নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৪র্থ পর্ব)

আমাদের সমাজের জন্য বিপজ্জনক মৌলবাদ।

মৌলবাদ কেন বিপজ্জনক সেটা বলার আগে কিছু প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা হোক। প্রথমত আমাদের চিন্তা করে দেখা উচিৎ আমরা কি আমাদের রাষ্ট্রব্যাবস্থাকে আধুনিক করে তুলতে চাচ্ছি নাকি প্রাচীন কিছু নিয়ম কানুনের মাধ্যেমে বা মধ্যযুগীয় আইন ব্যাবস্থা দ্বারা পরিচালিত করতে চাচ্ছি ? যদি আমরা আমাদের রাষ্ট্রব্যাবস্থাকে সেই মধ্যযুগীয় কায়দায় নিয়ন্ত্রণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা অনুসরন করে বাস্তবায়ন করি তাহলে কি আমাদের রাষ্ট্রের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে ? যার উওর জানতে গেলে আমাদেরকে সবার আগে যেকোন একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র বা ধর্মীয় বিধানে পরিচালিত রাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসাবে আনতে হচ্ছে। ইসলাম ধর্মের মোড়ল দেশ গুলোর মধ্যে তালিকায় সর্বোপ্রথম যাদের নাম আসে তাদের মধ্যে সৌদিআরব হচ্ছে সবার আগে। এই সৌদিআরববের শাসনব্যাবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা যদি ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে দেখা যাবে সেখানে আজও সমস্ত মধ্যযুগীয় নিয়ম কানুন অনুসরন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে করুণ অবস্থার মধ্যে আছে সৌদিআরবের নারী সমাজ। নারীরা পুরুষের দ্বারা নির্যাতনের স্বীকার হলেও শরীয়া আইন মোতাবেক ৪ জন পুরুষ সাক্ষী না থাকার কারণে তারা কোন বিচার পাচ্ছেনা। নারী শিক্ষায় এই সৌদির কোন ভূমিকা নেই বললেই চলে। এই নারীদের বিবাহের জন্য অসামান্য যৌতুক প্রথা আজও সেই দেশে প্রচলিত আছে যা না হলে নারীদের বিবাহ করার কোন অনুমতি নেই।

সৌদিআরবের রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের জনগনের কোন অংশগ্রহন নেই। সবাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী বা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট হবার কারনে এই সৌদিআরবকে মুসলিম রাষ্ট্র বলা হয়ে থাকে। ভৌগলিক অবস্থান এবং প্রকৃতিগত কারণে এই রাষ্ট্রটির মাটির নিচে প্রচুর পরিমানে তেল সম্পদ থাকায় এই দেশটি আজ একটি ধনী দেশ হিসাবেই এখনও পরিচিত আছে বিশ্বে। তবে এমন নয় যে তাদের তেল সম্পদ অফুরন্ত, কখনই শেষ হবে না তাই তাদেরকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কোন প্রয়োজন পড়েনা। এখন প্রশ্ন যদি হয়ে থাকে এতো ধনী একটি দেশ তাহলে তাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো কেমন হতে পারে ? শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য যে যুগ যুগ ধরে এই সৌদি আরবে শরিয়া আইনের নামে চলে আসছে নির্দিষ্ট একটি শেখ আর বাদশা পরিবারের শাসন। বাদশা শেখ আব্দুল আজিজ এর গোষ্ঠিতান্ত্রিক এই পারিবারিক শাসনে সমস্ত রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশের জনগন তাই মেনে নেই যেখানে এই পরিবারের সদস্য যা বলে থাকে, কোন নাগরিকদের বিন্দুমাত্র মতামত প্রকাশের অধিকার এই সৌদিআরবে নেই। এই রাজপরিবার নিজেদের ক্ষমতা ও রাজত্ব কায়েম করা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রের জনগনের চোখের আড়ালে গোপনে হাত মেলাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী আ্মেরিকার সাথে যারা তদের পারিবারিক রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য শক্তি জোগাবার বিনিময়ে লুটে নিচ্ছে তাদের দেশের তেল সম্পদ। এবং সেই রাজপরিবারের তেল সম্পদ লুটে পুটে খাওয়া এবং প্রতি বছর মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি হজ্ব্ব এর নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলা্র আয়ের তথ্য তারা নাগরিকদের কাছে গোপন করে ভোগ করছে।

এখনও এই সৌদিআরবের শরিয়া আইনের নামে প্রচলিত আছে মধ্যযুগীয় সব বর্বরতা যা মানব সভ্যতার জন্য চরম হুমকী স্বরুপ বলে দাবী করেছেন অনেকেই। চুরি করার দায়ে প্রকাশ্যে হাত কেটে ফেলা, বিবাহ বহিঃর্ভুত যৌন সম্পর্কের কারণে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুতে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা সহ ইসলাম ধর্মের প্রধান ঐশরিক কিতাব কোরান মোতাবেক যত বর্বরতা আছে সেই বিচার ব্যাবস্থায় সেই সব মধ্যযুগীয় বিচার ব্যাবস্থা আজও সেখানে বিদ্যমান। আধুনিক কোন বিচার ব্যাবস্থার বিন্ধুমাত্র ছোয়া সেখানে নেই। তাছাড়া সৌদিআরবে কোন মানুষের বাক-স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা বা মৌলিক মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। সব থেকে লজ্জাজনক যে বিষয়টি তা হচ্ছে আরব শেখরা পেট্রোডলারের বদৌলতে আধুনিক বিশ্ব থেকে তাদের নিজেদের জন্য সকল সুবিধা তারা নিচ্ছে, ভোগ করছে আধুনিক সকল প্রযুক্তি এমনকি তাদের টয়লেটও তৈরি করা হচ্ছে স্বর্ণ দিয়ে সব মিলিয়ে অত্যান্ত বিলাশবহুল এক জীবন যাপন করলেও তারাই আবার সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে আকড়ে রেখেছে সেই মধ্যযুগীয় সব ধ্যান ধারণা।

সৌদিআরব বাদে আজ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলেও আমরা একই চিত্র দেখতে পারি। ইরানী বিপ্লবের নেতা ঈমাম আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করে আধুনিক সকল শাসন ব্যাবস্থা তুলে দিয়েছিলেন। গনতান্ত্রিকতার বদলে সেচ্ছাচারিতা, সাধারণ জনগনের মত প্রকাশের বাধা, বাক-স্বাধীনতায় কঠোর নিয়ন্ত্রন সহ প্রশাসনের কাজে জনগনের অংশগ্রহন নিষিদ্ধ করেছিলো যা এই মৌলবাদেরই অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঈশ্বর প্রদত্ত নিয়মকানুন তারা অনুসরন করার কথা বলে থাকে তাই সেখানে ভিন্ন মত প্রকাশের কোন যায়গাও থাকেনা। যেহেতু শরিয়া আইন মতে এই সমস্ত আইন কানুনের সকল নিয়ম কানুন মোল্লা আর ধর্মগুরুদের যারা সেই ঐশরিক কিতাব আর ঈশ্বরের বানী সম্পর্কে পন্ডিত ব্যাক্তি বলে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং যাদের এইসমস্ত ধর্ম শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান থাকে শুধু তারাই নৈতিকতার প্রশ্নে সীদ্ধান গ্রহন করবেন এখানে কারো দ্বীমত পোষন করার কোন প্রশ্নই উঠেনা। ধর্মের যতই উদার নৌতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেনো তা কখনই একটি আধুনিক এবং গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে কোন ভূমিকায় রাখতে পারেনা। যারা বলে থাকেন ধর্ম-ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে তারা নিজেরাই তাদের চরিত্রে স্ববিরোধী অবস্থানে থাকেন।

বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তের আফগানিস্তানের মৌলবাদের দিকে তাকালে দেখা যায় এক বীভৎষ চিত্র। ৭০ এর দশকেও সেখানে নারীরা স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলো বিভিন্ন অফিস আদালাতে চাকরী করেছিলো। তালেবান মৌলবাদীদের দ্বারা নিয়য়ন্ত্রণ শুরু হবার পর থেকে নেমে আসে শেখানে অন্ধকার। নারী শিক্ষা সম্পুর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্ম মতে একমাত্র ঐশরিক কিতাব কোরান বাদে পৃথিবীর সমস্ত গ্রন্থ হচ্ছে তাদের কাছে শয়তানি কিতাব নামে পরিচিত ছিলো তাই বাড়ী থেকে সমস্ত বই খুজে খুজে তারা তা আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিলো। আফগানিস্তানের নারীদের গৃহপালিত পশুর মতো জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হলো ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী। হাজার হাজার বছরের অন্যান্য ধর্মের ঐতিহ্যবাহী সমস্ত নিদর্শন ও পুরাকীর্তি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিলো। এসকিছুর জন্য মৌলবাদ-ই দায়ী।

প্রত্যেকটি ধর্মের মৌলবাদীদের অতি সাধারণ একটি বৈশিষ্ঠ হচ্ছে তারা তাদের ধর্মের মৌলিক বিধানকে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবিকলভাবে প্রয়োগ করতে চায়। মুসলিম মৌলবাদীরা তাদের ঈশ্বর প্রদত্ত কোরানের বানী এবং যেহেতু নবী মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত একজন রাসুল তাই তার জীবনাচরণ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে তা প্রচলিত করেত চায়। ইহুদী মৌলবাদীরা তাদের তোরাহ নামক ধর্ম গ্রন্থের বাইরে কোন কিছু মানতে রাজী নয়। তারা তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে সেই মোতাবেক বিধি বিধান দ্বারা পরিচালনার কথা বলে খ্রিস্টান ধর্মের মৌলবাদীরা তাদের বাইবেল এক ও অভিন্ন সত্য বলে প্রচার করে। তাদের মতে বাইবেল প্রদত্ত জীবন বিধান হচ্ছে একমাত্র জীবন বিধান যা অনুসরন না করলে ঈশ্বর নারাজ হতে পারে তাই তারা বাইবেল মতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমাজ পরিচালনা করার কথা স্বগৌরবে প্রচার করে, হিন্ধু ধর্মের বেদ, গীতা প্রদত্ত জীবন বিধান অনুসরন করতে বলেন হিন্দু পন্ডিত আর পুরোহিতেরা। রাষ্ট্রীয় বিধানেও তার প্রয়োগের কথা প্রচলিত আছে। এই সমস্ত ধর্ম বিশ্বাসী মৌলবাদীরা প্রানী জগৎ এবং এই পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাখ্যা হিসাবে নিজ নিজ ধর্ম গ্রন্থের মতবাদকে একমাত্র সত্য বলে মনে করে থাকে। এই ক্ষেত্রে একেকটি ধর্মের সৃষ্টি রহস্য একেক রকমের হবার কারণে তা প্রতিটি ধর্মের সাথেই বিরোধী। যদি একটি রাষ্ট্র ব্যাবস্থা কোন একটি ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে তাহলে শেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের কোন প্রয়োগ থাকতে পারেনা। কারণ ঈশ্বর প্রদত্ত সকল নিয়মই হয়ে থাকে সেখানকার একমাত্র সত্য ও অপরিবর্তনশীল রাষ্ট্রব্যাবস্থা। রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মত প্রকাশের কোন সুযোগ সেখানে থাকেনা। কারণ, যেহেতু ধর্মীও বিধি মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে, শেখানে সাধারণ জনগনের থেকে যারা ধর্ম এবং ধর্মীও জ্ঞানে জ্ঞানী বা ধর্মগুরু হিসাবে পরিচিত শুধুমাত্র তাদের কথাই গ্রহন করা যেতে পারে।

চলবে…… ৫ম পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ

১১/১০/২০১৮

106 total views, 2 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
trackback

[…] চলবে…… ৪র্থ পর্বের লিংক […]