নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয়। (১ম পর্ব)

ভূমিকা।

নাস্তিকতা এবং মুক্তচিন্তা চর্চা করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ প্রগতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিজ্ঞান ভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা। ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যাবস্থা রাষ্ট্রের নাগরিকদের অবৈজ্ঞানিক, ক্ষতিকারক এবং হাজার হাজার বছরের পুরাতন ও মধ্যযুগীয় নিয়ম কানুন বহাল রাখার কথা বলে তা সাধারণ মানুষকে বোঝানো। নির্দিষ্ট কোন ধর্মীয় মতবাদকে সবসময় ছোট করা নাস্তিকতার মধ্যে পড়েনা সেটা বিদ্বেষ এর পর্যায়ে যায়। আশৈশব পালিত কোন ধর্মীয় রীতিনীতি যখন কেউ বাদ দিয়ে মুক্তভাবে চিন্তা করতে শুরু করে তখন বিগত দিনের বিশ্বাস করা অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক মতবাদের উপরে তাদের অজান্তেই একটি ক্ষোভের সৃষ্টি হয় যা রুপ নেয় এই জাতীয় বিদ্বেষে। নাস্তিকতার চর্চা করার পূর্বে অবশ্যয় এই সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে আপনার নাস্তিকতা চর্চা যাতে সাধারণের কাছে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

প্রায় দেখা যায় অল্প কিছুদিন ধর্ম থেকে বেরিয়ে আসা অনেক মুক্তচিন্তক শুধুই ধর্মীও গোড়ামী নিয়ে ট্রল করে থাকে যা আসলে এই মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা ব্যাক্তিদের পরিচয় সাধারণের কাছে নেতিবাচকভাবে উথাপন করে থাকে যে বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই অবগত না হয়েই একই কাজ বারবার করতে থাকে। যদি কথা এমন হয় যে আমরা চাই আমাদের সমাজে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা হোক সকল প্রকারের কুসংস্কার দুর হয়ে যাক অবৈজ্ঞানিক সব ধর্মীয় মতবাদ বাদ দিয়ে মানুষ আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলুক তাহলে এমন প্রচার প্রচারনার ফলে কিন্তু তার জন্য ভালোর থেকে খারাপের পাল্লাটায় বেশি ভারি হতে থাকে। একটা সময় দেখা যায় নাস্তিকতার চর্চা একটি নেতিবাচক বিষয় বলে সমাজে পরিগনিত হতে থাকে। উদ্দেশ্য যদি হয় সমাজে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার এবং প্রসার ঘটানো তাহলে এই ক্ষেত্রে যে সমস্ত বাধা আছে তা খুজে বের করতে হবে। এই সমস্ত বাধা বিপত্তি খুজতে গেলেই সবার আগে দেখা যায় ধর্মীও মৌলবাদ একটি প্রধান সমস্যা। একশ্রেনীর মানুষেরা তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে পুজি করে মানুষের মাঝে এই মৌলবাদের বীজ বপন করছে যার ধারাবাহিকতায় একটি দেশের সচেতন নাগরিকেরা সমাজে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা হারাচ্ছে।

তাহলে যারা মুক্তচিন্তা এবং নাস্তিক্যবাদের চর্চা করছেন তাদের উচিৎ হবে আগে সেই মৌলবাদের নেতিবাচক দিক গুলো মানুষের মাঝে তুলে ধরা। কিভাবে একটি সমাজে এই মৌলবাদ যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে এই মৌলবাদের উথান, এই মৌলবাদী শক্তি কিভাবে প্রতিহত করে একটি বিজ্ঞানমনষ্ক সমাজ ও রাষ্ট্রা গঠন করা যায় সেই সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাস কখনও বস্তু বা রাষ্ট্রর থাকতে পারেনা এটা সম্পুর্ণ ব্যাক্তির নিজস্ব বিশ্বাস আর ভক্তির ব্যাপার এটা বোঝানো। বর্তমান আধুনিক যুগে ধর্মান্ধ মানুষেরা তাদের কোন ধর্মীয় মতবাদ বা ঐশরিক কিতাব বলে পরিচিত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বা কোন ঈশ্বর প্রদত্ত নিয়ম কানুনের পক্ষে কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যার্থ। তারা যতই তাদের ধর্মীয় ঐশরিক কিতাবের সুত্র দিয়ে সমাজ ব্যাবস্থা বা রাষ্ট্রব্যাবস্থা পরিচালনার কথা বলুক তা আধুনিক বিশ্বের বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যাবস্থার কাছে অগ্রহনযোগ্য প্রমণিত হবে। অতএব ধর্মীও যেসমস্ত যুক্তি হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতায় টিকে ছিলো, ঈশ্বর প্রদত্ত যত নিয়মকানুন দ্বারা মানুষ আজও তাদের সমাজ পরিচালিত করে আসছিলো তার পরিবর্তন মানুষের আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোন ধর্ম বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ যেনো না ছড়িয়ে পড়ে সেটা লক্ষ্য রাখা জরুরী।

যারা মুক্তচিন্তা ও নাস্তিক্যবাদের চর্চা করছেন তাদের যা করতে হবে তা হচ্ছে আগে সেই মৌলবাদ সম্পর্কে নিজে সচেতন হতে হবে এবং সমাজকে ও সাধারণ মানুষদের সচেতন করে তুলতে হবে। মৌলবাদী শক্তি কিভাবে ধর্মকে ব্যাবহার করে হিংস্রতায় রুপ নিতে পারে তা বোঝাতে হবে। মৌলবাদী শক্তি কিভাবে নারী শিক্ষা ও নারী অধিকারের বিপক্ষে কথা বলে একটি রাষ্ট্রের সমস্ত নারী জাতীকে অন্ধকারে রাখতে পারে সেটা নিয়ে কথা বলতে হবে। মৌলবাদের উৎস ও ইতিহাস জানতে ও জানাতে হবে, আমাদের রাষ্ট্রে মৌলবাদের সুত্রপাত কিভাবে হলো তা জানতে হবে, মৌলবাদের হিংস্ররুপ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মৌলবাদ কিভাবে কাজ করে থাকে, ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে মৌলবাদ একটি সমাজে জীবিত রাখে এবং আমরা কিভাবে এই মৌলবাদী কাল শক্তিকে রুখে দিয়ে একটি আধুনিক সমাজব্যাবস্থা দ্বারা একটি আধুনিক রাষ্ট্র তৈরি করে বসবাস করতে পারি সেই সম্পর্কে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করায় হচ্ছে মুক্তচিন্তার চর্চা বা নাস্তিক্যবাদ চর্চার উদ্দেশ্য হতে হবে।

কালো মৌলবাদী শক্তির বিপক্ষে কথা বলতে গেলে অবশ্যয় অবৈজ্ঞানিক এবং অযৌক্তিক এই ধর্ম ও ধর্মীও বিশ্বাস সম্পর্কে লিখতে হবেই যা করতে গেলে একশ্রেনীর ধর্মান্ধ মানুষেরা আপনাকে আক্রমণ করবে তাদের আশৈশব পালিত ধর্ম ও ধর্ম বিশ্বাস মিথ্যা ও অযৌক্তিক প্রমাণিত হবার কারণে। তবে এই ধর্মান্ধ শ্রেনীর মানুষের মস্তিষ্কে এই বিশ্বাস নামক ভাইরাস যে এই মৌলবাদী শক্তি বিভিন্ন ধর্মের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে তা তারা বুঝতে পারছে না সেটা কিভাবে তা বোঝাতে হবে। মৌলবাদ সম্পর্কে জানতে গেলে অবশ্যয় আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাস জানতে হবে। নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানা এবং মুক্তিযুদ্ধ পুর্বের রাষ্ট্রব্যাবস্থা সম্পর্কে যথেষ্টা ধারনা না থাকার ফলে তারা এই কালো মৌলবাদী শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নয়। যেহেতু আমরা একটি আধুনিক এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি তাই আগে আমাদের জানতে হবে আসলেই আমাদের রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা গুলো কি কি। আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের এই ছোট্ট দেশটিকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পেয়েছি কিন্তু ভৌগলিক এই স্বাধীনতাকে সার্বিক ভাবে স্বাধীন করার জন্য আমাদের যে সামাজিক স্বাধীনতা তা কিন্তু আজও আমরা প্রায় অর্ধশত বছরেও অর্জন করতে পারিনি যার একটিমাত্র কারণ হচ্ছে এই ধর্মীয় মৌলবাদী কালো শক্তি।

চলবে…… দ্বিতীয় পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ

১০/১০/২০১৮

125 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of