বনলতা

       

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়টা। বাংলা মাস হিসেব করে দেখলাম পৌষ মাস। আমাদের নিয়মিত জীবনে বাংলা মাসের প্রয়োজন নেই। কিন্তু, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, আমরা আবহাওয়া বা ঋতু পরিবর্তনের হিসেবটা এখনো বাংলাতেই করি। গরম পরলেই মনে করতে চেষ্টা করি চৈত্র মাস শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টি বেশি হলেই বলি, বৃষ্টি হবেনা? আষাঢ় শ্রাবণ মাস শুরু হয়ে গেছে।

বাংলা মাসের হিসেবটা করলাম একারণেই। আজকে যেন হঠাৎ করেই শীতটা জেকে বসেছে। প্রতিদিনের মতো কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত হয়ে গেছে। বাসা বলতে ঠিক বাসা না আমার। মফস্বলে চাকুরী করার ঝামেলা এই একটা, আপনি চাইলেও ভালো কোন বাসা ভাড়া পাবেন না। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় এই ছোট্ট শহরতলীতে একটা ছোট্ট হোটেল রয়েছে। এখানে কালে ভদ্রে কেউ ভাড়া নেয়। আমি তাই বাসা ভাড়া করার ঝামেলা না করে (আসলে না পেয়ে) হোটেলটাকেই বাসা করে নিলাম।


নির্ভেজাল এক হোটেল। বেশির ভাগ রুমই অধিকাংশ সময় আটকানো থাকে। একজন কেয়ারটেকার আছে। এই লোকটা হোটেলটির চেয়েও নির্ভেজাল! আমি ফোন না করলে বা আমার কোন দরকার না পড়লে মনের ভুলেও আমার রুমের কাছে আসেনা। নিয়মিত বোর্ডার হওয়ায় আমাকে কিছু আলাদা সুবিধা দিচ্ছে ওরা। এই যেমন : হোটেলের একমাত্র আমার রুমেই টেলিভিশন আছে। বাসায় ঢোকার সময় পাইলট নামের কেয়ারটেকারকে ফোন করে বলি খাবার দিয়ে যেও। খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাইলটকে যদি আমি খাবার যোগাড়ের কথা না বলি সে আমাকে সে রাতে সেধে খাবারই দেয়না! লোকটা ভীষণ লাজুকও বটে। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা পাইলট ভাই, পাইলট মানে কী জানেন? হেসে উত্তর দিল, জে ছার! এ্যারোপ্লেন চালায় যে।
- আপনার নামটা রেখেছে কে?
-তা জানিনা ছার!

এমন নির্লিপ্ত মানুষের সাথে কথা আগানো যায় না। শীতের সাথে হালকা কুয়াশা আর নবমীর চাঁদ এক মায়াময় আবহ সৃষ্টি করেছে আজ। গ্রাম থেকে মফস্বল কে পৃথক করে রেখেছে দীর্ঘ ৪ কি.মি. এক রাস্তা। অন্তত আট-দশ বছর আগে এই রাস্তা একবার পিচ ঢালাই হয়েছিল। এখন পিচের চিহ্নও নেই। নিচের ইটের খোয়াগুলি রাস্তায় হেসে কুটিকুটি হয়। আর, খোয়াগুলির এই হাসি অসহ্য মনে হয় কিছু ত্রিচক্রযানের। ওরা খোয়াগুলির উপরে অত্যাচার করে। ভেঙ্গেচুরে গিয়ে রাস্তার পাশের আগাছার সাথে আলিঙ্গন করে। সবুজাভ থেকে সেগুলো ইটাভ কালার ধারণ করে। নবমীর চাঁদের আলোয় এগুলোকে ঠিক আগাছা মনে হয় না, মনে হয় যেন এক অভেদ্য দেয়াল। এ পথ দিনের বেলায় কর্মচঞ্চল মানুষের আনাগোনায় মুখরিত থাকে। কিন্তু সন্ধ্যে হওয়ার সাথে সাথে জনশূন্য থেকে জনশূন্যতর হয়। গ্রামের সাথে মফস্বলের এই রাস্তাটি অদ্ভুত শূন্যতায় ভোগে। তাই, প্রায়ই চেষ্টা করি যত তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাসায় ফিরতে। নাহলে, এই এতোটা বন্ধুর পথ একা একা পারি দিতে হয়।

একবার তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাচ্ছিল! ছোট চাকরী করি বলে বউকে সব সময় এনে রাখতে পারিনা। আসলে, ছোট চাকরী একটা ছুতা! বউ এখানে এনে রাখলে সারাদিন আমি থাকবো বাইরে বাইরে, আর সে একা বাসায়। মানে হোটেলে! মিডল ক্লাস সত্ত্বা তখন জেগে উঠে। বউ কি না কি করে কে জানে! যাহোক, কেলেঙ্কারির কথা বলি। বউ আমার বৃহস্পতিবার বিকেলেই বাসায় এসে বসে আছে। বৃহস্পতিবার আগডুম বাগডুম। শুক্রবার সারাদিন টোনাটুনি। শনিবার চলে যাবে। কিন্তু, আমার আসতে আসতে সেদিন রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। সেদিন ঘুনাক্ষরেও মনে ছিল না যে সেটা বৃহস্পতিবার ছিল। কিছুটা ক্লান্তি আর অবসাদ নিয়ে বেশ গদাইলস্করি চালেই বাসায় ফিরে রুম খুলতে গিয়ে দেখি রুমে তালা নেই!! মানে? ও মাই গড! পরক্ষণেই মনে পরলো সব। বউ আমার বিকেল থেকে অপেক্ষা করছে। সেদিন আমাকে সোয়া দুইটা পর্যন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। আর, পরবি পর মালির ঘাড়ে! ঐদিনই হোটেলে ৪ জন বোর্ডার উঠলো!

এসব ভাবতে ভাবতে নবমীর চাঁদে সাঁতরে এগুচ্ছি । হঠাৎ, দূর থেকে ফট ফট আওয়াজ আসতে লাগলো, টমটমের আওয়াজ। আশার প্রদীপে একটু ঝিলিক মারলো মাত্র। পরক্ষণেই দমে গেল মন, এই ড্রাইভার নিশ্চয়ই এতো রাতে উল্টো পথে যেতে রাজি হবে না। কিন্তু, আমাকে ভুল প্রমাণিত করে এবং অবাক করে আমার ঠিক সামনে এসেই থামলো টমটমটা।
-যাবেন ছার?
গ্রামের মানুষের এই একটা অভ্যাস, কাউকে একটু পরিপাটি দেখলেই স্যার ডেকে বসে। অবশ্য, আমার সাথে ওদের সম্পর্ক টাকা পয়সার হওয়ায় স্যার ডাকে একটু বেশিই জোর থাকে! সম্মতি জানাতেই লক্কড় ঝক্কর টাইপের গাড়িটা ঘোরালো লোকটা। আমি উঠে পরলাম। দুলতে দুলতে চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেদ করে অন্ধকারকে ফড়ফড় করে চিরে এগিয়ে চলছে আমাদের বাহন। দুলুনিতে ঘুম পেয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ গাড়ি স্লো হওয়ায় তন্দ্রা কেটে গেল। ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নেমেছে। এবং একটা মহিলা উঠে বসলো গাড়িতে। আমার ঠিক পাশে। বুঝতে পারলাম না, ড্রাইভার কি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গাড়ি থামালো? নাকি মহিলাকে তোলার জন্য? নাকি দুটোই। ড্রাইভার কিছু না বলেই এসে গাড়ি স্টার্ট করলো। আমি আড়চোখে মহিলার দিকে তাকালাম। গ্রামের মহিলা হলেও বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের মনে হচ্ছে। এবং সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, মহিলাটি নিঃশব্দে কাঁদছে। বুঝতে পারলাম বাড়ি থেকে রাগ করে এসেছে। গায়ে কোন শীতের কাপড় নেই, শুধু একটা শাড়ি পড়া। যাকে বলে এক কাপড়ে চলে আসা। অনুভব করতে পারলাম মহিলা কাঁপছে। কিন্তু সেটা শীতে নাকি কান্নার চোটে বুঝতে পারলাম না। আরেকটু ঘেঁষে বসলো সে। ঠিক আমার গায়ে লাগোয়া। চুপচাপ বসে থাকলাম। মনে হচ্ছে, শীতেই কাঁপছে। অথবা, কান্না লুকানোর জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। আমি নিরাপদ কি না এটা কি তার পরখ? চুপ থাকলাম। মহিলাকে আগে কখনো দেখেছি বলেও মনে হয় না।

মিনিট দশেক পরে গাড়ি গন্তব্যে পৌছুলো। নেমে ভাড়া দিলাম। ইচ্ছে করেই কিছু টাকা বেশি দিলাম। সেটা কি এই অসময়ে আমাকে দয়া করার জন্য নাকি ঐ মহিলার ভাড়া বাবদ সেটা আমি নিজেও জানিনা! মহিলা নেমে টমটমের ঠিক পেছনে দাঁড়ানো। টমটমটি চলে যাওয়ার পরে আমি আর একা মহিলা দাঁড়ানো। আমার দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, আপনার গন্তব্য কোথায়? নিরুত্তর এক মানবী দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার নিরব চোখের দৃষ্টি হাজার উত্তর থেকেও আলাদা করে দেয়, "আমি নিরুপায়। দয়া করে আমাকে একটু আশ্রয় দিন। " হোটেলে যেতে মিনিট তিনেকের পথ। আমি ধীর পায়ে হেটে চললাম সামনে। মহিলা আমার দৃষ্টিতে আশ্বস্ত হয়ে আমাকে অনুসরণ করছে। এই সময়ে বিদ্যুৎ না থাকা একটা নিয়মিত ঘটনা।

হাটতে হাটতে ভাবলাম তার জন্য আলাদা একটা রুম নেব কি না। মূহুর্তেই অতিরিক্ত ঝামেলার জন্য এড়িয়ে গেলাম। একটা রাত না হয় বসেই কাটাবো। সরাসরি রুমে ঢুকলাম। মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলাম। মহিলাটি রোবটের মতো নিঃস্পৃহ ভঙ্গিমায় মোমবাতি নিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকলো। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হতেই নিকষ একটা অন্ধকার এবং অদ্ভুত একটা হাহাকার আমাকে ঘিরে ধরলো। হাহাকার টা কী জন্য ঠিক বুঝতে পারলাম না।

গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পাইলটকে ফোন করলাম। দুটো মিল অর্ডার করলাম। তিন চার মিনিটের মধ্যেই খাবার এসে গেল। পাইলট চলে যাবারও প্রায় মিনিট তিনেক পরে মহিলা বের হলো। পানির ঝটকায় মুখমণ্ডলের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। যেন, মোম হাতে দাঁড়িয়ে কোন দেবী মূর্তি। অথবা দেবীর আরাধনার জন্য দাঁড়িয়ে লক্ষ্মী গৃহবধূ। না, তার বহিরাঙ্গের দর্শনে যে কেউ বলতে পারবে এ কুমারী নয়। আমিও এবার ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে এসেই দেখি টেবিলে রাখা খাবারের এক প্লেট থেকে খাওয়া শুরু করেছে মহিলাটি। আমাকে দেখে হঠাৎ থমকে গেল! আমি স্মিত হাসি দিলাম। এর মানে হচ্ছে, সমস্যা নেই, চালিয়ে যান।

আমিও একটি প্লেট নিয়ে বসে পরলাম। বুঝতে পারলাম মহিলাটি অভুক্ত ছিল বেশ সময় যাবত। খাওয়া শেষে সে দুজনারই প্লেট ধুইতে নিয়ে গেল। 'ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে' এর উদাহরণ আরকি! মহিলা ঘর থেকে বেরিয়েও ঘরোয়া আচরণ গুলি ছাড়তে পারেনি! আসলেই কি উনি ঘর ছাড়তে পেরেছে? মোমবাতিটি নিভু নিভু করছে। অথচ সুঁতোটা এখনো প্রাণপণে জ্বলতে চাচ্ছে! যেন নিজেকে জ্বালিয়ে আমাদের আলো দিতে পারাতেই তার পরম সুখ। কিন্তু, মোম তাকে যোগ্য
সঙ্গ দিতে পারছে না। গলিত মোমের মাঝে ঢলে পরলো সুতোটি। আগুনটাও মিইয়ে পরে নিভে গেল।

এমন সময় আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গানে ডুব দিয়েছিলাম। এরকমটা আমার কখনো হয়নি। 'যে তোরে পাগল বলে তারে তুই বলিস নে কিছু' শুনছিলাম। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখি মহিলা উপুড় হয়ে শোয়া। পাশে
পাতলা কম্বলটা রাখা। কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। শরীরের মৃদু ওঠানামা দেখে বুঝলাম মহিলা আবার কাঁদছে। বিড়াল পায়ে গিয়ে খাটের পাশে দাঁড়ালাম। আলতো করে শরীরের অর্ধেকটা ঢেকে দিলাম। শরীরে স্পর্শ পেতেই মৃদু কাঁপুনিটা থেমে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মাথার পাশে বসলাম। মাথায় হাত রাখলাম। নিথর দেহ তার।

আমি এভাবে হাত বোলাতে বোলাতে কখন যেন তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। ভারি একটা স্পর্শে তন্দ্রা কেটে গেল। দেখি মহিলা উঠে আমার বুকে মাথা রাখলো। আমি এবার নিশ্চুপ। তার শরীরের সাথে আমার শরীর লেপ্টে যাচ্ছে। শরীরে আমার বান ডেকেছে। কিন্তু, মনঃপ্রাণ দিয়ে সেই বানকে যথাসম্ভব ঠেকানোর চেষ্টা করলাম। আমার বুকে গরম গরম একটা স্পর্শ পেলাম। বুঝতে পারলাম ওটা অশ্রু।

এবার আমি মহিলার পিঠে হাত রাখলাম। ঠিক আগের মতো নিথর হয়ে গেল দেহটি। শুধু দুজনের নিঃশ্বাস টের পাচ্ছি। নবমীর চাঁদ তখন মধ্য গগণে। ওখান থেকেই তার চোরা চাহনি রুমের মধ্যে। দুটো নরনারীকে এভাবে দেখে লজ্জা পাওয়ায় হয়তো মেঘের আচল উঠলো তার মুখে। এভাবে কতক্ষণ ছিলাম ঠিক জানিনা। আবার, গরম একটা আবহ অনুভব করলাম বুকে। এবার গরম নিঃশ্বাস। বাঁধকে পরাজিত করলো জোয়ার। মহিলার দেহটি আরেকটু উপরে উঠলো। অধরে অধর মিলে যুগল হলো। গঙ্গা, যমুনায় বান ডাকলো। চন্দ্রদেবও বুঝি মুচকি হাসলো মেঘের চাদর সরে যাওয়ায়।

তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলাম ঘুম থেকে। অবাক হয়ে দেখলাম দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে চন্দ্রালোক না, সূর্যালোক ঢুকে পরেছে। বেলা প্রায় এগারো টা!!! অনেক দেরি করে ফেলেছি, ফিল্ডে যেতে হবে। লাফ দিয়ে উঠে ওয়াশরুমে গেলাম। কাল রাতের কথা মনে পরলো।

নাহ্! মহিলা তো নেই! রুমের কোথাও তার কোন চিহ্নই নেই। কেয়ারটেকারকে কিছু জিজ্ঞেসের সাহস পেলাম না। নজর পরলো কাচের গ্লাসের নিচে এক টুকরো কাগজের দিকে।
 " জীবনের শ্রেষ্ঠতম রাতে দুদণ্ড শান্তির জন্য ধন্যবাদ।"
গোটা গোটা অক্ষরে লেখা। জীবনানন্দের বনলতা সেনের কথা মনে পড়ে গেল। আমি দুদণ্ড শান্তি দিয়েছি!!! হোক না। জীবনবাবু শুধু বনলতাদের পুরুষ বানিয়ে রেখেছেন, আমাদের সমাজেও তো পতিতার কোন পুংলিঙ্গ নেই! পৃথিবীর গোড়াপত্তন থেকে তো দুদণ্ড শান্তি একপাক্ষিক-ই রয়ে গেল। আজ নয় একটু ব্যতিক্রম হলো।

সবচেয়ে অবাক হলাম এই ভেবে, আমি তার নাম, ধাম কিছুই জানিনা। শুধু এটুকু নয়, আমি তার সাথে একটি কথাও বলিনি! লেখাটা না থাকলে হয়তো ইল্যুশন ভেবে ভুল করতাম। বুঝলাম, মনের ভাষার কাছে মৌখিক কথোপকথন অতি তুচ্ছ।
বি.দ্র. গুরু জীবনানন্দ দাশ, বনলতা শব্দটির ভুল ব্যবহার করলে মাফ করে দেবেন।

65 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of