মুক্তিযুদ্ধ – বাবার দেখা , আমার শোনা।

প্রাইমারীতে পড়েছিলাম আমাদের গ্রামেই। প্রাইমারীর গন্ডি
শেষ করে ভর্তি হয়েছিলাম পাশের গ্রামের হাই স্কুলে। আসলে তখন পাশের গ্রাম সম্পর্কে ধারণা কম ছিল। তখন পাশের গ্রামের মুরুব্বীদের মুখে প্রায়ই ‘মিলিটারি খাল” নামে একটা খালের নাম শুনতাম। তাদের কথা প্রসঙ্গে বুঝতে পারি খালটি আমাদের গ্রামেই। বাড়ি গিয়ে বাবার কাছে জিজ্ঞেস করি খালটিকে মিলিটারি খাল বলার কারণ কী। তার কাছ থেকে যা শুনি তা এরকম।


প্রাইমারীতে পড়েছিলাম আমাদের গ্রামেই। প্রাইমারীর গন্ডি
শেষ করে ভর্তি হয়েছিলাম পাশের গ্রামের হাই স্কুলে। আসলে তখন পাশের গ্রাম সম্পর্কে ধারণা কম ছিল। তখন পাশের গ্রামের মুরুব্বীদের মুখে প্রায়ই ‘মিলিটারি খাল” নামে একটা খালের নাম শুনতাম। তাদের কথা প্রসঙ্গে বুঝতে পারি খালটি আমাদের গ্রামেই। বাড়ি গিয়ে বাবার কাছে জিজ্ঞেস করি খালটিকে মিলিটারি খাল বলার কারণ কী। তার কাছ থেকে যা শুনি তা এরকম।

তখন ছিল কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস। ধানে ভরা ফসলের ক্ষেত। আশেপাশের তুলনায় আমাদের গ্রামটা খুব ছোট। মাঝখান দিয়ে ছোট্ট একটা রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সারি সারি বাড়ি। গ্রামের শেষ মাথা থেকে খালটি চলে গেছে অন্য গ্রামের দিকে। শহর থেকে মিলিটারিদের দল গ্রামের দিকে ঢুকছে তখন। আমাদের গ্রামেও একদল ঢুকে পরেছিল। সারা দেশের মতো আমাদের গ্রামেও চললো অত্যাচার। তবে কোন
নারীর সম্ভ্রমহানী হয়নি। কয়েকদিন আগে ওদের গুলীতে শহীদ হন অনিল মল্লিক। তার দোষ ছিল তিনি এলাকার মানুষদের সঙ্ঘবদ্ধ করেছিল ওদের বিরুদ্ধে। আতঙ্ক ঘিরে ধরেছিল এলাকার মানুষদের। কিন্তু থেমে থাকেনি ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর প্রয়াস।

সেদিন সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরছিল। বৃষ্টির পানি নেভাতে পারেনি গ্রামের মানুষের স্বজন হারা বেদনার আগুন। প্রস্তুতি চলে ওদের খতম করার। ওরাও গাদ্দারের মাধ্যমে টের পেয়ে যায় সবকিছু। অন্তিম সময়ে একূল ওকূল না পেয়ে ভয়ে পালাতে থাকে। ক্ষেতের পানি শুকানোর পথে। তার মধ্যে দিয়েই দৌড়াতে থাকে। মাঝে মাঝে ধানের ক্ষেতের
মধ্যে দিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে। আবার দৌড়ায়। প্রাণপণে দৌড়ায়। পেছন থেকে ধাওয়া করে গ্রামের মানুষ। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র। ওরা দৌড়ায় আর মাঝে মাঝে ঘুরে গুলি করে। ওরা ঘুরে দাড়ালেই শুয়ে পরে গ্রামবাসী। একসময় ওদের একজন পেছনে পরে যায়। বাকি তিন জন সামনে দৌড়ায়। পেছনের জনের বোঝতে বাকি থাকেনা যে কী ঘটবে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গুলি করতে ভুলে যায়। সুযোগ নেয় গ্রামবাসী। যার যা ছিল তাই নিয়েই কাউন্টার এটাক।
বাকি তিন জনের শেষ সীমানা সেই খাল। কিছু না বুঝে ঝাপিয়ে পরে বাকি তিনটা। সাতার জানত না ওরা। এবার মনের সুখে কোপায় গ্রামবাসী ! মাছ কোপানোর যন্ত্র (কালি , কতু , কোচ ) দিয়ে কোপায় ওদের। রক্তে লাল হয় খালের পানি। অনিলের রক্তের পরিবর্তে পশুর রক্তে লাল হয় খাল।

গ্রামবাসীরা (যারা গ্রামে অবস্থান করছিল) তখনও চিন্তায় ছিল। আমার বাবা অতটা সাহসী ছিলনা। সে ওদের গায়ে কোপ দিতে পারেনি। কিন্তু সে আর পাশের বাড়ির এক লোক
দৌড়ে এসে গ্রামবাসীকে সুখবর শোনায়।

মিলিটারিদের হত্যার কাহিনী পৌছে যায় ওদের উপরমহলের কাছে। কয়েকশত নরপিশাচ পাঠায় আমাদের গ্রামকে সায়েস্তা করার জন্য। আমাদের পাশের গ্রামের নাম বাকাই (bakai). ওদের লিস্টে বাকাই এর নাম লেখা হয়। কিন্তু ওরা ভুল করে লিখে bakal যা আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে। শত শত ঘরবাড়ি পুরিয়েছে সেখানে। শহীদ হয়েছে অনেকে। বেচে যায় আমাদের গ্রাম।

স্বাধীনতার প্রায় ৩৫ বছর পরে অনিল মল্লিকের নামে একটা সৌধ নির্মিত হয়। আগে শুধু ফুল দিতাম নির্দিষ্ট একটা জায়গায় , জানতাম না কী জন্য দিচ্ছি। পরে এসব জানতে পারি। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা তালিকা করা হয়। তালিকায় নাম ওঠে কিছু মানুষের যারা কিনা তখন গ্রামেই ছিলনা! মুরুব্বিরা বলাবলি করে – আরে অমুকে তো তখন ছিল অমুক গ্রামে মামা বাড়ি। কানে যায় এসব ভুয়া যোদ্ধারও। কিন্তু এসবে কি কান দিলে চলে? ! তাদের সাথে নাম আছে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারও। এলাকায় যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরী হয় সে কিছু জানতেই পারেনা।

বাবাকে জিজ্ঞেস করি আপনার নামও তো ওখানে থাকতে পারতো! অন্তত ওখানে যারা আছে তাদের চেয়ে …..
জবাব আসে , না বোধক। সে মুক্তিযুদ্ধ না করে তালিকায় নাম ওঠাবে না!

5 total views, 2 views today

7
Leave a Reply

avatar
4 Comment threads
3 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
ডাঃ আতিকআবীর সমুদ্রআকাশসাজ্জাদ সাজুদৈনিক মজিদকন্ঠ Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
দৈনিক মজিদকন্ঠ
ব্লগার

আমার কাকুর বেলায় সেইম ঘটনা
আমার কাকুর বেলায় সেইম ঘটনা ঘটছে।লেখক কে মোবারক বাদ

সাজ্জাদ সাজু
ব্লগার

কাহিনী সেইম।স্পট ভিন্ন!
কাহিনী সেইম।স্পট ভিন্ন! আপনার বাবার জন্য সেলুট। আমার বাবাও এলাকায় থেকে সবাইকে সংঘটিত করেছিল, যুদ্ধের প্রয়োজনে অস্ত্র নিয়েছিল । কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন।কারণ তালিকায় নাম নাই।

আকাশ
ব্লগার

(No subject)
:গোলাপ:

সাগর সাগর
ব্লগার

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের যন্ত্রনায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলায় আছেন। দুঃখজনক।