নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৬ষ্ঠ পর্ব)

বাংলাদেশে মৌলবাদের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস এবং পাকিস্তান।

শুরু হলো ধর্মীও মৌলবাদীদের দ্বারা সৃষ্ট দাঙ্গা, প্রায় চার বছরের ব্যাবধানে এই দাঙ্গা খুব দ্রুত লাহোর পর্যন্ত পৌছেছিলো কাদিয়ানী অমুসলিম এবং মুসলিমদের মধ্যে। ১৯৫৩ সালে এই দাঙ্গা এতই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলো যার ফলে পাকিস্তান সরকার সামরিক শাসন জারী করতে বাধ্য হয়েছিলো। এই দাঙ্গার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলো সেসময়। কেউ নিজেদের শরীরে বোমা বেধে আল্লাহু আকবার বলে শহীদ হয়েছিলো আবার কেউ কাফের হবার কারণে মুসলিমদের হাতে জীবন দিয়েছিলো। সামরিক শাসন জারী হবার পরে পাকিস্তানি হাইকোর্টে প্রধান বিচারপতির অধীনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। এই দাঙ্গায় প্রত্যাক্ষভাবে উস্কানী দেবার অপরাধে রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামির প্রধান মৌলানা মওদুদীকে প্রধান আসামী করা হলো এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যদন্ডে দন্ডিত করা হলো। পরবর্তীতে মওদুদী সরকারের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন জানালে তাকে প্রাণ ভিক্ষা দেওয়া হয়। এবং তারও পরে সৌদিআরবের বাদশার হস্তক্ষেপে তাকে মুক্ত করা হয় জেল থেকে। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র গঠন হবার শুরুতেই এই বড় ধাক্কার ফলে অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সীদ্ধান্ত নিলেন রাষ্ট্রের সংবিধানে কিছু পরিবর্তন আনার। সেই সাথে অশিক্ষিত মৌলবাদী এসব ধর্মন্ধদের কিছুটা শান্ত করার জন্য পাকিস্তানের সংবিধানে অবজেক্টিভ রেগুলেশন যুক্ত করলো যেখানে উল্লেখ করা হলো রাষ্ট্রীয় বিধানে কোরান এবং সুন্নাহ ব্যাতিত কোন আইন থাকবে না।

পাকিস্তানের সংবিধানে কোরান ও সুন্নাহের পরিপন্থি কোন অধ্যায় আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি আলেম দল গঠন করলেন যারা ইসলাম ধর্মের শরীয়া আইন মোতাবেক পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধন করে প্রনয়ন করলো। আর এভাবেই পাকিস্তানের প্রধানন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মৌলবাদীদের সাথে প্রথম আপোষ করেছিলো। পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্ম এভাবেই যায়গা করে নিলো এবং মৌলবাদী ধর্মীও দলগুলো এটা তাদের প্রাথমিক একটি বিজয় ভেবে উল্লসিত হলো। কিন্তু এরপরেই প্রাসাদ রাজনীতির সুত্রপাত ঘটেছিলো পাকিস্তানে। প্রধানমন্ত্রী লেয়াকত আলী খান মৌলবাদীদের সাথে আপোষ করেও বেশিদিন থাকতে পারেনি। আ্তোতায়ির গুলিতে তার মৃত্যু হলো। এরপরেই শুরু হলো ক্ষমতা দখলের লড়াই। পাকিস্তানের সাধারণ জনগনের চোখার আড়ালে চলতে থাকলো পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করা ও ক্ষমতার ভাগ নিয়ে কামড়া কামড়া যাকে বলে। ইস্কান্দর মির্জা হলেন প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আইযুব খান হলেন প্রধানমন্ত্রী। কোন প্রকারের কোন আদর্শিক দ্বন্দ বাদেই ৩০ মাসের ব্যাবধানে ইস্কান্দর মির্জাকে তাড়িয়ে জেনারেল আইযুব খানের ক্ষমতা দখল। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ জনগনের পক্ষে কিছুই বোঝার উপাই ছিলো না কোথা থেকে কিভাবে কি হচ্ছে। তৎকালীন বাংলাদেশ অর্থ্যাৎ পুর্ব পাকিস্থানের তো প্রশ্নই উঠেনা।

অবশেষ ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতা হিসাবে আসলো জেনারেল আইয়ুব খান। ব্রিটিষ আদর্শে গড়া জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রের সংবিধানে আনলেন পরিবর্তন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে এই প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র কথাটি বাদ দিলেন তিনি। অন্যান্য অনেক শরীয়া আইনের পরিবর্তন করেন বিশেষ করে গোড়া ধার্মীকদের কট্টর বিরোধীতা শর্তেও তিনি মুসলিম পারিবারিক আইনের সংশোধন করলেন। কিন্তু জেনারেল আইযুব খানের বৃটিষ আদলে গড়া মনোভাব বেশিদিন টিকলো না। মোল্লা রাজনীতির চাপে এবং মৌলবাদীদের সস্তা জনপ্রিয়তার দরকারে সে আবারও ১৯৬২ সালের পরিবর্তিত পাকিস্তানের সংবিধানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কথা গুলো যোগ করেন। এরপরেই ঘটেছিলো সবচেয়ে মজার ঘটনাটি যখন ১৯৬৫ সালে ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচনে দাড়িয়েছিলো। এই আইয়ুব খান তখন শত শত মোল্লা হুজুর একত্রিত করে ফতোয়া জারী করা শুরু করে দিলো যে ইসলামী কোন রাষ্ট্রর নারী রাষ্ট্র প্রধান হতে পারবেনা। ইসলাম ধর্মে নারী নেত্রিত্ব হারাম হবার কারণে এই মৌলবাদীরা এমন ফতোয়া জারি করেছিলো। নানা ধরনের কারচুপি আর মোল্লা রাজনীতির সহোযোগীতায় আইয়ুব আলী খান নির্বাচিত হলো এবং তার এই বিজয়ের সাথে সাথে পাকিস্তানের মোল্লাদের অবস্থান আরো সুসংহত হলো।

এদিকে অবিভক্ত পাকিস্তানের পুর্বপাকিস্তানেও সেই পাকিস্তানি শাসকেরা একই ভাবে বাঙ্গালীদের ধর্ম ব্যাবহার করে পরিচালিত করে আসছিলো। বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলনকে বার বার প্রতিহত করেছিলো এই ধর্মকে ব্যাবহার করেই। বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা তা থেকে বেরিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করে অনেক রক্ত ঝরিয়ে সর্বোশেষ ১৯৭১ সালে এই মৌলিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ প্রাণ এবং অসংখ্য নারী ধর্ষণ ও গনহত্যা যার সবই পাকিস্তানি মৌলবাদী দ্বারা করা হয়েছিলো ধর্মের নামে। ইসলামী মৌলবাদীরা অন্য ধর্মের বাঙ্গালীদেরকে কাফের মনে করে হত্যা করেছে, বাঙালী নারীদের ধর্ষণ করেছে আর তাদের ধন সম্পদ গনিমতের মাল হিসাবে অধিগ্রহন করেছিলো তাদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। এসব অত্যাচারের ভেতরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা সেই মৌলবাদীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে স্বাধীন করেছিলো বাংলাদেশ। পাকিস্তানের নেতৃত্বে থাকা সামরিক জান্তা, রাজনীতিবিদ তারা যখন দেখলো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা ধর্ম দ্বারা দেশ পরিচালনা করার যে ক্ষতিকারক চিত্র যা মাত্র ২৪ বছরের ব্যাবধানে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ মতো দেশ গঠন করতে পারে সেই সম্পর্কে কি তারা অবগত ছিলোনা। অবশ্যয় ছিলো।

এই মৌলবাদী শক্তি আর ধর্ম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার ফলাফল কি হতে পারে তা জানা শর্তেও পাকিস্তান সেই বিপজ্জনক পথেই অগ্রসর হতে থাকলো। জুলফিকার আলী ভূট্টো এই মৌলবাদীদের ব্যাবহার করেই নানান কারচুপির মাধ্যেমে ক্ষমতায় আসলেন পাকিস্তানের। তিনি ক্ষমতায় আসার পরেই বিরোধী দলীয় জোটবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে মৌলবাদীরা তার বিরুদ্ধে, অভিযোগ কারচুপি করে ক্ষমতা দখল করা ও স্বৈরাচারী অপশাসন দূর করা। জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন নিজের ভিত্তি মুজবত করার জন্য আবারও সেই মৌলবাদীদের সাথে হাত মেলালেন এবং প্রধান বিরোধী দল গুলোকে হাতে নেওয়ার জন্য এবং সাধারণ মুসলিমদের বোকা বানাবার জন্য কিছু শরিয়া আইন প্রনয়ন করলেন পাকিস্তানে। এরপরেই একটি আদর্শ মৌলবাদী এবং ধর্মীও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানকে জিনি গড়ে তুলেছিলেন তিনি হচ্ছেন জেনারেল জিয়া। ভুট্টো ক্ষমতায় থাকাকালীন কাদিয়ানীদের প্রথম অমুসলিম হিসাবে ঘোষণা দিলেন এবং মোল্লাদের মন জয় করলেন। ভুট্টোর পরে যখন জেনারেল জিয়া পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসলেন তখন পাকিস্থান একটি পুর্ণ মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেলো। জিয়াউল হক কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষোনার পাশাপাশি তাদের আলাদা পরিচয়পত্র প্রদান করলেন তাদের জন্য আলাদা ভোট পদ্ধতী এবং তাদের সমস্ত মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হলো, সরকারি চাকুরী থেকে কাদিয়ানিদের বহিঃস্কার করা হলো, শরিয়া আইন দারা পরিচালিত আদালত গঠন করা হলো। সেই শুরুতে জিন্নাহ যে অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্ম নিরাপেক্ষ একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলো তার উত্তরসূরিরা ঠিক তার বিপরিত একটি পাকিস্তান গড়ে তুললো যা মধ্যযুগীয়া কায়দায় পরিচালিত হতে থাকলো।

এরপর থেকে শুরু হলো মৌলবাদীদের প্রকৃত শরিয়া আইন, চুরি করলে প্রকাশ্যে তার হাত কেটে ফেলা, বিবাহ বহিঃর্ভুত সম্পর্কে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুতে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা। নারী শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া, একজন পুরুষ সাক্ষীর বিপক্ষে দুইজন নারী থাকা সহ যত প্রকারের মধ্যযুগীয় বর্বরতা ছিলো তার সবই প্রচলিত করা হয়েছিলো পাকিস্তানে। বর্তমানেও সেই হুদুদ আইনের নামে সকল প্রকারের শরিয়া আইন পাকিস্তানে বিদ্যমান। জিয়াউল হকের পরবর্তিতে এপর্যন্ত যারা পাকিস্তানের ক্ষমতায় এসেছেন তাদের কেউ এই মৌলবাদী বা ইসলামী করণের কোন পরিবর্তনে পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। পশ্চিমা ভাবধারায় প্রশিক্ষিত বেনজির ভূট্টো ক্ষমতায় আসার পরে আর কোন সংস্কার হয়নি পরে যখন সামরিক শাসক মোশাররফ ক্ষমতায় আসলেন তখন তিনি এই মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বললেও রাষ্ট্রীয় সংবিধানে ইসলামী প্রজাতন্ত্রীর কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। যেসমস্ত কারনে বর্তমানে পাকিস্তানের মৌলবাদের যেই ইতিহাস আমরা এখানে জানলাম তার থেকেও বর্তমানে মৌলবাদ সবথেকে শক্ত অবস্থানে আছে পাকিস্তানে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যতদিত ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছে ততদিন একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে নিজেদের কখনই পরিচয় দিতে পারবেনা। পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় কিছু কিছু স্থানে তালেবান দ্বারা নিয়ন্ত্রনের কথাও শোনা যায়। এদিকে বেলুচিস্তানের নাগরিকেরা এই মৌলবাদীদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে বেলুচ জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যা একদম মুক্তিকামী বাঙালীর পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধের মতো মুক্তিযুদ্ধ।

চলবে……

-মৃত কালপুরুষ

১২/১০/২০১৮

182 total views, 3 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of