সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও মডারেট মুসলিমের ভুলধারণা।

বর্তমান সময়ের মডারেট মুসলিমদেরকে আমরা নিশ্চয় সবাই কমবেশি চিনি। তারা আর যাই হোক একেবারে সেই গ্রাম্য কাঠমোল্লা টাইপের ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে আপনাকে কখনই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে না। তাদের কিছু কৌশল আছে যা ব্যাবহার করে আপনাকে তারা প্রতারিত করতে পারে। তেমনি একজন মডারেট মুসলিম লেখক ‘আরিফ আজাদ’ তার একটা স্টাটাসে নারীদেরকে যে সমাজে পণ্য মনে করা হতো সেই সমাজব্যাবস্থাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেবার চেষ্টা করেছে দেখলাম। মডারেট আর কাঠমোল্লাদের মধ্যে কৌশল ব্যাবহার করার পার্থক্য ছাড়া আর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আপনি খুজে পাবেন না। তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু একই, যেমন আরিফ আজাদের উদ্দেশ্য এখানে নারীকে আবারও বস্তাবন্দী জীবন যাপনে ফিরিয়ে নেওয়া।

নারীদেরকে যুগে যুগে ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজব্যাবস্থা পন্য মনে করে এসেছে। নারী যে মানুষ সেটা কোন ধার্মীকেরা মনে করেনা। তাদের মতে নারীর পোষাক থেকে শুরু করে তাদের হাটাচলা, কথাবার্তা, খাদ্যখাবার, এবং তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা সবই পুরুষরা নির্ধারন করে থাকে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় রীতি নীতি দিয়ে। ধর্মের নামে তারা ভয়, ভীতি প্রদর্শন করে যুগে যুগে গড়ে তুলেছে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা। প্রগতিশীল সমাজের নারীরা আজ কিছুটা হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু নারীদের মাঝে সেই পুরাতন ধর্মীয় রীতি নীতির প্রচলন ধরে রাখতে আজও পিছু ছাড়েনি সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাস্থায় জন্ম নেওয়া একশ্রেনীর ভাইরাস আক্রান্ত মস্তিষ্কের মানুষেরা। আর তারাই হচ্ছে এই স্টাটাস ধারীর মতো মডারেট মুসলিম যারা বিভিন্ন ছলে বলে কৌশলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আপনাকে পুরুষের দ্বারা নারীকে নিয়ন্ত্রনের ধর্মীও তত্বকে ইতিবাচক বানিয়ে বিভ্রান্ত করবে।

জনাব আরিফ আজাদ তার স্টাটাসে বলছে-

“আমরা যখন খুব ছোট ছিলাম তখন দেখতাম যে, আমাদের মা-চাচীরা যখন কোন পাত্রী দেখতে যেতেন তখন পাত্রীকে বলতেন, ‘দেখি, সামনে দিয়ে একটু হেঁটে যাও তো মা’। মা-চাচীদের আবদার শুনে পাত্রী নরম নরম পায়ে তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতো। মা-চাচীদের আরো নানাবিধ আবদার থাকতো। পাত্রীর দাঁত দেখা, চোখ দেখা, চুল দেখা ইত্যাদি…..”

সচেতন কোন মানুষের পক্ষে এই যে, মা, চাচীদের ব্যাবহার করে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাস্থার চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে তা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয়। প্রথমত, এই মা, চাচীরা আসলে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জন্ম নিয়েছিলো এবং সেই সমাজের ভেতরেই তারা বেড়ে উঠেছিলো এবং একটা সময় তারা এই মা, চাচী হয়ে উঠেছিলো। এই মা, চাচীদের মস্তিষ্কের গঠন, চিন্তা, ভাবনা, চেতনা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, বিচার বিশ্লেষন করার ক্ষমতা সবই ছিলো পুরুষতান্ত্রিক। তা না হলে কখনই তারা এভাবে আয়োজন করে নারী বা পাত্রী দেখতে যেতেন না। এটা যে সম্পুর্ণ একজন নারী বা একজন পুরুষের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির ব্যাপার তা তারা সেই সমাজের প্রেক্ষিতে বোঝার ক্ষমতা রাখতো না তাই এই জাতীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।

এখানে যে পাত্রী দেখার চিত্রটির কথা বলা হচ্ছে সেটাকে এই মডারেট লেখক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। যুক্তি হিসাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতা বা “মিস ওয়ার্ড বাংলাদেশ” নামের যে নারীদের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে যা নিয়ে কয়েকদিন ফেসবুকে বিভিন্ন আলোচনা হলো সেই প্রতিযোগিতা টাইপের আয়োজনের দোহাই দিয়েছেন। এখানে আগেই বলে রাখি, ব্যাক্তিগত ভাবে আমি নিজেও এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিপক্ষে কথা বলি। যেসমস্ত নারীরা এই জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করেন এবং যারা এই জাতীয় আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট তারা সহ যারা এই জাতীয় প্রতিযোগিতাই উৎসাহ প্রদান করে থাকেন তাদের প্রত্যেকেই নিজেদের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বহন করেন। বিশেষ করে সেই নারীরা যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে থাকেন।

এই মডারেট মুসলিমটি কৌশলে তার মা, চাচীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে একটা যায়গায় ভুল করেছেন, আর তা হচ্ছে সে বলতে চেয়েছেন যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করেন তারা সবাই প্রগতিশীল নারী। আসলে এখানেই সে ভুল করেছে, যারা এই জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করে থাকে তারা আসলে সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার শেকল ছিড়ে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা এখনও নিজেদের পন্য হিসেবেই ভাবে তাই এই জাতীয় আয়োজনে অংশ নেয়। এসমস্ত নারীরা নিজেদের আত্মসম্মান এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজেরাই স্ববিরোধী অবস্থানে থাকে। আধুনিক যুগে এমন মানসিকতার নারীদের মনোভাবের জন্য আমার কাছে মনে হয় একমাত্র দায়ী হচ্ছে সেই পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজব্যাবস্থা। যে কথাটি এই মডারেট আরিফ আজাদ একটিবারের জন্য এখানে উল্লেখ করেনি। এটা উল্লেখ না করে সে তার মা, চাচীদের সেই ঘরোয়া সুন্দরী প্রতিযোগিতার সাথে এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার তূলনা করে একটাকে ইতিবাচক এবং একটাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়েছেন। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার কথা এখানে না উল্লখে করার কারণ, তাদের আল্লাহ তাদেরকে ঐশরিক কোরানের মাধ্যমে যে বানী দিয়েছেন তার প্রতিটি বানীই পুরুষতান্ত্রিক, যেখানে নারীদেরকে মানুষ না মনে করে পন্য মনে করা হয়েছে। এখন যদি এই সামান্য বিষয়ে বলতে গিয়ে কেচোঁ খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে তাহলে আখেরে এই সব মডারেট মুসলিমদের লাভের থেকে ক্ষতি বেশি হবার কথা না ?

-মৃত কালপুরুষ

০৮/১০/২০১৮

275 total views, 4 views today

2
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
1 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
2 Comment authors
মৃত কালপুরুষরাজকাহন Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
রাজকাহন
ব্লগার

সুন্দরী প্রতিযোগীতার মানে হচ্ছে নারীকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা।