নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৫ম পর্ব)

বাংলাদেশে মৌলবাদের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস এবং পাকিস্তান।

মৌলবাদের উৎস হচ্ছে ধর্ম আর যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাবে একক কোন ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস থাকবে সেখানে এই মৌলবাদী শক্তি আরো জোরদার হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পূর্বে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তান মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালে এই বাংলাদেশেকে পুর্বপাকিস্তান নামে গঠন করেছিলো যাদের কাছ থেকে ২৪ বছর পরে বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলার সাধারণ জনগন এক হয়ে এই বাংলাদেশেকে স্বাধীন করেছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই পুর্বপাকিস্তানের ধর্ম ইসলামী মৌলবাদের শক্তি এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু কেনো হয়নি তার উত্তর দিতে গেলেই বলতে হবে আমরা আমাদের দেশকে ভৌগলিক ভাবে স্বাধীন ঠিকই করেছি কিন্তু সেই মৌলবাদীদের শেকড় একেবারেই উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়নি। দেশের মধ্যে কোন না কোন ভাবে সেই মৌলবাদীরা ধর্মের নামে তাদেরকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলো। বাংলাদেশের মৌলবাদের জন্ম ও বিকাশ সম্পর্কে জানতে হলে তাই আমাদের সেই পাকিস্তানের মৌলবাদী শক্তি এবং পুর্ব পশ্চিম দুই পাকিস্তানের ইতিহাস জানতে হবে সবার আগে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার বিশ্লেষন করলে দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি কিছুটা হলেও সেই পাকিস্তানি ধর্মীও মৌলবাদ দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের একটি ফটোকপি হিসাবেই চলমান রয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

পাকিস্তানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মূলত পাকিস্তান গঠন করেছিলেন দ্বী-জাতি তত্বের উপরে ভিত্তি করে। ১৯৪৭ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন বৃহত্তর ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য ভারতের কাছে দাবী করেছিলো মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্রের তখন তিনি দ্বী-জাতি তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে গঠন করেছিলেন পাকিস্তান। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন দ্বী-জাতি তত্ত্বের প্রবক্তা। তিনি এই দ্বী-জাতি তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে পাকিস্তান গঠন করলেও মৌলবাদী ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবক্তা মূলত তিনি ছিলেন না। তার ভাষ্য ছিলো কিছুটা এরকম, “পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক নিজেদেরকে পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবেই পরিচয় দিবে। হিন্দু, মুসলিম একই সাথে বসবাস করতে থাকলে একটা সময় তারা ধর্মীয় ভেদাভেদ ও সাম্প্রদায়িকতা ভুলে যাবে। ধর্মীও অর্থে আমরা পাকিস্তানের গঠন করতে চাইনা, কারণ ধর্ম হচ্ছে মানুষের নিজ নিজ স্বাধীন ইচ্ছার ব্যাপার। মানুষের ধর্ম ব্যাক্তিগত বিশ্বাসের ক্ষেত্র। ধর্ম কখনও রাষ্ট্র বা বস্তুর হতে পারেনা, কারণ রাষ্ট্র বা বস্তুর কখনই ইহকাল পরকাল বলে কিছুই থাকেনা”। এভাবেই একেবারে শুরুতে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হয়েছিলো ধর্ম নিরাপেক্ষভাবেই।

মূলত ধর্ম নিরাপেক্ষভাবে পাকিস্তানের উদ্ভব হলেও কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন ধর্মকেই রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্যাবহার করেছিলো যে কারনেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি রাষ্ট্রে কোন ধর্মের জোরালো শক্তি থাকতে পারবেনা বা সেই রাষ্ট্র সম্পুর্ণ ধর্মনিরাপেক্ষ কোন রাষ্ট্র বলে পরিগনিত হবে সেটা মনে করা কিন্তু ভুল হবে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো পাকিস্তানের আরেক প্রধানমন্ত্রীও লেয়াকত আলী খান ছিলেন তৎকালীন সময়ের পশ্চিমা গনতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন প্রধানমন্ত্রী যারা প্রত্যেকেই ধর্মকে ব্যাবহার করেছেন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে কিন্তু কখনই একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের কথা তাদের মাথায় আনেননি। যে কারনেই পাকিস্তানকে রাষ্ট্র হিসাবে গঠনের ঘোর বিরোধীতা করেছিলো তৎকালীন সময়ের ধর্মীও মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম এবং মজলিশে আহরায়ে ইসলাম। এই সমস্ত মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তান গঠনের আন্দোলনেরই বিরোধীতা করেছিলো সেসময়। এরপরেই আছে এই সমস্ত মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের কিছু হাস্যকর ও মজার ইতিহাস। আসলে মুসলিম জাতির ইসলাম ধর্মের মধ্যেই রয়েছে একটি স্বাধীন দেশে কিভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তা লন্ডভন্ড করে দেওয়া যায় তার সব ধরনের শিক্ষা আর তার উপরে যদি গোড়া ধার্মীক, অশিক্ষিত এবং মৌলবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোন সম্প্রদায় হয়ে থাকে তবে তো কথায় নেই।

স্বাভাবিক কারনেই যখন ধর্মকে হাতিয়ার করে গঠিত হওয়া পাকিস্তান নামের ধর্মনিরাপেক্ষ রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়ে গেলো তখন রাষ্ট্রের মধ্যে সেই বিরোধীতা করা দুই রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম এবং মজলিশে আহরায়ে ইসলাম কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলো কিন্তু মৌলবাদী শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই রাজনৈতিক দল কিভাবে আবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে গিয়ে মৌলবাদী রাষ্ট্র গঠন করেছিলো সেটাই মুল বিষয়। এই দুই দল আসলে সদ্য গঠন হওয়া পাকিস্তানের মধ্যে কোন একটি আন্দোলন করার ইস্যু খুজে বেড়াচ্ছিলো। মজার ব্যাপার হলো এই দাঙ্গাবাজ মৌলবাদীদের একটি রাষ্ট্রে দাঙ্গার সৃষ্টি করার জন্য তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ইস্যুরও প্রয়োজন পড়েনা। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে কাদিয়ানী মুসলিমদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে এই দাবী তুলে তারা ১৯৪৯ সালেই দাঙ্গা বাধিয়ে দিলো পাকিস্তানের মধ্যে। কাদিয়ানীরা মূলত মুসলিম নয় তাই তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে অমুসলিম ঘোষনা করা একটি সদ্য গঠিত রাষ্ট্রের জন্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রসঙ্গে একেবারেই অর্থহীন ও হাস্যকর একটি বিষয় ছিলো। জামায়াতে ইসলাম এবং মজলিশে আহরায়ে ইসলাম কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষনার দাবীতে দাঙ্গা বাধাবার আহবান করে। বোকা ও অশিক্ষিত পাকিস্তানি মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করলে নেকী এবং সোয়াবের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে আরো উস্কে দিলো এই দুই মৌলবাদী রাজনৈতিক দল।

চলবে…… ৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ

১১/১০/২০১৮

124 total views, 3 views today

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
trackback

[…] চলবে…… ৫ম পর্বের লিংক […]