ইসলামধর্মে ‘মাদ্রাসাশিক্ষা’ বলে কোনো শিক্ষা নাই (দ্বিতীয় পর্ব)


বর্তমানে প্রচলিত ‘মাদ্রাসা’ (বা ‘মাদরাসা’) একটি আরবি-শব্দ। আধুনিক অভিধানকারদের মতে, এটি ‘দরস্’ বা ‘দারসুন’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। আর এর অর্থ হলো—পড়া, অধ্যয়ন, আবৃত্তি বা পাঠ। এসব কিছুসংখ্যক চিন্তাবিদের অভিমত মাত্র। কিন্তু এই মাদ্রাসা-শব্দটি কুরআনের কোথাও নাই। এর কারণ কী?

মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যাপারে মহান আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা নাই। তিনি আলকুরআনের কোথাও একটিবারের জন্যও মাদ্রাসাবিষয়ক শিক্ষাদীক্ষার কথা বলেননি। কিন্তু, বর্তমানে অনেকে জোরপূর্বক মাদ্রাসাশিক্ষার পক্ষে অনেকরকম দলিল-ব্যবহারের চেষ্টা করে থাকে। আসলে, এরা নিজেরাও মাদ্রাসাশিক্ষায় তথাকথিত শিক্ষিত। তাই, এরা সবসময় মাদ্রাসার পক্ষে ইসলামের নাম ব্যবহার করে এ-কে ‘ইসলামীশিক্ষা’ বলে এর পক্ষে যুক্তিপ্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকে।

প্রাচীনকালে, আমরা প্রাচ্যে ও প্রতীচ্যে মাদ্রাসার অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। আর পাশ্চাত্যে এর অস্তিত্ব খুঁজতে যাওয়া তো চরম বোকামি। প্রাচ্যের বাগদাদ-নগরীতে প্রতিষ্ঠিত ‘নিজামিয়া-মাদ্রাসা’ এতদাঞ্চলের প্রথম মাদ্রাসা। এটি ১০৬৫ খ্রিস্টাব্দে ‘সেলজুক-শাসনামলে’ নিজামুল মুলক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে নিজামিয়া-মাদ্রাসা। এখানে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ‘নিজামিয়া’ শব্দটি নিজামুল মুলকের নাম থেকেই সৃষ্ট। অনুমান করা হয়: এটিই বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক মাদ্রাসা। পরবর্তীকালে সমগ্র আরবে, আরবের আশেপাশে ও আরবের বাইরে নিজামিয়ার আদলে ও অনুকরণে আরও কিছুসংখ্যক নিজামিয়া-মাদ্রাসা গড়ে উঠতে দেখা যায়। এরপর ১২৩৩ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে ‘মুসতানসিরিয়া-মাদ্রাসা’ নামে আরও একটি বড়সড় মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।

পূর্বেই বলেছি: আধুনিককালে প্রচলিত মাদ্রাসা বা মাদ্রাসাশিক্ষার জন্ম হয়েছে আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায়ের কয়েকশ’ বছর পরে। আর এসব মাদ্রাসা গজিয়েছে ইসলামকে আশ্রয় করে। এখানে, যৎসামান্য ইসলামীবিধিবিধান শিক্ষা দেওয়া হয় মাত্র। কিন্তু এই শিক্ষার মধ্যে ‘আল্লাহ, রাসুল ও ইসলামে’র কোনো স্বীকৃতি নাই। এমনকি মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আলকুরআনেও মাদ্রাসার কোনো স্বীকৃতি নাই। রাসুলের হাদিস নামে কথিত ‘সিয়াহ সিত্তাহ’র গ্রন্থেও মাদ্রাসার পক্ষে একটি হাদিস কিংবা দলিল নাই (অবশ্য কেউ-যদি এখন মাদ্রাসার পক্ষে একখান ‘জাল-হাদিস’ বানিয়ে তা সবার সামনে পেশ করে—তাহলে, এই লেখকের করার বা বলার কিছু থাকবে না)। কারণ, মুসলমানরা জাল-হাদিস বানাতে খুবই ওস্তাদ। এখানে, আরও একটি দরকারি কথা বলে রাখি: রাসুলের বিদায়ের পরে মুসলমান-নামধারী বহু ব্যক্তিবর্গ (এমনকি সাহাবী-নামধারী অনেক ব্যক্তিবর্গও) নিজেদের স্বার্থে রাসুলের নামে ‘জাল-হাদিস’ বানিয়েছিলো। এরা স্বীয় স্বার্থ-চরিতার্থ করার জন্য এমনটি করেছে। সেই সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘জাল-হাদিস’ তৈরি করা হয়েছিলো। ‘খোলাফায়ে রাশেদীনে’র যুগেও (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায়ের আগে স্বয়ং রাসুল সা. কর্তৃক হজরত আলী আ. ইসলামের তথা মুসলমানদের ইমাম নির্বাচিত হন। আবারও বলছি: তিনি সরাসরি রাসুল সা. কর্তৃক নির্বাচিত হন। কিন্তু তখন এটি একটি শ্রেণী মানেনি ও স্বীকার করেনি) হজরত আলীর শানশওকত ম্লান করার জন্য পাল্টা হাদিস তৈরি করা হয়েছিলো। হজরত আলীর মর্যাদাবিষয়ক হাদিসগুলোকে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিলো—খলিফা-নামধারী আবু বকর, উমর ও উসমানের আমলে। এই অকাজে সেই সময় সাহাবী-নামে আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গও জড়িত ছিল। এমনকি হজরত আলীর নামে আলকুরআনে যে-সব আয়াত নাজিল হয়েছিলো—তাও প্রতিহিংসাবশত বিনষ্ট করা হয় খলিফা-নামধারী আবু বকর, উমর ও উসমানের আমলে। কুরআনের ‘সুরা লোকমানে’র আদলে হজরত আলীর নামে কুরআনে একটি সুরাও ছিল। এইসব নষ্ট করা হয়েছে ‘খোলাফায়ে রাশেদীনে’র আমলে (খলিফা-নামধারী আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনে খাত্তাব ও উসমান বিন আফফানের সময়। সকলে মনে রাখবেন: এই তিন খলিফার আমলে কুরআন সম্পাদনা, সংকলন ও প্রকাশ করা হয়)। এসব কথা বলার অর্থ হলো: একশ্রেণীর মতলববাজ-মুসলমানরা নিজেদের প্রয়োজনে মাদ্রাসাবিষয়ক একখানা হাদিস এখন বানিয়েও ফেলতে পারে। কিন্তু এ-পর্যন্ত কোনো হাদিসে ‘মাদ্রাসা’ বা ‘মাদ্রাসাশিক্ষা’র কোনোপ্রকার অস্তিত্ব নাই। যদি কারও কাছে এবিষয়ে একখানা হাদিস থাকে তবে তা পেশ করলে এই লেখক তা অবনতমস্তকে মেনে নিবে। তবে কথা হচ্ছে—হাদিসখানা কিন্তু সহীহ হতে হবে।

রাসুলের নামে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিকল্পিতভাবে ‘হাদিস-জাল’ করা শুরু হয় উমাইয়া-শাসনামলে। আর এই অকাজে সর্বপ্রথম নেতৃত্ব দেয় মক্কার প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধড়িবাজ আবু সুফিয়ান, তদীয় পুত্র মুআবিয়া, এবং মুআবিয়ার একমাত্র ও জারজপুত্র এজিদ। আর শয়তানের জারজপুত্র এজিদ ইবনে মুআবিয়া ‘জাল-হাদিসে’র সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিল। কারণ, এজিদের দাদা আবু সুফিয়ান ও পিতা মুআবিয়া নামকাওয়াস্তে মুসলমান ও প্রথম শ্রেণীর মুনাফেক ছিল। এরা সর্বপ্রথম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস-জাল করতে শুরু করেছিলো। তাদের বংশধর শয়তানের জারজপুত্র এজিদ সেই ধারাটিকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করতে থাকে। এজন্য এজিদের তথাকথিত আলেম-উলামা-নামধারী একটি শয়তানী-সিন্ডিকেট ছিল। বর্তমানেও এজিদপন্থী ওহাবী, সালাফী, খারিজী, মওদুদীবাদী-জামায়াতীরা স্বীয় স্বার্থে সঠিক হাদিসের পরিবর্তে জাল-হাদিস ব্যবহার করছে। তাই, এদের নতুন আবিষ্কৃত হাদিস মাদ্রাসার পক্ষে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করলে তা কখনও গ্রাহ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হবে না। পূর্বের বক্তব্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বলতে পারি যে, মাদ্রাসাশিক্ষার কথা আল্লাহর বাণীতে, আলকুরআনের আয়াতে, হাদিসে কুদসীতে, রাসুলের বাণীতে ও হাদিসে নাই—তা কীভাবে একচান্সে ও এককথায় ইসলামীশিক্ষা হতে পারে?

জানি, এসব কথা শুনে মাদ্রাসাপাস যেকোনো ব্যক্তিই ভয়ংকরভাবে উত্তেজিত হতে পারেন—আর তারা বলতে পারেন—কুরআনে তো অনেককিছুর উল্লেখ নাই তবুও আমরা তা করছি। হ্যাঁ, আমরা তা করছি। কিন্তু তাকে কি আমরা ‘ইসলামের অঙ্গ’ বা ‘ইসলামী’ কোনোকিছু বলছি বা বলতে পারি? যেমন, দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টিভি, বেতার ইত্যাদি ব্যবহার করছি। কিন্তু এগুলোকে আমরা ‘ইসলামী’ বলছি না। আর এগুলোর কথাও কুরআনের কোথাও লেখা নাই। আবার, সালাত (নামাজ), সিয়াম (রোজা), জ্ঞানার্জন, অজু করার কৌশল বা বর্ণনা, জাকাত, হজ্জ, ন্যায়বিচারপ্রতিষ্ঠা, সুদ-ঘুষবিরোধী কথা, ব্যভিচারবিরোধী কথা, মদ্যপানের বিরোধিতা, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা, জান্নাতের হুর-গেলমানের বর্ণনা, মদকে হারাম ঘোষণা, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য কুরআনে উল্লেখ আছে। কিন্তু মাদ্রাসাশিক্ষা যদি এতোই জরুরি ও প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে তাহলে কুরআনে তার কথা কেন বলা হয়নি? মহান আল্লাহর কাছে কোনো মাদ্রাসাশিক্ষা নয়, মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো শিক্ষাই গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জ্ঞানীদের ভালোবাসেন। আর এখানে, ইসলামী বা অনৈসলামিক কোনো কথা বলা হয়নি। কুরআন ‘জ্ঞানী’ বলতে কখনও-কোথাও একটিবারের জন্যও প্রচলিত মাদ্রাসাপাস ‘হুজুর’দের বুঝায়নি। আসলে, ইসলামে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার কথাই বলা হয়নি। অথচ, আমাদের দেশের মাদ্রাসাপাস ‘হুজুর’, ‘পাতিহুজুর’, ‘মৌলোভী’, ‘মোল্লা’, ‘কাটমোল্লা’, ‘মাওলানা’ ইত্যাদি লকবধারীরা নিজেদের স্বেচ্ছায় আলেম-উলামা ঘোষণা করছে! এগুলো ইসলামের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তার কারণ, ইসলামধর্মের কোথায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, মাদ্রাসা থেকে কিছু-একটা পাস দিলেই সে আলেম হয়ে যাবে? পূর্বেই বলেছি: মাদ্রাসাপাসরা সাধারণ মানুষের মতো নিজেদের শিক্ষা-সার্টিফিকেটধারী কিছুটা শিক্ষিত ভাবতে পারে। কিন্তু কখনও ইসলামের নামে নিজেদের ‘আলেম-উলামা’ দাবি করতে পারবে না। এরজন্য চাই, ইসলামের সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই ঘোষণা কি মাদ্রাসাপাস হুজুরদের পক্ষে আছে? আর এইরকম ঘোষণা কি মুসলমানদের একমাত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে আছে? থাকলে একবার তা আমাদের দেখান তো দেখি। দেখি, আপনারা কতপ্রকার দলিল-প্রমাণ দেখাতে পারেন। মাদ্রাসাকে ‘ইসলামীশিক্ষা’ বলে যারা মাদ্রাসার পক্ষে এতো সাফাই গেয়ে থাকেন তারা এর পক্ষে আলকুরআনের একটি আয়াতসহকারে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করুন। এবার দেখবো আপনাদের কত মুরোদ!

ভারতীয় উপমহাদেশের মাদ্রাসাপাস মৌলোভী ও কথিত মাওলানা-নামধারী-ব্যক্তিবর্গ নিজেদের স্বার্থে এখন প্রচার করছে—মাদ্রাসাশিক্ষা ইসলামীশিক্ষা! আর-এক শ্রেণীর অতিসস্তা মোল্লা ও কাটমোল্লা এখন যত্রতত্র বলে বেড়াচ্ছে যে, একমাত্র মাদ্রাসাশিক্ষা ইসলামীশিক্ষা! আর মাদ্রাসাশিক্ষা ব্যতীত অপরাপর সকলপ্রকার শিক্ষা বা পৃথিবীর সকল দেশের সাধারণ কলা ও বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষা নাজায়েজ! জানি, এসব তাদের মনগড়া ও শয়তানী কথা। আর এরা ইসলামের দোহাই দিয়ে নিজের স্বার্থে এসব বলছে। এখানে, বলে রাখি: মাদ্রাসাশিক্ষা যদি জায়েজ হয়ে থাকে তাহলে দেশের বা পৃথিবীর প্রচলিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা আরও বেশি জায়েজ। তার কারণ, এসব সাধারণ ও বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্ব নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ও সমাজ-রাষ্ট্রে অভিযোজন-ক্ষমতা-লাভ করছে। সাধারণ শিক্ষিত মানুষেরাই এই পৃথিবীতে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টিভি, বেতার, রকেট, এরোপ্লেন, মানুষের রোগনির্ণয়ের যাবতীয় সরঞ্জামাদি, রেলগাড়ি, ইলেকট্রিক রেল, আধুনিক স্থাপনা, আধুনিক রাস্তাঘাট তৈরির নিত্যনতুন সরঞ্জামাদি ইত্যাদিসহ মানবজীবনের ব্যবহার্য যাবতীয় আধুনিক যন্ত্রপাতিসমূহ আবিষ্কার করেছে। এখানে, মাদ্রাসাশিক্ষিত কোনো মানুষকে তো খুঁজে পেলাম না! যে শিক্ষা মানবকল্যাণে প্রভূত কাজ করছে তা কীভাবে নাজায়েজ হয়? আর যে মাদ্রাসাশিক্ষা সমাজে-রাষ্ট্রে মানুষের কোনো কাজে লাগে না তা বুঝি খুব জায়েজ? এখানে, মাদ্রাসাপাসরা বলে থাকে, আপনি মরার পরে কে আপনার জানাজা পড়াবে, কে আপনাকে কবরে নামাবে? আর কে আপনার জন্য দোয়া করবে? আসলে, এসব ভাওতাবাজি। একজন মুসলমান সে তার যেকোনো নিকটাত্মীয়ের জানাজা পড়তে পারবে। আর এগুলো কয়েকদিনে একটু শিখে নিলেই হবে। আর সে না পড়লে তার জন্য একশ্রেণীর ভাড়াটিয়া পেশাজীবী-হুজুর আছে। আর দোয়া করার জন্য মানুষ ডাকতে হয় না। তাই, সাধারণ মুসলমান তথা মানুষকে ভয় দেখিয়ে একমাত্র মাদ্রাসাশিক্ষাকে ইসলামীশিক্ষা বলার কোনো যৌক্তিকতা নাই। আসলে, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মাদ্রাসাপাস হুজুর ও পাতিহুজুররা ভীতসন্ত্রস্ত। এদের ভয়—মাদ্রাসা উঠে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জীবনজীবিকার ক্ষেত্রে কামাই-রোজগার কমে যাবে। তাই, তারা নিজেদের স্বার্থে ইসলামের নাম ব্যবহার করে একমাত্র মাদ্রাসাশিক্ষাকে বলছে ইসলামিক শিক্ষা আর দেশে প্রচলিত ও বিশ্বব্যাপী বৃহৎ সাধারণ শিক্ষাকে বলছে অনৈসলামিক! এগুলো তাদের সম্পূর্ণ বেআদবি, ধৃষ্টতা, প্রলাপোক্তি, ষড়যন্ত্র ও শয়তানী। তাই, বাংলাদেশরাষ্ট্রের স্বার্থে একশ্রেণীর হুজুর বা পাতিহুজুর কর্তৃক সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাকে অনৈসলামিক বলার ধৃষ্টতা, বাড়াবাড়ি ও দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। তাদের বলে দিতে হবে: দেশের সাধারণ শিক্ষা নাজায়েজ বা অনৈসলামিক হলে মাদ্রাসাশিক্ষা আরও বেশি নাজায়েজ ও অনৈসলামিক। কারণ, ভারতবর্ষে এগুলোর জন্মই হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে। ভারতবর্ষের একটি মাদ্রাসা খুঁজে পাওয়া যাবে না—যা পরের জাকাত, ফিতরা, দান-সাদকাহ ইত্যাদির মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি।

ভারতীয় উপমহাদেশে এযাবৎকাল প্রচলিত তিন ধরনের মাদ্রাসার অস্তিত্ব রয়েছে। আর এগুলো হলো—কওমীধারার মাদ্রাসা, খারিজীধারার মাদ্রাসা ও আলিয়াধারার মাদ্রাসা। মূলত কওমী ও খারিজীধারার মাদ্রাসার বৈশিষ্ট্য একইরকম। কওমীধারার অনুসরণে ও অনুগামী হয়ে দেশে প্রচলিত রয়েছে বিপুল সংখ্যক নুরানী ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। এগুলো আসলে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র কওমীমাদ্রাসা।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ-সরকারের হাত ধরে, ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় ও ইংরেজদের সহায়তায় একের-পর-এক বিভিন্ননামে আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এর মধ্যে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’ (পরে এটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ‘ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা’ নামে)। এটি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস। তার সহযোগী ছিল ভারতীয় কতিপয় ইংরেজ-দালাল। এরপর ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর-জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে ইংরেজদের হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশের কওমী-খারিজীধারার প্রথম মাদ্রাসা ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এর প্রতিষ্ঠাতা ওহাবীপন্থী মৌলোভী ও ইংরেজ-দালাল আবুল কাসেম নানুতবী। এরপর ‘দারুল উলুম দেওবন্দে’র অনুকরণে ও অনুসরণে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে প্রথম কওমীমাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম-জেলার হাটহাজারীতে। এর নাম ‘দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’ ওরফে ‘দারুল উলুম হাটহাজারী’ বা ‘হাটহাজারী মাদ্রাসা’। তারপর পিরোজপুর-জেলার স্বরূপকাঠি থানার ছারছীনা গ্রামে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছারছীনা দারুস সুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসা’। এর প্রতিষ্ঠাতা ওহাবীপন্থী মৌলোভী নেছারউদ্দীন আহমেদ। ১৯৩৭ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায় ‘আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই বাড়তে থাকে বাংলাদেশে কওমী ও খারিজী ধারার মাদ্রাসা।

পরবর্তী-অধ্যায়গুলোতে আমাদের বাংলাদেশে গড়ে ওঠা কওমী-খারিজীধারার মাদ্রাসাসমূহের উৎপত্তি, উদ্ভব, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও বিকাশসম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হবে। এগুলো আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে আলিয়াধারার মাদ্রাসাগুলোর কী-কী পার্থক্য রয়েছে তাও এখানে তুলে ধরা হবে।

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
২১/০৯/২০১৮

প্রথম পর্বের লিংক:

54 total views, 1 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
সলিম সাহা Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
সলিম সাহা
ব্লগার

যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।
মন্তব্যটি গুরুজির পক্ষ থেকে করা হলো।