আওয়ামীলীগ-বিএনপি’র এক্সটেনশন হিসেবেই ক্রিয়াশীল থাকবে আমাদের বামপন্থী রাজনীতি?

[প্রেক্ষাপটঃ বর্তমানে কামাল হোসেন-মান্নাদের সাথে বিএনপি’র ঐক্যপ্রক্রিয়া, আওয়ামী ফ্যাসিজমের হাত থেকে দেশকে রক্ষা এসব ইস্যুতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের মধ্যে বেশ মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে। বাসদ (খালেকুজ্জামান), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (সাইফুল হক) আর গণসংহতি আন্দোলন- এই ঐক্য প্রকৃয়ার পক্ষে, বা যোগ দেয়ার পক্ষে বা নো-ডিস্টার্ব নীতিতে ফ্যাসিজম মোকাবেলার পক্ষে। গণসংহতি আন্দোলনের সাকি ভাই তো নাগরিক ঐক্যের সমাবেশের হেফাজত- বিএনপির সাথে একই মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন। বাম গণতান্ত্রিক জোটের বাকি দলগুলো অবশ্য এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগদান তো দূরের কথা, সমালোচনাও জারি রাখতে চান- আওয়ামী ফ্যাসিজম বিরোধী জোরদার লড়াই সংগ্রামের পাশাপাশি। অন্যদিকে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের উমর ভাই- ঐক্য প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানিয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এই দলগুলোর কর্মী-সমর্থকরাও ফেসবুকে নানারকম আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি, তিনজনের আলাপের প্রেক্ষিতে- এই পোস্টটি লেখা। প্রথমজনের কমেন্টগুলোর জবাব এই পোস্টেই হাজির করছি; বাকি দুজনের সাথে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কগুলো কিছুটা এডিট ও সংক্ষেপিত করে উপস্থিত করলাম। প্রথমজন বাসদ (খালেকুজ্জামান) এর একজন কর্মী, দ্বিতীয়জন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের একজন কর্মী এবং তৃতীয়জন- এককালে অবিভক্ত বাসদ কর্মী, বর্তমানে প্রবাসে থাকেন ও কিছুটা বাসদ (মার্কসবাদী) এর সমর্থক।]

(ছবি একঃ গণসংআন্দোলনের জোনায়েদ সাকি- জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশের মঞ্চে। গণফোরামের ডঃ কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায়। একই মঞ্চে ছিল- হেফাজতে ইসলামের নেতারা)

 

এক

: এখন যা অবস্থা তাতে লীগ আরেক টার্ম টিকে গেলে ভয়াবহ হবে। ধরি লীগ পড়লে বিএনপি আসবে। কিন্তু সেটাও যদি আসে তবু সেই সরকারের গুছিয়ে উঠতে সময় লাগবে। হরেদরে আক্রমণাত্মক হতে সময় নেবে। এই গ্যাপটুকু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাওয়ার দরকার আছে। .. সঙ্গঠনই করা যাচ্ছে না, আর প্রতিরোধের শক্তি যে সংগ্রহ করবেন? কী করে? আর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একটু অদক্ষও, যেটা লীগ না, প্রতিপক্ষকে ক্র্যাশ করে দেয়ার ব্যাপারে তাঁদের ফ্যাসিবাদী ক্ষমতা বেশী। লীগকে এই টার্মে ফেলানোই দরকার। যেকোন উপায়ে। আমি কোন গত্যন্তর দেখি না।

:: এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে- আওয়ামীলীগকে এই টার্মে ফেলানোই দরকার! আওয়ামীলীগ আরেক টার্ম টিকে গেলে ভয়াবহ হবে। বিরোধীদল, বিরোধীমত একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। এর সাথেও একমত যে- সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু, সেই বিএনপি-জামাতকে নিয়ে আমার কোন আশাবাদ নাই। তবে এটা মনে করি- তারা যতই গণবিরোধী শক্তি হোক না কেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া দরকার- যতদিন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক-জনমুখী শক্তির উত্থান না হচ্ছে, ততদিন পালাক্রমে এই বিএনপি আর আওয়ামীলীগকে আমাদের সহ্য করতেই হবে- ফলে, তুলনামূলক আলোচনার চাইতে জরুরি হচ্ছে- একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ, নিয়মিত সুষ্ঠু নির্বাচন এবং ফ্যাসিস্ট-স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান। এতে যদি জনগণ বিএনপি-জামাতের মত গণবিরোধী শক্তিকেই বেছে নেয়- আপত্তি করার উপায় নাই। হরেদরে আক্রমণাত্মক হতে সময় নিবে কি নিবে না- এইরকম স্পেকুলেশন করার প্রয়োজন দেখি না, বিএনপি-জামাতের ২০০১ নির্বাচনে জেতার আগ মুহুর্ত থেকে বা জেতার পরেপরেই সারাদেশে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল- সেই অভিজ্ঞতা ভুলারও প্রয়োজন দেখি না, কিংবা নেক্সট টার্মে বিএনপিকে নিয়ে কোনরকম আশাবাদও রাখি না। তারপরেও- ফ্যাসিজম দূর হলে কিছুটা মাত্রায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসে, দম ফেলার ফুসরত মেলে- সেই চাওয়াটাও ধারণ করি। সেজন্যে, বিএনপি-জামাত আসবে কি আসবে না, সেইটা নিয়ে হেডেক নাই (বস্তুত- একটু সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসবে। আওয়ামীলীগ নিজেরাও যে সমীক্ষা চালিয়েছে- সেই মোতাবেকও সর্বোচ্চ ৩০টি আসন পেতে পারে। আমার ধারণা- ৩০টা আসন পাওয়াও কঠিন হবে; কেননা- আমার আত্মীয়-স্বজন থেকে বন্ধুবান্ধব পরিচিত অসংখ্য ডাই-হার্ড আওয়ামী সমর্থকদের চিনি, যারা এবার আওয়ামীলীগে ভোট দিবে না), কিন্তু ফ্যাসিজম দূর হওয়া দরকার, কিছুটা মাত্রায় হলেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ আসা দরকার। সেজন্যে- এই টার্মে আওয়ামীলীগকে সরানো অতি আবশ্যিক। কিন্তু, “যেকোন উপায়ে”? আমি মনে করি না। “যেকোন উপায়”- কথাটা খুব ভয়ানক, এবং আমি সবসময়ই এর বিরোধিতা করি। কেননা- এই “যেকোন উপায়ে”র মধ্যে অনেক কিছুই থাকতে পারে। বিদেশীদের/ সাম্রাজ্যবাদীরা সৈন্য- অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যদি আমাদেরকে ফ্যাসিজমের হাত থেকে রক্ষার্থে আসে (যেভাবে লিবিয়ায়, ইরাকে গাদ্দাফি-সাদ্দামের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েছিল)- রাজী হবো? যদি দেশজুড়ে মোল্লারা (হেফাজত- জেএমবি-খেলাফত-জামাত) ইসলামী খেলাফতের ডাক দিয়ে ফ্যাসিজম উৎখাত করতে আসে- সমর্থন জানাবো? কিংবা বিএনপি দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব শুরু করলো- আর্মি ডিজিএফআইও ইনভল্ভ হয়ে গেলে- ’৭৫ এর মত রক্তের বন্যা বয়ে গেল … সমর্থন জানাবো? ফলে- এইরকম “যেকোন উপায়”কেই আমি খুব সন্দেহের চোখে দেখি এবং ভয়ও পাই। ফ্যাসিজম যখন জনগণের বুকে একদম জগদ্দল পাথরের মত এসে বসে- তখন জনগণ সেই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্যে “যেকোন উপায়” খুজে বটে- আর সেটাই আরো ভয়ংকর শক্তিকে ম্যাসাকার করে দিতে উৎসাহিত করে। তাই, এরকম “যেকোন উপায়” – এর ব্যাপারে খুব সাবধান ও সচেতন থাকতে চাই।

: যদি বলেন বামপন্থীদের দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম পথে ফ্যাসিজমকে হঠানোর কথা। খুবই ভাল বিষয়, তাই হওয়া উচিৎ। কিন্তু লীগকে হঠানোর জন্যে অন্যান্য যেসব পক্ষ এখন রাস্তায় আছে, সংগ্রামের লক্ষ্য সেদিকে ঘোরানো মানে হলো লীগকে সুবিধা করে দেয়া। এখন লীগের জন্য তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর কোন প্রয়োজন নাই, আপনি যদি স্রেফ লীগরেও কষে দুইটা গালি দিয়ে বিএনপিরেও দুইটা দেন তাইলেই লীগের চলবে।

:: প্রথমত, অন্যান্য পক্ষ বলতে- বিএনপি-জামাত আর ইদানিংকার গজে ওঠা কামাল-মান্না-বদ-রবদের ঐক্যপ্রক্রিয়া। তো, তারা কতখানি রাস্তায় আছে? কতখানি লড়াই-সংগ্রাম করছে? রাস্তায় আন্দোলন করা, লীগ- পুলিশের মাইর খাওয়া, জেল জরিমানা খাওয়া- এইসবের কোন ইচ্ছা-আগ্রহ তাদের নাই। বিএনপি জামাতও শক্তি জমিয়ে রাখতে চায়, নির্বাচনকালীন সময়ের জন্যে। তাদের মূল লক্ষ নির্বাচন, কোনভাবে একটু সুষ্ঠু নির্বাচন হলে- তারা জিতবে, সেজন্যে তাদের লক্ষ দেশী-বিদেশী নানা চাপে হোক, নির্বাচনকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটা অংশের সহযোগিতায় হোক- কোনভাবে কিছুটা সুষ্ঠু নির্বাচন। আন্দোলন করে নিরপেক্ষ-নির্দলীয় কিংবা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করার কোন লক্ষণ, উদ্যোগ, ভূমিকা- কিছুই তাদের নাই। কিন্তু তারা জিততে চায়, ক্ষমতায় যেতে চায়। ক্ষমতায় গেলে- তারা কি করবে, সেটাও তাদের অতীত ইতিহাস থেকে আমরা জানি, তদুপরি তাদের এমন কোন জনমুখী দাবিনামা- কর্মসূচি নাই, যেখান থেকে বিভ্রান্ত হয়েও বলা যাবে বা আশা করা যাবে যে- বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় গেলে অন্যরকম কিছু হবে! এই কথাগুলো, এই সমালোচনাগুলো বামরা করতে পারবে না? করলে- আওয়ামীলীগের পক্ষে যাবে? দ্বিদলীয় বৃত্তের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখা কি সম্ভব- বিএনপি জামাত জোটের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকে, তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক আশাবাদ ধারণ করে ও প্রকাশ করে (যেমনঃ বিএনপিকে জামাত থেকে দূরে রাখতে হবে, বিএনপিকে আন্দোলনমুখী করতে হবে, বিএনপি’র দাবিনামা- কর্মসূচিতে জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে হবে ইত্যাদি)? আদতে কি এভাবে বিএনপি’র পার্পাস সার্ভ করা হচ্ছে না? বিএনপি’র বি-টিম হওয়ার উদ্যোগ নয় এগুলো? আর, আওয়ামীলীগকে দুটো গালি দিয়ে বিএনপিকেও দুটো গালি দিলে আওয়ামীলীগ খুশিই হবে- এরকম কথা শুনলেই বুঝা যায়, আন্দোলন-লড়াই বলতে এরা কেবল দুটো গালি আর সমালোচনা বুঝে থাকে। আওয়ামীলীগ সরকার এখন ক্ষমতায় থেকে ফ্যাসিজম কায়েম করেছে। তার বিরুদ্ধে তো কেবল সমালোচনা না- রীতিমত রাজপথে, মাঠে ময়দানে লড়াই সংগ্রাম, মিছিল- সমাবেশ, হরতাল অবরোধ- এসব করতে হবে, সেটা করতে গিয়ে পুলিশ- র‍্যাব- লীগের ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী মোকাবেলা করতে হবে। যাবতীয় কর্মসূচির অভিমুখই তো আওয়ামীলীগের ফ্যাসিজম- প্রধান শত্রু তো এটা। বিএনপি-জামাত জোট বা নানারকম ঐক্য- এরা তো এই মুহুর্তের প্রধান শত্রু না যে, তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে নামতে হবে। কিন্তু, তাদের বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা থাকবে না, তাদেরকে যদি গণবিরোধী শক্তি মনে করি- তাদের দ্বারা জনগণের কোন পরিবর্তন সম্ভব না মনে করি- সেইটাও বলা যাবে না? কেননা- এতে আওয়ামীলীগ বেনেফিটেড হবে? এমন অবস্থান কি যৌক্তিক?

: আমি বলছি না কামাল হোসেন- বিএনপি-হেফাজতের ঐক্যমঞ্চে গিয়ে উঠতে হবে। কিন্তু সমালোচনা এই মূহুর্তে কেন? তাতে শুধু লীগের লাভ হচ্ছে তা নয়, মানুষের কাছে এই মূহুর্তে মেসেজ যাচ্ছে যে বামপন্থীরা বাস্তবে লীগের পারপাস সার্ভ করছে। … সময় একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর কিন্তু। আপনি কিছুতেই শীতকালের ওয়াজ গরমকালে করতে পারেন না।

:: শীতকালের ওয়াজ গরমকালে না দেয়ার পরামর্শ/ উপদেশটা বেশ মজার। শীতকাল মানে বুঝানো হচ্ছে- সাধারণ সময়, আর গরমকাল হইতেছে- ইলেকশনের সময় … আমাদের দেশের বামপন্থীরা সারাজীবন দ্বি-দলীয় বৃত্ত ভাঙ্গার ওয়াজ দিলেও- নির্বাচন আসলেই (গরমকাল) এমন গরম হইয়া যায় যে- শীতের ওয়াজ আর মুখেও আনতে চায় না … ২০০৮ এ জামাত-মৌলবাদী জুজু ঠেকানো মূল কর্তব্য হয় (নৌকায় ভর করে হলেও), ২০১৪-এ সংঘাত-সংকট ঠেকানোতে দুইদলের সংলাপ সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া মূল কর্তব্য হয়, ২০১৮ এ এসে একদলীয় ফ্যাসিবাদ ঠেকানো মূল কর্তব্য হয় (বিএনপি’তে মুক্তির পথ পেয়ে হলেও) … এরকমই এরা সারাজীবন কইরা গেছে … বামফ্রন্ট-বাম বিকল্প- বাম জোট- সবকিছুই আসলে থেকে গেছে কথার কথা…
এইসব বি-টিমগিরি করা বামরাই তখন, দ্বিদলীয় বৃত্ত ভাঙ্গার শ্লোগানকে কখনো আওয়ামী পার্পাস কখনো বিএনপি-জামাতের পার্পাস সার্ভ হচ্ছে বলে অভিযোগ করে। ২০০৮ এ ১৪ দলের সমালোচনা করা ছিল- বিএনপি-জামাত-মৌলবাদের পার্পাস সার্ভ করা, আজ বিএনপি-জামাত-কামালদের ঐক্যের সমালোচনা হচ্ছে আওয়ামীলীগের পার্পাস সার্ভ করা! অথচ, তারা যে স্বতন্ত্র বাম-গণতান্ত্রিক অবস্থান খুইয়ে যথাক্রমে আওয়ামীলীগের এক্সটেনশন কিংবা বিএনপি-জামাতের এক্সটেনশন হিসেবে কাজ করছে বা কাজ করার খায়েশ প্রকাশ করছে; সেইটা কি বুঝছে না? স্বতন্ত্র অবস্থানে আন্দোলন মানে- এই মুহুর্তে প্রধান শত্রু ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে রাজপথে- মাঠে – ময়দানে লড়াই-সংগ্রাম এবং একই সাথে একইরকম দাবি যদি অন্যকোন গণবিরোধী শক্তিও তোলে- তাদের সাথে নিজেদের স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ, সেই সমস্ত শক্তি যে গণবিরোধী- এই সমালোচনাও হাজির রাখা; এভাবেই সারাজীবন চলা গেলেও নির্বাচনকালীন গরমকালে সেটা করা যাবে না- বিএনপি-জামাত জোটের বিরোদ্ধাচরণ করা যাবে না! এইসব বি-টিম বামদের পাল্লায় পড়েই আমাদের বামপন্থী আন্দোলন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর!

: ধরেন লীগকে ফেলতে কন্টেস্টিং ফোর্স কামাল হোসেনদের জোট। আপনিও ফেলতে চান কিন্তু প্রধান ধারা না, হতে চান, সেই লক্ষ্যে কাজও করেন। তখন কি আপনি অন্য যারা মাঠে আছে তাদের সমালোচনা করবেন? বিশেষ করে যখন আপনি এই মূহুর্তে কন্টেস্টিং ফোর্স না, এবং ফেলতে পারলে তাঁরাই পারবে। তখন যারা কিঞ্চিত হলে ফেলতে পারার সামর্থ রাখে তাঁদের সমালোচনা করার মানে জনগণের কাছে কী? আর আল্টিমেট রেজাল্টেন্ট কী?

:: লীগকে ফেলতে কন্টেস্টিং ফোর্স মোটেও কামাল হোসেনদের জোট না। রাখঢাকের দরকার নাই- আসল ফোর্স হচ্ছে বিএনপি। কামাল-বদ-মান্না’রা হচ্ছে বড়জোর সহায়ক শক্তি। এরা আন্দোলনেরও সহায়ক শক্তি না, কেননা এরা কয়েকজন ব্যক্তিমাত্র- এদের না আছে কোন দল, না আছে আন্দোলন করার মত কর্মী-সমর্থক বাহিনী। তারপরেও- এদেরকে বিএনপি’র দরকার- নির্বাচনের সময়কালে এদের ইমেজ- দেশে বিদেশে এদের লবি- এইসব কাজে লাগিয়ে কিছুটা সুষ্ঠু নির্বাচন যদি করা যায়- সেই উদ্দেশ্যে। জামাতকে দরকার- নির্বাচনের আগে দিয়ে- নির্বাচনের সময় কিংবা পরে দখলকার্য, কিংবা জ্বালাও-পোড়াও এসবের দরকার হয় সেজন্যে। তাই- বিএনপি ঐক্য প্রক্রিয়াতেও থাকতে চায় যেমন, জামাতকেও রাখতে চায়। কামালরা জানে- বিএনপিকে ছাড়া তারাও অচল, তাই যত যাই শর্ত দেক না কেন- শেষ পর্যন্ত জামাত-টামাত -দাবিদাওয়া-কর্মসূচি এইসব কোনকিছুই কোন ফ্যাক্টর হবে না; স্রেফ আসন ভাগাভগির নিশ্চয়তা পেলেই তারা ঐক্যে থাকবে। তা হোক- সবই তাদের ব্যাপার। এইসব নিয়ে তেমন হেডেক নাই। আসল কথা হচ্ছে- ফ্যাসিজম হঠানো যাচ্ছে কি না। ফ্যাসিজম দূর হয়ে যদি এইসব বিএনপি-জামাত-কামাল-রবরা ক্ষমতায় আসে, তাতেও আপত্তি নাই। কিন্তু, এই জিনিসগুলোরে ক্ষমতায় আনার জন্যে বামদের সচেতন থাকতে হবে, উদ্যোগী হতে হবে? সেটার আল্টিমেট রেজাল্টটা কি – সিপিবি’র বাকশাল করা, নৌকা মার্কায় নির্বাচন করা, মৌলবাদ ঠেকাতে আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ কর্মসূচি নেয়া কিংবা আওয়ামীলীগকে নো ডিস্টার্ব নীতিতে চলা এতদিনকার ইতিহাস, তথা মেনন-ইনু-বড়ুয়াদের ইতিহাসেও শিক্ষা নিতে পারি নাই?

: আবার বলি, আমরা সবাই বুঝি জনগণ লীগের এই অপশাসন আর চায় না। তাঁরা এবার বাক্স পেলে লীগকে সরাতে বিএনপি পেলে বিএনপিতে ভোট দিয়ে হলেও লীগকে সরাবে। মোদ্দা কথা যা হাতের কাছে পাবে তাই সই। তখন যদি আপনি জনগণের সেই হাতের পাঁচের সমালোচনা করেন, জনগণের কাছে আপনি কী হবেন?

:: হা হা, সেইরকম প্রশ্নই বটে! জনগণ বিএনপিকে ভোট দিবে, বিএনপিকে ভালোবেসে না- আওয়ামীলীগ ঠেকাতে। জনগণ বিএনপিকে ভোটটা দিবে বিএনপিকে গালাতে গালাতেই বা বিএনপি সম্পর্কে কোনরকম আস্থা-ভালোবাসা-আশাবাদ ব্যাতিরেকেই। ফলে, জনগণরে প্রো-বিএনপি ভাবার কিছু নাই। ফলে- বামরা বিএনপিকে সমালোচনা করলো কি না- সেইটা নিয়া জনগণ বিচার করবে না। জনগণ দেখবে- বামরা এই ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কতখানি আন্তরিকভাবে রাস্তায় আছে! আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে না থেকে শুধু শুধ বিএনপি’র সমালোচনা করলে, বা বিএনপি-জামাতের সাথে তুলনা করে আওয়ামীলীগকে অগত্যার গতি হিসেবে তুলে ধরলে- আওয়ামীলীগের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করবে ঠিকই। কিন্তু আওয়ামী ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনে থাকলে- বিএনপি-জামাত কামালরে সমালোচনায় পাবলিক আওয়ামীপ্রীতি খুজবে না- কেননা পাবলিক বিএনপি-জামাতের এইসব সমালোচনা নিজেরাই করে। বরং, বামরা যদি- বিএনপি জামাতের মঞ্চে গিয়ে যদি হাজির হয়, নো ডিস্টার্ব নো সমালোচনা নীতি নেয়- বিএনপি-জামাতের বি-টিম বা এক্সটেনশন হিসেবে কর্মকাণ্ড চালায়, তাহলে বিএনপি-জামাতের প্রতি পাবলিকের গালি-সমালোচনার ভাগিদারও তাদের হতে হবে বৈকি। সুতরাং- জনগণের কাছে কি হবেন, সেইটা ইনু-রব-মেননদের পরিণতি দেখে শেখা উচিৎ …

(ছবি দুইঃ ১৮ জুলাই ২০১৮ এ “জোট মহাজোটের বাইরে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তুলুন”- এই আহবান জানিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে।)

দুই

: এইসব বামরা যত কথা যেভাবেই বলুক, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার কৌশল এদের কখনোই ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না, এদের উদ্দেশ্য সেটা না। এদের প্রতি যে নির্দেশনা তারা সেটাই সমাজে করে চলেছেন।

:: উমর ভাইও নাকি বিএনপিকে সমর্থন জানিয়েছেন- মানে আওয়ামী বিরোধী বাম-ডান-অতি ডান সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন – এইরকম কি জানি দেখলাম … তাহলে ব্যাপারটা কি দাড়ালো? ক্ষমতা দখলের কৌশলটা কি এইক্ষেত্রে?

: আমার কাছেও উমর ভাই এর বক্তব্য সমর্থনযোগ্য। এই যে আপনি উপরে যেটা বলেছেন, সেটা হচ্ছে একটু দম ফেলার সময়টা পাওয়া। এখন তো কেউ কোন প্রকার রাজনৈতিক কাজই করতে পারছে না। সামান্য লিফলেটটা পর্যন্ত বিলি করতে দিচ্ছে না, পোষ্টার লাগাতে দিচ্ছে না। সরকারী বেসরকারী বাহিনী দিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে। পছন্দের বক্তব্য ছাড়া কাউকে কোন রাজনীতিই করতে দিচ্ছে না। বিচার বলে রাষ্ট্রে কিছুই নেই। এই অবস্থায় এই শক্তিকে হঠিয়ে নতুন সরকার এলে তার অধিনে কিছুটা দম ফেলার সুযোগ পাওয়ার আশা করে এই অবস্থান হয়তো উমর ভাই নিয়েছেন। এবং শুধু নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা নয়, সঙ্গে নিজেদের অবস্থানটাও তুলে ধরেছেন, যেমন- যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদেরকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল নিতে হবে। বিচার বিভাগসহ অন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করতে হবে। অপহরণ গুম খুন বন্ধ করতে হবে। ইতিমধ্যে যারা অপহরণ গুম খুন হয়েছেন, এব্যাপারে যারা জড়িত তাদেরকে বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ব্যাংক লুটের তদন্ত রিপোর্টগুলো প্রকাশ করতে হবে, দায়ীদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে, পাচারকৃত টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ভারতের সাথে শেখ হাসিনার কৃত গোপন চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে, তা বাতিল করতে হবে। ইত্যাদি দাবী জানিয়ে ভবিষ্যত সরকারের বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়াও আরো যে কথা উমর ভাই বলেছেন, তা হচ্ছে- আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। আন্দোলনকারী পক্ষগুলোকে নিয়ে/ সকল দলের অংশ গ্রহনে নির্বাচনকালীন অস্থায়ী সরকার গঠন করতে হবে ইত্যাদি। শুধু এই সরকারকে হঠিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন, এমন কথা বললে উমর ভাইকে মিসইন্টারপ্রিটেশন হবে। প্রকৃতপক্ষে যেটা অবস্থা সেটা হচ্ছে, যেহেতু নিজেদের সাংগাঠনিক শক্তি দুর্বল সেহেতু সংগঠন গড়ে ওঠা না পর্যন্ত বিপ্লব ঘটানোর মত কর্মসূচী কিভাবে দেয়া সম্ভব।

:: হতাশাজনক! বিএনপি’র পিঠে সওয়ার হয়ে দম ফেলার ফুসরত চাইতেছেন? তারপরে- বিএনপি ক্ষমতায় এসে ফ্যাসিজম কায়েম করলে – তখন সেখান থেকে দম ফেলার ফুসরতের জন্যে আবার আওয়ামীলীগে সওয়ার হবেন … (র‍্যাব বিএনপি’র হাত ধরে আসে, গ্রেনেড হামলা, ক্রসফায়ার ও বাংলা ভাই দিয়ে “চরমপন্থী” নিধন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে টেম্পারিং করে ক্ষমতায় থাকা পার্মানেন্ট করার চেষ্টা- এইসব আগের টার্মেই ছিল- যার দোহাই দিয়া ১১দল ভেঙ্গে দলেবলে আওয়ামীলীগে সওয়ার হইছিলো, সিপিবি হইতে গিয়াও শেষ মুহুর্তে ফিইরা আসছিলো) … এইভাবে চালান … বিপ্লব কর্মসূচি তো দূরের কথা, বুর্জোয়াদের বি-টিম হওয়ার কর্মসূচি দিতে দিতেই এদেশের সব বাম দমবন্ধ হয়ে মারা যাবেন … বামফ্রন্ট – ১১ দল নাই হয়ে গেছে … বাম জোট, মুক্তি কাউন্সিলও নাই হয়ে যাবে – আপনাদের এইসব তামাশার কারণে …

: দম ফেলতে চাওয়াটা কিন্তু মূখ্য কর্মসূচী নয়। নিজেদের কর্মসূচীও রয়েছে, যা উপরে বলেছি। যাই হোক সঙ্গত কারণে একটা প্রশ্ন করি, আশা করি একটু ভেবে জবাব দিন। এই মুহুর্তে আসলে করণীয়টা কী? সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসূচী কী হওয়া উচিৎ?

:: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে- বাকি যে সব কর্মসূচির কথাগুলো বললেন, সেগুলো নিয়ে সামনে আসুন … রাজপথে বেশি করে ভিজিবল হন… মুক্তি কাউন্সিলকে যদি সাংগঠনিকভাবে দূর্বল মনে করেন, তাহলে বাম গণতান্ত্রিক জোট সহ- বৃহত্তর বামদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করুন, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে- যুগপৎ কর্মসূচি নিন … বুর্জোয়াদের ঐক্য নিয়া আপনাদের কথা বলার কি হলো? তাদের ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার কি হলো?
আপনি যদি মনে করেন- সব বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি এক করেও আপনারা অতি ক্ষুদ্র- অতিকায় ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করার সামর্থ্য আপনাদের নাই- তাইলেও তো সমস্যা নাই … আপনারা ফ্যাসিবাদ ফেলতে সমর্থ হবেন না … কেন মনে করছেন- বিএনপিকে সমর্থন দিলেই আপনাদের এই ক্ষুদ্র সমর্থন কোন কাজে আসবে? আপনারা এত ক্ষুদ্র যে- বিএনপি’র প্রতি আপনাদের সমর্থনে কিছু যায় আসবে না- আগামিতে পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। আগামি দু তিন মাসের খেলায় যেকোন কিছুই ঘটতে পারে- সেখানে আপনাদের আসলে কোন ইফেক্টিভ ভূমিকাই থাকবে না … কিন্তু, এক ফ্যাসিবাদ দূর করার লক্ষে আরেক ফ্যাসিবাদে সওয়ার হতে গেলে- নিজেদের রাজনীতিটা শুধু শুধু হারাবেন- আরো ক্ষুদ্র হবেন … ক্ষুদ্র থেকে বড় হওয়ার একটাই মাত্র উপায়- সেটা নিজেদের রাজনীতি নিয়ে কনসিসটেন্ট থাকা … মনে রাখবেন- বি-টিমরে জনগণ পুছে না … সিপিবি’র আজকের দশার কারণ এইটা … ওয়ার্কাস পার্টি- জাসদ তো বলতে গেলে একদম নাই হয়ে গেছে … বুর্জোয়াদের পিঠে সওয়ার হয়ে কোন বাম দলই কোনদিন টিকে নাই … না দেশে, না কোথাও …।

তিন

: ঐক্য প্রক্রিয়ারে কার্যকরী হইতে গেলে আমার মনে হয় দুইটা কাজ করতে হইব, এক বিএনপিরে আনুষ্ঠানিকভাবে জামাত থেকে দূরত্ব রাখতে হবে, দুই অল্প হইলেও আন্দোলনে নামতে হইব। এইগুলিরে বামজোট কাজে লাগাইতে পারে। আর ঐক্য প্রক্রিয়া হইলেও আমার ধারণা এইবারও আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকব, বিএনপি আস্তে পারবে না।

:: বিএনপি’রে কে জামাত থেকে দূরে রাখতে যাবে? কে আন্দোলনে নামাবে? আর বামজোট কোনগুলিরে কাজে লাগাবে? দেখেন- বিএনপি- ঐক্য – জামাত, কি করবে, কি করতে হবে, এইসব নিয়া কি বামজোট মাথা ঘামাবে? নাকি- তার কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলন করবে? আপনি এইখানে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন তাইলে? বিএনপি কোন চুলায় গেল- সেইটা নিয়া বামদের কি?
ঘটনা হচ্ছে- নির্বাচন যদি হয়, জামাত থাকুক আর না থাকুক- বিএনপি জিতবে। সেইটা বিএনপি জানে – কামালরাও জানে … কামালরা জানে বলেই বিএনপি জামাতরে ছাড়তে না চাইলেও কামালরা বিএনপি’র পেছনে লাইনে দাঁড়াবে- আর এইটা আবার বিএনপি জানে বলে- তারা জামাত ছাড়ার শর্তে রাজি হয় নাই … আমরা বসে বসে এইসব তামাশা দেখছি … দেখবো … কিন্তু বিএনপি- কামালদের ঐক্য নিয়া নানারকম আশাবাদ কি করতে পারি? ঐক্য হতে গেলে জামাতকে ছাড়তে হবে, আন্দোলনে নামতে হবে … ইত্যাদি সব কথার কি মানে?

: ঐক্য প্রক্রিয়া বা এইরকম কোনকিছু যদি গইড়া উঠতে চায়, দেয়া উচিত। বামজোট তাগ মঞ্চে না যেয়ে যদি গড়ে উঠতে সহযোগিতা করতে পারে তো ভাল, না পারলে নাই। কিন্তু কোনভাবেই ঐক্যে সামিল হওয়া যাবে না। যুগপৎ আন্দোলন হইতে পারে এবং এইটা ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ আসার পরেও কাজে লাগার সম্ভাবনা আছে।

:: ক্লিয়ার হলো না … তাই কিছু সম্পূরক প্রশ্নগুলো করছিঃ প্রথমত- “ঐক্য প্রক্রিয়া বা এইরকম কোনকিছু যদি গইড়া উঠতে চায়, দেয়া উচিত” => বিএনপি কার সাথে কি ঐক্য করবে, সেইটার সাথে বামদের কি সম্পর্ক? তারা কিভাবে সেটাকে গইড়া উঠতে দিবে? বামজোট বাধাই বা দিচ্ছে কোথায়? দ্বিতীয়ত- “বামজোট তাগ মঞ্চে না যেয়ে যদি গড়ে উঠতে সহযোগিতা করতে পারে তো ভাল, না পারলে নাই” => বামজোট তাদের মঞ্চে না গিয়ে কিভাবে ঐক্য গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে পারে বলে মনে করেন? কেন এই সহযোগিতা করা জরুরি মনে করছেন? এতে বামদের কি লাভ- এভাবে বিএনপি’র এক্সটেনশন হিসেবে কাম করে? এবং তৃতীয়ত- “যুগপৎ আন্দোলন হইতে পারে এবং এইটা ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ আসার পরেও কাজে লাগার সম্ভাবনা আছে” => বিএনপি’র সাথে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়া কেন দরকার? দ্বি-দলীয় বৃত্ত-ফিত্ত নিয়া এতদিনকার বাতচিত সব তাইলে বাকোয়াজ? ২০০৮ এর আগের পরিস্থিতিতে জামাত-মৌলবাদী ইস্যুতে আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া, জোট-মহাজোট গঠন- সেইটার ব্যাপারে কি বলবেন? আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় আসলে- বিএনপি’রে রাস্তায় পাবেন? বা পাইলে বিএনপি’র সাথে আন্দোলন করবে বামরা? বিএনপি’রে আন্দোলনের শক্তি মনে করতেছেন?

: তোমার কথার সাথে আমার পার্থক্য মনে হইতেছে, তুমি ঐক্য গড়ে উঠল কিনা ঐটা নিয়া কনসার্ন না। সেইক্ষেত্রে আমি মনে করি তারা নিজেরা যদি ঐক্য গড়ে তুলতে চায়, সেইটা যেন ওঠে। আমরা যেন কোনভাবেই ইনভলব না হই, তবে অযথা বাগড়া না দেই। তুমি মনে করতেছ বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও আসতে পারে। আমি মনে করতেছি বর্তমান সিচুয়েশনে বিএনপির সেই সম্ভাবনা প্রায় নাই, আওয়ামীলীগই থাকবে এবং পরে আরও বেশী হিংস্র হবে। এইটাও একটা দূরবর্তী কারণ তাদের নিজেদের ঐক্য গড়ে উঠতে দেয়ার।

:: আমি মনে করতেছি- বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করবে- আন্দোলনের মধ্য দিয়ে না … ইলেকশনকে কেন্দ্র করে নানারকম তৎপরতায় … কেননা- এইটা বিএনপি জানে, আওয়ামীলীগ জানে- অবাই জানে, এই মুহুর্তে মিছিল মিটিং হরতাল দিয়ে কোন দাবিই আদায় করতে পারবে না বিএনপি- বাস্তবে দাঁড়ানোর সুযোগই পাবে না- উলটো শক্তি ক্ষয় হবে … নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হওয়ার পর থেকে বিএনপি- একশনে নামতে পারে … হাসিনার নেতৃত্বে সরকার হলে- ২০১৪ এর মত জ্বালাও-পোড়াও এর লাইনেও যাইতে পারে … উদ্দেশ্য জরুরি অবস্থার মত কিছু করা … তাছাড়া ইলেকশনের আগ দিয়া প্রশাসন- আর্মি- আমলারা কি করবে, হাওয়া বুঝে কোনদিকে যাবে- দেশি বিদেশি নানা শক্তি কি ভূমিকা রাখবে- এইরকম নানারকম ক্যালকুলেশন তার আছে- কেননা অন্তত এতটুকু সে জানে যে- পাবলিক ভোট দেয়ার সুযোগ পাইলে- আওয়ামীলীগরে সাইজ করবে … ফলে- যেকোন কিছুই হতে পারে … তবে সেইটা যে আন্দোলন-কর্মসূচি কিছু হবে না- সেইটা হলফ করে বলা যায় … এমনকি বিএনপি হাইরা গেলেও না …
তার চাইতেও বড় কথা- আপনি যেইখানে কোন সম্ভাবনাই দেখছেন না- বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়ার; সেইখানে কেন ওদের ঐক্য নিয়া বামদের মাথা ঘামাইতে কইতেছেন? কেন ঐক্য গড়ে তুলতে বামদের হেল্প করতে কইতেছেন? কেন বিএনপি’র সাথে যুগপৎ কর্মসূচিতে যেতে কইতেছেন? – তাতে কি লাভ হবে? বিএনপি নিজে পারবে না, বামরা হেল্প করলেই বিএনপি ক্ষমতা দখল করতে পারবে- এমনটা মনে করেন? বামরা হেল্প করুক বা না করুক- তাতে ইতর বিশেষ কিছু হবে না (বিএনপি জেতার হলে জিতবে, হারার হইলে হারবে- বামরা হেল্প করুক বা না করুক) … খালি খালি বিএনপি-জামাতের মত ফ্যাসিস্টদের সাথে নিজেদের জড়িয়ে বিএনপি’র বি টিম হওয়ায় কি লাভ?
বামজোট বিএনপি’র সমালোচনা করলে- সেইটা অযথা হবে কেন? বাগড়া দিতে নিষেধ করছেন কেন? বামজোটের নিজের স্বাতন্ত্র্য কিভাবে প্রকাশ করবে- যদি না সে অন্য দুই মেরুকরণের বিরুদ্ধেই কথা না বলে? বামজোট মূল লড়াইটা যদি করে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে- একইসাথে বিএনপি জোটের বিরুদ্ধে না বললে- বিএনপি’র সাথে তার পার্থক্য জনগণের সামনে কিভাবে পরিস্কার করবে? দেখেন, বাগড়া তো দিতেই হবে … বুর্জোয়াদের কামে বাগড়া না দেয়া মানেই হইতেছে- এক্সটেনশন বা বি-টিম হিসেবে কাম করা … ঐসব এক্সটেনশন হিসেবে কাম করার চাইতে মেনন-ইনু-সাকির মত ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগ দেয়া ভালো- তাতে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার চান্স থাকে …

: একটা জোট বা দল আরেকটা জোট বা দলের সাথে একত্রে, যুগপৎ, সমান্তরাল ভাবে আন্দোলন করলেই বি টিম না, বি টিমের মত আচরণ, কাজকারবার, বা রাজনীতি করলে বি টিম হয়।

:: ব্যাপারটা স্রেফ একটা দল/জোটের সাথে আরেকটা দল/জোটের রসায়ন না। একটা “বাম” দল/ জোট যখন আরেকটা “বুর্জোয়া ফ্যাসিবাদী, গণবিরোধী” শক্তির সাথে জোট করে, যুগপৎ কর্মসূচি নেয়- এটা জেনে যে, এর ফলাফল প্রধানত সেই বুর্জোয়া ফ্যাসিবাদী শক্তিই নিবে- অর্থাৎ সেই বুর্জোয়া গণবিরোধী শক্তির ক্ষমতা আরোহনের উপায় হিসেবে নিজেকে স্রেফ ব্যবহৃত হতে দেয় (বিনিময়ে বুর্জোয়া শক্তি ক্ষমতায় গেলে একটা দুইটা এমপি-মন্ত্রী গিফট পাইলেও পাইতে পারে- নাও পারে)- সেই বাম দল/ জোটকেই তখন বুর্জোয়া গণবিরোধী শক্তিটির বি টিম বলে … বিএনপি- জামাত, বুর্জোয়া, গণবিরোধী কি না? বিএনপি জামাত, কোন আন্দোলনের শক্তি কি না (এমনকি বিরোধীদলে থাকা আওয়ামীলীগের সাথে তুলনা করেও বলেন)? বিএনপি-জামাত সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি কি না? বিএনপি-জামাত সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যাবতীয় দাসচুক্তি করা দল কি না? … এখন, এদের সাথে আপনি যুগপৎ আন্দোলন করার কথা বলছেন! কিসের আন্দোলন? আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিএনপিকে বসানোর আন্দোলন! সেই আন্দোলনে বিএনপি’র সাথে থেকে বামদের এচিভমেন্ট কি? এইসব ক্যালকুলেশন মিলিয়েই এইবার বলেন, বিটিম বলবেন কি না?

যাইহোক- একই কথা বারেবারে বলছি … অতীতে এই আপনি কামাল হোসেন- মান্না-রবের সাথে নিদেন বৈঠক, আলোচনা সভায় অংশ নেয়ার দায়ে কোন কোন বামের সমালোচনা করেছেন, এমনকি বামমোর্চাকে বাদ দিয়ে সিপিবি’র সাথে ঐক্য/ যুগপৎ কর্মসূচির ব্যাপারে মেলা কথাবার্তা হইছে … সেইখানে বিএনপির সাথে যুগপৎ কর্মসূচির কথা কল্পনাও করেন কেমনে- বুঝি না … তার চাইতেও বড় কথা- সেই বামফ্রন্ট-১১ দলের আমল থেকেই আমরা সবসময় দ্বিদ্বলীয় বৃত্ত ভাঙ্গার কথা বলেছি; নৌকা-লাঙ্গল-পাল্লা-শীষ- একই বিষ- এইসব বলে এসেছি; আর নির্বাচনের আগে দিয়া (পুরা ১০ বছরে একবারও একটা আন্দোলন আলাদা আলাদা হয়নাই)- বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলন করার কথা চিন্তা করেন কেমনে? এতদিনকার শ্লোগান- আদর্শ- সব কিছুর সাথে প্রতারণা না?

দেখেন, আওয়ামীলীগের প্রতি ঘৃণা ঠিক আছে। আমরা সবাই সেইটা ধারণ করি। কিন্তু আওয়ামীলীগকে হঠানোর জন্যে সেই মন্দের ভালোর সাথে যুগপৎ আন্দোলন করবো? তারপরে বিএনপি ক্ষমতায় এসে- আবার ৫-১০ বছরে এর চাইতেও ভয়ানক হয়ে উঠবে, তখন আওয়ামী ফ্যাসিজমের কথা ভুলে তাকে মন্দের ভালো মনে করে- বিএনপি ফ্যাসিজমের হাত থেকে বাচতে মন্দের ভালো আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ করবো? এই চক্র কি এভাবেই চলবে? বামরা সারাজীবন মন্দের ভালোর সাথে যুগপৎ করেই যাবে শুধু?

(ছবি তিনঃ সিপিবি, বাসদ ও গণোতান্ত্রিক বাম মোর্চার যৌথ সংবাদ সম্মেলন, ১ আগস্ট ২০১৭। ব্যানারে লেখাঃ “মহাজোট, জোট এর বাইরে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোল”।)

4,656 total views, 2 views today

4
Leave a Reply

avatar
2 Comment threads
2 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
3 Comment authors
রাজকাহনঅনুপম সৈকত শান্তনুর নবী দুলাল Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
নুর নবী দুলাল
ব্লগার

আওয়ামীলীগকে একমাত্র বিকল্প বলে আবার ক্ষমতায় আনার মানে এদেশে ফ্যাসিবাদকে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কোনভাবে এইবার শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসতে পারলে বাংলাদেশ নামের গণপ্রজাতন্ত্রী থেকে থেকে বিচ্যুতি ঘটে হাসিনার রাজতন্ত্র কায়েম হবে ঘোষনা দিয়ে।

রাজকাহন
ব্লগার

জোনায়েদ সাকি এবং তার দল গণসংহতি আন্দোলনকে বামপন্থী বলতে আমার আপত্তি আছে।