মাদকবিরোধী কনসার্ট (গল্প-৩৫)

শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ঢাকার ফাঁকা রাস্তায় ছুটছে একটি ব্যান্ডদলের মাইক্রোবাস। মধ্য চল্লিশের দলপ্রধান ও ভোকালিস্ট বসেছে ড্রাইভারের পাশের সিটে। তার চোখে কালো সানগ্লাস, গায়ে কালো শার্ট, মাথায় কাঁধ-সমান লম্বা কালো চুল। জ্যোতিষ প্রদত্ত নানান রকম পাথরসমৃদ্ধ আংটি পরা দুই হাতের ছয় আঙুলে, ডান হাতের জলের বোতলে হুইস্কি। কয়েক চুমুক দিয়ে সে বোতলটি পিছনে বসা লিড গিটারিস্টের হাতে দেয়। আমিনবাজার ব্রিজের কাছে পৌঁছলে কর্তব্যরত একজন পুলিশ সদস্য শিল্পীদের গাড়িটি থামানোর জন্য নির্দেশ দেন। পুলিশের কাছে গিয়ে গাড়িটি থামে। ভোকালিস্ট পুলিশের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে, আর পুলিশ সদস্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে গদগদ হয়ে লম্বা সালাম দেন। নিশ্চয় পুলিশ সদস্য এই ভোকালিস্টকে চেনেন। কেননা এদের ব্যান্ড যতোই পশ্চিমা ধারার হোক, এদের উচ্চারণ যতোই ইংরেজির অনুকরণে হোক, যন্ত্রের শব্দের আধিক্যে এদের গানের কথা যতোই বোঝা না যাক, এদের সুর যতোই শ্রবণেন্দ্রিয়ে বিরক্তির উদ্রেক করুক; দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা টেলিভিশনগুলেতে এরাই এখন দাপিয়ে বেড়ায়! কেউ এদের গান শুনতে না চাইলেও চ্যানেল পাল্টানোর সময় কখনো না কখনো টিভির পর্দায় এদের লম্ফ-ঝম্ফ চোখে পড়বেই! ভোকালিস্ট পুলিশের দিকে এমনভাবে ডান হাত তোলে যেন কোনো সন্ন্যাসী তার অন্ধ ভক্তের দিকে আশির্বাদের হাত বাড়িয়েছেন! গাড়ি আবার গতি বাড়িয়ে ছুটে চলে সামনের দিকে।

বেজ গিটারিস্ট এখন শিস বাজাচ্ছে, ড্রামার গাঁজা টানছে। গাঁজার স্টিকটি হাত ঘুরে চলে যায় সামনে বসা ভোকালিস্টের হাতে। সে গাঁজায় টান দিতেই ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটি বের করে, সাবিহার ফোন, ফোন রিসিভ করে সে-‘হ্যাল্লো, মাই ডিয়ার! হাউ আর ইউ?’

সাবিহা ভোকালিস্টের বন্ধু, র‌্যাম্প মডেল। সাবিহা বলে, ‘আই অ্যাম ওকে, তুমি কেমন আছো?’
‘পার্টি, প্র্যাকটিস, শো; সব মিলিয়ে বিন্দাস আছি সুইট হার্ট।’
সাবিহা কথার ফাঁকে ফাঁকে আ, উ, উম ইত্যাদি অদ্ভুত শব্দ করে, ‘আমাকে ভুলে গেছো না? একটা ফোনও তো দাও না?’
‘ও স্যরি ডার্লিং, আসলে কিছুদিন ধরে এতো বিজি আছি যে..’
‘শুধু অজুহাত।’
‘ও স্যরি বেবি।’
‘গাড়ির শব্দ শুনতে পাচ্ছি কোথাও যাচ্ছো নাকি?’
‘হ্যাঁ, শো করতে যাচ্ছি।’
‘কোথায়?’
‘নন্দনপার্কে, মাদকবিরোধী কনসার্টে!’
‘মাদকবিরোধী কনসার্টে? তুমি? হা হা হা, ও মাই গড।’
‘ও ডার্লিং কুল কুল, এতে হাসির কী হলো?’
‘হাসবো না! থাক বাদ দাও।’
‘শোনো, আমরা শিল্পী, স্যোশাল রেসপনসিবিলিটি আছে, সমাজের মানুষের জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হয়।’
‘দ্যাটস রাইট।’
‘বিলিভি মি, অর্ধেক পেমেন্টে যাচ্ছি, শুধুমাত্র তরুণ সমাজের জন্য কিছু করতে চাই বলে।’
‘ইউ গ্রেট ডার্লিং!’
‘এই তুমি একদিন স্টুডিওতে আসো না!’
‘ওকে, আসবো।’
‘কবে আসবে?’
‘তুমি যেদিন বলো।’
‘ঠিক আছে আমি তোমাকে জানাবো।’
‘ওকে ডার্লিং, গুডলাক, রাখছি, বাই।’
‘লাভ ইউ বেবি, বাই!’

মধ্যরাতে রাতে চার পেগ ওয়াইন পান করার পর ঘুমাতে যায় ভোকালিস্ট। জাপানী পুতুলের মতো দেখতে তার স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। ভোকালিস্ট চিৎ হয়ে শুয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢোকে। মাদকবিরোধী কনসার্টের ছবি দিয়েছিল ফেসবুকে, সেই ছবিতে এখন হাজার তিনেক লাইক আর শ’তিনেক কমেন্টস। সে কয়েকটি কমেন্টে চোখ বুলায়-‘ইউ আর গ্রেট বস’, ‘স্যালুট বস’, ‘লাভ ইউ গুরু’, ‘চালাম বচ (বানান এভাবেই লেখা)’ ‘বস, আমি কনসার্টে ছিলাম, আমার জীবন ধন্য’, ‘আপনার মতো শিল্পীরা আছে বলেই সমাজটা এখনো এতো সুন্দর’ ইত্যাদি!

ঢাকা।
অক্টোবর, ২০১৮

210 total views, 5 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of