“হিরো” হওয়ার সাধ গল্প : পর্ব-২

এর মধ্যে প্রবল বৃষ্টি নামলো নদীর তীরে। সবাই ভিজে যাচ্ছে প্রচন্ড বৃষ্টিতে কিন্তু আমার গায়ে এক ফোঁটা জলও পড়ছে না। বন্ধুরা সবাই এসে আমার গা-ঘেষে দাঁড়ালো বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। এ দৃশ্য দেখে বন্ধু নিরঞ্জন বললো, একটা কাজ করা যায়। বাজারের কাছে প্যান্ডেল করে সার্কাস দেখানো হচ্ছে। সেখানে বিল্টুকে দেখিয়ে টাকা কামানো যায়। ওর কথামত আমরা ১১-বন্ধু একটু হেঁটে পৌঁছে গেলাম একদম সার্কাস প্যান্ডেলে। আয়োজক ছিল নিরঞ্জনের বাপ-চাচাসহ আমাদের প্রতিবেশিরা। তারা সব শুনে মাইকিং শুরু করলো সর্বত্র —
“ভাইসব, এমন আজগুবি খেলা দেখতে পাবেন, যাতে প্রচন্ড বৃষ্টি হলেও গাঁয়ে একফোটা পানি পড়বে না। পানির উপর দিয়ে হেঁটে যাবে কিন্তু পা ভিজবেনা”!
সন্ধ্যার প্রাক্কালেই পুরো প্যান্ডেল ভর্তি হলো ১০-টাকা দামের টিকেটে। সবাইর এক দাবী অন্য সার্কাস দেখবো পরে, আগে পানিতে হাঁটার সার্কাস দেখতে চাই। এ খবর চাউর হলে আরা হাজারো মানুষ উপস্থিল হলো সার্কাস প্যান্ডেলের কাছে। মানুষের চাপে ভেঙে পড়লো পুরো প্যান্ডেল। বন্ধুরা পাঁচ হাজার টাকা নগদ গ্রহণ করে প্যান্ডেলের পাশের খালে হাঁটতে বললো আমাকে। জলের ওপর হাঁটা দেখে হাজারো মানুষ খুশিতে হাততালি দিয়ে সার্কাস না দেখে আমার পিছু নিলো সবাই! পানির অভাবে বুকে ফেটে যাচ্ছে আমার। মা বুদ্ধি করে রসালো ফল খাওয়াতে থাকলো আমাকে যাতে পানির অভাব কিছুটা পুরণ হয়। সারাদিন পানি না পেয়ে গাছের সব শশা খেয়ে সাবাড় করলাম ২/৩ দিনেই। টিচারসহ স্কুলের সবাই দেখতে এলো আমাকে বাড়িতে। এলাকার সব শশা সবাই নিয়ে আসতে থাকলো আমার জন্যে! এবার সত্যিই প্রকৃত হিরো হলাম আমি।
:
১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে একটা যাত্রীবাহি বড় জলযান ডুবে গিয়েছিল আমাদের নদীতে। যার নাম “ইরানী” ছিল। অনেকদিন ডুবন্ত জাহাজের টপ মাস্তলে “ইরানী” লেখাটা উর্দু আর ইংরেজিতে দেখেছিলাম আমরা। বেশ কবার নৌকা নিয়ে বন্ধুরা জাহাজের কাছে গিয়েছিলাম কিন্তু ডুবন্ত জাহাজ বলে ভেতরে ঢুকতে পারিনি কখনো। এবার বন্ধুরা প্লান করলাম, প্রথমে আমি জাহাজে ঢুকবো তার পিছু পিছু ওরা সবাই। মাস্তল অনেক বছর আগেই ভেঙে গেছে বলে অনুমান করে জাহাজের কাছাকাছি গিয়ে প্রথমে নৌকো থেকে নামলাম আমি। পা দিয়ে চাপ দিতেই পানি সরে গিয়ে জলের সুড়ঙ্গ পথে দেখতে পেলাম শেওলাপরা পুরনো জাহাজের অংশ। প্লানমতো আমার পিছু পিছু আমার ১১-বন্ধু ঢুকে গেলো জাহাজের ভেতরে। আমি যেখানে হাত দেই বা পৌঁছি সেখানের পানি সরে গিয়ে দৃশ্যমান হয় প্রায় ১৫ বছর আগে ডোবা বৃটিশ নির্মিত বিশালকার যাত্রীবাহি জাহাজের। আমরা ঘুরে ঘুরে অনেক জিনিসপত্র উদ্ধার করতে পারলাম জাহাজ থেকে। বেশ কটা কেবিনে মৃত মানুষের কঙ্কাল দেখলাম আমরা। কারো গলাতে বা হাতে স্বর্ণের অলঙ্কার পেলো বন্ধুরা। প্রায় ৩/৪ ঘন্টা ঘুরে জাহাজ থেকে অনেক জিনিসপত্র উদ্ধার করলাম আমরা।
:
ইঞ্জিনরুমে বিশালাকৃতির স্টিম ইঞ্জিনের কাছে গেলে সেখানে কালো দিঘির জলে দেবতা মাছটির মত বিশালাকার এক মাছ দেখতে পেলাম। কাছে গেলেই মাছ বললো, তুমি অভিশাপ পেয়েছো জলদেবতা থেকে তাইনা?
বললাম, হ্যা দেবতা! প্লিজ আমাকে একটু হেলপ করবে?
জাহাজের জলদেবতা বললো, তোমাকে কোন হেলপ করতাম না আমি! এটা আমাদের রীতি বিরুদ্ধ! কিন্তু যাকে তুমি বড়শি দিয়ে ধরে হত্যা করেছো, সে ঐ কালো দিঘির দেবতা হতে দেয়নি আমাকে। তার দলবল নিয়ে বছর পাঁচেক আগে তাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে। তাই এখনো আমার মনের একমাত্র সাধ ঐ দিঘির দেবতা হবো আমি, ঘর করবো মৃত দেবতার বিধবা স্ত্রীকে নিয়ে ঐ দিঘিতে। তুমি যদি আমাকে দলবলসহ তুলে ঐ দিঘীতে অক্ষত নিয়ে যেতে পারো, তবে ওখানের বর্তমান দেবতার সাথে ফাইট দিয়ে যদি আমি দেবতা হতে পারি ওখানের, তবে তুলে নেব তোমার জল অভিশাপ। আবার তুমি সাধারণ জীবনে ফিরে যেতে পারবে!
:
নানাবিধ টেনশনেও রাতে গভীর ঘুম হলো মরার মত আমার! গভীর রাতে এক স্নিগ্ধ ঘ্রাণময়তা আর আলোয় ঘুম ভেঙে গেল আকস্মিক। চোখ মেলে চোখের ওপর ভাসতে দেখলাম ফ্রিয়াকে। ফ্রিয়া হচ্ছে উপুলু দ্বীপের সেই পরী, যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় তুতুলিয়া দ্বীপে জীবন বাঁচিয়েছিল আমার উইচ হাইতা নামক এক ডাইনি থেকে। বিস্মিত চোখে বললাম ফ্রিয়া তুমি কিভাবে এলে, জানলে কেমনে আমার কথা্?
ফ্রি চোখে মুখে হাসির প্লাবন এনে বললো, তুমি আমার অনেক প্রিয়। তোমার ঘ্রাণে এতোদূর আসতে পেরেছি আমি। যখন জানতে পারলাম “জল অভিশাপ” পেয়েছো তুমি, তখন আর বসে থাকতে পারলাম না উপুলু দ্বীপে। তোমাদের এ গাঁয়ে আসতে অনেক বাতাস আর প্রতিকুলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাকে!
কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল আমার। ইচ্ছে হলো জড়িয়ে ধরি ফ্রিয়াকে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে বললাম, ফ্রিয়া আমি পানি খেতে পারছিনা, স্নান করছে পারছি না। আমি যে মরে যাচ্ছি ফ্রিয়া! তুমি কি আমায় বাঁচাতে পারবে এ জল অভিশাপ থেকে?
ফ্রিয়া বললো, তাইতো ৪-হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এলাম তোমার কাছে।
একটা কাগজে মোড়ানো জিনিস আমার হাতে দিয়ে বললো, এটা রাখো যত্ন করে। এর মধ্যে পরীর দেশের “বাতাসা” আছে, যা জলদেবতাদের খুব প্রিয়। তুমি একটা বাতাসা কাল সকালে ঐ কালো দিঘির জলে ছুঁড়ে মারবে। ওটার ঘ্রাণ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ২য় বাতাসার লোভে ঐ কালো দিঘির বর্তমান দেবতা জলের ওপর মুখ তুলবে। তুমি তখন বলবে, আরো বাতাসা দিতে পারি, যদি তুমি আমার “জলের অভিশাপ” তুলে নাও। মৎস্য দেবতাদের কাছে পরীর দেশের বাতাসা এতোই প্রিয় যে, সে বাতাসার লোভে তোমার থেকে তাৎক্ষণিক জল অভিশাপ তুলে নেবে।
:
এতো রাতে আমি কার সাথে কথা বলছি, শুনে মা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আকস্মিক মা ঢুকছে দেখে তাৎক্ষণিক পালিয়ে গেল ফ্রিয়া জানালা দিয়ে। মাকে কি বলবো বুঝতে পারলামনা তখন। সারারাত আর ঘুম হলোনা আমার টেনশনে। ভোর হতেই মাকেসহ দিঘির তীরে উপস্থিত হলাম, যেখান থেকে বড়শিতে তুলেছিলাম দেবতা মাছটিকে। একটা বাতাসা জলে ছুড়তেই জলের মধ্যে প্রচন্ড লড়াইয়ের মত জলতান্ডব হলো। মনে হলো, সম্ভবত ভয়ঙ্করসব দানব মাছেরা ঐ বাতাসার জন্যে লড়াই করছে। কিছুক্ষণপর মুখ তুললো ঐ দিঘির মৎস্য দেবতা। আমার দিকে বিকট মুখ হা করে বললো, তুমি একবার আমাদের দেবতাকে হত্যা করেছো, আজ আবার এক বাতাসা ছুড়ে আমাদের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়েছো, তাতে জলতলে ৪-মৎস্য কুমার মারা গেছে তোমার কারণে।
মিনতি করে বললাম, আমাকে ক্ষমা করে মাছ দেবতা। আমি এসব কিছুই জানিনা। তুমি এ বাতাসা নাও। আর আমার জল অভিশাপ তুলে নাও। জল ছাড়া কি মাছ বা মানুষ বাঁচতে পারে!
 
মৎস্যদেবতা রুষ্ঠ কণ্ঠে বললো, না ঐ বাতাসার লোভ আমার নেই, ওটার জন্য আমাদের সন্তান মাছেরা লালায়িত। তোমার বাতাসা চাইনা আর তোমার অভিশাপও তুলে নেবনা।
:
আকস্মিক ফ্রিয়া উড়ে এলো কোত্থেকে যেন। সে এবার জলদেবতকে বললো, তুমি যদি ওর জল অভিশাপ তুলে নাও, পরিস্থান থেকে আরো অনেক বাতাসা এনে দেব তোমাকে। ফ্রিয়ার কথা শুনে মাছ দেবতা বললো, বাতাসা চাইনা। কেবল তুমি যদি মৎস্যদেবী হয়ে এ দিঘির জলে বসবাস করতে রাজি হও আমার সাথে, তবেই কেবল ওর জল অভিশাপ তুলে নেব।
আমার দিকে তাকালো ফ্রিয়া। তার চোখ জলে টলটল করছে। সে চোখ মুছে বললো, তাই হবে। বিল্টুর জীবন বাঁচাতে তোমার সাথে জলে বসবাস করবো আমি! কথা দিলাম।
জলে নামতে বললো মৎস্য দেবতা ফ্রিয়াকে। আমার হাত ছুঁয়ে আবার চোখ মুছে নিজের শরীরের অর্ধেক জলতলে নিমজ্জিত করলো ফ্রিয়া। জলের ওপরে মুখ রেখে বললো, এবার ওর জল অভিশাপ তুলে নাও।
অভিশাপ তুলে নিয়ে মুহূর্তে ফ্রিয়াকে নিয়ে দিঘির কালোজলে ডুব দিলো মৎস্যদেবতা চোখের পলকে!
:
1st Part Link : https://www.facebook.com/JahangirHossainDhaka/posts/267589320556559
এরপর পর্ব-৩ আগামিকাল

24 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of