ধর্মান্ধতার শিকলে বাধা নারী ও প্রগতীশীল সমাজ।

ধর্মান্ধতার ব্যাপারে আমাদের সমাজ কিছুটা সচেতন হলেও ধর্মভীরুতা এখনও অনেকের মাঝেই বিদ্যমান থাকার মূল কারণ হচ্ছে মিথ্যা ও বানোয়াট কল্পিত জগতের ভয়, ভীতি প্রদর্শন করে একশ্রেনীর মানুষ তাদের জীবন যাপন করছে। সবার আগে এই শ্রেনীকে যদি বোঝানো সম্ভব হয় ধর্ম ব্যাবহার করে ভয়, ভীতি প্রদর্শন করে সমাজের মানুষকে বোকা বানাবার ফলে যে শুধু তারাই প্রগতীশীল বিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়ছে তা কিন্তু নয়, সেই সাথে এই শ্রেনী তাদের এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মও এই একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে স্বল্প সময়ের এই জীবন অতিবাহিত করে ফেলছে। মাঝখান থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সচেতন নাগরিকেরা সেই হাজার হাজার বছর ধরে প্রচলিত ঘুনে ধরা ভঙ্গুর প্রথার পরিবর্তন করে নতুন চিন্তা, ভাবনার প্রয়োগ করে সমাজে প্রগতী নিয়ে আসতে ব্যার্থ হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, মানুষ সেই শুরু থেকে কিভাবে এই সভ্যতার শুরু করে তাদের জীবন যাপন করে আজকের দিনের মানব সভ্যতা গঠন করেছে সেটা সম্পর্কে সঠিক ধারণা এই ধর্মান্ধ এবং ধর্মভীরু মানুষের একই বৃত্তে আটক থাকা চিন্তার বন্ধ দরজায় সব থেকে জরে আঘাত করতে পারবে।

সভ্যতার শুরুতে মানুষ একটা সময় জানতো না আগুন কি জিনিষ। তখন তারা কাঁচা মাংশ খেতো। বনে জঙ্গলে বজ্রপাতের ফলে তৈরি হও্য়া আগুন দেখতো সব জালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। এক কথায় ভয়ানক ব্যাপার এই আগুন, কি জিনিষ এটা। তখন তারা ভয়ে সেই আগুনের পূজা করা শুরু করে দিলো যাতে তাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে না দেয়। একটা সময় আগুন হয়ে গেলো ঈশ্বর। শুরু হলো ঈশ্বরকে রাজী, খুশি করাবার পালা “অগ্নি পূজা”। হঠাৎ একদিন দেখতে পেলো আগুনে পুড়ে যাওয়া জঙলে আগুনে পোড়া মৃত পশু। ক্ষুধার্থ মানুষেরা দেখলো সেই পশুর মাংশ আবার খেতেও বেশ সুস্বাদু এবং নরম। দাঁত দিয়ে ছিড়তে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। তখন চিন্তা করা শুরু হলো আগুন নিজেদের আয়ত্বে আনতে হবে এবং মাংশ এভাবেই পুড়িয়ে খেতে হবে। চেষ্টা চলতে থাকলো, এবং একটা সময় তারা পাথরে পাথরে ঘষা দিয়ে জ্বালাতে শিখে গেলো সেই আগুন। মাংশ পুড়িয়ে খাওয়া চলতে থাকলো। একটা সময় সুমদ্রের পাড়ে লবনের মধ্যে অতিরিক্ত মাংশ সঞ্জয় করা শুরু হলো। দেখা গেলো মাংশ লবনের মধ্যে রেখে খেলে আরো সুস্বাদু লাগছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তা খাওয়া যাচ্ছে। এভাবেই শুরু হলো আরেকটি খাদ্যের সাথে মানুষের পরিচয়। নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে তারা একটা একটা করে সাফল্য অর্জন করলো। একটা সময় সভ্যতার যাত্রা শুরু হলো।

এইভাবে লিখে মানব সভ্যতা সৃষ্টির ইতিহাস বোঝাতে গেলে, মনে হবে কতই না সহজে তারা গড়ে তুলেছিলো আমাদের জন্য এই সভ্যতা। আসলে কিন্তু তা নয়। মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের জন্য যে ভাষার ব্যাবহার এবং শরীরে পোষাক পরে সভ্য হতে মানুষের লেগেছিলো কয়েক লক্ষ বছর। তবে তাদের মধ্যে প্রগতীশীল চিন্তা ভাবনা ছিলো বলেই এই সভ্যতা গঠন করতে পেরেছিলো। সব সমস্যার সুত্রপাত সেই মানব সভ্যতায় শুরু হয়েছিলো মানুষ যখন সমাজ গঠন করেছিলো। এই সমাজ গঠনের ফলে তাদের যত অজ্ঞতা, না জানার লজ্জা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে একটা সময় সেই আগুন ঈশ্বর এর ধারনা চলে গেলো একজন বা বহুজন অদৃশ্য কোন ঈশ্বরের উপরে। মানুষের মনের হাজারও প্রশ্ন যার উত্তর তাদের জানা ছিলোনা তার সব দ্বায়ভার চলে গেলো সেই অদৃশ্য ঈশ্বরের ঘাড়ে। আর যারা এই ঈশ্বরের উপরে সব প্রশ্নের উত্তর চাপিয়ে দিয়ে মানুষকে শান্তনা দিতে থাকলো তারা তৈরি করে দিলো কিছু ধর্মীয় রীতিনীতি। সাথে জুড়ে দেওয়া হলো সেই শুরুর দিকের আগুনে পুড়ে যাবার ভয়ের মতো কিছু ভীতি। আর আজকের দিনের সমাজে আমরা যে ধর্মভীরু মানুষদের দেখছি তারাই আজও বহন করে নিয়ে চলেছে সেই প্রথা।

শুধু যে ধর্মান্ধতা ও ধর্মভীরুতা আমাদের সমাজের প্রগতীর যাত্রাকে রোধ করার চেষ্টা করছে তা নয়। সেই সভ্যতার শুরুতেই এই মানব জাতির মধ্যে নারী এবং পুরুষের ভেদাভেদ তৈরি করা হয়েছিলো যা প্রগতীর পথে বাধার আরো একটি মূল কারণ। সভ্যতার শুরুতে মানুষ যখন সামাজিক হতে শুরু করেছিলো, তখন নারীদের হাতেই ছিলো সমাজের নিয়ন্ত্রণ। অজ্ঞতার কারনে অনেক স্থানেই নারীদের ঈশ্বর বা স্রষ্টা ভেবে পূজাও করা হতো, কারণ নারীর ছিলো এক মহান ক্ষমতা। একটি নারীর শরীর থেকে আরেকটি শরীর সৃষ্টি করার ক্ষমতা শুধু নারীদেরই আছে। শুরুতে এই নারীদের হাত ধরেই এসেছিলো কৃষি বিপ্লব। পুরুষ তখন শিকার ছেড়ে ঘরে ফিরতে শুরু করেছিলো এবং নারীদের হাত থেকে কৃষিকাজ ছিনিয়ে নিয়েছিলো। আস্তে আস্তে নারী ঘরোয়া কাজের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেলো। এই সুযোগে তৈরি হলো বিভিন্ন ধরনের ধর্ম আর যুগে যুগে সেই ধর্মের দোহায় দিয়ে নারীকে করা হলো পন্য। এই থেকে নারীকে অপমান, অবমাননা ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিলো। আজকের দিনে প্রচলিত সেই সব প্রথা পরিবর্তন করে সমাজে নতুন ও প্রগতীশীল চিন্তাভাবনা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এই নারীদের ভূমিকা সব থেকে বেশি। ঠিক তেমনই ধর্মীয় গোড়ামি, ধর্মান্ধতা, ধর্মভীরুতাও এই নারী এবং পুরুষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে রাখতেও সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।

-মৃত কালপুরুষ
২৬/০৯/২০১৮

10 total views, 1 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of