মাহদী থেকে মার্ক্স ও ‘জগতের লাঞ্ছিত’। পর্ব -২

জাঞ্জ বিদ্রোহ শুরু হওয়ার বছর চারেক আগেই ইয়াহিয়া ইবনে উমর আব্বাসিয়দের হাতে পরাজিত ও নিহত হন। শিরচ্ছেদ করে খলিফার দরবারে তার মাথা পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইয়াহিয়ার মৃত্যু সংবাদ জনগনকে নিশ্চিত করা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনের খাতিরে তার মাথা সামারা শহরের প্রধান ফটকের উপর লটকে দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও জায়েদি শিয়াদের মধ্যে প্রচার চলতে থাকে যে তিনি আসলে নিহত হন নাই, গায়েব হয়ে গেছেন এবং কেয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদী হিসাবে আবার ফিরে আসবেন। এই গায়েব তত্ত্বের সুযোগ নিয়েই চার বছর পর আলী বিন মুহাম্মদ নিজেকে ইয়াহিয়ার পুনরাবির্ভাব বলে দাবি করেছিলেন। প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, পরাজিত ও নিহত হওয়া এবং তারপর ‘গায়েব হয়ে যাওয়া ও মাহদী হিসাবে পুনরাবির্ভাবে’র তত্ত্ব প্রচার, এই ধরণের ঘটনা ইয়াহিয়া ইবনে উমরের ক্ষেত্রেই প্রথম ঘটে নাই। আলীর বংশধর ইমামদের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে, পরেও ঘটেছে, বারবার ঘটেছে। প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল শিয়া ইমামদের জন্যে সাধারণ ঘটনা। যারা বিদ্রোহ করেন নাই, তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন খলিফার নির্দেশে বিষ প্রয়োগে নিহত হয়েছেন। বিদ্রোহী অথবা রাজনীতিবিমুখ যাই হোন না কেনো, আলী ও ফাতিমার বংশধরদের ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ হিসাবেই গ্রহণ করেছিল প্রথমত উমাইয়ারা, এবং তারপর আব্বাসিয়রা। বারবার বিদ্রোহের একাধিক কারন ছিল। উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া তার পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা নির্বাচিত করে ইসলামী খেলাফতে রাজতন্ত্রের সুচনা করেছিলেন। তারপর থেকে হাজার বছর যাবৎ উমাইয়া, আব্বাসিয়, ওসমানি তুর্কি ইত্যাদি সামন্ত রাজবংশের অধিকারেই ছিল খলিফার মসনদ। ইসলামের খেলাফত যদি বংশানুক্রমিকভাবেই অর্জন করা যায়, তাহলে মুহাম্মদের বংশধরদের চাইতে বড় দাবিদার কেউ হতে পারে না, এই ধরনের বিশ্বাস অনেকের মাঝে ছিল। উমাইয়া খেলাফতের আমলে সমাজের নির্যাতিত, বঞ্চিত বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠি বিশেষ করে অনারব মুসলমানরা মুহাম্মদের বংশধর অথবা তার পরিবারের সদস্য অর্থাৎ হাশেমি বংশের খেলাফতের দাবির প্রতি সহানুভুতিশিল হয়ে পরে। তাদের মধ্যে এই ধারণা পোক্ত হয় যে মুহাম্মদের পর আলীই ছিলেন মুসলমানদের প্রকৃত ইমাম এবং তারপর হাসান, হুসাইন ও তাদের বংশধররা হলেন মুসলমানদের নেতা তথা ইমাম এবং উমাইয়াদের বদলে ইসলামের নবীর বংশের ইমামদের হাতে ক্ষমতা আসলেই তাদের সকল দুঃখ, দুর্দশা ও লাঞ্ছনার অবসান হবে। ফলে বিদ্রোহী ইমামদের সমর্থন দেয়ার জন্যে সবসময়ই সমাজের কিছু অংশ তৈড়ি ছিল, অনেকক্ষেত্রে বরং তাদের চাপেই ইমামরা বিদ্রোহী হয়েছেন। অন্যদিকে অন্যায় ও শোষনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল ‘ইমামি’ তত্ত্বের অন্তর্গত বিষয়। ইয়াহিয়া ইবনে উমর ছিলেন একজন জায়েদি ইমাম। অর্থাৎ তিনি মুহাম্মদের নাতি হুসাইনের নাতি জায়েদ ইবনে আলীর বংশধর। জায়েদ ইবনে আলীকে যারা ইমাম হিসাবে অনুসরণ করতেন তারাই জায়েদি শিয়া। ইরানে সাফাভিদ শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে পর্যন্ত জায়েদিরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ট্র শিয়া, অন্যান্য যে কোন শিয়াদের তুলনায় সুন্নিদের সাথে তাদের মিল বেশি। প্রথম দুই খলিফার ব্যাপারেও তারা অন্য শিয়াদের মতো বিরূপ নয়। কিন্তু মুসলমানদের নেতা তথা ইমাম হওয়ার ক্ষেত্রে তারাও ‘বিদ্রোহের’ আবশ্যকতা প্রচার করেছেন। জায়েদিদের মতে হাসান এবং হুসাইনের যেকোন বংশধরই ইমাম হতে পারেন, যদি তার দুইটা গুন থাকে। ইমাম হতে হলে, প্রথমত জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে, দ্বিতীয়ত শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। তাদের মতে শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছাড়া পুরোদোস্তুর ইমাম হওয়া সম্ভব না, আংশিক ইমাম হওয়া সম্ভব বড়জোর। পুরো মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা খেলাফতের দাবিদার হওয়ায় এবং ইমামী কর্তব্য হিসাবে সামাজিক শোষন, অবিচার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দায় নিয়ে তাই এই ইমামরা বংশানুক্রমিকভাবেই ক্রমাগত বিদ্রোহ করে গেছেন।

শিয়া ইমামদের মধ্যে সর্বপ্রথম গায়েব ও মাহদী তত্ত্ব প্রচার করা হয় আলীর তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আল হানাফিয়ার নামে। তিনি ফাতেমার সন্তান ছিলেন না, বরং আলীর হানাফি গোত্রিয় স্ত্রী খাওলার পুত্র ছিলেন। কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইনসহ হাশেমি বংশের ৭৪ জন সদস্য নিহত হওয়ার পর মুহাম্মদ হানাফিয়া হাশেমি বংশের প্রধান হিসাবে আবির্ভুত হন। তৎকালিন শিয়াদের অধিকাংশই তাকে ইমাম হিসাবে সমর্থন দেয়। ৬৮৬ সালে মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়াকে ইমাম ঘোষনা করে কুফায় আল মোখতার বিদ্রোহ শুরু করেন। মুহাম্মদ হানাফিয়া কখনোই সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেন নাই, কিন্তু আল মোখতারের রাজনৈতিক নেতৃত্বে মুহাম্মদ হানাফিয়াকে ইমাম মেনেই আলী পরবর্তি যুগের শিয়ারা তাদের আলাদা পরিচয় নিয়ে প্রথমবারের মতো সংগঠিত হতে পেরেছিল। মোখতারের নেতৃত্বে ‘মুহাম্মদের ঘরের পার্টি’, ‘গরিবের ভ্যানগার্ড’, ‘আল্লাহর এলিট বাহিনী’ এইরকম বিভিন্ন নাম নিয়ে বিদ্রোহীরা সংগঠিত হয়। বিদ্রোহের উদ্দেশ্য হিসাবে আল্লাহর আইন ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, ইমাম হুসাইনসহ নবী পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ, গরিবের স্বার্থ রক্ষা ইত্যাদি প্রচার করা হয়। ফলে সমাজের পশ্চাৎপদ বিভিন্ন গোষ্ঠি বিশেষ করে অনারব মাওয়ালী এবং দক্ষিন আরবের বেদুইনদের মধ্যে এই বিদ্রোহ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মোখতারের বিদ্রোহী বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিল অনারব মাওয়ালী। মোখতারের নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো অনারব র্যািডিকাল শিয়া মিলিটেন্টদের উত্থান হয় যারা পরবর্তি সময়ে বিভিন্ন উমাইয়া বিরোধী বিদ্রোহে প্রধান শক্তি হিসাবে আবির্ভুত হয়। তবে মোখতারের বিদ্রোহ জনপ্রিয় ও প্রবল আকাড় ধারণ করেছিল এর কসমোলজিকাল ব্যাখ্যার কারনে। মুহাম্মদ হানাফিয়া’কে মাহদী ঘোষনা করা ছিল এর প্রথম ধাপ। মোখতার ও তার অনুসারীরা ঐতিহাসকদের বর্ণনায় ‘কায়সানিয়া শিয়া’ নামে পরিচিত। ইমাম মাহদী সংক্রান্ত মুসলিম বিশ্বাসের প্রাথমিক ধারণাগুলো এই কায়সানিয়াদের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল। মাহদী টাইটেলটি এর আগে ইমাম হুসাইনের একটি টাইটেল হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু শেষ জমানায় ন্যায় বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার মসিহা চরিত্র হিসাবে ‘ইমাম মাহদী’ টাইটেলের ব্যবহার কায়সানিয়ারাই প্রথম করেছে। এই বিদ্রোহ আরো এপোকেলিপ্টিক চেহারা ধারণ করেছিল মোখতারের ‘আর্ক অফ কোভেনেন্ট’ আবিস্কারের দাবিতে। মোখতার তার কথিত ‘আর্ক অফ কোভেনেন্ট’ (তাবুত আল সাকিনা) সামনে রেখেই মোখতার কারবালার সবচেয়ে বড় ভিলেন হিসাবে পরিচিত ওবাইয়দাল্লাহ বিন জিয়াদ’কে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে কারবালার প্রতিশোধ গ্রহন করেন।

তবে প্রাথমিকভাবে সফল হলেও মোখতারের বিদ্রোহ কিছু সিমাবদ্ধতা কখনোই অতিক্রম করতে পারে নাই। এই বিদ্রোহের সবচাইতে বড় দুর্বলতা ছিলেন স্বয়ং ইমাম মাহদী। যাকে ইমাম মাহদী মেনে এই বিদ্রোহ বড় আকাড় ধারণ করেছে সেই মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া নিজেই কখনো সরাসরি রাজনীতিতে জড়ান নাই। আলী, হাসান এবং হুসাইন প্রত্যেকেই শত্রুর হাতে নিহত হওয়ার পর, বিশেষ করে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর হাশেমি পরিবার কিছুদিনের জন্যে অপেক্ষাকৃত অরাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। হুসাইনের মৃত্যুর পর তার তরুন পুত্র আলী বিন হুসাইন সমাজ ও রাজনীতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকী ধর্মচর্চার জীবন বেছে নেন। পরিবারের সিনিয়র সদস্য হিসাবে মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া হাশেমি পরিবারের প্রধানের ভুমিকা পালন করলেও সরাসরি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা থেকে বিরত থাকেন। এমনকি তিনি উমাইয়া খেলাফতের সাথে একধরণের বোঝাপড়ার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন ও একটা পর্যায়ে সিরিয়ায় গিয়ে তৎকালিন খলিফা আবদ আল মালেককে খলিফা হিসাবে স্বিকৃতীও দিয়ে আসেন। শিয়া ধর্ম বিশ্বাসে যেহেতু ‘তাকিয়া’র ধারণা প্রচলিত আছে, তাই তার এই রাজনৈতিক অবস্থানকে তাকিয়া হিসাবে প্রচার করার সুযোগ ছিল, যেমন আবু বকর, উমর ও উসমানের খেলাফত বিষয়ে আলী তাকিয়া অবলম্বন করেছিলেন বলে শিয়াদের মাঝে বিশ্বাস প্রচলিত আছে। মুহাম্মদ হানাফিয়া ৭০০ সালে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। আল মোখতার তার শত্রুদের হাতে পরাজিত ও নিহত হন। কায়সানিয়ারা কুফা, জাজিরা ও নিশিবিশ শহরে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। কুফার পতনের পর জাজিরা এবং সর্বশেষ নিশিবিশ কেন্দ্র করে মোখতারের মাওয়ালী অনুসারীরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত টিকে ছিল। মোখতারের পতন এবং মোহাম্মদ হানাফিয়ার মৃত্যুর পর কায়সানিয়ারা বড় ধরণের ধর্মতাত্ত্বিক ও আদর্শিক সমস্যার সম্মুখিন হয়। বিদ্রোহের সময় তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছড়িয়ে পরে যে ইমাম মাহদী মুহাম্মদ বিন হানাফিয়ার মাধ্যমেই মুহাম্মদের পরিবার ইসলামী দুনিয়ার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সত্য ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। মুহাম্মদ হানাফিয়ার মৃত্যুতে এই বিশ্বাস বাস্তবে পরিণত হওয়ার সুযোগ আর থাকলো না। কায়সানিয়াদের মধ্যে এই সময় এই বিশ্বাস ছড়িয়ে পরে যে হানাফিয়া আসলে মৃত্যু বরণ করেন নাই বরং আল্লাহ তাকে গায়েব করে দিয়েছেন এবং কেয়ামতের পূর্বে তিনি আবার ফিরে আসবেন। কেয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে এবং তিনি সত্য, সাম্য ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন এই জাতীয় বিশ্বাস জনগণের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কায়সানিয়াদের হাত ধরেই। তবে হানাফিয়ার গায়েবের প্রকৃতি কেমন তা নিয়ে কায়সানিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত হয়ে ওঠে। এক পক্ষ প্রচার করে যে আদম এবন ইউনুস নবী যেমন আল্লাহ সাময়িক শাস্তি হিসাবে যথাক্রমে দুনিয়ায় এবং মাছের পেটে পতিত হয়েছিলেন, হানাফিয়াকেও সাময়িক শাস্তি হিসাবে আল্লাহ গায়েব করে দিয়েছেন। আরেক পক্ষ প্রচার করে, শাস্তি নয় বরং হানাফিয়াকে রক্ষা করার জন্যেই আল্লাহ তাকে গায়েব করে দিয়েছেন। আরো প্রচার হয় যে রওজা পাহাড়ে তার ডানদিকে একটি সিংহ এবং বামদিকে একটি চিতা বাঘ নিয়োজিত করে আল্লাহ তাকে পাহারা দিচ্ছেন। তিনি পানি ও মধু খেয়ে কেয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবেন, এবং কেয়ামতের ঠিক পূর্বে সত্য ও ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তিনি মানুষের মাঝে ফিরে আসবেন।

মুহাম্মদ বিন হানাফিয়ার মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা বহুদলে ভাগ হয়ে যায়। কেউ তার পুত্র, আবার কেউ তার ভাইদের ইমাম হিসাবে মানতে শুরু করে। তার পুত্র আবু হাশিমকে আবার একটি দল ইমাম মাহদী বলে প্রচারও করে। এইসব দল ও উপদলের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সফল ছিল ‘আব্বাসিয়’রা। আব্বাসিয়রা ছিল ইসলামের নবী মুহাম্মদের চাচাতো ভাই আবদাল্লাহ ইবনে আব্বাসের বংশধর অর্থাৎ হাশেমি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আবদাল্লাহ ইবনে আব্বাস ইমাম আলীর সমর্থক অর্থাৎ শিয়া ছিলেন। আধুনিক যুগের জায়েদি, বারোপন্থী এবং ইসমাইলিয়া শিয়াদের সাথে প্রাচীন কায়সানিয়া শিয়াদের সবচাইতে বড় পার্থক্য হচ্ছে কায়সানিয়ারা ঠিক আলী ও ফাতিমার বংশধরদের লয়ালিস্ট ছিলেন না, বরং ‘হাশেমি’ লয়ালিস্ট ছিলেন। যেই সময়ে কায়সানিয়াদের আবির্ভাগ ঘটেছিল তখন পর্যন্ত আলি ও ফাতিমার বংশধরদের কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইমামী ঐতিহ্যের বিশ্বাস গড়েই ওঠে নাই। ফলে ফাতিমার পুত্র না হয়েও হাশেমি হিসাবে মুহাম্মদ হানাফিয়া ইমাম হিসাবে সর্বসম্মত স্বিকৃতী পেয়েছেন। হানাফিয়া পুত্র আবু হাশিম ছিলেন নিঃসন্তান। আব্বাসিয়দের দাবি মোতাবেক, আবু হাশিম মৃত্যুর সময় তার দুরসম্পর্কের কাজিন ‘মুহাম্মদ’কে ইমাম এবং হাশেমি পরিবারের প্রধান নির্বাচিত করে গেছেন। এই ইমামি দাবির জোরেই মুহাম্মদের পুত্র আল সাফফাহ এবং আল মনসুর হাশেমি লয়ালিস্ট অনারব মাওয়ালীদের মাধ্যমে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন এবং আব্বাসিয় খেলাফতের প্রতিষ্ঠা করেন।


ছবিঃ ইমাম খোমেনি

পরবর্তি যুগের শিয়ারা গড়ে উঠেছে আলী ও ফাতিমার পুত্র বিশেষ করে ইমাম হুসাইনের বংশধরদের অনুসারীদের নিয়ে। মুহাম্মদের বংশধরদেরকেই তারা ইমাম মেনেছেন এবং মুহাম্মদের বংশধরদের মধ্যে মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে এই বিশ্বাস দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ইমাম হুসাইনের বংশধররা মূলত ইমামত কেন্দ্র করে অন্তর্গত কোন্দলের কারনে জায়েদি, ইসমাইলিয়া(সাতপন্থী) এবং বারোপন্থী এই তিনভাগে ভাগ হয়ে যায়। ইরানে সাফাভিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বারোপন্থীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ামতাবলম্বী। বারোপন্থীরা বিশ্বাস করে তাদের সর্বশেষ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আল মাহদীই হলেন প্রকৃত ইমাম মাহদী। তিনি জন্মের পর থেকেই গায়েব হয়ে আছেন। জীবনের প্রথম ৭২ বছর তিনি চারজন ডিপুটির মাধ্যমে তার অনুসারীদের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপর পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছেন। তিনি কেয়ামতের সময় তার অনুসারীদের দেখা দেবেন এবং সত্য, সাম্য ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এই গায়েম ইমামের নামেই ইরানে সাফাভিদ রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সময় বিপ্লবের নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি প্রচার করেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যে মাহদীর জন্যে অপেক্ষা করে থাকার দরকার নাই। ইমামের গুনাবলীর জন্যে যে ‘ইসমত’ থাকা দরকার তা সঠিক বিশ্বাস থাকলে যে কেউ অর্জন করতে পারে। ফলে ইমাম মাহদীর অনুপস্থিতে এবং মুহাম্মদের বংশের না হয়েও খোমেনি ইমাম টাইটেলের অধিকারী হতে পেরেছেন।


ছবিঃ ইমাম আগা খান

বারোপন্থী শিয়াদের ইমাম গায়েব অথবা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সাতপন্থী অর্থাৎ ইসমাইলিয়া শিয়াদের ইমামরা অদ্যোবধি বংশানুক্রমিকভাবে টিকে আছেন। মিশরের বিখ্যাত ‘ফাতেমিয়া’ খেলাফত তাদের হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। গত দুইশ বছর যাবৎ ইসমাইলিয়া ইমামদের টাইটেল হলো ‘আগা খান’। বর্তমান ইসমাইলিয়া ইমামের নাম শাহ করিম আল হুসাইনি। তিনি আলী ও ফাতিমা তথা মুহাম্মদের সরাসরি বংশধর। তিনি নাগরিকত্বে ব্রিটিশ এবং বর্তমান দুনিয়ার সবচাইতে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম এবং দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি রেসের ঘোড়ার মালিকদের একজন। তিনি বা তার বংশধরদের কেউ ভবিষ্যতে নিজেকে মাহদী দাবি করবে সেই সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “মাহদী থেকে মার্ক্স ও ‘জগতের লাঞ্ছিত’। পর্ব -২

  1. বিশ্লেষণধর্মী ও তথ্যসমৃদ্ধ
    বিশ্লেষণধর্মী ও তথ্যসমৃদ্ধ চমৎকার পোষ্ট। এই পোষ্টগুলো ধর্মবাজরা সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে যায়। এভাবে তাদের পিছলানো আশা করি না।

  2. উমাইয়া বা আব্বাসিয় বা ওসমনীয়
    উমাইয়া বা আব্বাসিয় বা ওসমনীয় খেলাফত সম্পর্কে আমার আগ্রহটা বেড়েছে মূলত The Ottoman Centuries: The Rise and Fall of the Turkish Empire -Lord Kinross বইটি পড়ার পর থেকে। আমি এসব সম্পর্কে আরও বেশি জানতে এবং পড়তে আগ্রহী। তাই এই লেখাটি দেখে অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু উৎস বা তথ্যসূত্র ছাড়া ইতিহাসের মূল্য অনেকখানিই কমে আসে। আশা করছি উৎস বা তথ্যসূত্র সমূহ নজরে আনবেন।
    আরেকটি কথা, পারভেজ আলম ভাই, আপনার আরও লেখা আমি পড়েছি। কিন্তু উৎস উল্লেখ না থাকলে অনেক কিছুরই সত্যতা নিরূপণ করা যায় না সঠিক ভাবে এবং নিরপেক্ষ ভাবে। No Offense.

  3. আগেও অনুরোধ করেছি, আবারও
    আগেও অনুরোধ করেছি, আবারও অনুরোধ করছি। প্লীজ, রেফারেন্সগুলো দিলে খুব ভাল হয়। এই বিষয়ে পড়াশোনা করবার ইচ্ছে আছে তাই রেফারেন্সগুলো দরকার। যদি কোন ওয়েবসাইট ঘেটে লিখে থাকেন তাহলে লিঙ্কগুলো প্লীজ দিয়ে দিলে উপকৃত হতাম।

    সিরিজ বরাবরের মতই জমে উঠেছে। চলতে থাকুক।

    1. ব্লগপোস্টে এই জাতীয় লেখার
      ব্লগপোস্টে এই জাতীয় লেখার রেফারেন্স দেয়াটা একটু জটিল। আমি তাই লেখার মধ্যেই বিভিন্ন বই এবং উৎসের নাম উল্লেখ করে দেই। তবে যারা অধিক পাঠ করতে চান তাদের জন্যে পরবর্তিতে কিছু প্রবন্ধ বা বইয়ের নাম লেখার শেষে উল্লেখ রাখবো। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 + = 57