ইতিহাসের তিনটা প্রধান ঘাতক

৩ টা প্রধান ঘাতক। যে কোনো ইতিহাসের বই খুলবেন মানব সমাজের তিনটা প্রধান ঘাতক বারবার আঘাত হেনেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল। একই তিন সমস্যা বিংশ শতাব্দীর চীন, মধ্যযুগীয় ভারতে এবং প্রাচীন মিশরের জনগণের মধ্যে বারবার দেখা দিয়েছে । এরা হল

১. প্লেগ / মহামারী ২. যুদ্ধ ৩. দুর্ভিক্ষ,

প্রজন্মের পরে প্রজন্মের মানুষেরা তাদের প্রতিটি দেবতা, দেবদূত এবং সন্তের কাছে প্রার্থনা করে গেছে এবং অগণিত সরঞ্জাম, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছে – কিন্তু তারপরও তারা অনাহারে, মহামারী এবং সহিংসতা লাখে লাখে মানুষ যেতে থাকে । অনেক চিন্তাবিদ, প্রফেট ও ভাববাদীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ আসলে ঈশ্বরের মহাজাগতিক পরিকল্পনা বা আমাদের অসিদ্ধ প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কেয়ামত ছাড়া হয়তো তাদের কাছ থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া সম্ভব হবেনা ।

কিন্তু “আলহামদুলিল্লাহ” এই একবিংশ শতাব্দীর এই শুরুর কালে আমরা নিজেদের এক ভিন্ন পৃথিবীতে আবিষ্কার করছি যা আমাদের অতিক্রান্ত পথের ইতিহাসের সাথে তুলনা না করলে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব না। বেশীরভাগ লোকই এ সম্পর্কে খুব একটা ভেবে দেখেনা, কিন্তু গত কয়েক দশকে দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধকে আমরা পরাজিত করেছি । অবশ্যই, এই সমস্যাগুলি পুরোপুরি সমাধান করা হয়নি, তবে এগুলো আজ প্রকৃতির অসংলগ্ন এবং অনিয়ন্ত্রিত বাহিনী থেকে পরিচালনাযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলিতে রূপান্তরিত হয়েছে ।  কোন ঈশ্বর / আল্লাহ কে  প্রার্থনা করে বা কোনো অলৌকিক উপায়ে নয়, আমরা দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং যুদ্ধ প্রতিরোধ করার জন্য কি করা উচিত তা আজ খুব ভালভাবে জানি – এবং আমরা সাধারণত এটি করতে সফল হই । আর যখন সফল না হই আমরা বলে ফেলি না যে এই পৃথিবীর নিয়মি এইটা এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল  বরং আমরা এই ঘটনার পেছনে দায়ী কে খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করি।  তদন্ত কমিশন গঠন করি এবং যুদ্ধ দুর্ভিক্ষ মহামারী পেছনে কে বা কি দায়ী তা নির্ধারণ করতে চেষ্টা করি। এই প্রক্রিয়া আমাদেরকে  ক্রমাগত সাফল্য দিয়ে আসছে।  পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সেনাবাহিনীর গুলিতে সন্ত্রাসী হামলায় কিংবা চোর ডাকাতির ঘটনায় যে পরিমাণ মানুষ মারা যাচ্ছে তারচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে অতিরিক্ত খাবার কারণে মারা যাচ্ছে কিংবা  বার্ধক্য জনিত কোন রোগে কিংবা আত্মহত্যা জনিত কারণে ।

পাঠকদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে বলতে চাচ্ছেন সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন এবং ইয়েমেনে যুদ্ধ এখনো চলছে- আফ্রিকার এইডস ক্রাইসিস এখনো যায়নি । এখনো মানুষ দুইডলারের কম আয়ে বেচে আছে অনেক যায়গায়। কথাগুলো সত্য তবে বর্তমান যুগের এই পরিস্থিতিরগুলোকে এযাবতকালের নাগালে পাওয়া সার্বজনীন স্বীকৃত মানব ইতিহাসের পাশে রাখলে আমাদের “আলহামদুলিল্লাহ” 😉 বলা ছাড়া উপায় থাকবেনা। আমি ইতিহাসের ছোট ছোট কিছু গল্প টেনে বিষয়টা বোধগম্য করতে চেস্টা করবো।

 

১. প্লেগ / মহামারী

১৫২০ সালের ৫ই মার্চ, একটি ছোট স্প্যানিশ ফ্লিটেলা মেক্সিকো যাওয়ার পথে কিউবা দ্বীপ ছেড়ে গেল। জাহাজগুলি ৯০০ স্প্যানিশ সৈন্যসহ ঘোড়া, আগ্নেয়াস্ত্র এবং কয়েকজন আফ্রিকান ক্রীতদাস বহন করে। ফ্রান্সিসকো ডে ইগুয়া নামক একজন ক্রীতদাস তার অজান্তে নিজ শরীরে এক ভয়াবহ বায়োলজিক্যাল টাইম বোম (smallpox ভাইরাস) বহন করে চলছিল । তার শতকোটি দেহ কোষের কোথাও জৈবিক বোমাটি টিক টিক করছিল । মেক্সিকোতে অবতরণের পর ভাইরাসটি তার দেহের মধ্যে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, অবশেষে একটি তীব্র ব্যথার মধ্যে তার ত্বকের উপর ছড়িয়ে পড়ে। জ্বরাক্রান্ত ফ্রান্সিসকো কে কম্পোওলান শহরে একটি নেটিভ আমেরিকান পরিবারের বাড়িতে বিছানায় নেয়া হয়েছিল। তিনি ঐ পরিবারের সদস্যদের সংক্রমিত করেন । তাদের থেকে সংক্রমিত হয় প্রতিবেশীরা। দশ দিনের মধ্যে কম্পোওলান শহরটি একটি কবরস্থানে পরিণত হয় । শরণার্থীরা কেমোপোলোনের কাছ থেকে কাছাকাছি শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের পর শহর এই প্রাদুর্ভাবের কবলে পরে মানুষ শূন্য হতে থাকলো, ভয়ার্ত উদ্বাস্তুদের নতুন ঢেউ মেক্সিকো এবং এর বাইরেও এই রোগটি বহন করে।

ইয়ুকাটান উপদ্বীপে মায়ানরা বিশ্বাস করতেন যে, তিনটি মন্দ দেবতা- একপট, উজেনকাক এবং সোজাক্ক (Ekpetz, Uzannkak and Sojakak)- এই রোগে মানুষকে সংক্রামিত করে রাতে ভর গ্রামে গ্রামে উড়ছে। Aztecs রা দোষ চাপিয়েছিল দেবতা Tezcatlipoca এবং Xipe, বা সম্ভবত সাদা মানুষের কালো জাদু উপর । পুরোহিত ও ডাক্তারদের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। তারা প্রার্থনা, ঠাণ্ডা গোছল, বিটুমেনের সাথে শরীরের ঘর্ষণ এবং ফোলাতে ধোঁয়াশাবিশেষ কালো beetles সুপারিশ করেন। কিছুই লাভ হয়নি হাজারে হাজার মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে পঁচতে থাকলেও কারো পক্ষে তাদের কবর দেয়ার সাহস হয়নি । কয়েকদিনের মধ্যেই সমগ্র পরিবারের সবাই মৃত্যুবরণ করেন এবং কর্তৃপক্ষ আদেশ দিতেন যে মৃতদেহগুলি কবর দেবার চেষ্টা না করে যাতে তাদের উপর বাড়ির দেয়াল ফেলে দেয়া হয় । কয়েকটি বসতিতে অর্ধেক জনসংখ্যা মারা যায়।

১৫২০ সালের সেপ্টেম্বরে এই মহামারী মেক্সিকো উপত্যকায় পৌঁছেছিল এবং অক্টোবরে অজেক্ট রাজধানী টেনোকাইটলান- এর দ্বারগুলিতে প্রবেশ করে ২৫০০০০ মানুষের একটি মহৎ মহানগর। দুই মাসের মধ্যে জনসংখ্যার অন্তত এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এজেটেক সম্রাট কাতুলহুয়াক সহ। ১৫২০ সালের মার্চ মাসে স্প্যানিশ নৌবাহিনী যখন এসে পৌঁছেছিল তখন মেক্সিকো ২২ মিলিয়ন লোকের বাসস্থান ছিল, ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র ১৪ মিলিয়ন মানুষ বেঁচে ছিল।

২. যুদ্ধ

আমি যদি বলি পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারকারীদের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া উচিত – অনেকেই হয়ত আমার সাথে একমত হবেন । কারণ এই বোমা আবিষ্কার পৃথিবীর পরিস্থিতি এমন করে ফেলেছে যে বড় আনবিক বোমা শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ লাগা মানব সভ্যতার সম্মিলিত আত্মহত্যার শামিল । আর প্রথমত এই কারনেই শক্তিশালী দেশ গুলো উপরে উপরে যতই হামকি ধামকি দিকনা কেন আল্লাহর রহমতে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ জড়ানো থেকে আজ পর্যন্ত বিরত থেকেছে। যদিও কতদিন তা থাকতে পারবে কেউ বলতে পারেনা কারন আজো আমরা সেই একি ধরনের মগজ, একই জীন বহন করে চলেছি। পৃথিবীতে মানুষের গত কযেক সহস্রাব্দীর ইতিহাস ঘটলে দেখা যায় আসলে এই রকম “শান্তি” বৃহত শক্তিগুলোর মধ্যে কখনোই বজায় ছিলনা। তবে ইতিমধ্যে এই ক্ষুদ্র শান্তির সময় আমাদের জন্ম নেবার সুজুগ পাবার জন্য আসুন এক সাথে বলি আলহামদুলিল্লাহ।

যুদ্ধ না লাগার আরো একটা কারণ জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি । আগের দিনে একটা দেশ আরেকটা দেশে আক্রমণ করে হীরা জহরত গনিমত লুট পাট করে নিয়ে আসতো। কিন্তু বর্তমান যুগে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হইল জ্ঞান। অস্ত্রের জোরে তেলের খনি দখল করা যায় ঠিক; জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার শান্তি পূর্ন পরিবেশ। একে অন্যের সাথে সহযোগিতার মধ্যদিয়ে সমষ্টিগত চর্চা করে লাভবান হচ্ছে।

‘‘একাটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হবে। ১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডা কংগোতে আক্রমন করে colton খনি লুট করে।’। কারন ঐ সময় মোবাইল ফোন বানানোর এই পদার্থের বিশাল চাহিদা ছিল। রুয়ান্ডার আর তাই এক বছরে ২৪০ মিলিয়ন ডলার উপার্যন করেছে। রুয়ান্ডার মত গরীব দেশের জন্য এটা বিশাল অর্জন।  আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে চীন যদি ক্যালিফোর্নিয়া আক্রমণ করে সিলিকন ভ্যালি ঘেরাও করে ফেলে, যদি ধরে নেই যে চীন তা করতে সক্ষম তার পরেও সিলিকন ভ্যালি তে কোন সিলিকন খনি খুঁজে পাবে না। অন্য দিকে চীন প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে Google / Apple এর মত বড় বড় হাই টেক কর্পোরেশন গুলোর সাথে কাজ করে তাদের সফটওয়্যার কিনে নিয়ে তাদের পন্য উৎপাদন করে। রুয়ান্ডা যুদ্ধ করে লুট করে এক বছরে যা উপার্জন করেছে তা চীন এক দিনেই আয় করতে পারে শান্তি পূর্ন বাণিজ্যের মধ্যে দিয়ে। তাই যুদ্ধ লাগা আজ আর লাভ জনক কোন কিছু বলে পরিলক্ষিত হচ্ছেনা।

৩. দুর্ভিক্ষ

কিছু সময় আগেও  পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বায়োলজিক্যাল পোভার্টি লাইন এর নিচে  অবস্থান করত ।  যার নিচে থাকা মানুষ অপুষ্টি ক্ষুধা দ্বারা ভয়াবহ ভাবে আক্রান্ত হতে পারে।  সামান্য একটু ভুল কিংবা কিছুটা দুর্ভাগ্যর কারণে একটা সমগ্র গ্রাম কিংবা দেশের দুর্ভিক্ষ লেগে যেত।  যদি অতিবৃষ্টি আপনার গমের খেত ধ্বংস করে দেয় কিংবা ডাকাতেরা যদি আপনার ছাগলের পাল কেড়ে নিয়ে যায় হয়তো আপনি এবং আপনার আত্মীয়-স্বজন না খেয়ে মারা যেতেন । দুর্ভাগ্য কিংবা বোকামি সঠিকভাবে একটি পুরো অঞ্চলের মানুষকে  খুব সহজেই অনাহারে ফেলে দিত। যখন প্রাচীন মিশরে কিংবা মধ্যযুগের ভারতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ লেগেছে তো তখন মোট জনসংখ্যার ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ।  সরকার থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ছিলনা। তাছাড়া খুবই ধীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অনেক দূর অঞ্চল থেকে খাবার আমদানি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবার কারণে  শাসকগোষ্ঠী ছিল নিরুপায় কিংবা অনাগ্রহী ।

আপনি যেকোন ইতিহাসের বই খুলেন না কেন আপনি দেখতে পাবেন দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত মানুষের ক্ষুধার জ্বালায় পাগলের মতো হয়ে যাবার  দুর্বিষহ বর্ণনা । ১৬৯৪ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের Beauvais শহরের একজন  কর্মকর্তা তার এলাকার খাদ্য মূল্য বৃদ্ধির কারণ এর পরিণত পরিস্থিতি বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে যে – সম্পূর্ণ  বিভাগ জুড়ে অসহায় আত্মাদের বিচরণ। তারা ক্ষুধার জ্বালায় খুবই দুর্বল এবং মৃতপ্রায় কারণ তাদের কোন কাজ নাই টাকা নাই রুটি নাই।  একটু বেঁচে থাকার আশায় কিংবা একটু ক্ষুদা থেকে রেহাই পেতে এই গরীব ক্ষুধার্ত মানুষেরা ময়লা বা দুর্গন্ধযুক্ত যা পায় তাকে খেয়ে ফেলতে চায়। ময়লার স্তূপে পড়ে থাকা মৃত ঘোড়ার মাংস কিংবা বেড়াল কিংবা কেউ কেউ  নিরুপায় হয়ে পান করে নিচ্ছে যখন গরু কিংবা মহিষ জবাই করা হয় তা থেকে  প্রবাহিত রক্ত। অন্যরা লুফে নিচ্ছে যে সব ময়লা আবর্জনা বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয় তা ।  অন্যান্য দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত মানুষেরা পানিতে ফুটিয়ে  খেয়ে নিচ্ছে আগাছা গাছের শিকড় বাকড় ।

একি দৃশ্য দেখা গেল সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে। গত ২ বছরে আবাদি জমি খারাপ আবহাওয়ার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ১৬৯৪ সালের বসন্তের সময় দেখা গেল শহরের শস্য ভান্ডার সম্পূর্ণ শূন্য।  ধনাঢ্য পরিবারের লোকজন বেশি দাম দিয়ে  যতটুকু খাবার তাদের নাগালে মিলছে কিনে নিয়েছিল যার কারণে যারা গরীব তাদের না খেয়ে মারা যাওয়ার পরিণতি ভুগতে হল। প্রায় ২.৮ মিলিয়ন ফরাসি  জনসংখ্যা যা কিনা মোট জনসংখ্যার ১৫% মারা গেল খাদ্যাভাবে ১৬৯২ এবং ১৬৯৪ সালের মধ্যে। অন্যদিকে ফ্রান্সের সূর্য রাজা লুইস (চতুর্দশ) তার রাজমহলে  রাজ ললনাদের সাথে অন্তরঙ্গ  বিনোদনে মেতে ছিলেন।

পরবর্তী বছর ১৬৯৫ সালে এস্তোনিয়া তে দুর্ভিক্ষ আক্রমণ করলো।  সেখানকার ৫ শতাংশ জনসংখ্যা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো । ১৬৯৬ সালে ফিনল্যান্ডের পালা ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ মানুষ মারা গেল। ১৬৯৫ সাল থেকে ১৬৯৮ পর্যন্ত স্কটল্যান্ড তীব্র রকমের দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হল এবং কিছু কিছু বিভাগে ২০ শতাংশ জনসংখ্যা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

অধিকাংশ পাঠকই হয়তো জানেন আপনি যদি এক বেলা দুপুরের খাবার না খেতে পারেন কিংবা আপনি যদি রোজার মাসের রোজা রাখেন,  কিংবা ওজন কমাবার জন্য ভেজিটেবল শেইক  খেয়ে যদি কয়েকদিন পার করেন তা কেমন অনুভূত হয়।  কিন্তু আপনাদের কল্পনা করা সম্ভব নয় যখন আপনি এমন একটি পরিস্থিতিতে আছেন যে বেশ কিছুদিন যাবত আপনি খাবার খেতে পাননি এবং আদৌ কোথা থেকে আপনার পরবর্তী খাবার আসতে পারে বা কোথায় খাবার পাওয়া যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। বর্তমান কালের অধিকাংশ মানুষের  এই জাতীয় কোন নিরুপায় দুর্বিষহ পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে না কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের এবং পূর্ব নারীদের এই সমস্ত পরিস্থিতির  মুখোমুখি হওয়া ছিল  খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। গত ১০০ বছরের চমৎকার টেকনোলজিক্যাল, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উন্নতির কারণে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি করেছি যা কিনা আজ মানবতাকে বায়োলজিক্যাল দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করছে। আজও পৃথিবীর কোথাও কোথাও দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটে কিন্তু তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক কারণে ঘটে যেমন মানুষের পলিটিক্স  জনিত ( যেমন ইয়েমেনের যুদ্ধ জনিত দুর্ভিক্ষ) কারণে, কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় কেউ যদি তার চাকরি হারিয়ে ফেলে কিংবা অর্থ সম্পদ হারিয়ে ফেলে  তারপরও তাকে ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাবার কথা না।  তাকে নিরাপত্তা দিতে আছে বিভিন্ন রকমের বীমা ব্যবস্থা সরকারি সংস্থা আন্তর্জাতিক এনজিও যারা কিনা তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ দৈনিক ক্যালরি যোগান দিতে পারে।  দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক  কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ কিংবা খাদ্যাভাব কে  নিতান্ত একটি সাময়িক বাণিজ্যিক  লাভ এর সুযোগে পরিনত করেছে মাত্র। এমনকি যখন যুদ্ধ ভূমিকম্প কিংবা সুনামি একটি সম্পূর্ণ দেশকে যদি তন্ন তন্ন করে দেয় তারপরও দেখা যায় আন্তর্জাতিক সহায়তার কারণে প্রায়শই দুর্ভিক্ষ প্রতিহত  করা সম্ভব হয়।  যদিও শত মিলিয়ন মানুষ এখনো প্রতিদিন  হয়তো ক্ষুধায় কালাতিপাত করে তবু খুব কম ক্ষেত্রেই তাদেরকে ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুবরণ করতে  হয়।

( Yuval Noah Harari র Homo Deus: A Brief History of Tomorrow ভিত্তিতে লেখা। )

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of