কিরণ। ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব – ৫।

 

কিরণ বুঝতে পারে মালতির এইআর ..” বলে থেমে যাওয়ার অর্থ মালতি সঙ্কোচ করছে কিন্তু এটা সঙ্কোচের সময় নয় এই মুহূর্তে মালতি এবং বন্যার দায়িত্ব কিরণের হাসপাতালের যাকিছু ফর্মালিটি, তা কিরণ পূর্ণ করবে দায়িত্বের অর্থ কিরণ বোঝে কিরণ একটা জীবনকে একসময় না বুঝে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল সেই অন্ধকার থেকে সৌম্য এখনও বেরিয়ে আসতে পারে নি তারপরই কিরণ শিখেছে দায়িত্ব অনেক সাধনার

 

হাসপাতালে কাগজপত্রে যতোটুকুতে মালতির স্বাক্ষর লাগবে, কিরণ সেগুলিতে মালতির স্বাক্ষর করিয়ে, বাকি লেখালেখি শেষ করে নেয় ও হাসপাতালে ভর্তির জন্য দশ হাজার টাকা জমা করে দেয়

 

বন্যার চিকিৎসা শুরু হয়ে যায় ডাক্তার এসে বন্যাকে পরীক্ষা করে ও প্রেসক্রিপশন লিখে নার্সকে সব বুঝিয়ে দেয় অনেকরকম রক্ত পরীক্ষা, বুকের পরীক্ষা, স্নায়ুর পরীক্ষা হবে বন্যার ডাক্তারবাবুকে কিরণ গিয়ে বন্যার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করে ডাক্তারবাবু আশ্বাস দেন, “তারা সবরকমভাবে চেষ্টা করবে বন্যার সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত তবে মনে হচ্ছে, কোনো  সংক্রমণে এমন হচ্ছে এই সংক্রমণটা ভীষণ অন্যরকম প্রশ্বাসের সাথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্নায়ু, মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে পরীক্ষা চলছে আগে রিপোর্টগুলো আসুক, তারপর পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা হবে

 

      প্রশ্বাসের সাথে এই সংক্রমণ শরীরে প্রবেশ করছে!

      তাহলে যা ভাবছিলাম ..

কিরণ মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে রিপোর্টের অপেক্ষা করে বন্যার শরীরে ঠিক কি ধরণের সংক্রমণ, তা কিরণকে জানতে হবে

 

কিরণ মালতির কাছে যায় মালতি বাইরে চেয়ারের এক কোণে বসে তখন থেকে কেঁদে চলেছে ওকে শান্ত করা প্রয়োজন মালতিকে এখন সুস্থ থাকতে হবে মালতি ভেঙে পড়লে বন্যাও ভেঙে পড়বে

কিরণ মালতির পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “কেঁদো না মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে

মালতি কৃতজ্ঞ মুখে কিরণের সামনে মাথা নিচু করে হাতজোড় করে কিরণ সাথে সাথে মালতির হাত ধরে মালতিকে বুকে জড়িয়ে নেয়

 

ভালোবাসা বড় অদ্ভুত হয় ভালোবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে দেখতে না পেলে বা কতো খারাপ আছে এমন ভয়ে যে কেউই কুঁকড়ে ওঠে কিরণ বোঝে এই ভালোবাসা

মালতিকে বিস্কুটের প্যাকেট দুটি দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “সারাদিন তো কিছু খাও নি এখন কি চা খাবে একটু! নাকি এখন ভাত বা রুটি খাবে!”

 

মালতি বলে, “খিদে নেই মেয়েটাও তো কিছু খাই নি

 

কিরণ বলে, “বন্যার খাওয়া নিয়ে ভেবো না ডাক্তাররা পরীক্ষা করছেন স্যালাইন চলছে এখন ওর পক্ষে যা খাওয়া উপযোগী, তা হাসপাতাল ওকে ঠিক খাইয়ে দেবে চলো, একটুখানি চা খাবে আগে তারপর ঘণ্টাখানিক বাদে খাবার খাবে

 

ক্যান্টিনে যায় দুজনে চেয়ারে বসে চায়ের অর্ডার দেয় দুজনেই চুপ মালতি ভাবছে বন্যার কথা আর কিরণের মনে চলছে নানান চিন্তাভাবনার কথা

 

সৌম্যকে কিরণ কেমন বদলে যেতে দেখেছিলো একটু একটু করে কিরণ বোঝে নি তখন সৌম্যর সাথে ছোটবেলা থেকে বন্ধুর মতো মিশেছে সে খেলেছে, হেসেছে, দৌড়েছে, মজা করেছে, গল্প করেছে ষোল বছর বয়সে যে কি হল হঠাৎ!

 

একদিন কিরণ ও সৌম্য ছাদে বসে সন্ধ্যায় আড্ডা দিচ্ছিল চাঁদের আলো এসে সন্ধ্যার অন্ধকারেও ছাদটা আলোয় ভরেছিল সৌম্য বেসুরে গলায় গান করছিলো, রবি ঠাকুরের গান, “কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া ..”

কিরণও সৌম্যর গানের সাথে গলা মেলাচ্ছিল ঠিকই চলছিলো সব সৌম্য হঠাৎই কিরণের হাতদুটো ধরে কাছে টেনে নেয়

 

দুজনই ভীষণ কাছাকাছি একে অপরের নিশ্বাস একে অপরের মুখে এসে পড়ছে কিরণের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কিরণ কিছু না বুঝেই সৌম্যর গালে থাপ্পড় মেরে ফেলে সৌম্য হাত দিয়ে তখন নিজের গালে চেপে ধরে আছে কিরণ চমকে ওঠে এরপর সেখান থেকে দৌড়ে ঘরে চলে যায়

 

কিরণের সৌম্যকে ভালো লাগে হয়তো ভালোও বাসে কিন্তু বোঝে না প্রেম ব্যাপারটি কিরণের সকল বাচ্চামিগুলো ভেদ করে সেভাবে ভেদ করতে পারে নি সৌম্যর প্রেম তখন কিরণ বুঝে উঠতে পারে নি সৌম্য ভীষণ অভিমানী সেও কিরণকে কখনো নিজের প্রেমের কথা বোঝাতে পারে নি চেষ্টা করে নি বোঝানোর

 

নিজের মনে মনে সৌম্য যেন একটু একটু করে হেরে যাচ্ছিল লজ্জায়, ব্যর্থতায় সহ্য করতে পারছিলো না নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে ফেলছিল, আড়াল হয়ে যাচ্ছিলো এরপর কিরণ যতবারই স্বাভাবিকভাবে মেশার চেষ্টা করেছিলো, সৌম্য কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নেয় কথা বলে না, হাসে না প্রাণচঞ্চল সৌম্য কেমন যেন থমকে গেছে!

 

মনে মনে সে কিরণকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিল সমস্ত আবেগ, সমস্ত ভালোলাগা, সমস্ত ভালোবাসা সে কিরণের সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছিল কিরণ এসব বুঝতে পারে নি কখনো কিরণের কাছে ভালোলাগা, ভালোবাসা সে শুধুই বন্ধুত্ব আর সৌম্য চেয়েছিল কিরণের সাথে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়তে, ভাসতে

 

প্রেমটা হয়ে ওঠে নি সৌম্য চলে যায় অনেক দূরে, শিমলাতে এক কলেজে অ্যাডমিশন নেয় একা হয়ে যায় কিরণ কিরণ সৌম্যর অনেক খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু সৌম্য যেন নিজেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে! সৌম্যর বাড়ি থেকেও অনেক চেষ্টা করে সৌম্য আর কিরণের বন্ধুত্বটাকে স্বাভাবিক করতে সৌম্য যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, হেরে গেছে!

 

চা শেষ করে কিরণ ও মালতি ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে ডাক্তারের কাছে যায় কিছু রিপোর্ট এসেছে ডাক্তার রিপোর্টগুলি দেখছে কিরণ ও মালতিকে ডাক্তার চেয়ারে বসতে বলে রিপোর্টগুলি মন দিয়ে পড়তে থাকে

 

কিরণ জিজ্ঞাসা করে ডাক্তারকে রিপোর্ট সম্পর্কে।

ডাক্তার বলে, “এই সংক্রমণের উৎস ফেন্টানিল হাইড্রক্লোরাইড। এর সাথে আরও কিছু রাসায়নিক মিশ্রণ আছে। ফেন্টানিল হাইড্রক্লোরাইড মূলত যন্ত্রণানাশক। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণ প্রাণঘাতী। আমরা সম্পূর্ণ চেষ্টা করছি যতো দ্রুত সম্ভব এই সংক্রমণের কবল থেকে রোগীকে বার করে আনার।”

 

মালতি এসব শুনতে শুনতে ভয়ে কেঁপে ওঠে। কিরণ জিজ্ঞাসা করে, “এই রাসায়নিকটি কিভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে?”

ডাক্তার – মূলত বাতাসের মাধ্যমেই এর সংক্রমণ মানব শরীরে প্রবেশ করছে। এবং সেখান থেকেই শরীরের বিভিন্ন অংশকে প্রভাবিত করছে।

কিরণ – এই রাসায়নিক একসাথে কতো মানুষের শরীরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে?

ডাক্তার – সেটা রাসায়নিকের পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে। ১ মিলিগ্রাম ফেন্টানিল হাইড্রক্লোরাইড একজন মানুষকে টানা দুদিন যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে। আর যদি ১০ কেজি ওজনের ফেন্টানিল হাইড্রক্লোরাইডের কোনো যৌগ বাতাসে মিশে যায়, তবে একটি শহরে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

 

কিরণ হতভম্ব হয়ে যায় কথাটি শুনে। তার মানে দুদিন ধরে কিরণ যাকিছু দেখছে শহরে, তা আসলে এই রাসায়নিক ফেন্টানিল হাইড্রক্লোরাইডের প্রভাবে! তার মানে গোটা কলকাতা শহর এখন বিপদে! এক দিনের বাচ্চা থেকে শুরু করে একজন বৃদ্ধ সকলেই বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে!

 

83 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of