কয়েকটি অপারেশনের একটি গল্প

আর কয়েকটা দিন পরেই দুর্গাপূজা। রীতি অনুযায়ী মূর্তি ভাঙার মধ্য দিয়ে পুজোর প্রস্তুতি পর্বের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেছে “মানসিক ভারসাম্যহীন”কতিপয় যুবক। তবে যতই তার মূর্তি ভাঙা হোক ভদ্রমহিলা শ্রীমতি দুর্গা মর্ত্যে আসবেনই। ওটা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ; নিয়ম রক্ষার আসা যাওয়া। ধর্মীয় সংবিধান রক্ষা বলে কথা! এই শক্তিমান রমনী মানুষ ও পৃথিবীর দুর্গতিনাশিনী। তবে বিরোধী লোকে বলেন ইনার অত্যাচারে নাকি তার গঞ্জিকাসেবী পতিদেবতা শ্রীযুক্ত শিববাবু মহাশয়ের দুর্গতির অন্ত নেই! সারাদিন স্বামীর সাথে খ্যাঁচখ্যাঁচ করে।স্ত্রীর রাশি রাশি অবিনাশী অভিযোগ ও ভৎর্সনা। এই যন্ত্রনা ভুলে থাকার জন্য স্বামী ব্যাঁচারা মাদকের আশ্রয় নিয়ে এখন পুরোপুরি মাদকাসক্ত হয়ে গেছেন।কিন্তু নিজের বেডরুমে বসে আরাম করে সামান্য একটু ইয়াবা সেবন করবেন তারও জো নেই। পুরুষ নির্যাতন শুধু আমাদের রাষ্ট্রপতির গৃহেই হয়না, স্বয়ং মহাদেবও এর ভুক্তভোগী। যাহোক এমনই এক স্বৈরিণী, কলহপরায়ণা, পতিনিন্দুক স্ত্রীলোককেই হিন্দুরা দিয়েছে “দেশরক্ষা ও জননিরাপত্তা মন্ত্রনালয়”এর দায়িত্ব। গৃহে নির্যাতিত ও একাধিকবার লাঞ্ছিত হয়ে নিরীহ ভদ্রলোকটি তাই শ্মশানে বসে চিতাভস্মকে শরীরের ভূষণ করে মৃতের হাড়গোড়কে কন্ঠমাল্য হিসেবে পরিধান করে আর একটা মৌর্য যুগের নোকিয়া বাটন সেটে গেমস্ খেলে দিনাতিপাত করেন। কারণ গৃহে তার সুখ নেই, কস্তুরীমৃগনাভীগন্ধায় সুরভিত হয়ে সপ্তরঙে রঙিন ভূষণে তণ্বী তণু আবৃত করে বহুমূল্য হীরামাণিক্যে অলংকৃতা হয়ে কোন রমনী তার জন্য পালঙ্কে শয়ান করে অপেক্ষা করে নেই। এজন্যই শ্মশানেই শিববাবু রচনা করেছে তার বাসর ইয়াবা আর গঞ্জিকা সমারোহে। শুধু শরৎ কালে যখন দুর্গার কাছ থেকে ডাক আসে যে ফ্যামিলি ট্যুর করতে মর্ত্যে যেতে হবে তখনই কেবল অমর্ত্য সেনের “ডেভেলপমেন্ট এ্যজ ফ্রিডম” বইটা সাথে করে ড্রিমলাইনার বিমানে চড়ে মর্ত্যে হাজির হন। কিন্তু এবার একটু বিপত্তি ঘটেছে। বলছি সেকথা।

মন্দিরে মন্দিরে আর রাস্তার মোড়ে “দুর্গা এ্যন্ড গং”এর আরাধনার আয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ। ঢাক ঢোল আর কাঁসর ঘন্টার সাথে পাল্লা দিয়ে লাউডস্পিকারে কি কি গান বাজানো হবে সেইসব নির্ধারণের জন্য সাংস্কৃতিক উপকমিটিগুলো অক্লান্ত পরিশ্রমের সাথে গবেষণা, মিটিং,সেমিনার এবং জনমত যাচাইয়ের কাজ করছে। উপ কমিটি একটা সার্চ কমিশন গঠন করে সেই কমিশনকে দক্ষিণ ভারতে পাঠিয়েছে সেখান কোন কোন লেটেস্ট তামিল,তেলেগু মালয়ালাম গান হিট হয়েছে সেই ব্যাপারে হাতে কলমে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। যেহেতু বাঙালির অনুষ্ঠান,তাই হালকা একটু বাংলা সংস্কৃতিও রাখতে হচ্ছে। সেই কারণে মেলানেশীয়া দ্বীপের দেশ ভানুয়াতুর লোকসংগীতের সুরের উপর রবি ঠাকুরের একখানা অপ্রচলিত কবিতা বসিয়ে দিয়ে মধ্যমাত্রায় বাংলা সংস্কৃতি চর্চারও সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে।

এমনই যখন অবস্থা তখন দুটো বিনা মেঘে বজ্রপাতের খবর এলো। প্রথম খবর হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর এবং দ্বিতীয় খবর হচ্ছে দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। প্রথম বজ্রাঘাতের কারণে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে মন্দিরের ঢাক ঢোলের শব্দ এবং মূর্তিপূজার মতো বেশরিয়তী কাজকর্মের উন্মত্ত প্রদর্শনীর সাথে কেউ সেলফি তুলে বা ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড এবং শেয়ার করলে সেটা কোন ধর্মনিষ্ঠ,শান্তিপরায়ন সহমত ভাইয়ের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিতে পারে। ফলে হয়তো সেই অনুভূতিপরায়ণ উনমানব আইন ও ধর্মের পরাকাষ্ঠা সেজে তৎক্ষনাৎ থানায় গিয়ে ৩২ ধারায় একটা মামলা ঠুকে দিতে পারেন।এটি তার গনতান্ত্রিক অধিকার বটে! তখন হয়তো বিদ্যুৎ গতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা বাহিনী এসে পূজা কমিটির আচার্য ও উপাচার্যকে কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যেতে চাইবে ডিজিটাল হাজতে। কোন এক লোকাল উপদেবতা অর্থাৎ স্থানীয় প্রজাহিতৈষী সহমত দলীয় উপনেতা এসে শীর্ণকীয় বৃদ্ধ পুরোহিতকে কান ধরে উঠবস করিয়ে মারমুুখী জনতার ধবলধোলাই এবং অপমানের হাত থেকে রক্ষা করে পরেরদিন সংবাদপত্রে বীর হিসেবে আখ্যায়িত হবে। ক্রোধন্মোত্ত জনতার হাত থেকে একজন সংখ্যালঘুকে বাঁচানো চাট্টিখানি কথা না!

আর দ্বিতীয় বজ্রাঘাতটা অবশ্য জনমানুষের উপর না, স্বয়ং জনদেবতার উপর নাজিল হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে খবর দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে সেটা শিবের নজরে এসেছে। ফলে তিনি ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে, কিছুতেই দুর্গার সাথে মর্ত্যের মন্দিরে আসতে রাজি হচ্ছেনা। গা ঢাকা দিয়েও কোন ফায়দা হলোনা তার, কারণ “আইনের হাত অনেক লম্বা”। গভীর রাতে “সুনির্দিষ্ট টিকটিকি তথ্যের ভিত্তিতে” মাদকবিরোধী কমান্ডো দল বহুবিধ অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে মাদক কারবারিদের সন্ধানে মন্দিরে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর দেশি অস্ত্রশস্ত্র যেমন ত্রিশুল, খড়গ, চক্র,বান, ঢাল প্রভৃতিসহ হিমালয় স্যালভেশন আর্মির (HSA)মুজাহিদিন কার্তিক, নারায়ন,মহিষাসুর এবং এর উইমেন্স উইংয়ের দুজন ফ্রন্টলাইন সদস্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে আটক করল পুজো শুরু হবার আগেই। এক মন্দিরের ভাণ্ডার থেকে সুন্দরবনের অভয়ারণ্য থেকে গুম হয়ে যাওয়া কয়েক প্রজাতির বণ্য প্রাণী যেমন মহিষ,সাপ, ইদুর,ময়ূর পাওয়া গেল। গ্রেনেড বোমা বিশেষজ্ঞ কার্তিক ওরফে বোমা কার্তিককে রিমান্ডে নিলে এবং তার সেল ফোন ফরেনসিক বিভাগে পাঠিয়ে বিশ্লেষণ করলে শিবের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ বাহিনী ইন্টারপোলের সহায়তায় একটি আন্তঃমহাদেশীয় অভিযান “অপারেশন খাইছি তোরে” পরিচালনা করে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ ইয়াবা ও গাজাসহ মাদকসম্রাট শিবকে আটক করে। এরপর আরেকটা অভিযান “অপারেশন চণ্ডিকা হান্টিং” পরিচালনা করে আরেক মাস্টারমাইন্ড মিসেস দুর্গা ওরফে চন্ডীকাকে শরীরে সুইসাইড ভেস্ট লাগানো অবস্থায় বিনা ওয়ারেন্টে এ্যরেস্ট করে। ইনি কিছুদিন আগে গুয়েতামালার একটা টিভি চ্যানেলে উগান্ডা নিয়ে গুজবভিত্তিক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে শ্রীলঙ্কার চামুণ্ডা ভাসের ভামমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।তারপর থেকেই তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল নিরাপত্তা বাহিনী।

পরদিন খবরের কাগজের হেডলাইন হয় “বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদের ঠাঁই নেই”।তার কিছুদিন পর এক নেতা পাতিসংঘের ভাষণে এবং অন্য নেতা The Daccan Times পত্রিকায় লিখিত নিবন্ধে বলেন “Bangladesh is a country of communal harmony. We believe in freedom and democracy.”

149 total views, 2 views today

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of