর ছিল। রাজাকাররা কি শুধু মানুষের ঘরবাড়ি লুট করতো? তা নয়, তারা মানুষের হাঁস, মুরগী, গোরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ইত্যাদি সবকিছু তস্করের ন্যায় আর বুনোদস্যুদের মতো লুণ্ঠন করতো। সেই সময় মানুষ হয়তো হঠাৎ পাকবাহিনীর ভয়ে পালাতে গিয়ে সময়ের অভাবে তার ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীসহ দামি-দামি জিনিসপত্র কোনোকিছু সঙ্গে না নিয়ে শুধু নিজের জীবন বাঁচাতে সবকিছু ফেলে একদিকে ছুটে পালিয়েছে। যেখানে মানুষগুলোর জীবনের এবং তাদের থাকা-খাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নাই—সেখানে তারা অহেতুক এইসব মূল্যবান সামগ্রী নিজের সঙ্গে নিয়ে কী করবে? আর সেই সময় মানুষের এই অসহায়ত্বের সুযোগটাকে পুরাপুরি কাজে লাগিয়েছে নরাধম, নিকৃষ্ট ও পশুতুল্য রাজাকাররা। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের নিজেদের ঘরবাড়িতে ফেরা দরকার—তবুও তারা বাড়িঘরে ফিরতে পারছে না পাকবাহিনীর ভয়ে। আর এই সুযোগে এই দেশের ভিতরে জন্ম নেওয়া কিছুসংখ্যক একজাতীয়-একদলীয়-বিজাতীয় হারামখোর, লুটেরা, কুলাঙ্গার, দুর্বত্ত ও রাজাকারগোষ্ঠী সেই সময় অসহায় মানুষের ঘরবাড়ির নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী অতি আনন্দের সঙ্গে লুণ্ঠন করতো। আবার লুণ্ঠনশেষে তাদের পাকিস্তানীপিতাদের হুকুমে সেইসব ঘরবাড়িতে একনিমিষে তারা আগুনও ধরিয়ে দিতো। আর পাকবাহিনীর সঙ্গে তারা তা দেখে সে-কী উল্লাসপ্রকাশ করতো! বাংলার মানুষের প্রতি ওদের কারও মনে কোনো মায়াদয়া ছিল না। এই হলো বাংলার রাজাকারদের চরিত্র।
৪. একাত্তরে রাজাকাররা হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য শয়তানীকাজে লিপ্ত হয়েই শুধু ক্ষান্ত ছিল না। তারা ছিল আদি-আসল ইবলিশশয়তান। আর শয়তানের নাজায়েজপুত্রদের মতোই এরা আমাদের দেশের পবিত্র মেয়েদের-নারীদের ধরে-ধরে পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী নামক শূয়রবাহিনীর ক্যাম্পে দিয়ে আসতো। আর এজন্যেই সেখানে আমাদের দেশের মাবোনেরা মাসের-পর-মাস পাকবাহিনীর শূয়রদের দ্বারা ধর্ষণের ও গণধর্ষণের শিকার হতো। এরা হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মতো ধর্ষণ ও গণধর্ষণকে সবসময় নিজেদের জন্য একেবারে জায়েজ মনে করতো। তাই, তারা রাজাকারদের সহায়তায় আমাদের দেশের নাবালিকা, বালিকা, কিশোরী, তরুণী, যুবতী, মাঝবয়সী, পৌঢ়া ইত্যাদি সববয়সী নারীদেরই একবার ধরতে পারলে ধর্ষণ না করে আর ছাড়তো না। আসলে, এরা জন্ম থেকেই ধর্ষণবিদ্যার উপর তাদের শয়তানীশাস্ত্রীয় জ্ঞানলাভ করেছিলো। একাত্তরের রাজাকাররা ছিল তাদের সহকারী ও সহযোগী। অনেক সময় মাওলানা-লকবধারী রাজাকাররাও পাকবাহিনীর মতো গণজমায়েতে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের কাজে লিপ্ত হতো। আর এরা মুখে বলতো: পাকিস্তান-জিন্দাবাদ—দীনইসলাম জিন্দাবাদ। এই হলো তাদের ধর্ম। আর এই হলো তাদের মওদুদীবাদীআকিদাহ। এরা ১৯৭১ সালে, আমাদের দেশের পরস্ত্রীপরনারীদের নিজেদের ‘গনীমাতের মাল’ বলে প্রচার করে তা পাওয়ার জন্য একেবারে লালায়িত হয়ে উঠেছিলো। আর তারা এভাবে তাদের পাকিস্তানীপিতাদের সঙ্গে হাসিমুখে জামায়াতের পরিবেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো পাপাচারে লিপ্ত হতো। সেই সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধা-ভাইয়েরা থাকতো ক্যাম্পে-ক্যাম্পে। আর মানুষের ঘরবাড়ি থাকতো সেই সময় প্রায় পুরুষশূন্য—অনেকটা অরক্ষিত। এই সুযোগে রাজাকাররা আমাদের দেশের মাবোনকে পাকবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিতো। আর এইসময় কোন্ বাড়িতে কতজন যুবতীমেয়ে আছে—তা তারা আগে থেকে খোঁজখবর নিতো। তারপর একদিন সময়-সুযোগমতো তারা তাদের পাকিস্তানীপিতাদের সহায়তায় সেইসব অসহায় মানুষের বাড়িতে আক্রমণ-পরিচালনা করতো। আর আক্রমণই বা এমন কী? তারা শুধু মানুষহত্যা করতো আর মানুষের স্ত্রীকন্যাকে নিজেদের ক্যাম্পে এনে ধর্ষণের-পর-ধর্ষণ আর গণধর্ষণ করতো—অবশেষে তাদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতো। মনে রাখবে: ১৯৭১ সালে, এই দেশে পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী আমাদের সব মানুষকে হত্যা করে আমাদের মাটিদখল করতে এসেছিলো। তাই, পাপিষ্ঠ-জারজ পাকিস্তানীসেনাবাহিনী সেদিন শয়তানের জারজপুত্র টিক্কা কসাই খানের কথায় নিরীহ বাঙালি-জাতির উপর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা লোমহর্ষক জুলুমনির্যাতন চালিয়েছিলো। আর পাকিস্তানীরা ও রাজাকাররা তাদের এই জারজনীতির জারজনির্যাতনকে সেদিন ধর্মপালন বলে মনে করেছিলো। এই হলো একটা জারজপাকিস্তানের জারজধর্মনীতি।

পাকিস্তানের আরেক চিহ্নিত দালাল—পাকিস্তানের আরেক ভয়াবহ পাপের সন্তান তথা জারজসন্তান ছিল বিহারীসম্প্রদায়। ১৯৭১ সালে, এদের দ্বারা হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ অন্যান্য নৃশংসতার সংক্ষিপ্ত চিত্র:

১৯৭১ সালে, মানবতাবিরোধী, শয়তান, পাপিষ্ঠ পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনীর সঙ্গে হাতমিলিয়ে বাংলাদেশের নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করতে তৎপর হয়েছিলো আমাদের এই দেশে আশ্রয়গ্রহণকারী শয়তান-বিহারীচক্র। তারা ১৯৭১ সালে, রাজাকারদের মতো একইভাবে-একইসঙ্গে পাকবাহিনীকে সবরকমের সাহায্য-সহযোগিতা করতো, এবং নিজেরাও অস্ত্রহাতে বাংলার সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করতো। তারা আমাদের দেশের মেয়েদের ধরে-ধরে জারজপাকিস্তানীদের ক্যাম্পে নিয়ে উপহার দিয়ে আসতো। তারা রাজাকারদের সঙ্গে হাতমিলিয়ে রাজাকারদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন বাহিনীতে নিজেদের নাম-লিখিয়ে রাজাকারদের মতো রাজাকার হয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো। সেই সময় তারা ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, যশোর, দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ ইত্যাদি অঞ্চলে ভয়াবহরকমের ত্রাসের রাজত্বকায়েম করেছিলো। খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, আত্মসাৎসহ এমন কোনো অপকর্ম নাই—যা তারা সেই সময় করেনি। তারা পাকবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাকিস্তানী-অস্ত্রহাতে নির্বিচারে মানুষহত্যা—গণহত্যা চালাতো। তাদের মধ্যেও বিন্দুমাত্র মুসলমানিত্ব ছিল না। তারা আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় বিদ্যমান কাফেরদের চেয়ে বেশি হিংস্র ছিল। অথচ, এইসব কাফের পবিত্র ইসলামের নামে আমাদের দেশের বাঙালি-মুসলমানদের হত্যা করতো। বিহারীরা হিন্দুনিধনেও মেতে উঠেছিলো। এরা পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে মানুষখুন থেকে শুরু করে পরের স্ত্রীকন্যাকে অপহরণ করার পর তা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া, পরস্ত্রী-পরকন্যাকে ধর্ষণ করা এবং পরের জায়গাজমিদখল ও পরের ঘরবাড়ি লুটপাট করা এবং তাতে অগ্নিসংযোগ করাকে সবসময় জায়েজ মনে করতো। ১৯৭১ সালে, সুযোগসন্ধানী-বিহারীরা আমাদের দেশের মাবোনদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে ওদের পাকিস্তানীবাপদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়াসহ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য ওরা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতো। ঢাকার মিরপুরে ছিল এই শয়তানদের প্রধান ও বৃহত্তম ঘাঁটি।

সেই সময় সত্যিকারের কাফেররা মুসলমানের পরিচয়ে ইসলামের নামে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বাংলাদেশের সত্যিকারের ঈমানদার, মুমীন ও মুসলমানদের হত্যা করতো। এরা ছিল এমনই ভয়াবহ কাফের। সেইসব দিনের কথা মনে হলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দেয়—আর মনে হয়: আমাদের পূর্বপুরুষগণ কী-এক ভয়ংকর কালসময় অতিক্রম করেছিলেন। আর এইরকম দিন যেন বাংলাদেশে আর-কখনও না আসে। এইজন্য আমাদের সবসময় চোখ-কান খোলা রেখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একতাবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। আর সামান্য স্বার্থের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো শক্তি যেন কখনও নিজেরা আত্মকলহে লিপ্ত না হই। শুধু আমাদের এই বাংলাদেশরাষ্ট্রের স্বার্থে আমাদের সবসময় এক, একতাবদ্ধ ও একসিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে—নইলে, আমরা মানুষ-নামের জানোয়ার হয়ে যাবো। আর আমি মনে করি: আমরা যারা বাঙালি—তাদের জীবনে বাংলাদেশরাষ্ট্রের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ বা বিষয় নাই। তাই, আজ দেশের স্বার্থে সবাইকে শপথগ্রহণ করে আমাদের লাল-সবুজের একমাত্র পতাকাতলে আসতে হবে। আমাদের এই দেশের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তিকে আজ থেকে চিরদিনের জন্য একতাবদ্ধ হতেই হবে। কারণ, পাকিস্তান নামক জারজরাষ্ট্রটি এখনও আমাদের পিছনে লেগে রয়েছে। তাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি-জাতিকে আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর-কোনো গতি নাই।”

অধ্যাপক লিটু মিয়া আবার একটু থামলেন। আর তিনি দেখলেন, কক্ষের সকলেই এখনও আরও কিছু শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে। তিনি এদের চোখমুখ দেখেই তা বুঝতে পারলেন। আর ততক্ষণে মেহমানদের জন্য চাসহ হালকা খাবার এসে গেছে। তিনি সবাইকে তা সদ্ব্যবহার করতে বললেন।

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
রচনাকাল: ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ
১১/০৯/২০১৮

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাইয়িদ রফিকুল হক
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
Offline
Last seen: 5 ঘন্টা 47 min ago
Joined: রবিবার, জানুয়ারী 3, 2016 - 7:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর