লালন নতুন কোন মতবাদের প্রবর্তক নয় পর্ব- (১)


বর্তমান বিশ্বে লালনের অনুসারী নামে পরিচিত বাউল সম্প্রদায়, তথা গাঁজা সেবনকারী একটি দল হর হামেশায় দাবী করেন যে, লালন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্ম বাদ দিয়ে নিজেই একটি নতুন ধর্ম বা মতবাদের প্রবর্তক। আর সে ধর্ম বা মতবাদটি অসাম্প্রদায়িক বাউল ধর্ম বা মতবাদ। তারা নিজেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও মুসলমান পরিচয় অপেক্ষা বাউল পরিচয় প্রদানে গর্ববোধ করে। এর মধ্যে অনেক লালন গবেষক আছেন, যারা অনেক শিক্ষিত। তারাও তাঁদের গবেষণায় লালনকে নতুন ধর্মের প্রবর্তক হিসাবে উপস্থাপন করে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রাপ্ত হয়ে ধন্য হয়ে গেছেন। লালনের উপর গবেষণা করে ডিগ্রী প্রাপ্তের অহংকারে অনেকের আবার মাটিতে পাও পড়তে চাই না। তারা নিজেকে অসামান্য ও অসাধারণ মানুষ হিসেবে ধারণা করে চলেছেন। কিন্তু আমি লালনের ভাব সঙ্গীত গ্রন্থে স্থান পাওয়া সর্বমোট ৫৩৪টি গানের, সবগুলি গান পড়ার পরেও, কোন ভাবেই আবিস্কার করতে সক্ষম হই নি যে, লালন হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও মুসলিম ধর্ম বা মতবাদ বাদ দিয়ে নতুন একটি ধর্ম বা মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
তাতে করে আমি মনে করছি যে, আমার ছোট মাথার অল্প বুদ্ধিতে লালনের গান পড়ে হয়তো লালনকে নতুন ধর্ম বা নতুন মতবাদের আবিস্কারক হিসাবে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। তবে আমি আশা করছি যে, আপনারা যারা পাঠক, তারা লালনের গান পড়ার পড়ে হয়তো আবিস্কার করতে সক্ষম হবেন যে, লালন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান মতবাদের বাহিরে নতুন মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আর সে লক্ষ নিয়েই আমি লালনের ভাব সঙ্গীত গ্রন্থে স্থান পাওয়া ৫৩৪টি গানের সবগুলিকে একে একে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেখি লালনের গান পড়ার পরে আপনারা কেহ লালনকে নতুন ধর্ম বা মতবাদ প্রতিষ্ঠাকারী হিসাবে আবিস্কার করতে পারেন কি না।
কথা না বাড়িয়ে আসুন আজ আমরা লালনের ভাব সঙ্গীত গ্রন্থে স্থান পাওয়া ৫৩৪টি গানের প্রথম গানটি একবার পড়ে দেখি। ভাব সঙ্গীতের ২৩ পৃষ্ঠা-
গান নম্বর- (১)
তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না।।
দেখা দিয়ে ওগো রাসুল ছেড়ে যেওনা।।
তুমি হও খোদারই দোস্ত, অপারের কাণ্ডারী সত্য,
তোমা বিনা পারের লক্ষ, আর দেখা যায় না।।
আসমানী আইন দিয়ে, আমাদের আনলেন রাহে,
এখন মোদের ফাঁকি দিয়ে, ছেড়ে যেও না।।
আমরা সব মদিনাবাসী ছিলাম যখন বনবাসী,
তোমা হতে জ্ঞান পেয়েছি, আছি সান্ত্বনা।।
তোমা বিনা এরূপ শাসন, কে করবে আর দীনের কারণ,
লালন বলে আর তো এমন, বাতি জ্বলবে না।।
ভাব সঙ্গীতে যেভাবে লেখা আছে, আমি হুবহু সেভাবেই তুলে ধরলাম। এবার আসুন এই গানটি একবার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখি যে, এই গানের মাধ্যমে লালন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান মতবাদ ছেড়ে নতুন কি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তা আবিস্কারের চেষ্টা করি।
তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না।।
দেখা দিয়ে ওগো রাসুল ছেড়ে যেওনা।।
গানের প্রথম এই দুই লাইনকে মুখবন্ধ বলা হয়। লালন এই গানটির মুখবন্ধে বলেছেন- হে রাসুল, তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না, দেখা দিয়ে ওগো রাসুল ছেড়ে যেও না। সম্মানিত পাঠক, গানের এই দুই লাইনের মাধ্যমে লালন পরিস্কার ভাবে প্রকাশ করেছেন যে, রাসুলের মতো দয়াল বন্ধু তাঁর জন্য আর কেহ নাই, এবং সেই রাসুল যেন দেখা দেওয়ার পরে ছেড়ে না যায় সেই আকুতি ব্যক্ত করেছেন। লালন যেখানে নিজেই বলেছেন যে, রাসুলের মতো তাঁর আপন বন্ধু আর কেহ নাই, সেখানে লালনের অনুসারীরা কোন যুক্তিতে লালনকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান মতবাদের বাহিরে অন্য নতুন মতবাদের প্রচারক ও প্রতিষ্ঠাকারী বলে দাবী করে, তা আমি অধম বুঝতে সক্ষম নই। আর আপনারা যদি বুঝতে সক্ষম হোন, তো কি কারণে বুঝতে সক্ষম হলেন জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।
এবার আসুন এই গানের পরের দুটি লাইনে লালন কি বলেছেন-
তুমি হও খোদারই দোস্ত, অপারের কাণ্ডারী সত্য,
তোমা বিনা পারের লক্ষ, আর দেখা যায় না।।
গানের প্রথম দুই লাইন মুখবন্ধের পরে, পরবর্তী প্রতি দুই লাইনকে গানের কলি বলা হয়, সে ক্ষেত্রে এই গানটি চার কলিযুক্ত গান। এখন আমি এই গানের প্রথম কলি একটু ভালো করে পড়ে দেখা চেষ্টা করবো। মুসলিম মতবাদের মানুষেরা বিশ্বাস করে যে, তাঁদের রাসুল অর্থাৎ মোহাম্মদ আল্লাহ্‌ বা খোদার হাবিব বা দোস্ত। আর সে জন্য মুসলিম সম্প্রদায় মিলাদের কিয়ামের মধ্যে বলে থাকে যে, ইয়া নবী সালামুয়ালাইকা, ইয়া রাসুল সালামুয়ালাইকা, ইয়া হাবিব সালামুয়ালাইকা। অর্থাৎ রাসুল যে আল্লাহ্‌র হাবিব বা দোস্ত তা কেবল মাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ই বিশ্বাস করে। আর লালন এই কলিতে বলেছে, তুমি হও খোদারই দোস্ত, অপারের কাণ্ডারী সত্য। অর্থাৎ রাসুল যে সত্যি অপারের কাণ্ডারী লালন তা মনে প্রানে বিশ্বাস করে, এবং সে এও বিশ্বাস করে যে, তোমা বিনা পারের লক্ষ, আর দেখা যায় না। তাঁর মানে রাসুল ব্যতীত পারের লক্ষ আর যে কেহ নাই, তা লালন মনে প্রানে বিশ্বাস করে।
এবার আসুন এই গানের দ্বিতীয় কলিতে লালন কি বলেছেন তা দেখে নিই-

আসমানী আইন দিয়ে, আমাদের আনলেন রাহে,
এখন মোদের ফাঁকি দিয়ে, ছেড়ে যেও না।।
এই গানের দ্বিতীয় কলিতে লালন বলেছেন- আসমানি এক আইন দিয়ে আমাদের সব আনলেন রাহে। পৃথিবীতে যত ধর্ম প্রবর্তক এসেছে, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ ব্যতীত কোন ধর্ম প্রবর্তকই দাবী করে নাই যে, তিনি- ধর্ম হিসাবে যে আইন প্রচার করছেন তা আসমানি বা আল্লাহ্‌ হতে ফেরেশ্তার মাধ্যমে তাঁর কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আসমানী আইন মানেই মোহাম্মদের প্রচারিত আইন পবিত্র প্রচলিত কোরআনের আইন। আর এই আইন দিয়েই মোহাম্মদ লালনসহ সকল মুসলিমকে রাহে এনেছেন বা ইসলামী পথে এনেছেন, লালন তা নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন। সেই সাথে লালন বলেছেন, এখন যেন ফাঁকি দিয়ে রাসুল ছেড়ে না যায়, সেই আকুতি প্রকাশ করেছেন।
তৃতীয় কলিতে লালন বলেছেন-
আমরা সব মদিনাবাসী ছিলাম যখন বনবাসী,
তোমা হতে জ্ঞান পেয়েছি, আছি সান্ত্বনা।।
আমরা সব মদিনাবাসী ছিলাম যখন বনবাসী, বাক্যের মাধ্যমে যে বিষয়টি পরিস্কার করেছে সে বিষয়টি হলো, মোহাম্মদ মদিনায় অবস্থান করে বনবাসী বা নেতৃত্বহীন মদিনাবাসীকে নেতৃত্ব দিয়ে জ্ঞান দান করেছেন ও সান্ত্বনা দিয়েছেন। আর লালন অকপটে স্বীকার করেছেন যে, মোহাম্মদ হতেই সে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছে ও প্রচলিত কোরআনের আশ্বাস মৃত্যুর পরে জান্নাত পাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে সান্ত্বনা প্রাপ্ত হয়েছেন।
লালন তাঁর গানের চতুর্থ কলি বা শেষ কলিতে বলেছেন-
তোমা বিনা এরূপ শাসন, কে করবে আর দীনের কারণ,
লালন বলে আর তো এমন, বাতি জ্বলবে না।।
যেহেতু মোহাম্মদের মৃত্যু ঘটেছে তাই, মোহাম্মদ বিনা ইসলামের এই শাসন কে করবে দ্বীনের কারণ। যদিও ভাব সঙ্গীত দ্বীন শব্দের বানান দীন লিখেছে, যেটা ভুল। পরিশেষে লালন বলেছেন- লালন বলে আর তো এমন বাতি জ্বলবে না।
লালনের গানের শেষ কলিটি একেবারেই শিশু সুলভ হয়েছে। কারণ- মোহাম্মদের মৃত্যু ঘটলে ও ইসলাম প্রচার ও পালনের জন্য প্রচলিত কোরআন রেখে গিয়েছেন। মোহাম্মদের অনুপস্থিতিতে যে ইসলামের প্রদীপ জ্বলবে না, এই বালখিল্য উক্তির মাধ্যমে লালন নিজেকে ইসলামে ভাসা ভাসা জ্ঞানের অধিকারী রুপেই উপস্থাপন করেছেন। ইসলাম বিষয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবতা যুক্ত জ্ঞান ছিল না। আর সে জন্যই লালন অনুমান নির্ভর এমন উক্তি করতে পেরেছেন।
সার কথা- লালন তাঁর এই গানে নিজেকে মোহাম্মদের দেওয়া আইনের উপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনা করেছেন, অকপটে সে কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে লালনের কোন উক্তির উপর ভিত্তি করে, লালন পন্থীরা দাবী করে যে, লালন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান মতবাদের বাহিরে, নতুন মতবাদ প্রচার করেছেন? লালন পন্থীদের পক্ষ থেকে যে কেউ এর জবাব করতে পারেন। মূলত যারা লালনের উপর গবেষণা করে ডিগ্রী প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদের কাছেই আমার এই জিজ্ঞাসা।
লিখেছেন গুরুজি। মূল লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
১। আলোচনা করে জ্ঞানীগণ, ঝগড়া করে অজ্ঞানীগণ ও মারামারি করে পশুগণ। সেরু পাগলার বাণী।

২। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নেওয়া ছলনাময়ী আশ্রয়টুকুর নামই, প্রেম বা ভালবাসা। সেরু পাগলার বাণী।

৩। যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই ইসলাম বা শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। আর- যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্ব অ-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই অ-ইসলাম বা অ-শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। সেরু পাগলার বাণী।

৪। আস্তিক হলো তারাই- যারা বিশ্বাস করে আল্লাহর অস্তিত্ব আছে। আল্লাহ দেহধারী, তাকে দেখা যায় ও তাকে ধরা যায়।
নাস্তিক হলো তারা- যারা মনে করে আল্লাহ নিরাকার, তাকে দেখা ও ধরা যায় না।
আর যারা বিশ্বাস করে স্রষ্টা বলতে কিছু নাই, তারা মূলতঃ ভণ্ড। সেরু পাগলার বাণী।।

8 total views, 1 views today

2
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
1 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
সলিম সাহাসাইয়িদ রফিকুল হক Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
সাইয়িদ রফিকুল হক
ব্লগার

লালন আসলে অসাম্প্রদায়িক
লালন আসলে অসাম্প্রদায়িক মহামানব।