শুভ জন্মদিন জলপুত্র।

শ্রদ্ধেয় সমালোচক আহমদ ছফা’র একটি প্রবন্ধের নাম ছিলো- ‘জীবিত থাকলে রবীন্দ্রনাথকেই জিজ্ঞেস করতাম’। প্রশ্ন টা ছিলো এমন–রবীন্দ্রনাথ কেন বাঙ্গালি মুসলিম নিয়ে কিছু লিখেন নি। বর্তমানে হরিশংকর জলদাস এভাবে লিখতে থাকলে কয়েক দশক পর কোন একজন আবার প্রবন্ধ লিখতে বসবেন- জীবিত থাকলে হরিশংকর জলদাসকেই জিজ্ঞেস করতাম।

হরিশংকর জলদাস। যার প্রতিটি উপন্যাস গল্প নিম্নবিত্ত জেলে জীবনের দর্পণ সরূপ। জেলে জীবনের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা, পরিবার-সমাজ চিত্র যেভাবে হরিশংকর জলদাসের কলমে উঠে আসে, এতটা স্পষ্ট ভাবে এখনো অন্য কোন উপন্যাস গল্পে উঠে আসে নি। কেননা– জেলে জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসে কথা আসলে প্রথমে আসে ‘পদ্মানদীর মাঝি’। তারপর অদ্বৈত মল্ল বর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। এই ছাড়া আর কোন উপন্যাসে এখনো অতটা জেলে জীবন উঠে আসে নি। এর পর হরিশংকর জলদাস। এছাড়াও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে অনেকে লিখলেও হরিসংকর জলদাস অনেকটা আলাদা। সাধারণত অনেক বড় বড় লেখকের লেখায় বাস্তবের সাথে কল্পনা মিশিয়ে একটি আবেগ সৃষ্টি করে। এই কল্পনা যে সত্য সব সময় তা একদম নয়। মিথ্যাও হয়। কিন্তু আবেগ সৃষ্টি করতে পারলে সবাই মেনে নেয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়- হুময়ূন আহমেদ বলেছেন পৃথিবী তে অনেক খারাপ পুরুষ থাকলেও একটি খারাপ বাবা নেই। বাবা বিষয় টা অনেকটা স্পর্শকাতর বলে অনেকে এই কথা গ্রহণ করলেও আসলে এটি ভুল। একটি নেই–অনেক আছে। সাম্প্রতিক খবরের কাগজে প্রায় দেখা যায় নিজের মেয়েকে ধর্ষণ এর খবর। এর থেকে খারাপ বাবা আর কি হতে পারে। সব মিলে হরিশংকরের সাথে অন্য লেখকের পার্থক্য হচ্ছে তিঁনি সত্যের সাথে কল্পনা মিশিয়ে আবেগ সৃষ্টি করেন না। সত্যের সাথে সত্য মিশায়। এতে আবেগ সৃষ্টি হয়ে যায়। এর কারণ হতে পারে হরিসংকরের বাস্তব জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা জমে ছিলো।

অনেকে বলে এত লেখালিখি করলে কি হয়? লেখালিখি করলে যদি সমাজ বদলে যায় রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়া, নজরুলরা কি কম লিখছেন? সত্যিকার অর্থে সমাজের কুসংস্কার চিরতরে নির্মূল হয় না। সমাজ সংস্কার স্থান-কাল দূরত্বে বদলে যায়। সব কিছুর মত বিবর্তবাদ এখানে ও কাজ করে। ভারত উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে চলতে থাকা বর্বর কুসংস্কার এর অধিকাংশ ছিলো ধর্মের নামে। প্রায় সব কিছুই পুরুষতান্ত্রিক মানসতা নিয়ে সৃষ্টি। বাল্যবিবাহ, জাতিপ্রথা, সতীদাহ, বিধবাবিবাহ বন্ধ ছাড়াও নরবলির মত কুপ্রথা হামেশা বেহাল তাঁবেদারিতে চলছিলো একটা সময়। যদিও এখনো কম বেশি আছে। পরিবারের কন্যাসন্তান বয়ঃসন্ধিকালে পা দিতে ব্রহ্মাণের সাথে রাতে রাখা হতো পবিত্র করার নামে। মন্দিরে পূজার্চনার সময় মহিলা প্রবেশ নিষেধ ছিলো। বিয়ের পর প্রথম রাতে নববধূ কে শক্তিসামর্থ্য পুরুষ দিয়ে সতীচ্ছদ করানো হতো। মুলত এটি ছিলো পুরুষের পৌরুষ্য ভয় অল্পবয়সী নারীর মাঝে প্রথম থেকে ছড়িয়ে দেয়া। এই কারণে হয়তো বিয়ের সময় পাত্রীর বয়স পাত্র থেকে কম হওয়ার রীতি চালু আছে এখনো। আসলে অধিকাংশ পুরুষ সঙ্গম ক্ষমতা নারীর তুলনায় কম। এই ব্যাপারে তামান্না সেতু’র একটা স্ট্যাটাস ছিলো -‘স্ত্রীর সাথে সেক্সুয়ালি স্যাটিসফাইড না হওয়াই যদি পুরুষের পতিতা পল্লি যাবার কারন হয়ে থাকে তবে–বিবাহিত নারীদের জন্য পুরুষের চেয়ে দশ গুন বেশি পতিত পল্লি প্রয়োজন।’ যাইহোক, এটা অন্য ব্যাপার। তো বলছিলাম কুসংস্কার থেমে থাকে না। বিবর্তনবাদের মত কুসংস্কার ও ভিন্ন রূপে আসছে। যখন ভিন্ন রুপে আসে তখন সময়োপযোগী করে লিখতে হয়। সমাধানের পথও স্নান-কালভেদে বদলে যায়। লিখতে হয় তখন।

হরিশংকর জলদাসের জীবনে বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিলো জেলে জীবন নিয়ে। জাত বৈষম্য, মহাজনের শোষণ, দারিদ্রতা, সামাজিক ধনী-গরীব বৈষম্য উঠে আসে তাঁর উপন্যাসে। জেলেদের কোন অতিরিক্ত দু:খ নেই, বহদ্দার বা মহাজনের অতিরিক্ত প্রাচুর্য নেই। যা আছে তা পরিপূর্ণ। উত্তাল সমুদ্র, ঝড়, জলদস্যুর হামলা, বখালে যুবক, ভালবাসা প্রেম সব পরিপূর্ণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত ধার করা ‘হোসেন মিয়া’ চরিত্র নেই।

একজন লেখক তাঁর স্বজাতি কে কতটা ভালবাসলে এভাবে লিখতে পারে সেটি হরিশংকর জলদাসকে দেখলে বুঝা যায়। চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা জেলে পাড়া থেকে উঠে আসা এই লেখকের প্রতিটি চিন্তা চেতনায় জেলে পাড়ার অবহেলিত অনাদৃত জেলেদের দু:খ-বঞ্চনা।

হরিশংকর জলদাসের লেখায় প্রেম ভালবাসা ব্যাপার টা সুন্দর ভাবে উঠে আসে। ভালবাসা নিয়ে আবেগ মোহ দূরে রেখে শরীর সত্য কে সামনে এনেছেন। যতটা ভালবাসা হয় শরীরের সাথে শরীরের ততটা মনের সাথে মনের হয় না। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘জলপুত্র’ জুড়ে আছে জেলে জীবনের নির্মম বাস্তবতা। একজন জলপুত্র গঙ্গা বাস্তবতার সাথে টিকে থাকতে পারে নি। জীবন সংগ্রাম আর সমাজের যাতাকলে বড় হয়েও অন্য জলপুত্র থেকে চিন্তা চেতনায় ছিলো আলাদা। জেলে অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ করায় মুসলিম মহাজনের রোষানলে খুন হতে হয়। অন্য উপন্যাস ‘দহনকাল’। উপন্যাস শেষ হবে, অথচ সব’চে বড় ধাঁধা– দহনকাল শেষ নাকি সূচনা!

তাঁর “কসবি” উপন্যাস অন্যতম সেরা উপন্যাসের একটি। জীবনের মারপ্যাঁচে বেশ্যাবৃত্তি পেশায় জড়িয়ে যাওয়া গ্রামের সহজ সরল মেয়ে কৃষ্ণা হয়ে যায় দেবযানী। চট্টগ্রাম শহরের নামকরা বেশ্যা। ভদ্র সমাজে কুচ্ছিত রূপ আর নিম্নবিত্ত সমাজের মেয়েদের টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করার বাস্তব উদাহরণ এই উপন্যাস। কসবি উপন্যাসের কয়েকটা লাইন এখানে না বললেই নয়। হরিসংকর জলদাস বলেছেন-
” নারী দেহবেসাতি পৃথিবীর অদিমতম ব্যবসা। দিনে দিনে মানুষ সভ্য হয়েছে, সমাজের অনেক কুপ্রথাকে ঘৃণায় ডাস্টবিনে ছুড়ে দিয়েছে। কিন্তু সভ্য শিক্ষক মানুষেরা দেহব্যবসা কে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। সমাজের উপরতলের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ভেতরের এই কদর্য রূপটাকে বদলানোর জন্য কেউ মরণপণ অভিযানে নামেনি।”
এছাড়া রয়েছে ‘রামগোপাল’ উপন্যাস হরিজন মানুষের দুঃখ কষ্ট নিয়ে লেখা পচা ঘিনঘিনে বিষয়বস্তু নিয়ে উপন্যাস এর আগে হয়তো কেউ লিখে নি। মেথর সম্প্রদায়ের জীবন সমাজ ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে বেঁচে থাকা উঠে আসে এই উপন্যাসে।

জলদাশিনীর গল্প, হরিকিশোর বাবু প্রবন্ধে প্রতিটি ছোটগল্প আঙ্গুল তুলে হিন্দু সমাজের অসহিষ্ণুতা সমাজ প্রথা, বর্ণভেদ। ‘সুবিমলবাবু’ গল্পে শুদ্ধ ব্রহ্মণ্ কে শুয়ে দেয় স্বামীহারা এক জলদাশীনির সঙ্গে। বুঝিয়ে দেয় শরীরের জাত নেই। তাঁর ‘রতন’ গল্প বাংলা সাহিত্যের অতৃপ্ত ছোট গল্পগুলোর একটি মনে হয়। একজন পোষ্টমাস্টারের সাথে অদৃশ্য ভাললাগা ভালবাসা মনে দাগ কেঁটে যাবে।

হরিশংকরের অন্যতম প্রতিভা সমালোচনা। লেখক রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা প্রথম একটু দেখা যায় ‘হৃদয়নদী’ উপন্যাসে। একজন রবীন্দ্রনাথ ভক্ত পারভীনকে কিভাবে রবীন্দ্রনাথ চিন্তায় চিন্তিত করে দেয় ফরহাদ, অর্থাৎ হরিশংকর জলদাস। মুহূর্তেই রবীন্দ্রচর্চায় ধোঁয়াসৃষ্টি করতে এমন কোন লেখক আগে আসে নি। ‘কসবি’ উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক পেশা বেশ্যা পল্লি নির্মাণ উঠে আসে। একই সাথে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মাগলার হিরো ‘হোসেন মিয়া’ কে তুলে দের সমালোচনার কাঠগড়ায়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ কে প্রশ্নবিদ্ধ সমালোনা করতে আলাদা উপন্যাস সৃষ্টি করে ‘আমি মৃণালিনী নই’। একজন নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে করে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে সংসার পেতেছেন খুব সহজ স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশ পায় মৃণালিনী অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর মুখে। এছাড়া রয়েছে কৈবর্তকথা, লুচ্ছা, রামগোপাল, একলব্য। যদি মহাভারত সম্পর্কে একটুও ধারণা না থাকে মহাভারত ধারণার হরিশংকরের ‘একলব্য’ একটি সহজ সত্য উপন্যাস। একজন নিষাদ গোত্রের বীর মহাভারতের কৌরব-পাণ্ডবের মহাবীরদের মাঝে হারিয়ে যেতে দেয় নি। দ্রোণাচার্যের পক্ষপাতী দৃষ্টির অর্জুন থেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন মহাবীর একলব্য ক

শুরুতে বলছিলাম মুসলিম সমাজ নিয়ে কেন লিখছেন না। বাঙ্গালি মুসলিম সমাজে কুসংস্কার নেই? বর্তমানে মক্তবের নামে মসজিদ মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ মুসলিম সমাজের অন্যতম ব্যাধি। কই, কেউ গত ১০-১৫ বছরে এক কলম লিখতে পেরেছে এই বিষয়ে? একটি লাইন ও না। ব্যাধি চেপে বসে থাকবে। লিখতে দিবে না কাউকে। বাঙ্গালি মুসলিম নিয়ে লেখকের তালিকায় অন্যতম লেখক ছিলো হুমায়ুন আজাদ। ফলাফল রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি। যুক্তিবাদী-মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়। খোদ আহমদ ছফা। একই ফলাফল। নাস্তিক ট্যাগটা প্রথমে। এমন যতজন এসেছে কেউ দেশ ছেড়েছে–কেউ দুনিয়া ছেড়েছে। এটি মুসলিম সমাজের সব’চে বড় দুর্ভাগ্য। বছরের পর বছর অপেক্ষা করলেও তাদের কোন হরিসংকর আসে না। আর হিন্দু সমাজের সৌভাগ্য একজন জলপুত্র হরিশংকর এখনো তাদের ভালবাসে। শুভ জন্মদিন জলপুত্র।

118 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of