বিষাক্ত রাজনীতি:- চতুদর্শ পর্ব-

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলা যায় বামেদের সামনে পাহাড় সদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা এসে উপস্থিত হলেও; সেগুলি কাটিয়ে উঠে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা! বামেদের নেতৃত্ব দুর্বলতা ফুটে উঠছে, তাই অনেক বুদ্ধিজীবীই মনে করছেন বামেদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং বামপন্থা মুছে যাবে! তাদের উদ্দেশ্যে বলি বামপন্থার কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও বামপন্থা এত সহজে মোছবার নয়। সময় বড় শক্তিশালী সমস্ত কিছুই সময়ের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বর্তমান দিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যতদিন মমতা ব্যানার্জির মৌলবাদী তোষণ নীতি থাকবে ততদিন বিজেপির মত দক্ষিণাপন্থী দলগুলি শক্তিশালী হবে এবং বাম শক্তিগুলি দুর্বল হবে। আবার যখনি বিজেপির মত দলগুলি ক্ষমতায় আসবে তখনই মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে ধর্মনিরপেক্ষ বাম চিন্তা চেতনার গুরুত্ব কতটা। এই বোধ থেকেই বাম চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটবে।

যার সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হল সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া মুম্বাইয়ে কৃষকদের দীর্ঘ পদযাত্রা। বামেদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া এই দীর্ঘ পদযাত্রায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কৃষক এই পদযাত্রায় যোগদান করেন। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় দীর্ঘ পদযাত্রার ফলে অনেক সময় কৃষকদের জুতো ক্ষয়ে পায়ের চামড়া পর্যন্ত বের হয়ে গেছে তবুও তাদের পদযাত্রা থেমে যায় নি! শেষ পর্যন্ত বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফনড়বিশ সরকার কৃষকদের সমস্ত দাবি দাওয়া মেনে নিলে কৃষকরা এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। এই আন্দোলনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণ জনগণ আন্দোলনকারী কৃষকদের খাদ্য পানীয় ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে প্রক্ষান্তরে এই আন্দোলনে যোগদান করেন।

এখন প্রশ্ন হল বামেদের এত জনসমর্থন আসল কোথা থেকে? ভারতীয় রাজনীতির এ এক নিষ্ঠুর পরিহাস কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও আজও কৃষক শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার লড়াইয়ে বামেদের ছাড়া অন্য কোন দলকে সেভাবে দেখা যায় না। আসলে ভোটে লড়তে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ আসে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা থেকে তাই যে সরকারই আসুক না কেন তারা এই সমস্ত বানিজ্যক সংস্থা গুলিকে বিশেষ ছাড় দিতে থাকে। যার ফলে রাজস্ব ঘটতি দেখা যায় প্রকারান্তে সমস্ত বোঝাটি সাধারণ জনগণের ঘাড়ে এসে পড়ে। বামেরা এই দিক থেকে কিছুটা স্বচ্ছতার পরিচয় দেয়। বামেরা বিভিন্ন কুপন, রাস্তায় রাস্তায় ভাড়/ডিপে থেকে ও কর্মী বর্গদের সাহায্যে চাঁদা তুলে খরচের অনেকাংশই তুলে নেই এবং নীতিগত দিক থেকে বামেরা সরকারি মালিকানার পক্ষে থাকার ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলির চাপ কাটিয়ে উঠে শাসন কার্য পরিচালনা করা তাদের পক্ষে তুলনামূলক সহজ হয়। তাই এই শ্রমজীবী মানুষদের দুঃখ দুর্দশা নিরশনে বামেরা আজও প্রধান ভরসা। তাই বামেদের এই আন্দোলন নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে এবং উওরপ্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশের মত রাজ্যে নতুন করে আন্দোলনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল এত সম্ভাবনাময় বাম রাজনৈতিক দলগুলি আজ দেশে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক কেন? এর অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়- বামেদের প্রাসঙ্গিক হওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা হল এই দলের অভ্যন্তরীণ নীতি। বহু ক্ষেত্রে এরা দেশের স্বার্থ বিরোধী অবস্থান নেয় যেমন- ভারত চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনের প্রতি দুর্বলতা প্রদর্শন। চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান! অথচ এই চীন 1962 সালে অতর্কিতে ভারত আক্রমণ করে এবং ভারত চীন যুদ্ধের সূচনা হয়। তবে এটা ঠিক বর্তমান দিনে চীনের মত এক মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই ভারতের উন্নয়নের জন্য প্রসঙ্গিক হবে। তবে চীন তার সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা থেকে কিভাবে বিদেশনীতি পরিচালনা করে সেটাই দেখার! ভারত মার্কিন পরমাণু চুক্তির ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে ইউপিএ-1 সরকার কে ফেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। কারণ সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সঙ্গে কোন চুক্তি নয় এতে দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হতে পারে কিন্তু ভারতের আগামী প্রজন্মের জন্য শক্তি ক্ষেত্রে এই পরমাণু চুক্তি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে এদের চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী হলেও স্ট্যালিনের সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা এরা দেখতে পায় না। আবার প্যালেস্টাইনের পক্ষেও ইজরায়েল বিরোধী নীতি নেয় কারণ এদেশের বেশিরভাগ মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তুষ্ট করতে হবে। অথচ দেখা যায় ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইজরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা একান্ত কাম্য। আসলে বামেরা নিরন্তর হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যার জন্য এরা প্রশংসার পাত্র কিন্তু এরাই আবার মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ভয়ংঙ্কর রকমের নিশ্চুপ থেকে মৌলবাদীদের সুবিধা করে দেয়। প্রক্ষান্তরে বামেরা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মৌলবাদীদের তোষণ করে যার বিষ ফল পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়। যে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বামেরা শাসন করল সেখানে আজও এত ধর্মান্ধতার অনুপ্রবেশ কেন?

আসলে বামেরা মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশেষ উন্নয়ন ঘটায় নি, তাদের ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবেই ভেবেছে তাই এই সমাজের মধ্যে উন্নত চেতনার বিকাশ ঘটেনি। তবে এখানে একটি কথা প্রাসঙ্গিক পশ্চিমবঙ্গে বেশিরভাগ শাসক ও বুদ্ধিজীবীরা মোটের উপর উচ্চ বর্ণের হিন্দু এরা ইসলামিয় মতাদর্শ সেভাবে বোঝে না এবং এদেশে যেহেতু মুসলমানরা সংখ্যালঘু তাই সংখ্যালঘুর ধুয়ো তুলে স্বভাবতই এরা যে কোন পরিবর্তনের বিরোধী। অন্যদিকে সরকার ও এদের বিশেষ ঘাঁটাতে চাই নি পাছে ভোট ব্যাঙ্ক হারাতে হয়! তাই দীর্ঘদিন ভোটে জিতে ক্ষমতায় থাকা হলেও সুশিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি যার ফল আজ ভুগতে হচ্ছে। বাম আমলে যদিও বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল তার নিদর্শন স্বরূপ আমরা দেখতে পায় সেই সময় পাঠ্যক্রমে বহু প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা যুক্ত করা হয়েছিল কিন্তু বর্তমান মমতা ব্যানার্জি সরকার নির্লজ্জ মোল্লা তোষণের ফলে সমস্ত প্রগতিশীল অংশ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাদ দিয়েছে তাই প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ এক রক্ষণশীল মেধাপূর্ণ সাম্প্রদায়িকতার উর্বরভূমিতে পরিণত হচ্ছে!

ঘটনার প্রবাহ যেদিকেই যাক দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের বামেদের শাসন ব্যবস্থায় উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা না গড়ে তোলার দায় বামেরা কোন ভাবে এড়াতে পারবে কি? প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি তুলে দেওয়া ও রাজ্যে কম্পিউটারের অনুপ্রবেশ করতে না দেওয়া বামেদের ঐতিহাসিক ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। অতিরিক্ত শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াও এক চরম ব্যর্থতা। এই ঘটনা গুলির ফলে জনমানসে বামেদের প্রতি ঔদাসীন্যতা দেখা যায়। এছাড়াও তরুণ নেতৃত্ব উঠে না আসা, পলিটব্যুরোর নামে বৃদ্ধতন্ত্রের চর্চা, পদ না ছাড়ার মানসিকতা, মাঠে নেমে আন্দোলন না করার মানসিকতা, কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা, স্বজন পোষণ এবং উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার নীতি এই সমস্ত দুর্বলতা না ত্যাগ করতে পারলে সম্ভাবনা বাম শক্তি গুলি দিনে দিনে আরও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। যে তিনটি রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরালা) বামেরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে ছিল তারমধ্যে বর্তমানে শুধু মাত্র কেরালায় বাম সরকার অবশিষ্ট আছে। তাই কমরেডরা ভেবে দেখুন বার বার ঐতিহাসিক ভুল না করে বাস্তবের মাটিতে দাড়িয়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিন

তাই সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে এটা সুস্পষ্ট ভাবে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এক শক্তিশালী দল হিসাবে উঠে আসছে এবং অচিরেই তা প্রধান বিরোধী দলে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটা সুস্পষ্ট- যে বিজেপির বঙ্গে কোন স্থান ছিল না তাদের এই চমকপ্রদ উত্থানের পিছনে মমতা ব্যানার্জির মৌলবাদী তোষণ নীতি এক সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এখন এই পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন বামশাসনে থাকার ফলে এখানকার সাধারণ জনগণ কোন দিনই হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় রাজনীতিকে প্রশয় দেয়নি। তাই সাম্প্রতিক নির্বাচন গুলিতে জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে অনেক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ বিজেপিকে রুখতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। যা তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হল এই অবস্থান কতদিন স্থায়ী থাকবে? একদিকে যখন চরম বেকারত্ব, ধর্মান্ধ রাজনীতির অনুপ্রবেশ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রচেষ্টা তখন জনমানসের এই অবস্থান কতদিন স্থায়ী হবে? মানুষের প্রতিবাদী মন কিন্তু যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চাইবে তাই শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রতি তাদের জনসমর্থন থাকবে। তাই এই মূহুর্তে কার্যকরী অন্যান্য বিরোধী দল না থাকায় কিছুটা শক্তিশালী বিরোধী হিসাবে সাধারণ মানুষ বিজেপির দিকে ঝুঁকছে তাই এ বঙ্গে বিজেপি দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো প্রায় 30% মুসলিম জনসাধারণ বিশিষ্ট এ বঙ্গে বিজেপি কি কোন দিন শাসন ক্ষমতা লাভ করতে পারবে?

চলবে…

তথ্যসূত্র:-
1. আনন্দ বাজার পত্রিকা।
2. এই সময়।
3. অন্যান্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

307 total views, 3 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
নুর নবী দুলাল Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
নুর নবী দুলাল
ব্লগার

পড়লাম। আপনার এই সিরিজটা নিয়মিত পড়ি। ভাল লিখছেন।