নিকষ বন্ধ্যা জমিতে চাষাবাদের গল্পকথা

?_nc_cat=110&oh=51de492b114f229227ee2e78e9c71090&oe=5C1C0DE3″ width=”500″ />
ছোটবেলাতে স্কুলের ফাঁকে সময় পেলেই ফসলের মাঠে ঘুরে বেড়াতাম আমি। আমাদের ঘরে মাইনে করা ৪-রাখাল বা ‘কিষাণ’ ছিলো। যারা আমাদের গরু-মহিষগুলোকে চরে ঘাস খাওয়াতো, আর কাজ করতো আমাদের ফসলের মাঠে। স্কুল থেকে ফিরেই প্রায় সারাদিন আমি তাদের সাথেই থাকতাম বিলে-ঝিলে। বাবা বলতেন, “আমার পড়ালেখা হবেনা একদম। ওদের মত চাষা বা কৃষক হবো আমি”। আমি বলতাম, “না বাবা, আমি ভাল জেলে কিংবা প্রতিবেশি সুমির বাবার মত ‘ঢাকি’ হবো। কারণ ঢোল আর ঢাকের শব্দ খুব ভাল লাগতো আমার কৈশোরে।
:
আমার প্রতিবেশি হিন্দু সুমির বাবা ভোলানাথ বাজাতে পারতা অনেক বাদ্যযন্ত্র। তা শেখার জন্যে তার পিছু পিছু ঘুরতাম আমি প্রায়ই। একবার সে “খঞ্জুরা” শেখাবে বলে তা বানাতে বললো আমায়। এটা বানাতে বুড়ো ‘গো-সাপের’ চামড়া লাগে। ১১-বন্ধু মিলে গো-সাপের গর্ত খুড়ে তা টেনে বের করতে গিয়ে মারাত্মক কামড়ে দিলো গো-সাপ আমায়। ছেলেকে কামরাণোর কারণে ভোলানাথকে ডেকে ‘মারধর’ করেছিল আমার বাবা গো-সাপ ধরার “কু-বুদ্ধি” দেয়ার জন্যে। অনেকদিন ভুগেছি সে বিষক্রিয়ায় আমি। ভাল হয়ে ভোলানাথের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাই আমি আমার জন্যে তার মার খাওয়ার কারণে। খুশি হয়ে ভোলানাথ নিজেই একদিন গো-সাপ ধরতে যায় আমার জন্যে। ভোলানাথের মেয়ে সুমি আর আমি গো-সাপ তাড়িয়ে, চামড়া ছাড়িয়ে, নদীতে ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে সহযোগিতা করি তাকে। একদিন সত্যি ভোলানাথ “খঞ্জুরা” বানিয়ে তা তুলে দেয় আমার হাতে। রাতদিন ভোলানাথের বাড়ি পড়ে থেকে মাস খানেকের মধ্যে ভাল খঞ্জুরা বাজাতে শিখি আমি। গ্রাম্য লাঠিখেলার অন্যতম অনুসঙ্গ ছিল এ খঞ্জুরা। আমার ইচ্ছে হয়, ভোলানাথের মেয়ে সুমিকে নিয়ে পথে পথে খঞ্জুরা বাজাবো আমি। পুরো পৃথিবীর পথে পথে ঘুরবো আমি বৈষ্ণব হয়ে পথে পথে শ্রীচৈতন্য দেবের মত!
:
দু’মাসে পরের লাঠিখেলাটিতে খঞ্জুরা বাজানোর সুযোগ হয় আমার। প্রায় সারাদিন লাঠিয়ালদের সাথে তালে-তাল দিয়ে কিশোর একমাত্র আমি খঞ্জুরা বাজিয়ে তুমুল করতালি পাই। আমার ১১-বন্ধু নাচতে থাকে পুরো মাঠে এ নবীন “খঞ্জুরা-বাদকের” সাথে। আমার লেখাপড়ার বিঘ্ন হবে মনে করে ভোলানাথকে নিষেধ করে দেন আমার মা, যেন খঞ্জুরা ছাড়া আর কোন বাদ্যযন্ত্র না শেখায় আমায়। তাই সুমি আামার পক্ষে তার বাবার কাছে নানা ওকালতির পরও সারিন্দা, ঢোল বা ঢাক বাজানো শিখতে পারিনি আমি ভোলানাথের কাছে। তবুও সারাদিন ঘরে খঞ্জুরার শব্দে সবাইকে অতীষ্ঠ করে রাখতাম আমি ঐ ক’মাস।
:
গ্রীস্মের দীর্ঘ স্কুল ছুটিতে সারিন্দা বা ঢোল বাজানো শিখতে না পেরে, রাগে মাকে না জানিয়ে গোপনে ইলিশ ধরা জেলেদের নৌকোতে চলে গেলাম আমি সমুদ্র মোহনায়। প্রথমে তারা নিতে না চাইলেও, আমরা ১১-বন্ধু মিলে রাতে নৌকো ফুটো করে দেব বা জাল ফেলে দেবো নদীতে গোপনে, এমন কথা বলাতে ভয় পায় তারা। তারপর দিলাম আমাদের গোলা থেকে ২-মন আমন চালের লোভ, যাতে ৫-জেলের সবাই রাজী হলো গোপনে নিতে আমাকে তাদের মাছ ধরা জেলে নৌকোতে। এবং একদিন ২-মন চাল ঘুষ দিয়ে সত্যি চলে গেলাম একদম সমুদ্র মোহনায়। নৌকো রাতে ঘাট ছাড়ার পর সকালে মাকে জানালো আমার বন্ধুরা তার ছেলের ‘দেশান্তরি’ হওয়ার এ দু:সংবাদ।
:
সারাদিন জেলেদের সাথে জাল টেনে, দাঁড় বেয়ে, পাল খাটিয়ে, আটকানো জাল ছাড়াতে সমুদ্রচরে ডুব দিয়ে, মাছ বেছে, তা অন্য নৌকোতে বিক্রি করে, নোনা পানিতে সাঁতরে ৭-দিন আনন্দে কেটে গেল আমার। ৮ম দিনে আকাশ ভেঙে প্রচন্ড ঝড় আর বৃষ্টি হলে আমাদের নৌকোর ছইটি উড়ে যায় সমুদ্র ঝড়ে। সারাদিন ভিজতে থাকি আমি অন্য জেলেদের সাথে। রাতে প্রচণ্ড জ্বর হয় আমার। তারপরো জেলে নৌকোতে কোন শুকনো্ কাপড় না থাকাতে ভিজে কাপড় চুলোয় গরম করে জেলেরা সেঁকে আমায়। শুইয়ে রাখে নৌকোর মাঝে পাটাতনে পাল দিয়ে ঢেকে। এর মধ্যেে আকস্মিক এক বজ্রপাত হয় আমাদের নৌকোর গলুইয়ে। চোখের পলকে দাঁড়-টানারত গলুইয়ের হিন্দু জেলে ‘মনিন্দ্র’কে নিয়ে একটা বজ্র কিংবা উল্কা ঢুকে যায় নদীর জলে। অন্য দু-জেলেও আকস্মিক বজ্রপাতে চেতনা হারিয়ে ফেলে নৌকোতে। বজ্রপাতে গলুই ভেঙে নৌকো ডুবতে থাকলে দুরের অন্য নৌকোরা তুলে নেয় তাদের নৌকোতে আমাদের। প্রবল জ্বরের প্রকোপেও আমি বুঝতে পারি, মনিন্দ্রকে আর পাওয়া যাবেনা। আর পাওয়া যায়নি মনিন্দ্রকে কোনদিন। সমুদ্র মোহনায় জলসমাধি হয়েছিল আমার গাঁয়ের এ গরিব জেলের।
:
আমাদের এ বিপদে গাঁয়ের পরিচিত অন্য নৌকো জালসহ বেয়ে নিয়ে আসে আমাদের বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্থ নৌকো্সহ দুদিন টেনে। কোন ঔষধ না খেলেও এর মধ্যে জ্বর ছাড়ে আমার। প্রায় ১০-দিনে কুচকুচে কালো জেলেতে রূপান্তরিত হয়ে ‘মনিন্দ্র’-হীন ঘরে ফিরি আমরা এক মৃত্যু বিষাদে। আকস্মিক এ মৃত্যু সংবাদে ঘাটে জড়ো হয় মনিন্দ্রের বৌ আর তার সন্তানেরা। ওদের কান্নায় ধুসর মেঘপোকারা উড়ে যায় বিরহের নীলাভ কোরাস গেয়ে দুরের আকাশে।
:
এসব দু:খ অতিক্রান্ত কৈশোরের সুথ বাতাসের দহনে পুড়ে যাওয়া এই আমি তাই এখনো ভুলতে পারিনা, আমার দলিত গাঁয়ের জী্বন আর ঐসব জেলে মনিন্দ্র-দের। যাদের সাথে ভালোবাসার ধানিরঙে কাঙ্খিত আনন্দ ফসলের সুখমাঠে অনেক পথ হেঁটেছি আর দৌঁড়িয়েছি আমি। তাইতো আজো অন্য প্রপঞ্জের এক তথাকথিত সুখি নাগরিক হয়েও, আমি ভালবাসার জীবনস্রোতের ধবল মৃত্তিকার গন্ধে উড়ে যাই ঐসব মনিন্দ্র-দের কাঁচা ঘরে এবং অঘ্রাণে প্রাপ্ত বামন চাঁদের দুষ্প্রাপ্যতার মত নিষ্ফলা চষে বেড়াই আমি ঐসব নিকষ বন্ধ্যা জমি!

7 total views, 1 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
ড. লজিক্যাল বাঙালি Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of