“হিরো” হওয়ার সাধ গল্প : পর্ব-৩ (শেষ পর্ব)

আমার জন্যে ফ্রিয়া নামের উপুলু দ্বীপের এ সুন্দরী পরীকন্যা বসবাস করবে এ কালোজলের অমান দিঘিতে ঐ কুৎসিত রাক্ষুসে মাছের সাথে। তা কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না আমি। তাই তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম পুরনো ইরানি জাহাজে যাবো এই জলদেবতার প্রতিদ্বন্দ্বিকে তুলে আনতে। নৌকোসহ বন্ধুদের নিয়ে উপস্থিত হলাম ইরানির মাস্তল বরাবর। কিন্তু হায়! আমাকে এখনতো আর ভয় করেনা জল। সুতরাং জল ঠেলে ডুব দিয়ে পুরনো জাহাজে ঢুকতে পারলামনা শত চেষ্টা করেও। বার বার জল ঠেলে ব্যর্থ হয়ে ঘরে রাখা সাঁতার কাটার পুরনো ফিন আর চোখে লাগানো পানিরোধক গ্লাস পরে আবার নামলাম জলে। কিন্তু রুদ্ধ শ্বাসে ভেতরে ঢুকতে পারলাম না জাহাজের। অবশেষে বুদ্ধি করে ফ্রিয়ার বাতাসা ছুড়লাম জাহাজের খোলে। গন্ধ পেয়ে শ্যামলরঙা জলেদেবতা এলো কাছে। তাকে দলবলসহ নৌকার কাছে এনে বিশেষ জালে তুললাম তাৎক্ষণিক। জলপূর্ণ বিশেষ পাত্রে অতি সাবধানে তাদের এনে ফেললাম আলোচিত দিঘিতে। যেখানে ফ্রিয়া বন্দী আছে কাল জলের দিঘিতে।

রাতে স্বপ্নে দেখা দিলো ফ্রি। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললো, তোমার পাঠানো জাহাজের শ্যামল দেবতা পরাস্থ হয়েছে কালদিঘির জলদেবতার কাছে। দলবলসহ নিহত হয়েছে সে এ দিঘির বিশাল বাহিনির কাছে। জানতে চাইলাম কিভাবে উদ্ধার করবো তবে তোমাকে ফ্রিয়া? ফ্রিয়া বললো, তুমি কি দিঘির সব জল তুলে ফেলতে পারবে? এখানে জলদেবতা একজন কিন্তু তার অনুসারী অন্যান্য জংলি মাছ প্রায় হাজার পাঁচেক। যাদের অনেকের আছে বিষাক্ত কাটা! সব জল তুলে ফেললে সকল মাছ মারা যাবে বলে তারা হয়তো বাধ্য করবে জলদেবতাকে তোমার সাথে শান্তিচুক্তি করতে তথা আমাকে ছেড়ে দিতে!

বিশাল এ দিঘির জল তোলা কি সম্ভব কতিপয় গ্রাম্য কিশোরের পক্ষে! ৩-মাইল দুরের শ্রীপুর বাজারে ছিল বিএডিসির সেচপাম্প কেন্দ্র। সেখানের সেন্টার ম্যানেজারের সাথে আগেই পরিচয় ছিল আমার। আমাদের জমিতে ইরিব্লক করার সময় একবার পাম্প ভাড়া এনেছিলো আমাদের কৃষি পরিবার তার কেন্দ্র থেকে। তখন দুতিনবার ভাত খেয়েছিল দুপুরে আমাদের বাড়িতে। তাই খুলে বললাম সব ঘটনা। সব শুনে তিনি বললেন, ৪০-টা পাম্পের ব্যবস্থা করতে পারবেন তিনি কিন্তু ডিজেলের ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের। তার সহযোগিতায় দিঘির একদিকে লাগানো হলো ৪০-টি বড় পাম্প। তার জল যেন সব নদীর দিকে যায়, তাই প্রায় আধা কিলোমিটার সংযোগ খাল কাটতে হলো আমাদের দিনরাত পরিশ্রম করে। বাজারের দোকানিরা এ প্রাণদায়ী কাজে আমাদের পাম্প চালাতে দিলো ২-ব্যারেল ডিজেল! কিন্তু পুরো দিন ৪০-টি পাম্প চালিয়েও দিঘির জল এক ইঞ্চি কমানো গেলনা। শেষে বিএডিসির সেচ ইঞ্জিনিয়ার বললেন, সম্ভবত নদী বা নিকটবর্তী সাগরের সাথে দিঘির তলদেশ দিয়ে সংযোগ আছে, যে কারণে ৪০ কেন ৮০ পাম্প লাগিয়েও এ দিঘির জল শুকোনো যাবেনা। এবার সকল পাম্পখুলে তার লোহার পাইপ ইত্যাদি আবার ৩-মাইল দুরের শ্রীপুর বাজারে ফেরত দেয়ার এক বিশাল ঝক্কির পালা আমাদের!

প্রতিবেশি ঠাকুর হরলাল মন্ডল সব শ্রম পর্যবেক্ষণ করছিলেন এ কদিন থেকে। শেষে তার ঘরের পুরনো জীর্ণ পুঁথির পাতা খুলে ডেকে পাঠালেন আমাকে। বললেন, জলদেবতাকে পরাস্থ করার পৌরাণিক যজ্ঞ ঔষধির কথা আছে দেড়শ বছরের এ পুরনো পুঁথিতে।কিন্তু তার জিনিসপত্র জোগার করতে পারবে তুমি এটা মনে হয়না আমার। আর ৮০-বছরের বৃদ্ধ আমি! তাই কেবল এ পুঁথির বলা মন্ত্র ছাড়া আর কোনভাবে কি কোন সহায়তা করতে পারবো তোমাকে? ভূর্জপত্রে হাতে লেখা আসাম কিংবা কামরুপের প্রাকৃত ভাষাতে লেখা পূঁথিমত জলেদবতাকে পরাজিত কিংবা নিধন করার মন্ত্র আর তার অত্যাবশ্যকীয় ঔষধি জীপনপণ বাজি রেখে সংগ্রহ করবো এমন কথা দিলে, ঠাকুর মন্ডল জোগার করতে বললেন শকুনের ডিম, প্যাঁচার তাজা পায়খানা, গো-খুরের জলা পানি আর গো-সাপের পিত্তরস। এ সকল জিনিসপত্রের নির্যাস করে তা একসাথে বিশেষ মন্ত্রপাঠে অমাবশ্যা বা পূর্ণিমার রাতে ঐ দিঘিতে ফেললে, দিঘির সকল রাক্ষুসে মাছ মারা যাবে জলদেবতাসহ। তখন মুক্তি পাবে উপুলু দ্বীপের পরী ফ্রিয়া!

শকুন দূরাকাশে উড়তে দেখেছি তবে তার বাসা বা ডিম দেখিনি কখনো। খোঁজ নিয়ে জানলাম, অন্তত ১০-মাইল দূরের এক বাগানে বিশাল পুরনো রেইনট্রি গাছে বসবাস করে বেশ কটি শকুন। নিরঞ্জনকে অনেক কষ্টে ঠেলেঠুলে ওঠালাম গাছে। কিন্তু বর্ষা ঋতুতে সে শকুনের বাসার কাছাকাছি গিয়ে পিচ্ছিল শ্যাওলাপড়া ডাল ভেঙে পড়ে গেল প্রায় ৩০/৪০ ফুট নিচে। শকুনের ডিম নয় এবার তাকে নিয়ে তখন ত্রাহি অবস্থা আমাদের। ২য় দিনে বন্ধু রফিক উঠলো গায়ে ছাই মেখে, যাতে পিছলা গাছ থেকে ফসকে পড়ে না যায় নিচে। কিন্তু বিফল হয়ে সে নিচে নামলো শকুনের ডিমের দুটো খোসা নিয়ে। যাতে বাচ্চা ফুটে তা বড় হয়ে চলে গেছে তাদের গন্তব্যে। সব শুনে বৃদ্ধ ঠাকুর মন্ডল বললেন, চুন মিশ্রিত পচা মাংস খাওয়াতে পারলে ২/৪ দিনের মধ্যে ডিম পারবে শকুনে। না হলে ডিম পারতে আবার ২/৩ মাসও সময় লাগতে পারে। খালে ভেসে যাওয়া মরা গরু টেনে এনে, তার রানের মাংস কেটে তাতে সাদা চুন মাখিয়ে তা টানিয়ে রাখলাম ১০ মাইল দুরের সেই বুনো বুড়ো রেইনট্রি গাছের ডালে। এবং শকুনে তা খেলো কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম দুরে ওঁৎ পেতে সবাই। দুদিন গাঁয়ের বাগানে প্যাঁচার ফোঁকড়ে অপেক্ষা করার পর সংগ্রহ করতে পারলাম প্যাঁচার কাংখিত বিষ্ঠা। নদীর ঢালে নরম কাদা মাটিতে গরুর পায়ের গর্তে জমা জল সংগ্রহ করলাম বিশেষ পাত্রে। গর্ত থেকে লেজ ধরে গো-সাপকে টেনে বের করার সময় গ্রাম্য গুইল ঘুরে কামড়ে দিলো বন্ধু বজলুর হাত। তারপরো সে ছাড়লো না ঐ বুনো গোসাপকে। তাকে কেটে পিত্তরস সংগ্রহ করা হলো গোসাপের। সব জোগার করে জমা রাখা হলো ঠাকুর মন্ডলের কাছে। এবার কেবল শকুনের আন্ডার অপেক্ষা। অধৈর্য বন্ধুরা বলতে থাকলো, চল শকুন ধরে তার পেট কেটে বের করে আনি ওর ডিম! আরো ৪-৫ দিন বৃক্ষ পর্যবেক্ষণ করার পর পাওয়া গেল শকুনের একটা সবুজাভ ডিম। ডিম হাতে নেয়ার পর ৪/৫ বার বাহক সেলিমকে মাথা আর চোখে আঘাত করলো উড়ন্ত শকুন। আমরা ক্রমে ঢিল ছুড়ে তাড়াতে থাকলাম মা শকুনকে। অতি সাবধানে ডিম নিয়ে সেলিম নামালো নিচে!

সকল জিনিসপত্র হাতে পেয়ে কাকা ঠাকুর মন্ডল বিশেষ যত্নে তৈরি করলেন জলদেবতা নিধনের প্রাণঘাতি নির্যাস! পরবর্তী পূর্ণিমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম সবাই। নির্দিষ্ট রাতে ফকফকা ভরা চাঁদরাতে দিঘির পারে সবাই দাঁড়ালাম আমরা। বার কয়েক বিশেষ মন্ত্র পাঠ করলেন ঠাকুর। মন্ত্রের টানে কিংবা ভরা জ্যোৎস্নার মোহময়তায় জলদেবতা মাথা তুললো তার দলবলসহ। ভরা চাঁদ জ্যোৎস্নায় আমরা ষ্পষ্ট দেখতে পেলাম কালো মাছগুলোর নড়াচড়া আর মুখগুলো। ক্রমে কাকা ঠাকুর জলে নিক্ষেপ করতে থাকলো তার নিজহাতে বানানো নির্যাস। পর পর ১৯ বার ছোট ছোট নির্যাসের টুকরো জলে নিক্ষেপের পর জলদেবতাসহ সকল মাছগুলোকে নিজেদের জীবনবাঁচাতে জলতাড়ণা করতে করতে নিমজ্জিত হতে থাকলো জলতলে। ঠাকুর বললেন, এখনই ক্রমে মারা যাবে সবাই।

কিন্তু মাছেদের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগেই ঠাকুর ঢলে পড়লেন পাশের ঘাসবনে। তাকে ধরাধরি করে বাড়িতে নেয়ার পর জল খেতে চাইলেন তিনি। মুখের কাছে জল ধরতেই তা লাফ দিয়ে সরে গেল দুরে। চামচ দিয়েও জল খাওয়ানো গেলনা

তাকে আর। বোঝা গেল, এবার “জল অভিশাপ” পড়েছে বৃদ্ধ ঠাকুরের ওপর। সম্ভবত জলদেবতা নিধনের মন্ত্রপাঠের কারণে তাকে অভিশাপ দিয়েছে জলের শক্তিধর জলদেবতা। জল না খেতে পেরে তৃষ্ণায় বুক চাপড়াতে চাপড়াতে দেহত্যাগের আগেই কালো দিঘি থেকে মুক্ত বাতাসে উঠে এলো উপুলু দ্বীপের পরীকন্যা ফ্রিয়া! একদিনে ফ্রিয়ার মুক্তি, অন্যদিকে বুড়ো ঠাকুরের মৃত্যুতে আনন্দ-বেদনার এক মহাকাব্যিক জীবনের গল্প রচিত হতে চললো আমাদের জীবনে!

ফ্রিয়াকে উদ্ধারের অভিযানে আমার বদলে মৃত্যু হলো বৃদ্ধ ঠাকুরের। তাকে দাহকালে উড়ে উড়ে অদৃশ্য অবয়ব আমাকে দেখালো ফ্রিয়া নিজেকে। বিকেলে ফিরে যেতে চাইলো ফ্রিয়া তার নিজে দেশে মায়ের কাছে! কৃতজ্ঞ নয়নে ফ্রিয়াকে বললাম, তুমি ইউচ হাইতার মায়াবি তুতুলিয়া দ্বীপ থেকে একবার জীবন বাঁচিয়েছিলে আমার। আবার এবার জীবন বাঁচালে এ কালো দিঘির রাক্ষুসে জলদেবতা থেকে। তুমিতো আমার প্রাণদায়ি ফ্রিয়া! তুমি কি থেকে যাবে আমার বাড়ি আমার মায়ের কাছে?

নীলাভ মণির মনোলোভা চোখে জল এনে ফ্রিয়া বললো – তোমার মনে নেই, উপুলু দ্বীপে তুমি ও আমি মাকে প্রতিজ্ঞা করে কথা দিয়েছিলাম, আমি পালাবো না তোমার সাথে কিংবা তুমি ধরে রাখবে না আমাকে! বললাম, হ্যা ফ্রিয়া মনে আছে আমার! তাহলে তুমি কি একবার আমার মায়ের সাথে দেখা করবে? একবেলা সুবাসিত নতুন রাজাশাইল চালের ভাত খাবে তুমি দুধ আর কলা দিয়ে? আমার অশ্রুসিক্ত কথাতে আপ্লুত হলো ফ্রিয়া। রাতে চাঁদের রূপোলি আলোতে দোতলা ঘরের বারান্দায় আমি আর মা অপেক্ষা করছিলাম খুব নরম করে রান্না করা গরম ভাত, ঘন হলুদাভ দুধ আর সবরি কলা নিয়ে। ফ্রি উড়ে এসে একদম মায়ের বুকের সাথে লাগলো! একান্ত তার কিশোরি কন্যার মত বললো, আপনার হাতে দুধ-ভাত খেয়ে আমার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই মা! আপনার ছেলে বিল্টুকে দেবেন আমার সাথে উড়ে যেতে উপুলু দ্বীপে? অনেক যত্নে রাখবো তাকে আমি!

এবার জল এলো মায়ের চোখেও! কা্ন্নাভেজা স্বরে সে বললো, বিল্টু ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো রে মা! আমি মরে গেলে বিল্টুকে নিয়ে যেও তুমি!

আমাকে আর মাকে জড়িয়ে শেষ বিদায় নিলো ফ্রিয়া। এক পরী আর দুজন মানুষের অশ্রুসিক্ত পথ ভেঙে উড়াল দিলো সে রাতের নীলাকালে।পশ্চিমাকাশে ডুবন্ত চাঁদের ক্ষীণ নীলাভ আলোতেও আমরা পরস্পরের জল চিকচিক চোখ দেখছিলাম। ক্রমে মহাকাশীয় বলয়ে চলমান কাঞ্চনপ্রভা চাঁদোয়া আলোয় দূরাকাশে হারিয়ে যেতে থাকলো ফ্রিয়া। যেন ছোট্ট পরীটির ভালবাসার উজ্জ্বলতার ভেতরে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে এক মৃত জমাট ব্যথার অন্ধকার! আকস্মিক প্রবল বাতাসের এক ছাট এসে দোলা দেয় আমাদের দোতলা ঘরের টিনের চালে। পাশের বৃক্ষদের প্রেমময় জীবনের বুনো বাতাসেরা যেন ছুঁয়ে যায় ফ্রিয়ার অবয়বে! ফ্রিয়া নামক দুরদেশের এ কষ্টনারীর শিশিরভেজা রাতের একাকি ধুসর পথের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকি আমরা! কখন পূবাকাশে আলোর বিচ্ছুরণ ঘরে টের পাইনা আমি কিংবা মা! আসলে জীবনের এসব প্রেমময়তা, জল, ঘাস, পাখি আর বুনো লতার মাঝে লুকিয়ে থাকে আমাদের কষ্টবেদনাগুলো। বায়ান্ন গলির তিপ্পান্ন মননের সংহত আবেগ আর চঞ্চলতার মাঝেও আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষা করতে এইসব ফ্রিয়া পরীদের জন্যে! যারা হারিয়ে যায় কখনো উপুলু দ্বীপে কিংবা সামুদ্রিক বুনো বাতাসে!

25 total views, 3 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of