মাহদী থেকে মার্ক্স ও ‘জগতের লাঞ্ছিত’। পর্ব -৩

ইসমাইলিয়া মুসলমানদের ফাতেমিয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আল মাহদী বিল্লাহ কিংবা বারোপন্থী শিয়াদের ইমাম আল মাহদী ছাড়াও মহানবীর পরিবার ও বংশধরদের মধ্যে থেকে মাহদী টাইটেলের দাবিদার আরো অনেকেই ছিলেন। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা মাহদী টাইটেলের দাবি নিয়ে বিভিন্ন সংগ্রাম ও সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভারতিয় উপমহাদেশে মহানবীর বংশধর মুহাম্মদ জৌনপুরি (১৪৪৩-১৫০৫) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা মাহদিয়া সম্প্রদায় নামে ভারতিয় উপমহাদেশে এখনো টিকে আছে। মরক্কোর বারবার নেতা ইবনে তুমরাত নিজেকে মহানবীর বংশধর ও ইমাম মাহদী দাবি করে ছিলেন। তার অনুসারীরা স্পেনে আলমোহাদ খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাম্মদের বংশধর বা বংশধর হিসাবে দাবিদারদের বাইরেও ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারমূলক সংগ্রামের নেতা হিসাবে বহু মাহদীর আবির্ভাব ঘটেছে। সুদানের সুফিবাদী ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ আহমেদ (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে ইমাম মাহদী ঘোষনা করেন, তার অনুসারীরা যথাক্রমে তুর্কি খেলাফত এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল। ব্রিটিশ আমলে ভারতিয় উপমহাদেশে মির্জা গোলাম আহমেদ (১৮৩৫-১৯০৮) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা ‘আহমেদিয়া মুসলিম’ হিসাবে পরিচিত। বাংলাদেশে সুন্নি উলামারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশী আহমেদিয়াদেরকে অমুসলিম দাবি করে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষনা করার জন্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি তুলেছে। বাংলদেশের আহমেদিয়ারা সংখ্যালঘু হিসাবে সংখ্যাগুরু সুন্নি মুসলমানদের হাতে সামাজিকভাবে নিগৃহিত এবং নির্যাতিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। অধিকাংশ সুন্নি উলামা কেয়ামতের পূর্বে ‘ইমাম মাহদী’র আবির্ভাবে বিশ্বাস রাখেন। তাদের মতে ইমাম মাহদীর এখনো আবির্ভাব ঘটে নাই, ভবিষ্যতে ঘটবে। বিভিন্ন শিয়া এবং মাহদী কেন্দ্রীক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে ইমাম মাহদী একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি। ইতিহাসের একটি সময়ে তার আবির্ভাব ঘটেছিল। অন্যদিকে সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্তদের কাছে ‘ইমাম মাহদী’ কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তি না, বরং একজন ভবিষ্যতের মানুষ, যার আবির্ভাব ‘শেষ জমানা’য় ঘটবে। যেহেতু অধিকাংশ শিয়াদের মতে তাদের ‘ইমাম মাহদী’ ঐতিহাসিক ব্যক্তি হলেও এখন গায়েব অবস্থায় আছেন, তাই সুন্নিদের মতো তারাও শেষ জমানায় তার আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছে। সুন্নিদের কাছে যা আবির্ভাব, শিয়াদের কাছে তা পুনরাবির্ভাব, এই হলো পার্থক্য। কিন্তু মাহদীর আবির্ভাব অথবা পুনরাবির্ভাব যাই ঘটুক না কেনো, তার হাত ধরে ‘সহি ইসলামে’র পুনরাবির্ভাব এবং ‘সাম্য ও ন্যায়ের সমাজে’র আবির্ভাব ঘটবে এই বিষয়ে দুই পক্ষই একমত।

মুসলমানদেরকে শিয়া এবং সুন্নি এই দুই ক্যাটাগোরিতে ভাগ করা গেলে আলোচনা আরামদায়ক হয়, কিন্তু তাতে মুসলিম হিসাবে পরিচিত জনগণ ও তাদের প্রতিনিধী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের ডাইভার্সিটি বিবেচনাবোধের বাইরে থেকে যায়। সহি ইসলাম ও খাটি মুসলমানের মতো সুন্নি/শিয়া ইসলাম কিংবা মুসলমানের ধারণা আলোচনা ও লেখালেখির জন্যে সুবিধাজনক হলেও এতে সরলিকরণ হয়, খন্ডিত ও বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ধারণা ক্রমাগত ব্যবহারে সহি সত্যের দাবিদার হয়ে ওঠে। বাস্তবতা হলো শিয়া অথবা সুন্নি এই দুই পরিচয়ের বহু মুসলমানের ধর্ম বিশ্বাসের কেন্দ্রে মাহদীর উপস্থিতি অথবা তেমন কোন প্রভাব নাই। আমরা ইতিপূর্বে আব্বাসিয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ইমাম ইয়াহিয়া ইবনে উমরের কথা আলোচনা করেছি। তারসময়কার জায়েদি শিয়ারা তাকে ইমাম মাহদী বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ার জায়েদি শিয়ারা সুন্নিদের মতোই ভবিষ্যতে ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছে, ইয়াহিয়া ইবনে উমরের পুনরাবির্ভাবের নয়। অবশ্য ইয়াহিয়া ইবনে উমরের একরকম পুনরাবির্ভাব ঘটেছিল জাঞ্জ বিদ্রোহীদের মাঝে, এই প্রবন্ধের শুরুতে যার বিস্তারিত আমরা আলোচনা করেছি। আলীর সমর্থক ইতিহাসের প্রথম শিয়া যাদেরকে বলা হয়, আলীর পর ইমাম হুসেইন এবং তার বংশধরদের যারা ইমাম মেনেছেন, যারা আবার মুহাম্মদ হানাফিয়াকে মাহদী মেনে বিদ্রোহ করেছেন, কিংবা ইয়াহিয়া ইবনে উমর অথবা মুহাম্মদ আল মাহদীকে ইমাম মেনেছেন তাদেরকে সবাইকে গড়পরতা শিয়া বলা হলেও প্রত্যেকেরই আলাদা সময়ের আলাদা সংগ্রামের পাশাপাশি ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা ও ভবিষ্যতের আকাঙ্খার ভিন্নতা ছিল বহুবিধ। কিন্তু এদের সবার ঐক্য একটা জায়গায়, আর তা হলো ধর্মচিন্তায় ‘ইমাম মাহদী’র কেন্দ্রীয় অবস্থান। ঐতিহাসিকভাবেই সুন্নি হিসাবে পরিচিতদের ধর্মচিন্তায় মাহদী অতোটা কেন্দ্রীয় বিষয় না। সুতরং, মাহদীর অবস্থান ধর্মচিন্তার কেন্দ্রীয় একটি বিষয় নাকি ধর্মচিন্তার পেরিফেরিতে তার অবস্থান, সেই তারতম্যের হিসাবে শিয়া এবং সুন্নি ধর্মচিন্তার ফারাক করা যায়। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে ‘শিয়া’ নাম না নিয়েই কিংবা এমনকি সুন্নি পরিচয়েও যাদের ধর্মচিন্তায় মাহদী পেরিফেরিরি বদলে কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অথবা কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে এসেছে, তাদের বিষয়ে কি বলা যায়? আমরা দেখেছি ‘কায়সানিয়া শিয়া’দের একটি উপধারা থেকে আব্বাসিয়রা সুন্নি ইসলামের প্রতিনিধীতে পরিণত হয়েছে এবং তাদের মাধ্যমেই অনারব মুসলমানদের মধ্যে সুন্নি পরিচয় জোরদার হয়েছে। আবার, সুন্নি সাফাভিদরা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত বারোপন্থী শিয়াদের প্রতিনিধী হয়ে উঠে বর্তমান শিয়া ইরানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। মাহদী চিন্তায় কে কখন শিয়া আবার কখন সুন্নি হয়ে ওঠে, তার সাথে তার রাজনৈতিক সংগ্রামের ওতপ্রত সম্পর্ক রয়েছে। সেই রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সংগ্রামের সাথে যুক্ত জনগোষ্ঠি ও তাদের প্রতিনিধী এবং তাদের বিরোধী পক্ষের মধ্যকার ক্ষমতা সম্পর্কের খবর না নিয়ে তাই মুসলমানদের ‘শিয়া’ এবং ‘সুন্নি’ এই দুই ভাগে ভাগ করে কিছু খন্ডিত ধারণা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।

মুসলমানের চিন্তায় ‘মাহদী’ সংক্রান্ত বিশ্বাস প্রথম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুহাম্মদ আল হানাফিয়ার অনুসারী অর্থাৎ ‘কায়সানিয়া’ শিয়াদের মাঝে। উমাইয়া খেলাফতের আমলে মুহাম্মদের পরিবার অর্থাৎ ‘হাশেমি ক্ল্যান’ ছিল উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রধান বিদ্রোহী পরিবার। আলী হত্যাকান্ড, হাসান হত্যাকান্ড, কারবালায় হুসাইনসহ ৭২ জনের মৃত্যু এই পরিবার এবং তাদের অনুসারীদের মধ্যে সূদুরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। পরিবারের পরবর্তি নেতাদের উপরও উমাইয়া খলিফাদের জুলুম জারি ছিল। এইসব ক্রমবর্ধমান বঞ্চনা, লাঞ্ছনার অনুভুতি ও নির্যাতন নিপিড়নের প্রতিশোধ গ্রহণের আকাঙ্খা এবং বারবার ব্যর্থ বিদ্রোহের হতাশার মাঝে ‘ইমাম মাহদী’ সংক্রান্ত বিশ্বাস তাদের ভবিষ্যতের প্রত্যশা এবং অস্তিত্ব এই দুইই বাঁচিয়ে রাখতে সহযোগিতা করেছিল। মুহাম্মদের পরিবার থেকে মুহাম্মদ নামেই (কিছু বর্ননা অনুসারে মুহাম্মদের চেহারাতেই) একজনের আবির্ভাব ঘটবে, যিনি ইমাম মাহদী হবেন এবং তার মাধ্যমে মুহাম্মদের পরিবার, ইসলাম এবং ন্যায় বিচারের পুনপ্রতিষ্ঠা হবে এই বিশ্বাস এই পরিবারের নেতা ও তার অনুসারীদের মধ্যে দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদিস শিয়া এবং সুন্নিদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালক্রমে মুহাম্মদের দুই চাচাতো ভাই আলী এবং আবদাল্লাহ ইবনে আব্বাসের বংশধরদের মাধ্যমে হাশেমি পরিবারের দুইটি ভাগ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে আব্বাসিয় বিদ্রোহের প্রাক্কালে। ইবনে আব্বাসের বংশধর আব্বাসিয়রা নিজেদের কাউকে ইমাম মাহদী হিসাবে ঘোষনা না করলেও আব্বাসিয় বিদ্রোহকে কসমিক মর্যাদা দেয়ার জন্যে ইমাম মাহদী সংক্রান্ত প্রোপাগান্ডায় অংশগ্রহণ করেছিল এর প্রমান পাওয়া যায় হাদিস শাস্ত্রে। ‘খোরাসানের কালো পতাকা ও ইমাম মাহদীর আবির্ভাব’ সংক্রান্ত যেসব হাদিস সুন্নিদের বিভিন্ন হাদিস সংকলনের ‘কিতাব আল ফিতান’ নামক অধ্যায়ে পাওয়া যায়, এসব হাদিস যে আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডার ফশল তা ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। আব্বাসিয় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল খোরাসানে আবু মুসলিম খোরাসানীর নেতৃত্বে, এবং কালো পতাকা উড়িয়ে (বিস্তারিতঃ খলিফার কালো পতাকা ও মাওয়ালী মুসলমানের গল্প)। উমাইয়াদের হাতে নিহত ইমামদের প্রতি শোক প্রকাশের জন্যে কালো পতাকা উড়িয়ে বিদ্রোহ হয়েছিল। সুন্নিদের বিভিন্ন হাদিস সংকলনে এমন কিছু হাদিস পাওয়া যায় যাতে ইসলামের নবী মুহাম্মদের বরাতে বলা আছে, “খোরাসান থেকে যারা কালো পতাকা উড়িয়ে আসবে, তোমরা তাদের কাছে যাবে, কারন তাদের মধ্যেই আছেন আল্লাহর খলিফা, ইমাম মাহদী” কিংবা “খোরাসান থেকে যখন কালো পতাকার আবির্ভাব ঘটবে তখন হামাগুরি দিয়ে হলেও তাদের কাছে যাবে (বায়াত নেয়ার জন্যে)”। ভারতিয় বংশদ্ভুত ব্রিটিশ ইসলামী পন্ডিত উসামা হাসান তার ‘দি ব্লাক ফ্লাগস অফ খোরাসান’ নামক লেখায় এসব হাদিসকে আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেছেন। একিরকম দাবি করেছেন উসামা হাসানের পিতা সুহাইব হাসান। সুহাইব হাসানের জন্ম ভারতে। তিনি তার পিএইচডি থিসিসে প্রমান করেছেন খুরাসানের কালো পতাকা সংক্রান্ত হাদিসগুলো আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডা হিসাবেই তৈড়ি হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘খোরাসানে’র কালো পতাকা সংক্রান্ত এসব হাদিস আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডায় ব্যবহৃত বহু হাদিসের একাংশ মাত্র। এসব হাদিসের মধ্যে কিছু হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় “আমার চাচা আব্বাসের বংশধরদের মাঝে ইমাম মাহদী’র আবির্ভাব ঘটবে” এমন দাবিও ইসলামের নবী মুহাম্মদের বরাত দিয়ে করা হয়েছে।

 

মজার ব্যপার হচ্ছে খোরাসানের কালো পতাকা ও ইমাম মাহদীর আবির্ভাব সংক্রান্ত এসব হাদিস বর্তমান সময়ে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে সালাফি জিহাদীদের মাঝে। আব্বাসিয়দের আমলে খোরাসান ছিল বর্তমান আফগানিস্তান, ইরান এবং মধ্যএশিয়ার অংশবিশেষ জুরে একটি প্রদেশ। আধুনিক যুগের সালাফি জিহাদীরা এসব হাদিসের বর্ণনাকে আফগানিস্তানে কালো পতাকা উড়িয়ে তালিবানদের আবির্ভাবের ভবিষ্যতবানী বলে প্রচার করে থাকে। আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে থাকাকালীন তার সব চিঠীর শেষে ঠিকানা লিখতেন খোরাসান, আফগানিস্তান। তালিবানদের সরকারী পতাকা ছিল সাদা এবং সামরিক পতাকা কালো। আল কায়েদা শুধুমাত্র কালো পতাকা ব্যবহার শুরু করেছিল। বোকো হারাম, আইসিসসহ অন্যান্য জিহাদী সংগঠনের কালো পতাকার ব্যবহার এবং খোরাসানের কালো পতাকা সংক্রান্ত হাদিসকে প্রোপাগান্ডা হিসাবে ব্যবহার যুগপতভাবেই বর্তমান সময়ে জারি আছে। মুসলমান তরুনদের রিক্রুট করার ক্ষেত্রে এই জাতীয় কসমিক প্রোপাগান্ডা অত্যন্ত কার্যকর পন্থা হিসাবে আধুনিক জিহাদী সংগঠনগুলো ব্যবহার করছে। বাস্তবতা হলো ইসলামের নবী মুহাম্মদ কোন একটি বিশেষ রঙের পতাকা ব্যবহার করেছেন এমন কোন ঐতিহাসিক প্রমান নাই। উমাইয়া খলিফারা ব্যবহার করতেন সাদা রঙের পতাকা। ইতিহাসে প্রথম সুস্পষ্টভাবে কালো পতাকার আবির্ভাবের খবর পাওয়া যায় খোরাসানে, আব্বাসিয় বিদ্রোহের পতাকা হিসাবে। আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডার অংশ হিসাবে এই কালো পতাকা স্থান পেয়েছে হাদিস শাস্ত্রে, আর আধুনিক সময়ে সালাফি জিহাদীদের হাতে পরে হাদিসের বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে তা জিহাদী সংগঠনের পতাকায় পরিণত হয়েছে। শিয়া ইমামদের শোকাবহ কালো পতাকা কিভাবে এন্টি শিয়া সালাফিদের জিহাদের পতাকা হয়ে উঠলো সেই ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে শিয়া এবং সুন্নি বিশ্বাসের সরল বিভাজন আরো কঠিন হয়ে উঠছে। কারন খোরাসানের কালো পতাকা মাহদীর আবির্ভাবের প্রতিক হিসাবে মাহদী কেন্দ্রীক ধর্ম বিশ্বাসকে সুন্নি জিহাদীদের ধর্মবিশ্বাসের একেবারে কেন্দ্রীয় একটা জায়গায় নিয়ে আসে। ইমাম মাহদীর সৈনিক হয়ে ওঠার বাসনায়, শেষ জমানার এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধে অংশ নিয়ে গাজী অথবা শহীদ হওয়ার জন্যে মধ্যযুগে শিয়া পরিচয় নিয়ে যে তরুনটি যুদ্ধ করতে গেছে আর আধুনিক যুগে সুন্নি পরিচয় নিয়ে যে তরুনটি জিহাদ করতে যাচ্ছে তাদের ধর্মের পরিচয়ে ফারাক থাকলেও বিশ্ববিখ্যা এক। তাদের মতবাদের নাম ও পোষাক আলাদা, কিন্তু গঠনটা একিরকম। দুইজনই সমাজের অপেক্ষাকৃত বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত এবং শোষিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত অথবা এই শ্রেণীর প্রতি সহানুভুতিশিল। কিন্তু এই শ্রেণী ধর্মানুভুতি তাদের সাম্প্রদায়িক ধর্মানুভুতিকে অতিক্রম করতে পারেনাই বলে শ্রেণী সংগ্রামের বদলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাতেই তাদের বিদ্রোহ এবং বিপ্লব আটকে গেছে। পাশাপাশি লুম্পেন সভাবের কারনে দাস ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, তেল ব্যবসা ইত্যাদি তাদের বিপ্লবী কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। কসমোলজি নির্ভর প্রোপাগান্ডা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর রিক্রুটমেন্টের জন্যে কার্যকর পন্থা হতে পারে, কিন্তু তাতে ইমাম মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে না। সাম্য ও ন্যায়ের সমাজও প্রতিষ্ঠা হবে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মাহদী থেকে মার্ক্স ও ‘জগতের লাঞ্ছিত’। পর্ব -৩

  1. কালো পতাকার অধিকাংশ হাদিসেই
    কালো পতাকার অধিকাংশ হাদিসেই স্পেসিফিকলি শেষ জমানার কথা উল্লেখ আছে। সাথে আরো অনেক ক্রাইটেরিয়ার কথা বলা আছে যেমন ঈসা (আ) এর পুনরাবির্ভাব, দাজ্জাল বা এন্টিক্রাইস্টের আবির্ভাব ইত্যাদি। আপনি সেগুলা মেনশন করেন নাই। অর্ধেক কথা উল্লেখ করেই একটা থিওরি দাড় করিয়েছেন। আর শেষ জমানা যে কবে তা তো আর কেউ নিশ্চিতভাবে দাবি করতে পারে না। অনেকে বর্তমান যুগকে শেষ জমানা হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। আজ থেকে ১ হাজার বছর আগেও এই দাবি অনেকে করেছেন। আজ থেকে ১ হাজার বছর পরও যে কেউ এই দাবি করবে না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এসব যে আব্বাসিয়দের প্রোপাগান্ডা ছিল তা আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন? তারাও তো ঐ জমানাকে শেষ জমানা হিসেবে ভেবে থাকতে পারে। আব্বাসিয় বিদ্রোহ মূলত খোরাসানে শুরু হওয়ায় তাদের ভেতর এই বিশ্বাসও জন্মে থাকতে পারে যে তারাই সেই প্রফেসাইজড বাহিনী। তারা যে স্রেফ প্রোপাগান্ডার জন্যই এসব হাদিস রচনা করেছিল তা নিতান্তই আপনার অনুমাননির্ভর তত্ত্ব। শুধু অনুমান দিয়ে ইতিহাস বর্ণনা করা যায়না। উপযুক্ত ডকুমেন্ট লাগে। আপনি যেভাবে এটাকে আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডা হিসেবে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন তাতে আমার হাসান ই সাব্বাহ কে মনে পড়ছে। তার পরিচয় নিশ্চয় আপনাকে নতুন করে দেওয়া লাগবে না। আশা করি আপনি তার ব্যাপারে জানেন।

    এনিওয়ে, কিতাব আল ফিতান যখন পড়েই ফেলেছেন তখন এটাও নিশ্চয় আপনার চোখে পড়েছে।

    Nu’aym ibn Hammad narrates in Al-Fitan, that the 4th
    Caliph, Ali ibn Abi Talib said:
    When you see the black flags, remain where you are and do not move your hands or your feet.
    Thereafter there shall appear a feeble insignificant folk. Their hearts will be like fragments of iron.
    They will have the state. They will fulfil neither covenant nor agreement. They will call to the truth,
    but they will not be people of the truth. Their names will be parental attributions, and their aliases
    will be derived from towns. Their hair will be free-flowing like that of women. This situation will
    remain until they differ among themselves. Thereafter, God will bring forth the Truth through
    whomever He wills.

    এখন এই প্রফেসির সাথে কিন্তু অন্য কোন ক্রাইটেরিয়া নেই। এটাকে তো আমি আইসিস বিরোধী প্রফেসি হিসেবেও পেশ করতে পারি তাইনা? এবং সেক্ষেত্রে আপনার আব্বাসিয় প্রোপাগান্ডা তত্ত্ব থেকে আমার এই আইসিস বিরোধী তত্ত্ব জোরালো হবে যেহেতু আমি সব ক্রাইটেরিয়া এবং ইলিমেন্ট বিবেচনা করেই এই দাবি করছি। তবে দাবিটা করলেও কিন্তু দিনশেষে সেটা হবে একান্তই আমার অনুমাননির্ভর তত্ত্ব। সেটাকে ইতিহাস বলা যাবেনা।

    অঃটঃ আপনি যে শেখ ইমরান নজর হুসেইনের লেকচারও শুনেন তা আমার জানা ছিলনা।

    1. যেহেতু হাদিসের উৎপত্তি ও
      যেহেতু হাদিসের উৎপত্তি ও অথেন্টিসিটি বিষয়ে আলোচনা করা এই পোস্টের প্রধান উদ্দেশ্য না, তাই বিস্তারিত ‘আল ফিতান’ সংক্রান্ত সকল ডিসকোর্সের আলোচনা সম্ভব ন। এই সিরিজের পরের পর্বে তাও কালো পতাকার পাশাপাশি দাজ্জাল, ইসা প্রমুখ সংক্রান্ত হাদিসগুলো সম্বন্ধে সামান্য আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি।
      আব্বাসিয়রা প্রোপাগান্ডার জন্যে এসব হাদিস তৈড়ি করেছে এটা আমার মনগড়া তত্ত্ব তা কিভাবে বলছেন। আমিতো দুইজন ইসলামী পন্ডিতের উল্লেখও করে দিয়েছি, এর মধ্যে একটি পিএইচডি থিসিসের কথাও উল্লেখ করেছি। কেয়ামততত্ত্ব সংক্রান্ত হাদিসগুলো নিয়ে যে অনেক ইসলামী পন্ডিত অতীতেও নানারকম সন্দেহ করেছেন সেই বিষয়েও পরের পর্বে কিছু আলোচনা করবো। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 − = 52