“হিরো” হওয়ার সাধ গল্প : পর্ব-১

কৈশোরে আমার নানাবিধ সখের অন্যতম ছিল “বড়শি বাওয়া”। কেঁচো, তেলাপোকা, মরা চিংড়ি, বিশেষ লাল পোকা বা এক রকম গ্রাম্য ফলকে টোপ বানিয়ে পুকুরে, নদীতে, বিলে বড়শি ফেলতাম আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে। আমার দ্বীপগাঁয়ে প্রচুর মাছের আধিক্য থাকার পরও, আমরা সখে প্রতিযোগিতা করে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম। একবার স্কুল বন্ধের দিন আমরা নদীর তীরে “পিকনিকের” আয়োজন করলাম। পিকনিক হবে আমাদের ঐদিন বড়শিতে ধরা মাছ দিয়ে। এবং যে সবচেয়ে বড় বা বেশি মাছ ধরে আনতে পারবে, তাকে দেয়া হবে “বিশেষ হিরোর পুরস্কার”। আর পিকনিকের বিশেষ আকর্ষণ হবে রান্নার আগে মাছ নির্বাচন করা, যাতে যোগ দেবে আমাদের স্কুল পড়ুয়া, আমাদের গায়ের হিন্দু মেয়েরা, যারা বিচারক হিসেবে নির্ধারণ করবে কার মাছ ধরা শ্রেষ্ঠ হয়েছে। কে হলো আজকের “মাছ ধরা হিরো”!

কৈশোরে নানা গুণ ছাড়াও আমার অন্যতম দোষ ছিল অস্থিরতা, যা এখনো কমবেশি আমার চরিত্রে বিদ্যমান। তাই প্রথমে নিজ পুকুরে, তারপর বাড়ির দরজার খালে, অবশেষ নদীতে বড়শি ফেলেও ১ ঘন্টায় তেমন বড় কোন মাছ না পেয়ে কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম প্রায় আধা কিলো দূরের বিলের মাঝের পুরণো “কালা পানির দিঘিতে”! কালো জলে পরিপূর্ণ দিঘিটা আমার জন্মের আগেই ছিল। নদী খাল বিলের জন টলটলে থাকলেও, ঐ দিঘিটার পানি ছিল বেশ কালো, যে কারণে ঐ দিঘিতে ভয়ে নামতাম না আমরা। তা ছাড়া পুরনো দিঘি বলে নানা কুসংস্কারও প্রচলিত ছিল ঐ দীঘি সম্পর্কে আমাদের গাঁয়ে! ওটাতে নাকি বয়স্ক “অমান” মাছ বসবাস করে অনেক বছর থেকে, যা কখনো মরে না, বুড়ো হয়ে পেকে গেছে তারা!

নিজেকে হিরো বানানোর তাগিদে একাকি গোপনে বড়শি ফেলার দুমিনিটের মাথায় প্রবল টান পড়লো বড়শিতে। ছিপে টান দিতেই প্রচন্ড শক্তিতে উল্টো আমাকেই টেনে দিঘির জলে নিয়ে যেতে চাইছে কে যেন। গাছের সাথে ছিপের নাইলনের সুঁতো বেধে বিশেষ কাঠির সাহায্যে ক্রমে সুঁতো টেনে নিয়ে এলাম একদম জলের কিনারায়। ওরে বাবা! এ দেখি কালো দৈত্যকার এক বিশাল অচেনা মাছ। প্রায় এক কিলো ঘাম ছুটিয়ে অবশেষে টেনে একদম দিঘির কিনারে আনতে পারলাম এ অচেনা মাছকে। মাছকে যখন টেনে ওপরে তুলতে যাবো, তখন বিস্ময়করভাবে কথা বললো বিশালাকার মাছটি।করুণ স্বরে বললো – “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি এ দিঘির জলদেবতা”। বললাম “না, জলদেবতা টেবতা মানিনা। আমাকে হিরো হতে হবে, তাই তোমাকে নেবই”!

“আমাকে মারলে তোমার অনেক ক্ষতি হবে” – মিনতি করে বললো মাছটি। কিন্তু ওর কোন কথাই শুনলাম না আমি। কলাপাতার রশিতে বেঁধে হাজির হলাম পিকনিক স্পটে হিরো হতে। প্রায় ১০-১২ কেজির মাছ দেখে কেবল হিন্দু মেয়েদের কাছে নয়, পুরো গাঁয়ে হিরো হলাম আমি। আমার ধরা মাছের কাছে সবার ধরা কই, শোল, বোয়াল হাস্যকর হলো যেন। মহা উৎসবে রান্না হতে থাকলো বিশালকার ঐ মাছ। মাছের খবর শুনে কেবল আমরা কিশোর কিশোরিরা নয়, তাদের মায়েরাও এসে যোগ দিলো এ “বিশাল পিকনিকে”!

রান্না শেষে কলাপাতা আনা হলো যাতে সবাই নদীর তীরে বসে খাবে। পাতায় সাজানো হলো নতুন চালের ভাতসহ বিবিধ খাবার। গাঁয়ের রীতি অনুসারে আমরা গেলাম নদীর জলে হাত ধুতে। ওমা এ কি! নদীর পানিতে হাত দিতেই জল দুদিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আমি জল ধরতে পারছিনা। সবাই হাত ধুয়ে পাতা নিয়ে খাবার শুরু করেছে। কেবল আমি চেষ্টা করছি নদীর জলে হাত ধুতে। কিন্তু না, যতবার চেষ্টা করছি পানি সরে যাচ্ছে দূরে। এবার নামলাম নদীর পানিতে। বাহ! আমার শরীরের চারদিকের পানি দূরে সরে যাচ্ছে। পুরো মাটি দেখা যাচ্ছে জলতলের। ধর্মক্লাসে শুনেছিলাম হযরত মুসা নবীর অনুরোধে নাকি নীলনদের পানি ভাগ হয়ে গিয়েছিল, এওতো দেখছি তেমনই কান্ড। আমাকে না দেখে বন্ধুরা গলা চিড়ে ডাক শুরু করেছে। স্কুলের হিন্দু মেয়েরা বলছে – “হিরো গেলো কই”! সবার ডাক শুনে হাত না ধুয়ে মাঠের ঘাসে মুছে খেতে বসলাম।

আমাকে সম্মান করে বিশাল মাছের মাথাটি কলাপাতাতে সাজিয়ে রেখেছে আমার জন্য। তার দিকে তাকিয়ে ভয় হলো আমার! তবে কি এ ব্যাটা জল স্পর্শ করতে দিচ্ছেনা আমাকে? আমি খুব তাড়াতাড়ি খাবার খাই, তাই খাবার মাঝে মাঝে জল লাগে আমার, না হলে গলায় আটকে যায় খাবার। একটু ভাত গিলেই জল চাইলাম বন্ধু রফিকের কাছে। ওরা আগেই নদীর জলকে মাটির কলসিতে তুলে তাতে ফিটকিরি দিয়ে রেখেছে, যাতে তা পরিস্কার আর জীবাণুমুক্ত হয়। সুমি একগ্লাস পানি নিয়ে এসে ধরলো আমার মুখের কাছে। ওমা! যেইনা পানি খেতে মুখ দিলাম গ্লাসে, ওমনি পুরো গ্লাসের পানি লাফ দিয়ে ভিজিয়ে দিলো আমার ওপরের ক্লাসের সিনিয়র মেয়ে মৌসুমীকে। সে কপট রেগে গিয়ে বললো, ভেজাতে চাওতো সুমিকে ভেজাও! আমাকে কেন? আমিতো তোমার বয়সে বড় তা কি ভুলে গেছো? ভীষণ লজ্জা পেলাম মৌসুমিদির এমন কথাতে!

পানি আর খেতে পারলাম না। আমার এমন অবস্থার কথা শুনে মা দৌঁড়ে এলেন আমাদের সখের পিকনিক স্পটে। সবার সামনে মাকে খুলে বললাম দিঘির সব কথা। পরীক্ষা করার জন্য মা নদীতে নামালেন আমাকে। ওহ বাবা! হেঁটে একদম নদীর মাঝে চলে গেলাম আমি। আমি যেদিকে যাই পানি ২-দিকে ভাগ হয়ে যায়। বন্ধুরা সবাই আমার পিছু পিছু নদীর মাঝে হেঁটে এলো। ওরা কেউ কেউ নদীর তলদেশ থেকে অনেক হারানো জিনিসপত্র তুলে আনলো। মা ভীষণ চিন্তিত হলো আমাকে নিয়ে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে পুরো এলাকায় রটে গেল এ চাঞ্চল্যকর সংবাদ। খবর পেয়ে হিন্দু বাড়ির সবচেয়ে বুড়ো ৮০-বছরের ঠাকুর হরলাল মন্ডল এলো লাঠিতে ভর দিয়ে। সব শুনে বললো, “জলের দেবতা রুষ্ঠ হয়ে এমন শান্তি দিয়েছে। এ শাস্তি তুলে নিতে পারে নতুন দেবতা। কারণ আগের দেবতাকে তো আমরা খেয়ে ফেলেছি রান্না করে, এখন নতুন দেবতাকে তুষ্ট করতে পারলে সে হয়তো তুলে নেবে এ শাস্তি”!

মা জানতে চাইলেন কই পাবো নতুন জলদেবতা? কিভাবে তুষ্ট করবো তাকে?

হরলাল কাকা বললেন, নামতে হবে ঐ দিঘির কালো জলে আপনার ছেলে বিল্টুকে একাকি। সেটাও বেশ ভয়ের কারণ। যদি নতুন দেবতা তুষ্ট না হন বা আগের দেবতার স্ত্রী কিংবা সন্তানরা ক্ষেপে থাকে বিল্টুর ওপর, তখন সবাই সম্মিলিত আক্রমণ করে মেরে ফেলতে পারে বিল্টুকে।

মা বললেন, তাহলে কি করা্ যায় মন্ডল বাবু?

মন্ডল কাকা বললেন, দেখি পুরনো পুঁথি পুস্তক ঘেটে কোন পথ বের করতে পারি কিনা।

 

এরপর পর্ব-২ আগামিকাল

 

 

45 total views, 1 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of