ভারতের বৃহত্‍ পুঁজি এবং বাংলাদেশে ভারত – আনু মুহাম্মদ

নোট : অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এ রচনাটি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেছিলেন ২০০৭ সালের মার্চে। তখন এটি ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্তে ছাপা হয়। লেখাটিতে তখন সাম্প্রতিক বিষয় হিসেবে টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাব সংক্রান্ত আরেকটি উপশিরোনামে একটি অধ্যায় যুক্ত ছিল। একান্তই সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত বিধায় তা এখানে বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাদ বাকি অংশ প্রকাশ করা হয়েছে হুবহু। লেখাটি বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদের আসল রূপ এবং বাংলাদেশের সমাজ বিকাশের বাধাগুলো বুঝতে অসাধারণ এক সহায়িকা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

তিন দিকে বিশালায়তন ও প্রবল পরাক্রান্ত এক প্রতিবেশী নিয়ে আছি আমরা৷ এই প্রতিবেশী দেশ ভারতের গতিবিধি, ভারতের সামাজিক অর্থনৈতিক গঠন, রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্প্রসারণ, তার বিকাশ ও সংকট, জনগণের লড়াই সবই বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক৷ শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবেক্ষেত্রেই ভারতের উপস্থিতি ও প্রভাব ক্রমবর্ধমান৷ বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিমুখ অনুধাবনে ভারত অনুসন্ধান তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷

ভারতের বাজার
বাংলাদেশের কোন ক্ষেত্রটি ভারতীয় বাণিজ্যিক তত্পরতার প্রভাবমুক্ত কিংবা কোথায় ভারতের উপস্থিতি নেই তার উত্তর দেয়া কঠিন- রাস্তায় বাস, ট্রাক, মিনিবাস, কার, হোন্ডা, অটোরিকশা, হাতে মোবাইল, মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের ঘরে কম্পিউটর, ব্রাশ পেস্ট কাপড় কলম চকোলেট বিস্কুট, গাড়ি বাড়ি, অনুষ্ঠানে কিংবা টিভিচ্যানেল বা সিডি প্লেয়ারে গান বা ছবি৷ এছাড়া বই, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি এমনকি মাছও ভারত থেকে আসে৷ ইংরেজী ভাষার যত বই আছে সেগুলোর দাম অনেক বেশী, ভারতীয় সংস্করণ মুদ্রণ দাম কম, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এগুলো এখন বড় ভূমিকা পালন করছে৷ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে অনেকেক্ষেত্রে ভারত থেকে আনা বইয়েরই আধিপত্য, এমনকি অনেক স্কুলে এসব বই এর সুবাদে জাতীয় পরিচয়ও ভারতীয় হিসেবেই ঘটে৷ এছাড়া ভারতের বাংলাভাষার বইও কমদাম ও বিষয়বৈচিত্র নিয়ে বাংলাদেশের বই বাজারের বড় অংশ৷

ভারতীয় এ্যাপোলো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে এখন ঢাকায়৷ এছাড়া বহু ডাক্তার এখানে বিভিন্ন কিনিকে মাঝে মধ্যেই আসছেন৷ তাঁদের বিজ্ঞাপন বহুলভাবে প্রকাশিত হচ্ছে৷ বহু পরিবারের মানুষ প্রতিদিন ভারতে যাচ্ছেন চিকিত্সাদ করতে৷ ভারতের কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে৷ আবার প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এখন ভারতে পড়াশোনা করছেন৷

ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এখন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আছে৷ শিল্প ও ব্যাংকিং ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে৷ বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান, ফ্যাশন ডিজাইন, মডেল ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ভারতের বিভিন্ন কোম্পানী বেশ ভাল অবস্থায়৷ বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন জগৎ এখন দ্রুত সম্প্রসারণশীল, আর এক্ষেত্রে একক আধিপত্য ভারতের মডেল, ডিজাইনার, এবং উদ্যোক্তাদের৷ সংবাদপত্রসহ মিডিয়া জগতেও তাদের প্রভাব ক্রমবর্ধমান৷ অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানেই ভারতের লোকজন কর্মরত আছে৷ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানেই কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভারতীয়রা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা অনেকক্ষেত্রে নির্ধারক৷

এসব দেখে এই প্রশ্ন কেউ করতেই পারেন যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এখন ভারতের অঙ্গ অর্থনীতি? নাকি বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের অর্থনীতির সম্প্রসারিত অংশ? বাংলাদেশে অর্থনীতির যে ধরন দাঁড়িয়েছে তাতে ভারতের সর্বব্যাপী প্রভাব আরও বাড়বে৷ এর পাশাপাশি এখন চীন এই বাজার ধরতে চেষ্টা করছে৷ বাজার দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকাশও ঘটছে অনেকভাবে৷ কিন্তু এতে বাংলাদেশ প্রায়ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত৷ বাংলাদেশে কমিশন এজেন্ট আর ডিলারদেরই উপস্থিতি বেশি৷

বাংলাদেশে গত তিন দশক ধরে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আর এডিবির কর্তৃত্বে যেসব সংস্কার হয়েছে সেগুলো রফতানীমুখী শিল্পখাতের বিকাশ ঘটিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে বৃহৎ ও মৌলিক শিল্পভিত্তি ও তার সম্ভাবনা ধ্বংস করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে তা তছনছ করেছে, দেশকে আমদানিমুখী করেছে, উত্পা্দনমুখিতা থেকে দোকানদারী অর্থনীতির প্রসার ঘটিয়েছে, শিক্ষা ও চিকিত্সাখর ক্ষেত্রকেও বাজারের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে৷ বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পরিবর্তনের ধরনে সবচাইতে লাভবান হয়েছে ভারতের বৃহৎ পুঁজি৷ ভারতের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার বা বিদ্যমান উন্নয়ন ধারার অবধারিত ফলাফল৷ বাংলাদেশের টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাব, করিডোর প্রস্তাব ইত্যাদি ও এসব নিয়ে বাংলাদেশের সরকারসমূহের কাবু তত্পেরতা নির্দেশ করছে এখানে ভারতের বৃহৎ পুঁজির ক্রমবিস্তারমান পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্রের নাজুক ও অবনত অবস্থা৷ এই নাজুক ও অবনত অবস্থা সীমান্ত বিরোধ, পানিবন্টন, সন্ত্রাস, বাণিজ্য সংলাপ, দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, জ্বালানী সহযোগিতা, সাফটা বিমসটেকসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন কর্মসূচী ইত্যাদি সবেক্ষেত্রেই প্রতিফলিত৷

যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-পাকিস্তান সংযোগ
যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় বিশেষত এই অঞ্চলে ভারতকে কেন্দ্র ধরেই কাজ করছে দীর্ঘদিন৷ যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের বিরুদ্ধে ভারতকে দেখতে চায়, চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায় ভারতকে৷ ভারতকে তাই সামরিক আর অর্থনৈতিক সবদিক থেকে তার বলীয়ান করা দরকার৷ আবার অন্যদিকে প্রয়োজনে ভারতকে সামাল দেয়ার জন্য বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের ওপর নানাভাবে আছর করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র৷ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তাই বিপদ নানামুখী৷

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতের শাসক শ্রেণীর মধ্যে এখন সুপারপাওয়ার হবার সাধ তৈরী হয়েছে৷ মধ্যবিত্তের মধ্যেও তা জাতীয়তাবাদী সুরে সুরে সংক্রমিত৷ দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগণের মধ্যে সেই সাধ সঞ্চার করবার জন্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ব এবং সাম্প্রদায়িকতা সবকিছুরই চাষ চলছে৷ শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশি যে-দেশের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন সেটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনীর স্থান৷ সেই দেশ পারমাণবিক শক্তি ধারণ করে৷ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ করে সেই দেশ প্রবেশ করেছে ‘পারমাণবিক ক্লাবে’র মধ্যে৷

পাকিস্তানও এইদিক থেকে পিছিয়ে নেই৷ দারিদ্র্য আর সংঘাতক্লিষ্ট এই আরেক দেশ যেখানে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেনাবাহিনীর বাস৷ এই চতুর্থ ও ষষ্ঠ বৃহত্তম সেনাবাহিনী কী করে? তারা বছরের পর বছর নতুন নতুন অস্ত্র কিনে বিশ্বের অস্ত্র বাণিজ্য চাঙ্গা রাখে এবং দুজনে মুখোমুখি উত্তেজনা তৈরী রেখে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার পুনরুত্পা্দন করে৷ মানুষের অন্য অনেক লড়াই ধামাচাপা পড়ে পরস্পর সত্যমিথ্যা হুঙ্কারের মধ্যে৷ পাকিস্তানের এই বাহিনী আর ব্যবস্থার আরও কাহিনী আছে৷ পাকিস্তানের বীর সামরিক বাহিনী আর দক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে আফগানিস্তানে একবার মুজাহেদীন আর তালিবানদের শাসন কায়েমে, আবার তাদের উচ্ছেদে৷ সবই করেছে যুক্তরাষ্ট্র৷ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তান পকেটের জিনিস, যাকে যখন যেভাবে খুশি ব্যবহার করা যায় আবার ফেলেও দেয়া যায়৷ আর ভারত হল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী, যার সঙ্গে তাকে বোঝাপড়া করতে হয়৷

ভারতের এই শক্তি তৈরী হয়েছে কেবলমাত্র বিশাল জনসংখ্যা থেকে নয়, তার অর্থনৈতিক শক্তি বিশেষত শিল্পভিত্তি থেকেও৷ এই শিল্পভিত্তি তৈরীর পেছনে ভারতের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, এর শাসক শ্রেণীর তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে৷ এখানে বলা দরকার যে, টাটা বা এশিয়া এনার্জিসহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা বিশ্বব্যাংক আইএমএফ কিংবা এডিবির তথাকথিত সংস্কার নিয়ে যেরকম দাস্যবৃত্তি আমাদের শাসকশ্রেণীর মধ্যে দেখা যায়, কিংবা তাদের নির্দেশ বাস্তবায়নের সাথে এদেশের শাসক শ্রেণী নিজেদের স্বার্থ যেভাবে একাকার করে ফেলে সেরকম থাকলে ভারতে টাটার মতো শিল্পগোষ্ঠীও গড়ে উঠতে পারতো না৷

ভারত বিভাগের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল৷ পুরো অঞ্চলে সমাজতন্ত্রী আন্দোলন বিরোধী বু্হ্য রচনার জন্য পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অবলম্বন৷ একাধিক সামরিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সামরিকীকরণকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল৷ ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, কাশ্মীর সমস্যা এজন্য ছিল খুব ভালো উপলক্ষ৷ যুক্তরাষ্ট্রের বশ্য রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সেই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন এখনও হয় নি৷ ৮০ দশক থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রথমে মুজাহেদীন ও পরে তালিবানদের মাধ্যমে মার্কিনী জেহাদ, আরও পরে তালিবান উচ্ছেদের নামে সরাসরি আগ্রাসন ও স্থায়ী দখল কায়েম, সব পর্বেই ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ পাকিস্তান ছিল মাধ্যম৷ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর হায়ারার্কি তাই বরাবর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অংশ হিসেবেই কাজ করেছে৷ পাকিস্তানে সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রের অস্বাভাবিক ভারসাম্যহীন ক্ষমতাবৃদ্ধির পেছনে মার্কিনী প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রভাব আছে৷

যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পাকিস্তানের বিরোধিতায় ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে৷ অর্থনীতি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিকাশ, শিল্পায়ন-উপযোগী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের উপর তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত-সোভিয়েত নানা বোঝাপড়া ও চুক্তি হয়েছিল৷ তবে এখানে তুলনামূলক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাকিস্তান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বশ্য রাষ্ট্রের ভূমিকায় স্থায়ী হয়ে গেছে, ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সেরকম কোনো অবস্থায় যায়নি, তাকে যেতে হয়নি৷ ভারতের নিজস্ব শিল্প ভিত্তি, বুর্জোয়া প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইত্যাদি তার পরিকল্পনার সঙ্গে ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ককে যুক্ত করতে সহায়ক হয়েছে৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপী যখন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন ভারত সেকারণে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে সমস্যায় পড়লেও বিপর্যস্ত হয়নি৷ পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রধানত এলাকায় সামরিক আধিপত্য রাখার খুঁটি থাকলেও এই অঞ্চলে বিশ্বপুঁজির নতুন বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে ৯০ দশকে মার্কিন-ভারত নতুন সমীকরণ তৈরী হয়৷

ভারতের শিল্পভিত্তি এবং বৃহৎ পুঁজির গঠন
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, অসুস্থতা এবং সুযোগের বৈষম্যের অবসান৷’ ৫০ বছর পরে খুব সহজেই বলা যায় যে, ভারত এই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে৷ বিশ্বের সবচাইতে বেশিসংখ্যক মানুষ এখন ভারতে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করেন৷ নিগৃহীত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ৷ শুধু শ্রেণীগত নয়, জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মীয় এবং লিঙ্গীয়, সবদিক থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার৷ তারপরও ভারত এখন একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি৷

স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের শাসকগোষ্ঠী শিল্পভিত্তি নির্মাণকে মূল গুরুত্ব দেয়৷ বিবেচনার বিষয় ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও বেসরকারি খাত কোনটি কীভাবে এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করবে? রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে এক্ষেত্রে? প্রায় চার দশক ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আধিপত্য এবং তারপর রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেসরকারী খাতকে অধিক জায়গা ছেড়ে দেয়া, এই দুই পর্বই ঘটেছে সম্পর্কিতভাবে৷

পাকিস্তানে যখন সরকার নিয়ে অস্থিতিশীলতা ক্রমে বাড়ছে ভারতে তখন স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তার অর্থনৈতিক সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের কাজ চলছিল৷ ১৯৫১ সালে প্রণীত ‘ইন্ডাস্ট্রিজ (ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেশন) এ্যাক্ট’-এ ৩৮টি খাত চিহ্নিত করা হয়৷ এবং শিল্পখাতের গতিমুখ নির্দেশ করবার জন্য বাজারের স্বয়ংক্রিয়তা নয়, রাষ্ট্রই মূল দায়িত্ব নেয়৷ ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শুরুতে শিল্পনীতিও প্রণয়ন করা হয়৷ পি সি মহলানবিশ মডেল এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে৷ এই নীতিতে যে লক্ষ্যগুলি নির্দেশ করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: ভারী শিল্প ও যন্ত্র উত্পারদনের শিল্প বিকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সম্প্রসারণ, বৃহৎ ও বিকাশমান সমবায়ী খাত গড়ে তোলা, ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের একচেটিয়া কর্তৃত্ব গড়ে তোলা রোধ করা৷ এই শিল্পায়নের প্রক্রিয়া নিশ্চিত রাখবার জন্য আমদানী ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রাখা হয়৷

১৯৫৫ সালে ‘ইমপোর্ট ট্রেড কন্ট্রোল অর্ডার’ অনুযায়ী বেশকিছু পণ্য আমদানী সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়৷ এছাড়া বহু পণ্য আমদানী নিরুত্সাকহিত করবার জন্য শুল্কহার অনেক উঁচুতে স্থাপন করা হয়৷ বিশ্বের সর্বোচ্চ আমদানী শুল্কহার যেসব দেশে ছিল ভারত ছিল তার মধ্যে একটি৷ ভোগ্য ও মধ্যবর্তী পণ্যের উপর ধার্য করা হয় সর্বোচ্চ শুল্ক, আর এর চাইতে কিছু কম হার আরোপ করা হয় মূলধনী পণ্যের উপর৷ ৮০ দশকেও বাংলাদেশের চাইতে ভারতের এই হার গড়ে শতকরা ৪০ ভাগ বেশি ছিল৷ ৯০ দশকে আমদানী উদারীকরণের পরও ভারতে আমদানী শুল্কের গড় হার বাংলাদেশের চাইতে বেশী৷ আমদানী সংক্রান্ত এই অবস্থানের দর্শন হলো দেশীয় শিল্পখাতকে গড়ে ওঠার সময় ও সুযোগ দান৷ এসবের ফলে ১৯৫৬ সাল থেকে শিল্পখাতের ভেতর বিভিন্ন উপধারার আপেক্ষিক অনুপাতও পরিবর্তিত হয়৷ ১৯৮০ সালের মধ্যে মৌলিক ও মূলধনী শিল্পখাত স্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে৷ ১৯৫৬ সালে মধ্যবর্তী শিল্প ও ভোগ্য পণ্য শিল্পের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ২৪.৬ ও ৪৮.৪ ভাগ, ১৯৮০ সালের মধ্যে এগুলো কমে অনুপাত দাঁড়ায় যথাক্রমে ২১.৩ ও ৩০.৫৷ অন্যদিকে মৌলিক শিল্প আর মূলধনী শিল্প অনুপাত ছিল যথাক্রমে ২২.৩ ও ৪.৭, ১৯৮০ সালের মধ্যে দুটো অনুপাতই বৃদ্ধি পায় যথাক্রমে ৩৩.২ ও ১৫.০৷ (আহলুওয়ালিয়া, ১৯৯১)৷

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বরাবরই নির্ধারক ছিল৷ রাষ্ট্রের এই ভূমিকায় যে অবকাঠামো এবং মৌলিক শিল্প ভিত্তি গড়ে ওঠে সেটাই ভারতের ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প খাতকেও শক্ত মাটির উপর দাঁড়াতে সক্ষম করে৷ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির ফলে দেশী বহু শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ পায়৷ বহু অদক্ষ প্রতিষ্ঠানও প্রথম দফায় আশ্রয় পায়৷ প্রথমদিকে পণ্যের গুণগত মানও খুব ভালো ছিল না৷ কিন্তু কয়েক দশক পরে বহু ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়৷ বহুজাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তার শক্তি অনেক বৃদ্ধি পায়৷

১৯৫৬-৬৬ সময়কালে ধাতব দ্রব্য, যন্ত্রপাতি, কাগজ এবং কাঠ শিল্পের প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা ১০ ভাগের বেশী৷ এইসময়ে পাদুকা শিল্প ছাড়া অন্যান্য ভোগ্যপণ্য যেমন খাদ্য, পানীয়, তামাক, বস্ত্র এবং চামড়াজাত দ্রব্য শিল্পের প্রবৃদ্ধি হার তুলনায় ছিল অনেক কম, শতকরা ৫ ভাগেরও কম৷ পরবর্তী পর্বে যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যের প্রবৃদ্ধি হার কমে যায়, বৃদ্ধি পায় ভোগ্যপণ্য প্রবৃদ্ধির হার৷ তৃতীয় পর্বে অর্থাৎ ১৯৮০-৯০ সময়কালে ভোগ্যপণ্যের মধ্যে টেকসই পণ্যসমূহের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে (মুখার্জি, ১৯৯৭)৷ ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এই তিন পর্বেই অনেক বৃদ্ধি পায়৷ তবে তাদের এই বিকাশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে কার্যরত মূলধনী ও মৌলিক শিল্পের অবদান এবং সংরক্ষণমূলক নীতির ভূমিকা ছিল মুখ্য৷

শিল্পায়নের জন্য আমদানি নির্ভরতা ক্রমশ হ্রাস পায় দেশের ভেতরে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল উত্পারদন ক্ষেত্র বিস্তারের ফলে৷ ভোগ্যপণ্য ক্ষেত্রেও আমদানি অনুপাত কমে, একইসঙ্গে দেশের ভেতর উত্পারদন বৃদ্ধি এবং আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের কারণে৷ দেশের ভেতর যোগানের সঙ্গে আমদানি অনুপাতে পরিবর্তন দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে৷ ১৯৫০ সালে খাদ্যদ্রব্য ক্ষেত্রে আমদানি অনুপাত ছিল শতকরা ৫.৯, ১৯৮০ সালের দিকে তা দাঁড়ায় ০.২; লোহা এবং স্টীল ক্ষেত্রে এই অনুপাত ২৫.২ ভাগ থেকে কমে হয় ১.১; যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে এই হার ১৯৫০-এর তুলনায় ১৯৮০তে হয় যথাক্রমে ৬৮.৯ এবং ১৫.৩ (গুহ, ১৯৯০)৷

রাষ্ট্র নির্দেশিত পুঁজিবাদ বিকাশে ভারত একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত৷ এখানে তাই খুব যুক্তিসঙ্গত কারণেই রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা বেসরকারী খাতে একচেটিয়া গোষ্ঠীর উদ্ভব ঠেকায়নি বরঞ্চ তাকে সহায়তা করেছে৷ পুঁজির পুঞ্জিভবনের অনিবার্য প্রক্রিয়ায় ভারত রাষ্ট্র ক্রমে একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়৷ তবে এর মধ্য দিয়ে ভারতে একটি শক্ত শিল্পভিত্তি নির্মিত হয়, শিক্ষা গবেষণা আর বিজ্ঞান প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়৷ কিন্তু পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বিকাশ ধরন অনুযায়ী শিল্পখাত ও দক্ষ জনশক্তির বিস্তার ছিল খুবই অসম এবং ভারসাম্যহীন- অঞ্চলগত এবং খাতওয়ারি দুভাবেই৷ তাছাড়া এর কেন্দ্রীভবন এমনভাবে ঘটে যার ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদে শিক্ষা গবেষণার যা-কিছু অগ্রগতি হয় তার সুবিধা বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীই নিতে সক্ষম হয়৷ তার ফলে ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী যখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উপর দখল এনেছে তখন একইসঙ্গে দুর্বল প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্রশিল্পে আটকে থাকে বিশাল জনগোষ্ঠী৷ কৃষিখাতের একদিকে যখন বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে এবং উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার চলে, অন্যদিকে তখন খরা, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জেনেটিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হন বিশালসংখ্যক কৃষক৷

সংস্কার কর্মসূচি
৮০ দশকের শেষ থেকে বিশেষত ৯০ দশকে ভারত রাষ্ট্র অর্থনীতির উপর বৃহৎ একচেটিয়া গোষ্ঠীসমূহের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়৷ সেসময়ে গৃহীত সংস্কার কর্মসূচিতে ভারতের অর্থনীতিতে বহুজাতিক সংস্থার প্রবেশ, আমদানি উদারিকরণ এবং বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের কর্তৃত্বও বৃদ্ধি পায়৷ তবে বাংলাদেশে এসব সংস্থার দাপটের সঙ্গে ভারতে এদের অবস্থানের গুণগত তফাৎ আছে৷

এসব সংস্থার ভেতর ভারতের প্রভাব আমরা বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই টের পাই৷ কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে ভারতের এই প্রভাব সেখানকার জনগণের পক্ষে যায়৷ এসব সংস্থার নানা প্রকল্পের ভারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের জীবনও এখন বিপর্যস্ত৷ কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিত্সাএসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এডিবির বিভিন্ন প্রকল্প জনগণের সম্পদ বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে৷ এসব প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে৷ বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সবসময়ই একটি মরণ ফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন প্রস্তুতি চলছে টিপাইমুখ বাঁধ এবং আরও ভয়ংকর নদী-সংযোগ প্রকল্পের৷ এগুলোর সাথে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি জড়িত৷

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর ‘সংস্কার কর্মসূচী’, যার সারকথা ছিল বিরাষ্ট্রীয়করণ, বিদেশী বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং বাণিজ্য উদারীকরণ, সেগুলোর প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী ছিল ভারতের ভেতরের বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীই৷ কেননা, এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির উপর বৃহৎ বেসরকারী শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যই সম্প্রসারিত হয়৷ তবে আমদানি উদারীকরণ ক্ষেত্রে তাদের দিক থেকে প্রতিরোধও ছিল৷ তার ফলে আমদানি উদারিকরণে বাংলাদেশ যেভাবে নির্বিচার আমদানী বৃদ্ধির পথ নিয়েছে, ভারত সেরকম উত্সােহ দেখায়নি৷ বরঞ্চ বাংলাদেশের নির্বিচার আমদানীর পথ ভারতের এসব শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক হয়েছে৷ অন্যদিকে এই সময়ে ভারতে বৃদ্ধি পায় যৌথ বিনিয়োগ৷

শিল্পোত্পাহদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার বিনিয়োগ ঘটে ভারতের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে৷ তেল-গ্যাস, টেলিকমিউনিকেশন, গাড়ি, মোবাইল, কম্পিউটর, বিদ্যুৎ, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ আসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে৷ তবে তার আগমনের ধরন, শর্তাবলী এবং ভারতের ভেতরের বিভিন্ন বৃহৎ গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুথবদ্ধতায় বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ধরনের চাইতে তা গুণগত ভিন্নতা তৈরী করে৷

১৯৯০ পর্যন্ত ভারতের বেসরকারী খাতের মোট পুঁজি ছিল জিডিপির শতকরা ৪.৩ ভাগ, আর রাষ্ট্রীয় খাতে এর অনুপাত ছিল ১০.২, অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি৷ ৯০ দশকের শেষে এসে এই দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে যায়৷ বেসরকারী খাতে পুঁজি গঠন রাষ্ট্রায়ত্তখাতকে অতিক্রম করে দাঁড়ায় শতকরা ৮.৩ ভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত কমে হয় ৭ ভাগ (কপিলা, ২০০১)৷ এই সময়কালে বিদেশী বিনিয়োগও তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পায়৷ প্রায় ১০ হাজার বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এই সময়৷ বিনিয়োগ প্রস্তাবে অর্থমূল্য ছিল ২ লক্ষ কোটি ভারতীয় রূপীরও বেশি৷ ৯০ দশকে বহু বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় পুঁজি প্রত্যাহার করা হয়৷ পর্যটন, খাদ্য, লৌহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হয়৷ বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতীয় যেসব পণ্যের একচেটিয়া বাজার সেগুলো নিছক ভারতীয় পণ্য নয়, যৌথ বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে সেগুলো প্রধানত বহুজাতিক পণ্য৷ ভারত কেবল ভারত নয়, এটি এখন বিশ্ব পুঁজির একটি বৃহৎ বিনিয়োগ ও সঞ্চালন ক্ষেত্র৷ এই অঞ্চলের কেন্দ্র৷

বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ ভেঙেচুরে বিলিয়ে দেয়া বা নষ্ট করা যেখানে সরকারের বরাবরের নীতি সেখানে ভারতে ৯০ দশকে এসব সংস্কারের সময়ও রাষ্ট্রীয় খাতকে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হয়৷ এসময়ে ভারত সরকার ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে নবরত্ন হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোর নবায়ন ও স্বায়ত্তশাসন দিয়ে সম্প্রসারণের কর্মসূচী নেয়৷ এগুলোকে নিজেদের বিনিয়োগ, যৌথ বিনিয়োগ ও অন্যদেশে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ইত্যাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়৷

এগুলো হলো: ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ইন্ডিয়ান পেট্রোকেমিক্যাল করপোরেশন লিমিটেড, অয়েল এন্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড, ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন, স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড, গ্যাস অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড, বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড (ভিএসএনএল), ভারত হেভি ইলেকট্রিকাল লিমিটেড এবং মহানগর টেলিফোন নিগম লিমিটেড৷ এছাড়া আরও অনেকগুলো লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে ‘মিনিরত্ন’ হিসাবে ঘোষণা করে এগুলোকেও রাষ্ট্রীয় নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনেক স্বাধীনতা দেয়৷ বাংলাদেশে নানা পশ্চিমা বিনিয়োগেও সহযোগী হিসেবে এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর নাম শোনা যায়৷

ভারতে চোরাই অর্থনীতির আকার গত ৯০ দশকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সম্প্রসারিত হয়েছে৷ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে ৯০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এই অর্থনীতির আকার পাওয়া গেছে মোট জিডিপির শতকরা ৪০ ভাগ৷ ১৯৮১ সালে এই হার ছিল শতকরা ২০ ভাগ৷ চোরাই অর্থনীতির, যা ‘কালো’ অর্থনীতি নামে পরিচিত, সম্প্রসারণ ঘটেছে অর্থনীতির এই বিকাশধারার মধ্যেই৷ এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ চরিত্রে পড়েছে অধিকতর হারে৷

ফোর্বস ম্যাগাজিনের সূত্র ধরে বিবিসি জানাচ্ছে (৯ মার্চ ২০০৭) এশিয়ার মধ্যে এখন সবচাইতে বেশিসংখ্যক বিলিয়নেয়ার আছে ভারতে৷ আগে এই স্থানটি ছিল জাপানের৷ এখন জাপানের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ২৪ আর ভারতের ৩৬৷ তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৯১ বিলিয়ন ডলার৷ স্টীল নির্মাতা লক্ষ্মী মিত্তাল সবার শীর্ষে৷ তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার৷ বিশ্বজুড়ে এরকম ব্যক্তির সংখ্যা এখন ৯৪৬, গত বছর ছিল ৭৯৩৷ দারিদ্র্য আর ঐশ্বর্যর এরকম সহাবস্থান পৃথিবীর আর কোথাও এই মাত্রায় পাওয়া যাবে না৷ শিল্পভিত্তি নির্মাণের ব্যাপারে না হলেও ঐশ্বর্য গঠনে বাংলাদেশের ধনিকগোষ্ঠীর আগ্রহ একইরকমের৷

ভারতে নতুনভাবে বিন্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, বেসরকারি খাত, যৌথ বিনিয়োগ, একক বিদেশী বিনিয়োগ, সবগুলো মিলিয়ে ভারতে দেশী বৃহৎ পুঁজি, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজি ও বহুজাতিক পুঁজির যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে তার সংবর্ধন, পুঞ্জীভবন এবং সম্প্রসারণের অনেক বেশি চাপ৷ চারপাশের দুর্বল দেশগুলো অতএব তার সুবিধাজনক ক্ষেত্র৷ এর সাথে খুব সঙ্গতিপূর্ণভাবেই ভারতের সামরিক চিন্তা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবল অংশীদার৷

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সম্পর্ক
সামরিক ক্ষেত্রে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক নতুন মোড় নেয় ওই ৯০ দশকেই, যা আরও পরিণত রূপ পেয়েছে বর্তমান দশকে বিশেষত ২০০৫ সালে৷ এই বছর ২৮ জুন দু’দেশের মধ্যে ‘নিউ ফ্রেমওয়ার্ক ফর দ্য ইউএস-ইন্ডিয়া ডিফেন্স রিলেশনস’ নামে নতুন চুক্তি স্বারিত হয়৷ বলা হয় এই চুক্তি করা হয়েছে ১৯৯৫ সালের বোঝাপড়ার সূত্র ধরে৷ ২০১৫ পর্যন্ত এই চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশ সামরিক ক্ষেত্রে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে৷ বস্তুত সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর থেকেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন সম্পর্ক বিকাশে উদ্যোগী হয়৷ পারমাণবিক শক্তি বিকাশেও পরস্পর যোগাযোগ ছিল৷

১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান দু’দেশই পারমাণবিক বিস্ফোরণ চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের উপর তথাকথিত অবরোধ আরোপ করে৷ ‘তথাকথিত’ বলছি এই কারণে যে, কোন অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র আসলেই আরোপ করে এবং কোনটি তার লোকদেখানো সেটা বোঝাটাও দরকার, খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়৷ ভারত ও পাকিস্তানের এই পারমাণবিক প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের অজ্ঞাতে হবার যো ছিল না, বিশেষত এসব দেশের সামরিক খাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে-ঘনিষ্ঠ যোগ তা খুব গোপন ব্যাপার নয়৷ আসল অবরোধ বা বৈরিতা কাকে বলে তা ইরান, ইরাক, উত্তর কোরিয়া, কিউবার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মার মার কাট কাট ভূমিকা দেখলে বোঝা যায়৷

তবে ভারত ও পাকিস্তানের এই পারমাণবিক বিস্ফোরণকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ব্ল্যাকমেইল করে এই দু’টি দেশের সাথে অধিকতর ধ্বংসাত্মক বন্ধন তৈরী করতে৷ ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে পুরোমাত্রায় ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর বিনিময়ে পাকিস্তানের উপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়৷ আর ভারতের সঙ্গে চলে অধিকতর সামরিক নৈকট্য স্থাপনের কথাবার্তা এবং ‘যৌথ স্বার্থে’ নানা প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য তত্পযরতা৷ এসবেরই ফল ২০০৫ সালের চুক্তি৷ এই চুক্তির মধ্যে প্রকাশ্যেই যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে তার মধ্যে আছে:

।। সামরিক ক্ষেত্রে পরস্পর অব্যাহত যোগাযোগ ও উন্নয়ন
।। গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান বৃদ্ধি
।। সমরাস্ত্র বাণিজ্য সম্প্রসারণ
।। প্রযুক্তি স্থানান্তর, সহযোগিতা, যৌথ উত্পাতদন, গবেষণা ও উন্নয়ন
।। মিসাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ
।। সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ
।। নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ তত্পররতা ও সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি
।। যৌথ ও সমন্বিত মহড়া
।। বহুজাতিক কর্মসূচিতে সহযোগিতা বৃদ্ধি৷ (ইপিডব্লিউ, আগস্ট, ২০০৫)

২০০৫ সালের ১৮ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে বুশ-মনমোহন যুক্ত বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত যৌথ সামরিক অবস্থান পরিষ্কার হয়৷ তারপর সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১-২ মার্চ ভারতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের সফরের মধ্যে দিয়ে তা পাকাপোক্ত হয়েছে৷

ভারত একইসময়ে মার্কিন-মিত্র সৌদী আরবের সঙ্গেও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে৷ ১৯৫৫ সালের পর প্রথম ২০০৬ সালেই সৌদী বাদশাহ ভারত সফর করেন৷ এই বছর ২৬ জানুয়ারী ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি৷ দায়িত্ব নেবার পর বিদেশ সফরে প্রথম তিনি চীন ও পরে ভারত সফর করেন৷ সৌদী আরবের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক যুক্ততা বহু পুরনো এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক৷ ভারত এখন সৌদী আরবের তেল রফতানির চতুর্থ বৃহত্তম গন্তব্য আর ভারতের আমদানীর মধ্যে তেল আমদানীতে সৌদী আরব সর্ববৃহৎ উত্সচ৷ ভারতের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারী ব্যবসায়িক সংস্থা রিলায়েন্স সৌদী আরবের রিফাইনারী ও পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্পে বড় বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ আবার অন্যদিকে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অয়েল এন্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন অন্ধ্র প্রদেশে একটি রিফাইনারীতে সৌদী আরবকে নিচ্ছে অংশীদার হিসেবে৷ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে ভারত ওআইসির (অরগানাইজেশন অব দ্য ইসলামিক কনফারেন্স) পর্যবেক্ষক মর্যাদা লাভের আবেদন করেছে, সৌদী আরব তা সমর্থন করতে স্বীকৃত হয়েছে৷

সৌদী আরব চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করবার জন্যও নানারকম ব্যবস্থা নিচ্ছে৷ দ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির জন্য চীনে তেলের যে বর্ধিত চাহিদা তৈরী হচ্ছে তার জন্য চীন সৌদী আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে উদ্যোগী৷ ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহ বরাবরই দেখা গেছে৷ সর্বশেষ যে উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের চাপে প্রায়-পরিত্যক্ত হল সেটি হচ্ছে ইরান থেকে ভারতে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ৷

মার্কিন-ভারত ঐক্য ও সংঘাত
চীনের অবিরাম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শক্তিবৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাবও বাড়াচ্ছে৷ যদিও চীনে মার্কিন বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য, তবুও ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার অর্থনীতিতে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রীতিমতো হুমকি৷ এশিয়ায় মিত্র জাপান চীনকে মোকাবিলার জন্য খুব নির্ভরযোগ্য নয়৷ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রভাব টেকসই করবার জন্য এখন অনেকখানি নির্ভর করছে ভারতের উপর৷ এই কৌশল বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান তাদের বড় অস্ত্র৷ এসব প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় প্রভাব তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সঙ্গে এখন একাকার৷ বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বিশেষত প্রাকৃতিক সম্পদ দখল কর্মসূচিতে মার্কিন-ইউরোপ-ভারত জোটবদ্ধতা খুব স্পষ্ট৷

ভারতের নিজের অর্থনীতিতে জ্বালানী সম্পদের চাহিদা বাড়ছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমিত গ্যাস ও কয়লা সম্পদের উপর দখল স্থাপন মার্কিন ভারত দুই বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর জন্যই খুব লাভজনক প্রকল্প৷ বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ ইতিমধ্যে মার্কিন ও ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর কর্তৃত্বে চলে গেছে ভয়ংকর সব উত্পাদদন অংশীদারী চুক্তির মাধ্যমে৷ ভারতে গ্যাস রফতানির জন্য মার্কিন-ভারত-বৃটিশ প্রশাসন এবং মার্কিন-ইউরোপীয় তেল কোম্পানিগুলো সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে৷ এই চেষ্টায় শরীক ছিল বাংলাদেশ সরকারের কতিপয় মন্ত্রী, আমলা, বড় ব্যবসায়ী এবং কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’৷ জনগণের প্রতিরোধের মুখে তা কার্যকর হতে পারেনি৷ টাটার প্রস্তাব এরই একটি ধরন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে৷ ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প একটি ব্রিটিশ কোম্পানির, কিন্তু এই প্রকল্পও ভারতকে উদ্দেশ্য করেই, কেননা প্রকল্প অনুযায়ী শতকরা ৭৫ ভাগ কয়লা ভারতে যাবার কথা ছিল৷

বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস সম্পদের যে বড় সম্ভাবনা তাও এসব বৃহৎ শক্তির বর্তমান মনোযোগের অন্যতম ক্ষেত্র৷ চট্টগ্রাম বন্দর বেসরকারিকরণ কিংবা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ এবং এগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবির প্রবল উত্সািহ নিছক বিনিয়োগ আগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই৷ এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ দখল ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের মোহনার কৌশলগত গুরুত্ব অনেক৷ চীনের সম্ভাব্য সামরিক শক্তিবৃদ্ধি মোকাবিলা এর গুরুত্ব বৃদ্ধির একটি কারণ৷ বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন বিভিন্ন সামরিক বেসামরিক গোপন চুক্তি এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফর এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ বলে মনে হয়৷ এসব প্রস্তাবনাতে ভারতের আগ্রহও এখন স্পষ্টই দেখা যায়৷ তার সাথে আছে বাংলাদেশের ভেতর করিডোরের প্রস্তাবের নানাভাবে উপস্থাপন৷ যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের এসব প্রস্তাবকে মোহনীয়ভাবে উপস্থাপন, জনপ্রিয় করা ও কার্যকর করবার জন্য এখন অনেকভাবে চেষ্টা চলাচ্ছে৷

সম্প্রতি চকোরিয়াতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার উদ্বোধন করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত গত ২০ ফেব্রুয়ারী৷ উল্লেখ্য যে, যে কুতুবদিয়া বা সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে তাদের মনোযোগ বলে বিভিন্নভাবে বোঝা যাচ্ছে সেগুলো চকোরিয়ার খুবই নিকটবর্তী৷ অর্থনীতি ক্ষেত্রে মার্কিন-ভারত ঐক্য অনেক শক্ত হলেও সামরিক প্রভাব নিয়ে পার্থক্য আছে বলে অনেকে ধারণা করেন৷ যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য ভারতের শক্তির উপর ভর করতে চায়, আর সেজন্য ভারতের বিভিন্ন আগ্রাসী প্রকল্পে পূর্ণ সমর্থনেও তারা প্রস্তুত৷ সেজন্য ইরান বা উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে দুনিয়া মাথায় তুললেও যুক্তরাষ্ট্র আগ বাড়িয়ে ভারতের পারমাণবিক তত্পারতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে৷ কিন্তু এসবের মধ্যে দিয়ে ভারত নিজেই যাতে একটা শক্তিতে পরিণত না হয় সেজন্যে বাংলাদেশ হয়তো তাদের একটি গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে৷ অতএব মার্কিন-ভারত ঐক্য ও সংঘাত দুদিকেই বাংলাদেশের বিপদের সম্ভাবনা৷

ভারত-বিরোধী রাজনীতির একটা শোরগোল বাংলাদেশে বহুদিন থেকেই আছে৷ বিএনপি থেকে শুরু করে জামাতসহ ইসলামপন্থী প্রায় সব দলই ভারত বিরোধী বলে পরিচিত৷ সামরিক শাসন যতবার হয়েছে তার সুরও ছিল অনেকখানি ভারত বিরোধী৷ এই ভারত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি সময় রাষ্ট্রমতায় ছিল৷ এই সময়কালেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের প্রায় একক আধিপত্য তৈরী হয়৷ অন্যদিকে ভারতপন্থী বলে অনেকে যাকে অভিহিত করেন সেই আওয়ামী লীগও এখন বিভিন্নসময় ভারতবিরোধী কথা বলছে৷ ‘হিন্দুপ্রধান’ ভারত-বিরোধিতা ভোটের রাজনীতি বা জনপ্রিয়তার একটি উপায় বলেই এখনও অনেকে মনে করেন৷ কিংবা সাম্প্রদায়িকতার সুরে ঢেকে-দেয়া দখলের সব আয়োজন৷

কিন্তু নানা তফাৎ থাকলেও অর্থনৈতিক নীতিতে এদের সবারই এক গভীর ঐক্য ও ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি৷ এসব নীতি বরাবর মার্কিন মদদপুষ্ট এবং ভারতকেন্দ্রিক বৃহত্পুঁরজির জন্য রাস্তা তৈরির মাধ্যম৷ এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, ‘সিভিল সোসাইটি’ বা রাষ্ট্রশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বলয়ের মধ্যেই বসবাস করে৷ এই বলয়ে বসবাস করে ভারত-আধিপত্য বিরোধিতা প্রতারণা বা নিছকই বাগাড়ম্বর৷

 

  • নির্দেশিত গ্রন্থ ও সাময়িকী
    Mookherjee (1997). Dilip Mookherjee (ed), Indian Industry, Policies and Performance. Oxford University Press.
    Guha (1990). Ashok Guha (ed), Economic Liberalization, Industrial Structure and Growth in India. Oxford University Press.
    Dreze and Sen (1999). Jean Dreze and Amartya Sen, India Economic Development and Social Opportunity. Oxford University Press.
    Ahluwalia (1991). Isher Ahluwalia, Productivity and Growth in India. Oxford University Press.
    Kapila, 2001. Uma Kapila (ed), Indian Economy Since Independence, Delhi.
    Kumar, 1999. Arun Kumar, ‘The Black Economy in India,’ Penguin, Economic and Political Weekly, August 6-12, 2005
    মুহাম্মদ ২০০২. আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশের তেল গ্যাস কার সম্পদ কার বিপদ৷ জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন৷
    মুহাম্মদ ২০০৬. আনু মুহাম্মদ, উন্নয়নের রাজনীতি৷ সূচিপত্র৷
    মুহাম্মদ ২০০৭. আনু মুহাম্মদ, ফুলবাড়ী কানসাট গার্মেন্টস ২০০৬৷ শ্রাবণ৷

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − 25 =