আমেরিকা প্রবাসী আশরাফুজ্জামান খান বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান জল্লাদ

মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খান ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করে। আশরাফুজ্জামান খান ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় সদস্য এবং আল বদর বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় সদস্য। আশরাফুজ্জামান খান আলবদর বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আশরাফুজ্জামান খান এবং তার বাহিনী মিরপুরে মুনীর চৌধুরী, আবুল খায়ের, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, রাশিদুল হাসান, ড. ফায়জুল মহি এবং ড. মোহাম্মদ মর্তুজাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হত্যা করে।
১৯৭১ সালের শেষ দিকে যুদ্ধাপরাধী আশরাফুজ্জামান খানের বাড়ি,৩৫০ নাখালপাড়া যেখানে সে থাকত, সেখান থেকে পাওয়া তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জনের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারীর নাম লেখা ছিল। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালে হত্যা করা হয়েছে এমন বুদ্ধিজীবী এবং পরবর্তী সময়ে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি অর্থাৎ গুম করা হয়েছিল তাদের নামও ডায়েরিতে লেখা ছিলো।

“Genocide’71 – an account of the killers and collaborators”, ঢাকায় প্রকাশিত, পৃষ্ঠা – ১৮৯ এ আশরাফুজ্জামান খান সম্পর্কে পাওয়া যায়।

একইভাবে সৌদি আরব কিছু সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় আল-বদরকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে আসছিল। এখানে আমরা আল-বদরের শীর্ষস্থানীয়দের অন্যতম আশরাফুজ্জামান খানের উদাহরণ দিতে চাই। আশরাফুজ্জামান খান ছিল আল-বদর বাহিনীর সরাসরি ঘাতকদের প্রধানদের মধ্যে অন্যতম। এটা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, সে নিজের হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষককে মিরপুরের বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করে। জনৈক মফিজুদ্দিন, যে আশরাফুজ্জামানের এসমস্ত অসহায় শিকারদের বহনকারী গাড়ী চালাচ্ছিল, সে আশরাফুজ্জামানকে বুদ্ধিজীবি হত্যার প্রধান ঘাতক হিসেবে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর আশরাফুজ্জামানের ব্যক্তিগত ডায়েরি তার ৩৫০ নাখালপাড়াস্থ বাসা যেখানে সে থাকত, সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। ডায়েরির দুইটি পাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯জন শিক্ষকের নাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের বাসার ঠিকানাসহ দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অফিসার মুহাম্মদ মরতুজার নামও এই ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই ২০ জন ব্যক্তির মধ্যে ১৪ই ডিসেম্বর ৮ জন নিখোঁজ হন :
মুনির চৌধুরী (বাঙলা )
ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস )
গিয়াসউদ্দীন আহমেদ (ইতিহাস)
রাশেদুল হাসান (ইংরেজি)
ড. ফয়জুল মহি (আই.ই.আর )
ডা. মুনাজা (মেডিকেল অফিসার)

মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায় যে, আশরাফুজ্জামান এসব মানুষদের তার নিজ হাতে গুলি করে। মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তির কারণে এই সমস্ত হতভাগ্য শিক্ষকদের ছিন্নভিন্ন শরীর রায়েরবাজারের জলাভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়। ডায়েরিতে অন্যান্য নামগুলোর মধ্যে এগুলোও ছিলো :
ড. ওয়াকিল আহমেদ (বাঙলা)
ড. নীলিমা ইব্রাহিম (বাঙলা)
ড. লতিফ (আই.ই.আর)
ড. মনিরুজ্জামান (ভূগোল)
কে. এম. সাদউদ্দীন (সমাজবিজ্ঞান)
এ.এম.এম. শহীদুল্লাহ্ (গণিত)
ড. সিরাজুল ইসলাম (ইসলামের ইতিহাস)
ড. আখতার আহমেদ (শিক্ষা)
জহিরুল হক (মনোবিজ্ঞান)
আহসানুল হক (ইংরেজি)
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজি)
কবির চৌধুরী (ইংরেজি)।

ডায়েরির আরেকটি পাতায় পাকবাহিনীর দোসর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিলো। এছাড়াও বুদ্ধিজীবি হত্যার অপারেশনের প্রধান ব্যক্তি চৌধুরী মঈনউদ্দীন, কেন্দ্রীয় আল-বদর শাখার একজন সদস্য শওকত ইমরান এবং ঢাকার বদর বাহিনীর প্রধানের নামও ডায়েরিতে ছিলো।

খুন হওয়া বুদ্ধিজীবিদের নাম ছাড়া ডায়েরিতে অন্যান্য বাঙালিদের নাম-ঠিকানা ছিলো। তাঁরা সবাই আল-বদরের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। একটি কাগজের টুকরোতে পাকিস্তান পাট-বোর্ডের অর্থ সদস্য আবদুল খালেকের নাম, তাঁর বাবার নাম, তাঁর ঢাকার ঠিকানাসহ তার বর্তমান ঠিকানা লেখা ছিলো। ১৯৭১ সালের ৯ই ডিসেম্বর, আল-বদর বাহিনী আবদুল খালেককে তাঁর অফিস থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারা ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। এরপর আল-বদর বাহিনী আবদুল খালেকের কাছ থেকে একটি চিঠি নিয়ে তাঁর বাড়িতে যায়, যে চিঠিতে তিনি অপহরণকারীদের টাকা দিয়ে দেয়ার জন্য বলেছিলেন। আবদুল খালেকের স্ত্রী ঐ সময়ে ৪৫০ টাকার বেশী দিতে অপারগ ছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে বাকি টাকা তিনি তাদের পরে দিয়ে দেবেন এবং তিনি তাদের অনুরোধ করলেন যেন তাঁর স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আবদুল খালেক কখনও ফিরে আসেননি।

আশরাফুজ্জামান কিছু সাংবাদিক হত্যার সাথেও জড়িত ছিলেন। পূর্বদেশ পত্রিকার শিফট-ইন-চার্জ ও সাহিত্য সম্পাদক এ. এন. এম. গোলাম মোস্তফাকে আশরাফুজ্জামান অপহরণ করেছিলো।

Genocide’71 – an account of the killers and collaborators” প্রকাশের পর থেকে আশরাফুজ্জামান খান নিউ ইয়র্কে চলে যায় এবং বর্তমানে সে উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সংস্থা ICNA-এর কুইনস শাখার সভাপতি।

সূত্র:
১. Genocide’71 – an account of the killers and collaborators” পৃষ্ঠা –১৮৯
২. দৈনিক সংবাদ, ৮ নভেম্বর ২০০৯
৩. দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯
৪. বাঙলা ওয়িকিপিডিয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “আমেরিকা প্রবাসী আশরাফুজ্জামান খান বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান জল্লাদ

  1. এইসব প্রবাসী জানোয়ার
    এইসব প্রবাসী জানোয়ার রাজাকারদেরও ফাঁসিতে ঝোলানর উদ্যোগ নিতে হবে। একটা বেজন্মাও যেন পার না পায়। পোস্টের জন্য রুদ্র সাইফুলকে ধন্যবাদ।

  2. এরূপ অনেক অনেক যুদ্ধাপরাধী
    এরূপ অনেক অনেক যুদ্ধাপরাধী দেশে এবং বিদেশে পালিয়ৈ আছে বা পালিয়ে রাখা হয়েছে। এদের সবাইকে ধরে এনে আইনের আওতায় বিচার কার্য সম্পন্ন করার জন্য সরকারের নিকট ব্লগারদের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি। সর্বপরি তথ্য ভিত্তিক উপস্থাপনার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

  3. প্রবাসী এই সব রাজাকার গুলারে
    প্রবাসী এই সব রাজাকার গুলারে খুঁইজা খুঁইজা বাইর কইরা ফাঁসিতে ঝুলাইতে হবে।পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 61 = 70