নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (২য় পর্ব)

রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক, কিন্তু আমাদের দেশের এই ভৌগলিক স্বাধীনতা কি আমাদের আর্থ স্বামাজিক যে স্বাধীনতা তা দিতে পেরেছে কিনা। সামাজিক স্বাধীনতা যদি একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক না পেয়ে থাকে তাহলে কোন একটি শক্তি সেই দেশের সামাজব্যাবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাহলে কি সেই শক্তি। খুজতে গেলেই পাওয়া যাবে ধর্মীও মৌলবাদী শক্তি। একটি রাষ্ট্রের আর্থ সামাজিক মুক্তি তখনই হবে যখন সেই রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। মানুষের ৫টি মৌলিক মানবাধিকার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার পথকে সুগম করতে হলে আমাদের দেশের প্রতিটি পরিবারের কর্মক্ষম ব্যাক্তির জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করতে হবে যাতে করে তাদের নুন্যতম অর্থনৈতিক সঙ্গতির নিশ্চয়তা প্রত্যেকেই পেয়ে থাকে। এরপরেই যা করতে হবে তা প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন ও গনতান্ত্রিক মত প্রকাশের অধিকার দেওয়া। কালো মৌলবাদী শক্তি মানুষের সেই মত প্রকাশে বাধা দিয়ে থাকে কারণ তারা চাই সমাজে তাদের ধর্মীয় মতবাদ বজায় রেখে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত রাখা এবং তাদের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করে সেই রাষ্ট্রকে ধর্মীয় আইন ব্যাবস্থার আওতায় আনা। আমাদের রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যার মধ্যে একটি হচ্ছে নাগরিকদের সমাজে স্বাধীন মত প্রকাশের নিশ্চয়তা না দিতে পারা। আসলে কিন্তু একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যাবস্থার উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমাজে প্রতিটি মানুষের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা।

এছাড়াও সেই রাষ্ট্রের একটি নিরাপেক্ষ প্রশাসন ব্যাবস্থা তৈরি করা যে প্রশাসন ব্যাবস্থা আইনের প্রয়োগ করে সমাজ নিয়ন্ত্রন করবে এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রন মুক্ত একটি বিচারব্যাবস্থা গড়ে তোলা যার মধ্যে অপরিহার্য। এখন যদি একটি রাষ্ট্রে কোন ধর্মীও ব্যাবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করা হয় তাহলে শেখানে থাকেনা কোন নিরাপেক্ষ বিচার ব্যাবস্থা, থাকবে না কোন স্বাধীন মত প্রকাশের নিশ্চয়তা। আর এই ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা একমাত্র ধর্মীও মৌলবাদের কারনেই হয়ে থাকে। ধর্মীও মৌলবাদীরা সব সময় চায় তাদের ধর্মীয় আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হোক। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পূর্বে পুর্বপাকিস্থান সেভাবেই আমাদের দেশকে পরিচালিত করে এসেছে যে কারনেই ১৯৪৭ সালের পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছরের ইতিহাস না পড়লে এই মৌলবাদী শক্তি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারনা পাওয়া সম্ভব নয়। দেশ স্বাধীন হবার পরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তৈরি করেছিলেন একটি স্বাধীন বাংলা ও যেখানে মত প্রকাশের অধিকার ছিলো কিন্তু আততায়ির গুলিতে তার মৃত্যু হবার পরেই বাংলাদেশের চেহারা আবারও মাত্র ৪ বছরের ব্যাবধানে পরিবর্তন হতে শুরু করেছিলো। আনা হয়েছিলো বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবর্তন। যোগ করা হয়েছিলো নানা ধর্মীয় আইন এবং ধর্মনিরাপেক্ষ রাষ্ট্রের নানান সংযোজন। মৌলবাদের উথানের ইতিহাস সেই ১৯৪৭ থেকেই বাংলাদেশের একটি শ্রেনীর মাঝে আজও টিকে আছে, সেই বিষয়ে পরে আলোচনা করবো।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ধর্মীয় আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করলে কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব নাকি সম্পুর্ণ ধর্মনিরাপেক্ষা রাষ্ট্র না হলে তা কখনই সম্ভব নয়। আসলে এই অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি হচ্ছে আপেক্ষিক একটি ব্যাপার যা নির্ভর করে প্রধানত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারনের উপরে। কালো মৌলবাদী শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ধর্ম বিশ্বাসী মানুষেরা অনেক সময় মনে করে থাকে ধর্মীও রীতিনীতি বা ইসলামী শরিয়া আইন দ্বারা যদি আজকে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রিত হতো তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা গুলোর সমাধান হতো এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো যেটা আসলে একদমই ভুল কথা। এই সব মৌলবাদীরা আন্তর্জাতিক বিশ্বের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রের ভৌগলিক অবস্থানের উপরে কোন জ্ঞান রাখেনা বলেই তাদের ধারনা শরিয়া আইন দ্বারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রন এসব সমাধান হবে। তাই যদি হতো তাহলে বিগত দিনে অন্যান্য শরিয়া আইন দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের অবস্থারও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমাদের চোখে পড়তো। ১৯৪৭ সালে পাকিস্থানের হয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের কাছে দাবী করেছিলো মুসলিমদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য যার ফলস্রুতিতে ভারতের দুইপ্রান্তে দুইটি পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুরুতেই গনপরিষদে তার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলো, যার অর্থ এরকম দাঁড়ায়, “আমরা একটি দেশের নাগরিক এই হিসাবেই অগ্রসর হবো এখানে কে হিন্দু আর কে মুসলমান সেটা প্রাধান্য পাবেনা” কিন্তু তাকেও কিছুদিনের মাথায় বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুরের মতো আততায়ির গুলিতে নিহত হতে হয়েছিলো।

এবং তারপরেই রাষ্ট্রিয় সংবিধানে পরিবর্তন করে ধর্মনিরাপেক্ষতা বাদ দিয়ে আবারও শরীয়া আইন বাস্তবায়ন করা হয়েছিলো পাকিস্তানে। এখন কথা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্মের পূর্ব থেকেই সেই ৬০ এর দশক থেকে পাকিস্তানের সংবিধানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ঘোষনা এবং পরিবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ৮০ এর দশক থেকে শরীয়া আইন বা হুদুদ আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা কি পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রেখেছে কিনা ? বা পাকিস্থানের অর্থনৈতিক কোন উন্নয়ন এসেছে কিনা সেটা সম্পর্কেও আগে জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। শুধু তাই নই আজকের আফগানিস্তান এবং সেই ৭০ এর দশকের আফগানিস্তানের দিকে তাকালেও আমরা কিছুটা আচ করতে পারি এই ইসলামী শরীয়া আইন একটি রাষ্ট্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। তালেবান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে গিয়ে একটা সময় প্রায় ধ্বংস হতে যাওয়া আফগানিস্থানের চিত্র মানুষ আজও ভোলেনি। কিংবা বর্তমান ইরানের ইতিহাস পড়লেও আমরা দেখতে পারি। ইসলামী বিপ্লবের পরে ঈমাম খাহমেনি দ্বারা পরিচালিত ইরানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাস কি ছিলো। শরীয়া আইন এবং ইসলামি শাসন ব্যাবস্থা দ্বারা মৌলবাদী শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত বর্তমান পাকিস্থানের অবস্থা আজ সেই দেশের নাগরিকেরাও অস্বীকার করতে পারেনা। দুখঃজনক হলেও সত্য যে আজ পাকিস্থান একটি ব্যার্থ রাষ্ট্রের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে শুধুমাত্র এই মৌলবাদীদের কারনেই।

একটা সময় মানব সভ্যতায় কোন আধুনিক রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি ছিলোনা। রাজনৈতিক জ্ঞান মানুষের সেই পর্যায়ে ছিলোনা যা দিয়ে তারা একটি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা রাখবে, তাই তারা ঝুকেছিলো কিছু কিছু মানুষের তৈরি কল্পিত কোন ঈশ্বরের দেওয়া বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের উপরে। ধর্ম বিশ্বাস যেভাবে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে মসিষ্কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়েছিলো এবং বর্তমানেও এই মৌলবাদীরা তার বীজ বপন করে চলেছে আমাদের সমাজে সেভাবেই এই ধর্মীয় আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মও হাজার হাজার বছর ধরেই টিকে আছে যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পুর্ণ একটি অবৈজ্ঞানিক এবং অযৌক্তিক ভুল মতবাদ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে প্রমাণিত। যারা নাস্তিকতা ও মুক্তচিন্তার চর্চা করে থাকেন তাদেরকে আসলে নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট না করে এই মৌলবাদী শক্তির মূল উৎস কি এবং এর উথান কোথা থেকে হয়েছে সেই সম্পর্কে প্রচার প্রাচারনায় আরো বেশি ভূমিকা রাখা উচিৎ বলে মনে করি। কারণ মৌলবাদের উৎস যদি সবাই জানে তাহলে এই কালো মৌলবাদী শক্তির নেতিবাচিক দিক গুলো সম্পর্কেও তারা অবগত হতে পারবে। মৌলবাদ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকলে যে কোন সচেতন মানুষই বুঝতে পারবে আজকের দিনে রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যার জন্য কি দায়ী।

চলবে…… ৩য় পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ
১০/১০/২০১৮

139 total views, 5 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
trackback

[…] মৌলবাদী কালো শক্তি। চলবে…… দ্বিতীয় পর্বের লিংক। -মৃত কালপুরুষ […]