নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৩য় পর্ব)

মৌলবাদের জন্ম কিভাবে হয়।

মূলত ধর্মীও মৌলবাদের সুত্রপাত ধর্ম থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবীতে প্রচলিত হাজার হাজার ধর্মের কোন ধর্মের মানুষই নিজ ধর্ম বাদে অন্য কোন ধর্মকে সত্য বলে স্বীকার করেনা। এই কারনেই করেনা, যদি নিজের ধর্ম বাদে অন্য কোন ধর্মকে তারা সত্য বলে তাহলে তাদের নিজেদের ধর্মের আর কোন মুল্য থাকেনা। প্রতিটি ধর্ম একটি দাবীই করে আসে যে সেই ধর্মই হচ্ছে পৃথিবীতে একমাত্র সঠিক এবং সত্য ধর্ম বাকী সকল ধর্ম মিথ্যা। কিছু কিছু ধর্ম আছে যেসমস্ত ধর্মে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায় এমনি নিজেদের ধর্মের জন্য জীবন দিয়ে দেওয়া এবং অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করার কথাও বলা হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে ইহুদী ধর্মের মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব পর্যন্ত করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। ধর্ম যেহেতু মানুষের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে তাই একজন গোড়া ধার্মিকের পক্ষে তার নিজের ধর্ম ব্যাতিত আরেক ধর্মের মানুষকে মেনে নেওয়া একেবারেই অসম্ভব একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা আমাদের দেশের যে ধর্মীও সাম্প্রদায়িকতার চিত্র দেখে থাকি সেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ এখানেই বোনা আছে। যখনই একটি রাষ্ট্রে ধর্মীও কোন মতবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হবে তখনই এই সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে সাম্প্রদায়িকতা এবং ধার্মিকতার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই দুই একটি ব্যাতিক্রম বাদে। যে রাষ্ট্র বা সমাজের মানুষেরা বেশি ধার্মিক হবে সেই সমাজ বা রাষ্ট্রে এই সাম্প্রদায়িকতা থাকবেই। এখন কথা হচ্ছে, মানুষ তার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস রেখে কখনই নিজেকে অসাম্প্রদায়িক দাবী করতে পারেনা। যেহেতু তারা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবী করতে পারেনা তাই তাদের পক্ষে ধর্মনিরাপেক্ষতা মেনে নেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। একটি রাষ্ট্র যখন নির্দিষ্ট কোন একটি ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে তখন সেই একটি ধর্মের প্রাধান্যতায় সেখানে বেশি গ্রহনযোগ্যতা পাবে এটাই স্বাভাবিক। ধর্মান্ধ বা ধার্মীক ব্যাক্তিরা যেহেতু মনে করে থাকেন তাদের একজন ইশ্বর আছেন এবং সেই ঈশ্বর যে ধর্মীয় বানী তাদের দিয়েছেন সেটা একেবারেই নির্ভুল এবং কোন প্রকারের সন্ধেহ ছাড়াই তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই, তাই তারা কোন প্রকারের যাচাই বাছাই করা ছাড়াই একমনে তাদের সেই ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্মীয় নিয়মকানুন অনুসরন করে থাকে।

ধর্ম বিশ্বাসী মানুষেরা মনে করেন তাদের ঈশ্বর প্রদত্ত সেই সকল কিতাব ঐশরিক কোন গ্রন্থ যা আকাশ থেকে বা অন্য কোথাও থেকে মানব সভ্যতায় এসেছে যাতে মানুষের কোন প্রকারের হাত থাকতে পারেনা। তারা যুগ যুগ ধরে এভাবেই প্রতিটি মানব সমাজে এই দাবী প্রচার করে এসেছে এবং সেই নিয়ম বাস্তবায়ন করেছে। যে কারণেই এই আধুনিক বিশ্বে যখন সকল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করে দেখানো হয় যে তাদের এই ঐশরিক কিতাব একটি ভুল মতবাদ দিচ্ছে তখন তারা সেটা মানতে রাজী থাকেনা বরং তারা মনে করে থাকে এটাই একমাত্র জীবন বিধান যা ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এবং চরম সত্য। তারা মনে করে থাকেন এই বানী নির্ভুল এবং চুড়ান্ত যার কোন পরিবর্তন, সংশোধন বা সংযোজন করার ক্ষমতা কোন মানুষের থাকতে পারেনা। আবার কিছু ধর্ম আছে যেগুলোর আসলে কোন ঈশ্বর বিশ্বাস নেই তারা আবার সেই সমস্ত ধর্মের যেসমস্ত ধর্ম যাযক আছেন তাদের মুখের বানীকেই চুড়ান্ত নির্ভুল বলে মনে করে থাকেন যেমন ধর্ম আছে, কুনফুসিয়াস, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ইত্যাদি ধর্মগুলো। অতএব এখানে বোঝা যাচ্ছে যে এই সমস্ত ধর্মের যাযক, পুরোহিত, মোল্লা, বা পয়গম্বর মানুষকে যা বলবে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে না পারলে তাদের জীবন যাপন তারা করতে পারবে না।

যে কারণেই ধার্মীক মানুষদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই দেখা যায় তারা তাদের নিজ নিজ ধর্মের ধর্মীও গুরু, পুরোহিত, মোল্লা এবং যাযকদের কথা মতো তাদের পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান মেনে চলেন কোন প্রাকারের যাচাই বাছাই করা বাদেই। যদি কোন ধার্মীক এই পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান না মানে তাহলে তাদের নিজ নিজ ধর্মে শাস্তির ব্যাবস্থা থাকে। আবার পরকাল বলেও একটি কাল্পনিক জগতের ধারণা প্রায় প্রতিটি ধর্মেই বিদ্যমান আছে যেখানে বলা হয়ে থাকে মৃত্য পরবর্তী আরেকটি জীবনেও সেই সাজা ভোগ করা লাগবে। যেকারণেই একজন ধার্মীক ব্যাক্তির পক্ষে তাদের নিজ নিজ ধর্মের ধর্ম গুরু আর মোল্লাদের প্রচার করা বানী একমাত্র জীবন বিধান হিসেবেই গ্রহন করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তারা মনে করে থাকে এই ধর্মীও রীতিনীতি অনুসরন না করলে তাদের ইহকাল ও পরকাল কোথাও সুখ মিলবে না এবং ইহকাল ও পরকালের সমস্ত বালা মসিবত দূর করার জন্য এই সমস্ত বানীই মেনে চলায় একমাত্র পন্থা। এখন যদি সেই সমস্ত ঐশরিক বানীর ভেতরে কোন অসংঙ্গতি থেকে তাহকে তাহলে কি তা সংশোধন করে উপোযুক্ত করে সেই বানী অনুসরনের কোন বিধান কি ঈশ্বরেরা দিয়ে থাকেন ? উত্তর হবে না।

ঈশ্বর প্রদত্ত কোন বানী মানুষের পক্ষে সংশোধন করে তা ব্যাবহার করার কোন বিধান এই ঈশ্বর কোন ধর্মেই দেয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং জীবন পরিচালনার জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত যত বানী আজ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তা ভুল প্রমাণিত হলেও পরিবর্তনের কোন উপাই নেই। ঈশ্বরের বানী যাই আছে তাই দিয়েই নিজেদের জীবন, রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনীতিতে তা ব্যাবহার করতে হবে এবং মেনে চলতে হবে। এখন এই জাতীয় বিশ্বাস যারা করে থাকেন এবং মনে করে থাকেন এই মতবাদটিই সঠিক তাকেই বলা হয়ে থাকে ধর্মীয় মতবাদ। আর এই মতবাদের একমাত্র সুত্র সেই ধর্ম থেকেই হয়ে থাকে। এককথায় আমরা বলতে পারি এই সমস্ত ধর্মীয় মতবাদই হচ্ছে মূলত মৌলবাদ এবং এই ধর্মীও বিশ্বাস হচ্ছে মৌলবাদের আদী এবং প্রাচীনতম উৎস। এই ধর্মীও মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা একে অপরের সাথে এমনভাবে সংযুক্ত যে একটি ছাড়া আরেকটি দেহ ছাড়া প্রাণ বা প্রাণহীন দেহ। মৌলবাদ আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজের জন্য কেনো একটি বিপজ্জনক বিষয় তা সম্পর্কে আমাদের আলোচনা করা প্রয়োজন। অতীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় ছিলো এই মৌলবাদ। এপর্যন্ত মানব সভ্যতায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই মৌলবাদের কারনে, সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে এই মৌলবাদের কারণে।

চলবে…… ৪র্থ পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ

১১/১০/২০১৮

 

97 total views, 2 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
trackback

[…] চলবে…… ৩য় পর্বের লিংক […]