শূন্য (গল্প-৩৪)

ফিতা দিয়ে মাপজোখ করে টেবিলে রাখা কাপড়ে দাগ দেবার ফাঁকে ফাঁকে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন পারুল আক্তার। আদা, লেবু, লবঙ্গের চা; চিনি কম। মেঘলা আর জাহানারা চায়ে চিনি বেশি খায় বলে মেঘলা বাসা থেকে ছোট্ট একটা কাঁচের বয়ামে চিনি এনে রেখেছে দোকানে, ওরা ওদের স্বাদ মতো চায়ে চিনি মিশিয়ে খায়। চার নম্বর রোডের রজনীগন্ধা নিবাসের নিচতলায় পাশাপাশি দুটো দোকান-পাপিয়া লেডিস টেইলার্স আর পলাশ ড্রাই কিনার্স; প্রথমটা উত্তরমুখি, দ্বিতীয়টা পূর্ব। এই দুটো দোকান ব্যতিত এই রোডে আর কোনো দোকান নেই, সব আবাসিক বাড়ি। গলিটা সোজা গিয়ে মিশেছে বড় রাস্তার সাথে। ওখানে ফুটপাতে দুটো চায়ের দোকান থাকলেও পায়ে হেঁটে ব্যবধান দুই মিনিটের, তাছাড়া নানা ধরনের লোক ওখানে চা খায় আর আডা মারে, ফলে বাসা থেকে চা বানিয়ে ফ্যাক্সে ভরে নিয়ে আসার অভ্যাস করেছেন পারুল। এখন অবশ্য কাজটি মেঘলা-ই করে।

পাপিয়া লেডিস টেইলার্সের মালিক পারুল। তিনি নিজে কাটিং মাস্টার, দোকানের সামনের দিকের টেবিলটায় তিনি কাপড় কাটেন; পিছনের দিকের তিনটে সেলাই মেশিনের দুটোয় সেলাইয়ের কাজ করে মেঘলা আর জাহানারা, অন্যটায় মাঝে মাঝে বসেন পারুল নিজে। মেঘলা পারুলের মামাতো ভাই রিয়াজুল খানের বড় মেয়ে পাপিয়ার মেয়ে। মেঘলার মায়ের নামেই দোকানটির নাম-পাপিয়া লেডিস টেইলার্স। পাপিয়াকে পারুল নিজের কন্যাই মনে করেন, পাপিয়ার বিয়ে হয়েছে সেই কবে, ছেলে-মেয়ে হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে; তবু পাপিয়া বাসায় বেড়াতে এলে ছোট্ট মেয়ের মতো তাকে কাছে বসিয়ে আদর করে খাওয়ান, মাথার চুল আঁচড়ে দেন। মেঘলা এসব দেখে হাসে। মেঘলা লেখাপড়ায় তেমন ভাল ছিল না, তাই কোনোরকমে এসএসসি পাস করার পর মেয়েকে ফুফুর কাছে দর্জির কাজ শিখতে পাঠিয়েছে পাপিয়া। মেঘলা এখন ভালই কাজ শিখে গেছে। মেঘলাকে দোকানের কর্মচারী বলা যায় না, সে সম্পর্কে পারুলের নাতনি, পারুলের সঙ্গেই থাকে, অর্থাৎ সে মালিকপক্ষ। তবু পারুল থাকা-খাওয়া বাদেও মেঘলাকে প্রতি মাসে হাতখরচ বাবদ চার হাজার টাকা দেন। মেঘলা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলেছে, কিছু টাকা ব্যাংকে রাখে আর কিছু বাড়িতে পাঠায়।

জাহানারা দোকানের প্রকৃত কর্মচারী। মেঘলার পাশের সেলাই মেশিনে বসে ফ্রক সেলাই করছে সে। জাহানারা জন্মসূত্রে অবাঙালি, বিহারী। এখন অবশ্য উর্দুর চেয়ে ওকে বাংলাই বেশি বলতে হয়, সকালে ঘর ছাড়ার আগে আর রাতে ঘরে ফেরার পর পরিবার আর পড়শির সাথেই কেবল উর্দুতে কথা বলার সময় পায়। ওর বাংলাও সাবলীল। বিয়ে করেছিল এক বাঙালি ছেলেকে। দুই বছর সংসার করে একটা পুত্র সন্তানের জন্মের পর স্বামী নিরুদ্দেশ। এক বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর বছর খানেক আগে খবর পেয়েছিল বাঙালি একটা মেয়েকে বিয়ে করে চট্টগ্রামে আছে তার স্বামী। অথচ কী দিওয়ানাই না ছিল তার জন্য! তিনটে বিহারী ছেলেকে টপকে জিতেছিল তার মন! এখন ছেলেকে নিয়ে পিতৃগৃহে থাকে জাহানারা, মিরপুর এগারো নম্বর বিহারী পট্টিতে।

পারুল হাত চালানোর ফাঁকে ফাঁকে মৃদু মাথা দোলাচ্ছেন, দোকানের কম্পিউটারে বাজছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান-
সজনী গো সজনী দিন রজনী কাটে না
যা সখী বল তারে সে ঘাটে যেন আসে না।।

পারুলের বয়স এখন বায়ান্ন। চিকন শারীরিক গড়ন। এখনো যথেষ্ট সুন্দরী তিনি। চুলের এক চতুর্থাংশ পেকে গেলেও তা বোঝার উপায় নেই। নাতনি মেঘলা প্রায়ই তার চুলে কলপ দিয়ে দেয়। মেঘলা তার দাদীকে যথাসম্ভব স্মার্ট রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু একটা ব্যাপারে মেঘলা কিছুতেই দাদীর রুচির পরিবর্তন করতে পারেনি-সংগীতের রুচি। মেঘলা শোনে একালের কিছু শিল্পীর ধুম-ধারাক্কা গান! আর পারুল? তার কৈশোর বয়সের পর থেকে কতো জল পদ্মা-যমুনা-ব্র‏হ্মপুত্র দিয়ে গড়িয়ে আরো কতো নদী হয়ে বঙ্গপোসাগরে গিয়ে পড়লো, পদ্মা-যমুনার পারে কতো-শত শিল্পীর জন্ম হলো, কতো শিল্পী বর্ষার পদ্মার ঘোলা জলের মতো হারিয়ে গেল; কিন্তু কৈশোরে পারুলের হৃদয়ে যে জায়গা করে নিয়েছিলেন-প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁশলে, মান্না দে, ভূপেন হাজারিকা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুকা, বশীর আহমেদ, রুনা লায়লা এবং এঁদের মতো সেকালের আরো কিছু বিখ্যাত শিল্পী; সে জায়গা আজ এতো বছর পরও অটুট। আরেকটু বড় হয়ে রবীন্দ্র সংগীত ভাল লাগতে শুরু করে। সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুবীর সেনের গান খুব শুনতেন, এখনো শোনেন। কৈশোরে বাবা আর ছোট চাচার মাধ্যমে পারুলের সংগীত রুচি যে তারে বাঁধা পড়েছিল, এতো বছর পরও তার থেকে এতোটুকুও নড়চড় হয়নি। ওঁদের পরে যে আর কোনো ভাল শিল্পীর জন্ম হয়নি তা নয়, কিন্তু পরবর্তীকালের শিল্পীরা পারুলের হৃদয়ে দাগ কাটতে পারেননি, অথবা পারুল নিজেই তাদের ব্যাপারে উদাসীন। তাইতো দোকানে কাজ করতে করতে আজও তিনি সেকালের শিল্পীদের গানেই বুঁদ হয়ে থাকেন।

মফস্বল শহরে বাড়ি হলেও পারুলের বাবা ইলিয়াস আলী এবং চাচা আশরাফ আলী খুব সৌখিন এবং সংস্কৃতিবান মানুষ ছিলেন। বাড়িতে রেডিও ছিল, ইলিয়াস আলী বেশ বড় একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেছিলেন। দুই ভাইয়ের একত্র সংসার ছিল। দু’জনে প্রায় পাল্লা দিয়ে ক্যাসেট কিনতেন। সংসারের কাজ-কর্ম সেরে দুপুর বেলা পারুলের মা আর চাচি সেলাই করতে করতে অথবা আধো তন্দ্রায় শুনতেন-প্রতিমা, সন্ধ্যা, লতা, আশার গান। কিন্তু আশির দশকের প্রথমদিকে ইলিয়াস আলীর কী যে হয়ে গেল ভাবলে এখনো অবাক লাগে পারুলের। তখন তিনি ম্যাট্রিক পাশ করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছেন। তার হাসি-খুশি আমুদে বাবা, যিনি কিনা নিয়মিত নামাজ পড়তেন না, মাঝে মাঝে জুম্মার নামাজে যেতেন, ধর্ম-কর্ম নিয়ে তার কোনো বাড়বাড়ি ছিল না; সেই বাবাই হঠাৎ নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করলেন আর মসজিদের নতুন ইমামের পরাপর্শে চিল্লায় গেলেন! তাদের মহল্লার মসজিদের আগের ইমাম মারা যাওয়ায় নতুন ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, নোয়াখালীর ইমাম। ইলিয়াস আলী চিল্লায় গেলেন আর ফিরে এসে আমূল বদলে গেলেন! মেজাজ গম্ভীর আর রুক্ষ হয়ে গেল। ফিরে এসে প্রথমেই তার রোখ চাপলো ক্যাসেট প্লেয়ার এবং ক্যাসেটগুলো বিক্রির! শুনে বাড়ির সবাই তো হাঁ! ইলিয়াস আলীর মাথা ঠিক আছে তো? নয়তো তার এতো সাধের ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটগুলো বিক্রি করতে চাইবেন কেন? তার চাচা আশরাফ আলী তো আকাশ থেকে পড়লেন বড় ভাইয়ের কথা শুনে!

আশরাফ আলী জানতে চাইলেন, ‘ক্যাসেট প্লেয়ার বিক্রি করতে চাও কেন?’
‘গান শোনা হারাম!’
‘চিল্লায় গিয়ে কে তোমার মাথা নষ্ট করলো মিয়া ভাই?’
‘উল্টা-পাল্টা কথা বলবি না। কেউ আমার মাথা নষ্ট করে নাই। সবাইকে আল্লাহ’র পথে আসতে হবে, আল্লাহ’র আইন মেনে চলতে হবে। তুমিও ওসব ফালতু যাত্রা-ফাতরায় অভিনয় করা বাদ দাও। ওসব কাফের মালাউনদের কাজ, মুমিন মুসলমানদের নয়!’

ইলিয়াস আলীর কথা শুনে বাড়ির সবার বিস্ময়ের সীমা রইলো না! যার বন্ধুদের বেশিরভাগই হিন্দু, প্রায় সারাক্ষণ হিন্দুদের সাথে ওঠা-বসা-খাওয়া, সেই হিন্দুদেরই কিনা গালি দিয়ে বলছেন কাফের মালাউন! জীবনে ইলিয়াস আলীর মুখে কেউ এই শব্দ দুটো শোনেনি। আশরাফ আলী সখের যাত্রা করেন। শীতকালে তাদের মহল্লায় সখের যাত্রাপালা হয়, তাতে তিনি অভিনয় করেন। ইলিয়াস আলী নিজেও কয়েকবার বিবেকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আর তিনিই এখন বলছেন ওসব যাত্রা-ফাতরা কাফের মালাউনদের কাজ! এতো অল্প সময়ে একটা মানুষের এতো পরিবর্তন হয় কী করে!

ইলিয়াস আলী নাছোড়বান্দা দেখে আশরাফ আলী বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার ঘরে আমি আস্তে সাউন্ড দিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজাবো, তোমার কানে যাবে না।’
ইলিয়াস আলীর এক কথা, ‘এ বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার রাখা যাবে না।’

শেষে আশরাফ আলী বুদ্ধি খাটিয়ে একদিন বললেন, ‘আমার এক বন্ধু ক্যাসেট প্লেয়ার কিনতে চায়, তার কাছেই বিক্রি করো।’
আসলে বন্ধুর কেনার কথা বলে আশরাফ আলী নিজে বড় ভাইকে টাকা দিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধুর বাড়িতে রেখে এসেছিলেন।

এরপর ইলিয়াস আলীর আরেক আদেশ জারি হলো যার কারণে দুই ভাইকে পৃথক হতে হলো। ইলিয়াস আলী বাড়ির দুই বউ এবং তার মেয়ে পারুলকে বোরকা পরার আদেশ দিলেন। কেন? নবী হযরত মুহাম্মদ নাকি বলে গেছেন-‘যে মেয়ে মাথার কাপড় ছাড়া চলবে কেয়ামতের দিন তার এক একটা চুল এক একটা সাপ হয়ে তাকে কামড়াবে।’

পারুল বোরকা পরতে চাননি। কিন্ত ইলিয়াস নাছোড়বান্দা, স্ত্রী-কন্যাকে তিনি বোরকা পরিয়েই ছাড়বেন। পারুল প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘সাপে কামড়ালে আমাকে কামড়াবে, তাতে তোমার কী!’
ইলিয়াস আলী সপাটে চড় মেরেছিলেন পারুলের গালে। বাধ্য হয়েই পারুল আর তার মাকে বোরকা পরতে হয়েছিল। নিজের স্ত্রী এবং কন্যা মেনে নিলেও ছোট ভাইয়ের বউ মেনে নিলেন না। তিনি বোরকা ছাড়াই বাইরে পরপুরুষের সামনে যেতে থাকলে ইলিয়াস আলী সংসার আলাদা সিদ্ধান্ত জানালেন আশরাফ আলীকে। গুনাহগাদের সঙ্গে তো আর থাকা-খাওয়া-চলা যায় না! ফলে সংসার আলাদা হলো।

বাড়িতে একটা আলমারি ভর্তি বই ছিল। বেশিরভাগ বই-ই ছিল হিন্দু লেখকদের, কিছু মুসলিম লেখকদের বইও ছিল। সংসার ভাগের সময় আলমারিটা ইলিয়াস আলী রাখলেন আর বইগুলো নিলেন আশরাফ আলী। কিছুদিনের মধ্যেই ইলিয়াস আলীর আলমারি ভরলো কোরান, হাদিস এবং নানারকম ধর্মীয় বইপুস্তকে।

তখন পারুল আর তার মাকে বাইরে যাবার সময় বাধ্য হয়ে বোরকা পরতে হতো। পারুলের খুব লজ্জা করতো। তাদের ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে একমাত্র তিনি-ই বোরকা পরতেন। পারুলের মা আর চাচী দারুণ সেলাইয়ের কাজ করতেন। কাপড়ের ওপর মানুষ, পশু-পাখি, লতা-পাতা আঁকতে পারতেন। পারুল মা-চাচীর কাছে সেলাই শিখতেন। ইলিয়াস আলী স্ত্রী এবং কন্যার সেলাইয়ের কাজ নিষিদ্ধ না করলেও একদিন জানিয়ে দিলেন যে মানুষ এবং কোনো প্রাণি যেন তারা না আঁকে; গাছপালা, লতা-পাতা আঁকা যেতে পারে। কাবাঘর কিংবা বাঁকা চাঁদ আঁকাও জায়েজ!

সংসার আলাদা হলে বন্ধুর বাড়ি থেকে ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটগুলো বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন আশরাফ আলী। তখন আর বড় ভাইকে সব বিষয়ে তেমন মান্য করতেন না তিনি। ইলিয়াস আলীও ছোট ভাইয়ের সংসারে নাক গলাতেন না। তবে তার খারাপ লাগতো যখন ছোট ভাইয়ের বউ বেপর্দা হয়ে বাইরে পরপুরুষের সামনে যেতো।

ইলিয়াস আলী সরকারি চাকরি করতেন পোস্ট অফিসে। সারাদিন বাড়িতে থাকতেন না। ফলে দুপুরবেলা পারুলের মা আর চাচী আগের মতোই সেলাই করতে করতে বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গান শুনতেন। আর পারুল তো লুকিয়ে যখন-তখন শুনতেন। তবে একদিন ইলিয়াস আলী অসময়ে বাড়িতে ফেরায় পারুলের মা ধরা পড়ে গিয়েছিলেন, রাতে স্বামীর হাতে মার খেয়েছিলেন তিনি। যে ইলিয়াস আলী কোনোদিন স্ত্রীর গায়ে হাত দিতেন না, নামাজী হওয়া এবং চিল্লা থেকে ফিরে আসার পর তিনিই যখন-তখন স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে শুরু করলেন।

এরপরই ইলিয়াস আলি এক অঘটন ঘটালেন। পরিবারের কারো মতামতের তোয়াক্কা না করে এক রক্ষণশীল-স্বচ্ছল পরিবারের নামাজী ছেলের সঙ্গে পারুলের বিয়ে ঠিক করে ফেলেলেন। সদ্য যুবতী পারুলের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো! পারুল যে ভালবাসে তারই মামাতো ভাই রিয়াজুল ওরফে রিয়াজকে! দুজনে লুকিয়ে লুকিয়ে শহরের নানা জায়গায় প্রেম করে বেড়াতেন। ফুফার বাড়িতে রিয়াজুল যখন-তখন আসতেন পারুলের টানে, তাতে কেউ কোনো সন্দেহ করতো না। আর ইলিয়াস আলী কিনা পারুলের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন! রিয়াজুলও তখন কলেজে পড়েন, ফলে তিনিও কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। সেই বিরহ-কাতর দুঃখের দিনগুলোতে পারুল চাচার ঘরে শুয়ে শুয়ে শুনতেন-
‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কী হবে
জীবনে তোমায় যদি পেলাম না…..’

পারুলের আর তার রিয়াজ ভাইকে পাওয়া হয়নি, তার কান্নাকাটি সব বৃথা গেছে, চন্দন পালঙ্কে না হোক শ্বশুরবাড়ির কাঁঠাল কাঠের খাটে তাকে একা একাও শুতে হয়নি, রাতের পর রাত তাকে শুতে হয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী ধর্মান্ধ বর শেখ আমানুল্লাহ’র সঙ্গে, যে প্রতিবার সহবাসের সময় দোয়া পড়তো-‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়ত্বানা ওয়া জান্নিবিশ শায়ত্বানা মা রাযাক্বতানা।’
আর বীর্যপাতের সময় হাঁফাতে হাঁফাতে কামাতুর স্বরে পড়তো-‘আলহামদুলিল্লাহি জাআলা মিনাল মা-যি বাশারান।’

দোকানে একজন খরিদ্দার ঢুকলো। বছর ত্রিশের বিবাহিত নারী, সঙ্গে বছর চারেকের ছোট্ট একটি মেয়ে। এই মহল্লায় আছে বেশ কয়েক বছর যাবৎ। বললো, ‘খালাম্মা, আমার ব্লাউজ দুটো হয়েছে?’
পারুল হাসিমুখে বললেন, ‘হ্যাঁ, কবেই হয়েছে। বেশ ক’দিন তোমাকে দেখি না যে আয়েশা?’
‘শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম।’
‘ও।’ আশেয়াকে বসবার ছোট্ট বেঞ্চটি দেখিয়ে পারুল আক্তার আবার বললেন, ‘বসো। জাহানারা ব্লাউজ দুটো দে তো।’
আয়েশা মেয়েকে নিয়ে বেঞ্চে বসলো। পারুল আয়েশার মেয়েকে বললেন, ‘দাদাবড়ি বেড়াতে কেমন লাগলো নানু?’
‘ভাল।’ বলেই মায়ের গায়ে গা ঘষতে লাগলো মেয়েটি।
‘গ্রামে গিয়ে কী কী দেখেছো?’
‘নদী দেখেছি, মাছ দেখেছি, তারপর…গরু দেখেছি।’
‘বাঃ তুমি তো অনেক কিছু দেখেছো!’
লাজুক হাসি দিয়ে মায়ের দিকে তাকালো মেয়েটি।

আয়েশা তার জিনিস বুঝে পেয়ে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলে আবার কাজে মন দিলেন পারুল, মেঘলা আর জাহানারা।

কেবল এই গলি নয়, এই ব্লকের অনেক নারী-ই পাপিয়া লেডিস টেইলার্সে আসে তাদের প্রয়োজনীয় পোশাক বানাতে। অনেকে বসে চা খায়, গল্প করে; বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ নারীরা, তারা তাদের সংসারের সুখ-দুঃখের গল্পও করে। কেউ আসে কেবল পরচর্চা-পরনিন্দা করতে, তাও শুনতে হয় দোকানের তিন অসম বয়সের শ্রোতাকে।
কম্পিউটারে এখন বাজছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান-
এ শুধু গানের দিন
এ লগন গান শোনাবার।
এ তিথি শুধু গো যেন
দখিন হাওয়ার।।

দোকানের সামনে দিয়ে একটা রিক্সা গেল, রিক্সার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরানোর সময় হঠাৎ পারুলের দৃষ্টি পড়লো রাস্তার ওপারের বাড়িটার দোতলার বারান্দায়। দ্রুতই দৃষ্টি নামিয়ে আনলেন তিন। কাপড়ে দাগ কাটতে কাটতে পুনরায় বার দুয়েক আড়চোখে তাকালেন বারান্দার দিকে। একজন লোক বারান্দার চেয়ারে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে আর মৃদু মাথা দোলাচ্ছেন। লোকটাকে কি বৃদ্ধ বলা যায়? বয়স ষাটের এপাশ-ওপাশ হবে হয়তো। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ। দাড়ি কামানো পরিষ্কার মুখমণ্ডল। মাথায় কাঁচাপাকা ব্যাকব্রাশ করা চুল, সামনের দিকের চুল ঝরে যাওয়ায় কপাল কিছুটা প্রশস্ত। মাত্র দু-বারের চোরা চাহনিতে লোকটাকে ভালমতো দেখে নিলেন পারুল। লোকটাকে আগে কখনো দ্যাখেননি। ওই বাসাটা খালি পড়েছিল মাস দুয়েক, লোকটা নতুন ভাড়াটিয়া তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই মাসেই উঠেছে। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার ওই বারান্দায় বছর ত্রিশের এক নারী, বছর পঁয়ত্রিশের এক তরুণ আর চার-পাঁচ বছরের একটা ছেলেকে দেখলেও লোকটাকে এই প্রথম দেখলেন তিনি।

উহ্ লোকটা এখনো তাকিয়ে আছেন এদিকে। এই বয়সেও লোল লোল স্বভাব যায়নি! পারুলের অস্বস্তি হচ্ছে। হাত মৃদু কাঁপছে। আবার চোরা চাহনি দিলেন তিনি, উহ্ লোকটা এখনো তাকিয়ে আছেন! বুকের মধ্যে কেমন ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করলো পারুলের। আজ থেকে অনেক বছর আগে পুরুষের চাহনি দেখে তার বুকের মধ্যে এমন ঢিপি ঢিপ করেছিল। সেই চাহনি ছিল তার রিয়াজ ভাইয়ের। তিনি মামা বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, রিয়াজ ভাই তাকে একলা ঘরে পেয়ে তার দুই হাত ধরে চোখের দিকে এমনিভাবে অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তার আগে থেকেই তাদের মধ্যে প্রেম চলছিল, তবু রিয়াজ ভাই তার হাত ধরে চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকায় বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। সেদিনই প্রথম রিয়াজ ভাই তাকে চুমু খেয়েছিলেন!

লোকটা মৃদু মাথা দোলাচ্ছে, নিশ্চয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান শুনে। পারুল কম্পিউটারের সাউন্ড কমিয়ে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে চোরা চাহনি দিয়ে দেখলেন লোকটার মৃদু মাথা দোলানো থেমে গেছে। লোকটা এবার অন্যদিকে মুখ ঘোরালেন। চুপচাপ বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কিছুক্ষণ পর বছর পাঁচেকের একটি ছোট্ট ছেলে এসে লোকটার কোলে চড়ে বসলো, আরো কিছুক্ষণ পর ছেলেটি লোকটার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। সবই আড়চোখে লক্ষ করলেন পারুল। এবার তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

এরপর থেকে রোজই দিনে কয়েকবার অনেকটা সময় বারান্দায় বসে কাটাতে লাগলেন লোকটা। পারুলও আড়চোখে বারান্দায় তাকিয়ে লোকটা এবং লোকটার পরিবার সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করলেন। পারুলের মনে হলো লোকটার স্ত্রী নেই। লোকটার ছেলে এবং বৌমা সকালে কাজে বেরিয়ে যায়। সারাদিন বাসায় থাকে ওই লোকটা, লোকটার নাতি আর একটা কাজের মেয়ে। স্কুল ভ্যান এসে ছেলেটাকে নিয়ে এবং দিয়ে যায়।

এ কদিনে একটা বিষয় বুঝতে পেরেছেন পারুল, লোকটা গান পছন্দ করেন, পুরনো দিনের গান। গতকাল বিকেলে জগজিৎ সিং এর গজল চালিয়ে বেশ জোরে সাউন্ড দিয়েছিলেন তিনি। লোকটার মুখ উজ্জল হয়ে উঠেছিল। হাত দিয়ে নিজের থাইয়ে তাল দিচ্ছিলেন আর মৃদু মাথা দোলাচ্ছিলেন। লোকটা ভাল না মন্দ তা বুঝতে পারছেন না পারুল। অমন করে তাকিয়ে থাকেন কেন অন্য নারীর দিকে? অমন করে তাকিয়ে থাকলে তার কাজ করতে খুব অস্বস্তি হয়।

দুই

পাশের দোকান অর্থাৎ পলাশ ড্রাই কিনার্সের পলাশ এসে দাঁড়ালো পাপিয়া লেডিস টেইলার্সের সামনে, পারুলের উদ্দেশে বললো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভাল। তোকে দেখি না যে দু-দিন?’
‘দে দে..দেশের বাড়ি গিছিলাম।’

আাড়চোখে পলাশ কয়েকবার মেঘলাকে দেখে নিলো, মেঘলাও পলাশকে। মেঘলা মোবাইলে গান চালিয়ে হেডফোনে শুনছিল, হেডফোন খুলে ফেললো, হয়তো পলাশ কী বলে তা শোনার জন্য। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা হলো না পলাশের, কেউ একজন পলাশকে ডাকায় সে তার নিজের দোকানে চলে গেল।

কাপড়ে কাঁচি চালানোর ফাঁকে পলাশের চলে যাওয়া দেখলেন পারুল। পলাশ আগে পারুলকে খালাম্মা বলে ডাকতো। মেঘলা এখানে আসার কিছুদিন পর থেকেই তাকে আর খালাম্মা বলে না, শুধুই আপনি করে সম্বোধন করে। আর পলাশ দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালে মেঘলার মুখের অভিব্যক্তিও বদলে যায়। আজকাল পারুলের মনে হয় মেঘলা কারো সাথে প্রেম করছে, অনেক রাত পর্যন্ত ফোনে কথা বলে। দোকানে কাজ করতে করতে মোবাইলে মেসেজ এলে মোবাইলের স্ক্রীনে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। আর পলাশও দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়, চোখমুখে একটা গদগদ ভাব থাকে। ছেলেটা দেখতে সুন্দর, লম্বা, ফর্সা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যে কেউ ওকে দেখলে শিক্ষিত এবং বড় চাকুরে ভাববে, বেশ ব্যক্তিত্ববান মনে হয়। কিন্তু ও যখন হাসে কিংবা কথা বলে তখনই ওর ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। হাসিটা একদমই বোকা বোকা, ওপর পাটির ডান দিকের একটা দাঁতের অর্ধেক ভাঙা। কিছুটা তোতলাও। তবে ছেলেটা বুদ্ধিমান এবং পরিশ্রমী। যখন লন্ড্রীর দোকানটি খুললো তখন সে নিজেই সব কাজ করতো। তারপর লন্ড্রীর কাজের জন্য একটা ছেলে রাখে দোকানে। দু-বছরের মাথায় ডি ব্লকে আরেকটি দোকান নিয়েছে সে। এখন তার দুই দোকানে চারজন কর্মচারী। সে নিজে এখন খাতাপত্রের কাজ আর মোবাইলে রিচার্জ এবং বিকাশের টাকা লেনদেন করে। এই দোকানেই বেশি থাকে, মাঝে মাঝে যায় ব্লকের দোকানে। পলাশ মাঝে মাঝেই পারুলকে তার উন্নতি এবং স্বপ্নের গল্প শোনায়। সে আর বেশিদিন এই ছোট্ট গলিতে পড়ে থাকবে না, আরো ভাল পজিশনে আরো বড় দোকান দেবে, অনেকগুলি শাখা খুলবে ইত্যাদি। ওর স্বপ্নের কথা শুনতে পারলের মন্দ লাগে না।

মাঝে মাঝেই পারুলের মনে প্রশ্ন জাগে, পলাশের সাথে কি মেঘলার কিছু একটা চলছে? এ বিষয়ে তিনি জাহানারাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, কিন্তু জাহানারা বলেছে সে কিছু জানে না। অথবা জাহানারা কিছু জানলেও মেঘলার নিষেধাজ্ঞার করণে হয়তো বলেনি। তবে পলাশ ছেলেটা মন্দ নয়। স্বভাব-চরিত্র ভাল, দিন দিন অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। উন্নতি করতে যে দম লাগে তা আছে ছেলেটার।

পলাশের সঙ্গে মেঘলার যদি কিছু হয়েই থাকে তবে তিনি ওদের সম্পর্ক মেনে নেবেন। মেঘলার মা-বাবাকেও রাজি করাবেন। মেঘলার মা-বাবা তার কথা ফেলতে পারবে না। তাছাড়া মেঘলা তার কাছে থাকে, মেঘলার জীবনের ভাল-মন্দের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তারও তো আছে।

পারুল নিজে তার মনের মানুষকে বিয়ে করতে পারেননি। রিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক মেনে নেননি তার বাবা ইলিয়াস আলী। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ই ইলিয়াস আলী নিজের পছন্দের পাত্র আমানুল্লাহ’র সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছিলেন। কী হলো তাতে? বিয়েটা তো টিকলো না। তিন বছরের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন পারুল। এক বছরের ছেলেকে নিয়ে উঠেছিলেন বাপের বাড়িতে। অবশ্য বাড়িটা তখন আর বাপের নেই, ভাইদের। ইলিয়াস আলী তখন পরপারে, নিজের গোঁয়ার্তুমির ফলে মেয়ের চূড়ান্ত ক্ষতি এবং কষ্ট তিনি দেখে যেতে পারেননি।

রিয়াজ ভাইও তখন বিবাহিত, এক কন্যার পিতা। রিয়াজ ভাই তার কন্যার নাম রেখেছিলেন পাপিয়া। বিয়ের আগে দুজনে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করার সময় রিয়াজ ভাই একদিন বলেছিলেন, ‘আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখবো পাপিয়া।’
‘আর যদি ছেলে হয়?’ বলেছিলেন পারুল।
‘ছেলে হলে নাম রাখবে তুমি। কী নাম রাখবে?’
‘পরে ভেবে বলবো।’

আর ভাবা হয়নি পারুলের, জানানো হয়নি রিয়াজ ভাইকে। গর্ভে ধারণ করে তাকে জন্ম দিতে হয়েছে আমানুল্লাহ’র ঔরসজাত সন্তান ইমরানকে। ডিভোর্সের পর ইমরানকে তিনি আর আমানুল্লাহ’র ছত্রছায়ায় যেতে দেননি। ইমরান এখন নিউজিল্যান্ডে। এখান থেকে বিবিএ শেষ করার পর নিউজিল্যান্ডে গিয়ে এমবিএ করেছে। এখন চাকরি করছে, বিয়ে করেনি এখনো।

আমানুল্লাহকে ডিভোর্স দিয়ে ভাইদের সংসারে ফিরে আসার পর সে কী অশান্তি ভাই আর ভাইয়ের বউদের সঙ্গে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধর করেছিলেন রিয়াজ ভাই। রিয়াজ ভাই তখন ঢাকায় চাকরি করেন। তিনি একটা লেডিস টেইলার্সে পারুলের চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন। সেলাইয়ের কাজ বাড়িতে থাকতেই কিছু জানা ছিল। বাকিটা ঢাকায় এসে ওই লেডিস টেইলার্স থেকে শেখা। তার একমাত্র সন্তান ইমরান তখন বাড়িতে মা-ভাইদের কাছে থাকতো, পরে ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর তিনি নিজেই রিয়াজ ভাইয়ের মেয়ের নামে খুলেছেন-‘পাপিয়া লেডিস টেইলাসর্’। রিয়াজ ভাই ঠিকই তার মেয়ের নাম রেখেছেন পাপিয়া, দুঃখ এই যে তিনি পাপিয়ার মা হতে পারেননি। টেইলার্স দেবার সময় রিয়াজ ভাই তাকে আর্থিক সাহায্যও করেছিল, কয়েক বছর পর সেই টাকা ফিরিয়ে দিতে গেলে রিয়াজ ভাই নেননি।
পারুল এখনো পাপিয়াকে কন্যাসম স্নেহ করেন। রিয়াজ ভাই বেঁচে নেই, বছর পাঁচেক আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। রিয়াজ ভাইয়ের বউ সুফিয়া ভাবী এখন রাজবাড়ীতে থাকেন ছোট ছেলের কাছে। ভাবীর শরীরও ভাল না। প্রায়ই কথা হয় ফোনে। রিয়াজ ভাইয়ের বিয়ের পর প্রথমদিকে সুফিয়া ভাবীর সঙ্গে পারুলের সম্পর্ক তেমন গাঢ় ছিল না, বরং পারুল ভেতরে ভেতরে ঈর্ষা করতেন তার সুফিয়া ভাবীকে। একটা ঘটনার পর থেকেই তাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।

ঘটনাটা ঘটেছিল রিয়াজ ভাই পারুলকে ঢাকায় এনে টেইলার্সের কাজে ঢুকিয়ে দেবার পর। তখন পারুল ছোট্ট একটা রুম নিয়ে একাই থাকতেন। একদিন অফিস শেষে রিয়াজ ভাই দেখা করতে এসেছিলেন। পারুলের যে সেদিন কী হয়েছিল, চা-নাস্তা খাওয়ানোর পর হঠাৎ রিয়াজ ভাইকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। প্রবল কামোত্তেজনায় রিয়াজ ভাইয়ের গলায়-মুখে চুমু খেতে শুরু করেছিলেন। রিয়াজ ভাই পারুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোর ভাবী আমাদের সম্পর্কের কথা জেনেও আমাদেরকে খুব বিশ্বাস করে। আমার চেয়েও তোকে বেশি বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে বলেই আমাকে তোর এখানে আসতে বাধা দেয় না, বরং সে নিজেই তোর খোঁজ নিতে আমাকে পাঠায়।’

রিয়াজ ভাইয়ের পিঠে আর বাহুতে কাঁকড়ার মতো আঁকড়ে থাকা তার হাতের আঙুলগুলো মুহূর্তেই শিথিল হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রিয়াজ ভাই চলে যাবার পর খুব কেঁদেছিলেন তিনি। এরপর থেকে রিয়াজ ভাই ছিল কেবলই তার ভাই, আর সুফিয়া ভাবী যেন তার বাল্যসখী।
মেঘলা জানে যে তার দাদার সঙ্গে পারুল দাদীর সম্পর্ক ছিল। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে প্রায়ই সে দাদার সম্পর্কে অনেক কথা শোনে পারুলের কাছ থেকে, তারা কিভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করতেন বাদ যায় না সে-সব কথাও। মেঘলা শোনে আর খিল খিল করে হাসে।

পারুল দাদীর হঠাৎ যে কী হয়েছে মেঘলা তা বুঝতে পারছে না। আজকাল বেশ পরিপাটী হয়ে দোকানে যান। আগে বেশিরভাগ দিন সালোয়ার কামিজ পরেই দোকানে যেতেন, আজকাল পরছেন কেবল শাড়ি। সেদিন মেঘলার লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিপ দেবার সময় মেঘলা হঠাৎ দেখে বললো, ‘দাদী, তোমার রকমসকম তো কিছু বুঝতেছিনে, হঠাৎ ঠোঁটে লিপস্টিক দিতাছো, কারো প্রেমে পড়ছো নাকি?’

মেঘলা দেখে ফেলায় প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন পারুল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে নিজেও মোক্ষম উত্তরটা দিলেন, ‘হ, পলাশের প্রেমে পড়ছি!’

লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল মেঘলার মুখ।
‘যাও!’ বলে সামনে থেকে সরে পড়েছিল মেঘলা।

প্রথম প্রথম যখন লোকটা বারান্দায় বসে পারুলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন তখন তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন, বিরক্ত লাগতো, রাগ হতো। এখন আর সে-সব লাগে না। বরং মনে হয় ছেলে-বৌমা অফিসে চলে যায়, নিঃসঙ্গ লোকটার কোনো সঙ্গী নেই, দোকানের দিকে তাকিয়ে তাদের কাজ করা দ্যাখে, গান শুনে মনে আনন্দ পায়। তাকিয়ে ভাল লাগলে তাকাক না, গান শুনে আনন্দ পেলে পাক না! পারুল কম্পিউটারের সাউন্ড বাড়িয়ে দেন।

পারুল যখন নিজে দোকান দেন, তার মাস কয়েক পরেই একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেছিলেন। তারপর তো ক্যাসেট প্লেয়ারের দিন ফুরোলো। এরপর তিনি কিনেছিলেন একটা সিডি প্লেয়ার। বছর খানেক হলো নাতনির আগ্রহে কিনেছেন একটা কম্পিউটার। মেঘলা তাকে বুঝিয়েছিল, ‘কম্পিউটার আর ওয়াইফাই কিনে নিলে তোমাকে আর পয়সা খরচ করে গানের সিডি কিনতে হবে না, ইউটিউবে সব কিছু শুনতে পাবা। শুধু মাসে মাসে ইন্টারনেটের বিলটা দিতে হবে।’

পারুল কম্পিউটারের কিছুই জানতেন না। ইউটিউবের নাম প্রথম শোনেন মেঘলার মুখে। তিনি বলেছিলেন, ‘ইউটিউবে কি মান্না, হেমন্ত, লতা, সন্ধ্যার গান আছে?’

‘সব আছে দাদী। একটা কম্পিউটার কেনো আমি তোমারে সব শিখায়া দিমু। আর তখন টাকা-পয়সার হিসাবও কম্পিউটারেই রাখমু।’

কম্পিউটার আর ওয়াইফাই কিনে ইন্টারনেটের লাইন নেবার পর বিস্ময় বনে গিয়েছিলেন পারুল! প্রথমে মানুষ ইয়া বড় কলের গানে গান শুনতো, তাদের পাড়ার ননীবাবুর ছিল। তারপর এলো ক্যাসেট প্লেয়ার, তার বাবা-চাচার ছিল। এরপর এলো সিডি প্লেয়ার। এখন কম্পিউটার আর এইটুকু পুচকে মোবাইলেই গান শোনা যায়! ইউটিউবে হেমন্ত মান্না দে থেকে শুরু করে সেকালের সব শিল্পীদের গান পেয়ে পারুল প্রথমদিকে শিশুর মতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। এখন তিনি নিজেই ইউটিউব চালানো শিখে গেছেন। নিজে নিজেই সার্চ দিয়ে পুরোনো দিনের শিল্পীদের গান শোনেন।

আজ সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছেন পারুল, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করা ব্লাউজ। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। কপালে লাল টিপ। আজকাল সাজতে খুব ভাললাগে তার। এই নিয়ে মেঘলা মাঝে মাঝেই রসিকতা করে। মেঘলা তো আগে থেকেই চাইতো তার দাদীকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে, কিন্তু দাদী তখন সাজতে চাইতো না। আর এখন হঠাৎ কী এমন হলো যে দাদী নিজেই সেজেগুজে দোকানে যেতে শুরু করেছে! দাদীর এই হঠাৎ পরিবর্তন খুব ভাল লাগে মেঘলার।

দোকানে এখন পারুল আর জাহানারা। মেঘলার শরীর খারাপ থাকায় দোকানে আসেনি, বলেছে পরে আসবে। কাজ করতে করতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর মাঝে মাঝেই বারান্দায় তাকাচ্ছেন পারুল। লোকটি বারান্দায় নেই। পারুলের মনের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠছে-লোকটা বারান্দায় আসে না কেন? দোকানের দিকে তাকায় না কেন? আজকাল যেন নিজের অজান্তেই তিনি লোকটার প্রতীক্ষায় থাকেন। লোকটা বারান্দায় এসে না বসলে বারান্দার ওই শূন্য চেয়ারটার মতো তার নিজের মনটাও যেন শূন্য শূন্য লাগে! তিনি নিজেই আবার মনকে শাসন করেন-‘পারুল, বুড়ো বয়সে তোর কি ভিমরতি হলো? লোকটা তোর কে যে তার জন্য মন উচাটন হয়? ছিঃ পারুল, নিজের কাজে মন দে।’ অবুঝ মন, মন শোনে না মনের বারণ, তাই বারবার বারান্দায় চোখ চলে যায়।
পারুল কম্পিউটারে মোহাম্মদ রফির গাওয়া নজরুলগীতি চালালেন-
‘উচাটন মন ঘরে রয় না
প্রিয়া মোর।।
ডাকে পথে বাঁকা তব নয়না
উচাটন মন ঘরে রয় না
প্রিয়া মোর…’

আর কী আশ্চর্য, একটু পরই লোকটা বারান্দায় এসে চেয়ারে বসলেন! কিশোরীর চপলতায় পারুল সাউন্ড বাড়িয়ে দিলেন। লোকটা দোকানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা দোলাচ্ছেন, ঠোঁট নাড়ছেন। পারুলের মনে হলো নিশ্চয় লোকটা মনে মনে গানটা গাইছেন, অথবা নিচু স্বরে গাইছেন যা এখান থেকে শোনা যাচ্ছে না। এবার পারুল নিজেও গানটির সঙ্গে নিচুস্বরে গলা মেলাতে লাগলেন-
লইয়া স্মৃতির লেখা
কত আর কাঁদি একা।।
ফুল গেলে কাঁটা কেন যায় না
প্রিয়া মোর।।
উচাটন মন ঘরে রয় না
প্রিয়া মোর
উচাটন মন ঘরে রয় না।।

এই অদ্ভুত ভাললাগার মাঝে হঠাৎ একটা র‌্যাবের গাড়ি এসে থামলো রাস্তায়। গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজন র‌্যাব সদস্য পলাশ ড্রাই কিনার্সের দিকে এগিয়ে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই পলাশকে দোকানের মধ্যেই ধরে ফেললো তারা। রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছিল তারা থমকে দাঁড়ালো। উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেল। পারুল নিজেও কম্পিউটার বন্ধ করে দোকান থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। একজন র‌্যাব সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করেছে ও?’

‘কথা বলবেন না, সরে যান।’ প্রায় ধমকের সুরে বললো একজন র‌্যাব সদস্য।

পলাশের হাতে হাতকড়া পড়িয়ে ওকে গাড়িতে তুললো দুজন র‌্যাব সদস্য। আর কয়েকজন র‌্যাব সদস্য পলাশের দোকানের জিনিসপত্র এলোমেলো করে, তন্ন তন্ন কিছু খুঁজতে লাগলো। শোকেচের নিচের তলায় পাওয়া গেল একটি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি, কিছু জিহাদী বই আর একখানা কোরান। একজন র‌্যাব সদস্য সেগুলো উদ্ধার করে অন্য একজনের হাতে দিলো। এখানে-সেখানে খুঁজে আরো কিছু জিহাদী বই পেল র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাবের কোনো সদস্যের মাধ্যমেই হোক আর কোনো উৎসুক জনতার অনুমানের ভিত্তিতেই হোক, সকল উৎসুক জনতার মধ্যে এই কথাটা ছড়িয়ে পড়লো যে পলাশ একটা জিহাদী জঙ্গি।

পারুল হতবাক হয়ে গেলেন, পলাশ জঙ্গি? এও কি সম্ভব? ওর মুখে তো দাড়ি নেই, মাওলানাদের মতো পোশাকও পরে না! টুপি মাথায় দিয়ে পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে যায় নিয়মিত, সে তো অনেকেই যায়।

পলাশ ড্রাই কিনার্স সিলগালা করে দিলো র‌্যাব সদস্যরা। তারপর পলাশকে নিয়ে গজরাতে গজরাতে গলি থেকে বেরিয়ে গেল র‌্যাবের গাড়িটা। পারুল ফিরে এলেন নিজের দোকানে।

মনটা খারাপ হয়ে গেল পারুলের এই ভেবে যে সত্যিই কি পলাশের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে মেঘলার? তাহলে তো মেঘলাও থানা পুলিশের ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে! আবার নিজেই এই বলে মনকে প্রবোধ দিলেন যে, না তেমন কিছু থাকলে তিনি নিশ্চয় টের পেতেন, জাহানারা টের পেতো। পলাশের সঙ্গে মেঘলার কোনো সম্পর্ক নেই ভেবে তিনি বেশ স্বস্তি বোধ করলেন। আর পলাশ একটা জঙ্গি, যে জঙ্গিরা দিনে দুপুরে মানুষকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে, যে জঙ্গিরা বোমা ফাটিয়ে মানুষ মারে; ভাবতেই পলাশের প্রতি ঘৃণা জন্মালো তার। মনে হলো বড় কোনো অঘটন ঘটানোর আগেই যে পলাশ ধরা পড়েছে, বেশ হয়েছে।

একজন মধ্যবয়সী নারীকে তার কাপড় বুঝিয়ে দিচ্ছেন পারুল, হঠাৎ দেখলেন দোতলার তরুণ দম্পতি বাড়ির গেট দিয়ে বের হলো। গেটের সামনে একটা সাদা প্রাইভেট কার। তিনি টাকা গুনে ড্রয়ারে রেখে নারীকে বিদায় দিলেন। পরক্ষণেই দেখতে পেলেন লোকটা গেট দিয়ে বের হলেন। লোকটার বাম হাত ধরে আছে ছোট্ট ছেলেটি আর ডান হাতে সাদাছড়ি! ছোট্ট ছেলেটি নিজেই গাড়ির সামনের দরজা খুলে সিটে বসে পড়লো। তরুণটি লোকটার হাত থেকে সাদাছড়িটা নিয়ে ভাঁজ করে নিজের কাছেই রাখলো আর তরুণীটি লোকটার ডানহাত ধরে গাড়িতে বাসিয়ে দিলো। তারপর তরুণ দম্পতি লোকটির দুইপাশের সিটে বসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা পারুলের চোখের আড়ালে চলে গেলে তিনি বিস্ময়ে দোতলার দিকে তাকালেন, চেয়ারটা নেই। ওই বাসার সামনে দুটো পিকআপ ভ্যানে মালামাল তোলা হচ্ছিল, কিন্তু পলাশের ঘটনাটার জন্য কোন ভাড়াটিয়া চলে যাচ্ছে সে বিষয়টায় আর মনোযোগ দেননি তিনি। মাত্র মাস কয়েক আগেই বাসাটায় উঠেছিল পরিবারটি।

পরক্ষণেই দোকানে ঢুকলো মেঘলা। দাদীকে দোতলার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই জাহানারা বললো, ‘জানোস, পলাশরে র‌্যাব ধইরা নিয়া গেছে!’

‘ক্যান?’ যেন আঁৎকে উঠলো মেঘলা।
‘অয় তো এট্টা জঙ্গি। ওর দোকানে বন্দুক, গুলি আর জিহাদি বই-টই পাওয়া গেছে।’

মেঘলা ধপাস করে বসে পড়লো খরিদ্দাররা এলে যে ছোট্ট বেঞ্চটায় বসে সেটায়, ওর চোখ ছলছল করে উঠলো। পারুল মেঘলার চেহারা দেখেই কিছু অনুমান করতে পারলেন, কাছে গিয়ে মেঘলার ঘাড়ে হাত রাখতেই তার কোমর জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো মেঘলা। জাহানারা এই কান্নার অর্থ বুঝলো কি বুঝলো না কে জানে, সে হাবলার মতো তাকিয়ে রইলো মেঘলার দিকে। পারুলের কোমর জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছে মেঘলা। মেঘলার মাথায় সান্ত্বনার হাত রেখে পারুলের বুকের মধ্যেও শূন্যতার হাহাকার উঠলো যেন! তার দিকে তাকানোর অপরাধে যে লোকটাকে প্রথমদিকে তিনি নারীলোলুপ ভেবেছিলেন, পরের দিকে যে লোকটার তাকানো তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন, সংগীতপ্রীতির জন্য যে লোকটার প্রতি একটা অদ্ভুত ভাললাগা এবং মায়া জন্মেছিল তার, যে লোকটার জন্য তিনি দিনের পর দিন শাড়ি পরে সেজেগুজে দোকানে এসেছেন; অথচ সেই লোকটা…! পারুল তাকিয়ে রইলেন দোতলার শূন্য বারান্দার দিকে! তার অন্তর্জগৎ থেকে যেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় গেয়ে উঠলেন বিদ্যাপতি ঠাকুরের পদ-
‘ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর…’

ঢাকা।
মে, ২০১৮

51 total views, 4 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of