কা’ব আল আহবার ও হাদিস শাস্ত্রে ইহুদী-খ্রিষ্টান প্রভাব

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগেই তিনি আরব গোত্রগুলোকে ইসলামের ব্যানারে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধিন করতে সক্ষম হন এবং বাইজেন্টাইন সিরিয়ায় অভিযান শুরু করেন। খলিফা উমরের আমলে পারস্য সাম্রাজ্য খেলাফতের কাছে পুরোপুরি পরাজিত হয় এবং বিলুপ্ত হয়ে যায়। সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায়, কনস্টান্টিনোপোলের নিয়ন্ত্রন এশিয়া মাইনর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে পরে। অল্প সময়ের মধ্যে যে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল তার অধিকাংশ নাগরিক ধর্মে ছিল খ্রিষ্টান, তারপর ইহুদী, জোরাস্ট্রিয়ান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা। নও মুসলিমদের একটা বড় অংশ ছিল সাবেক ইহুদী অথবা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। মক্কার আরবরা যেমন তাদের গোত্রিয় ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের বহুকিছু সমেত ইসলামে প্রবেশ করেছিল, তেমনি সিরিয়া , ইয়েমেন কিংবা ইরাকের ইহুদী অথবা খ্রিষ্টানরাও নিজেদের পুরনো সংস্কৃতি ও ধর্মচিন্তার ঐতিহ্য নিয়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। খলিফা উমর প্রথম একটি একক গ্রন্থ আকাড়ে কুরানকে লিপিবদ্ধ করার কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু আপামর জনসাধারণের কুরান পাঠের সুযোগ ছিলনা বললেই চলে। হাদিশ শাস্ত্র বলতে কোনকিছু তখনো গড়ে ওঠে নাই। অন্যদিকে ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্ম ইসলামের বহু আগেই কোডিফায়েড ধর্মের রূপ লাভ করেছিল। কেনোনিক এবং এপোক্রিফা মিলিয়ে এই দুই ধর্মের বহু ধারা উপধারার অনুসারীদের মাঝে বহু লিখিত কিতাবে সুসংবদ্ধ ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে নানারকম মিথোলোজির চর্চা ছিল।

রোমানরা জেরুজালেম থেকে ইহুদীদের বিতারিত করার প্রায় পাঁচশ বছর পর ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের সাসানিদদের সহযোগিতায় ইহুদীরা পাঁচ বছরের মতো ইসরায়েলে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ইহুদী সেনারা জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রন নিয়ে খ্রিষ্টানদের উপর বড় ধরণের হত্যাযজ্ঞ চালালে পারস্য সম্রাট খসরু ইহুদী সেনাদের জেরুজালেমের বাইরে থাকার নির্দেশ দেন। যে অল্প সময় ইহুদীরা জেরুজালেমে ছিল সেই সময়টিতে তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের ধ্বংসস্তুপ পরিস্কারের কাজে হাত দেয় তৃতীয়বারের মতো বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মানের আশায়। সাসানিদরা চলে যাওয়ার পর বাইজেন্টাইন সেনাদের হামলায় জেরুজালেমের বাইরে অবস্থান নেয়া ইহুদী সেনাবাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জেরুজালেমে আবার বাইজেন্টাইন শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের স্থানটিকে খ্রিষ্টানরা তাদের ময়লা ফেলার জায়গা হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। জেরুজালেম থেকে বিতারিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বৈধভাবে ইহুদীরা জেরুজালেমে বসবাস করার অধিকার পায় মুসলমানদের জেরুজালেম বিজয়ের পর। শান্তিপূর্ণভাবে জেরুজালেমের শাসন বুঝে নেয়ার সময় খলিফা ওমর খ্রিষ্টানদের সাথে যে কয়টি আপস রফা করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল ‘জেরুজালেমে ইহুদীদের ব্যান জারি রাখা’। কিন্তু পরবর্তিতে ওমরের প্রচেষ্টায় ইহুদীদের ৭০টি পরিবার জেরুজালেমে বৈধভাবে বসবাস করার অধিকার পায়।

মুসলমানদের সিরিয়া বিজয়ের আগে ইসরায়েলের ইহুদীরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। এই যুদ্ধটিকে তারা এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধের মর্যাদা দিয়েছিল। গায়েব হয়ে যাওয়া ইহুদী মসিহা ও তার পুনরাবির্ভাবের কাহিনী নির্ভর ‘সেফের জেরুব্বাবেলের’ মতো পুস্তক রচনা এইসময় তারা রচনা করেছে। ইসরায়েল থেকে বিতারিত হওয়ার পর থেকে ইহুদীরা বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তার প্রতিক হিসাবে বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্ণির্মান করার স্বপ্ন দেখেছে, চেষ্টা করেছে। পারস্য সাম্রাজ্যের পক্ষ নিয়ে বাইজেন্টাইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং সেই বিদ্রোহকে শেষ জমানার যুদ্ধের সাথে তুলনা করে দাউদের বংশধর মসিহার আবির্ভাবের প্রত্যাশা সেই ধারাবাহিক স্বপ্ন ও প্রচেষ্টার অংশ মাত্র। সিরিয়ায় মুসলিম বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পরও এই স্বপ্ন ও প্রচেষ্টা জারি থাকে। মুসলমানদের সিরিয়া বিজয়কে ইহুদীদের একাংশ শেষ জমানার এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধের অন্তর্গত একটি ঘটনা হিসাবে ধারণা করেছিল। যদিও মদিনায় মুহাম্মদের শাসনের সময়টায় ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের শত্রুতা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছিল কিন্তু সিরিয়া অথবা ইয়েমেনের ইহুদীদের মধ্যে অনেকে যে বাইজেন্টাইনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়কে ইহুদীদের পক্ষের বিজয় বলেই ধারণা করেছিল তার প্রমান আছে। সমসাময়িক ইহুদীদের লিখিত ‘রাব্বি শিমিয়ন বার ইয়োকাইয়ের গোপন কথা’ পুস্তকে ইসলামের নবী মুহাম্মদ সম্পর্কে ইহুদীদের ফেরেশতা মেটাট্রন বলছেন – “তোমাদেরকে দুষ্ট বাইজেন্টাইনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যেই তিনি ইসমায়েল বংশের রাজত্ব নিয়ে আসছেন। তিনি তাদের মধ্যে একজন নবী হিসাবে উঠে দাঁড়াবেন এবং তাদের জন্যে রাজ্য জয় করবেন”।

মুসলমানদের জেরুজালেম জয়ের পর খলিফা ওমর বায়তুল মুকাদ্দাসের স্থানে ডোম অফ রকএর ভিত্তি স্থাপন করেন জেরুজালেমে মুসলমানদের নামাজ পড়ার স্থান হিসাবে। ফলে ইহুদীদের তৃতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মানের স্বপ্ন পুরণ হয় নাই। তবে মসজিদের জায়গা নির্বাচন খলিফা করেছিলেন কা’ব আল আহবারের পরামর্শে। কা’ব আল আহবার ইহুদী থেকে মুসলমান হয়েহচিলেন । খলিফা ওমরের জেরুজালেম যাত্রার একজন সঙ্গী ছিলেন তিনি। খলিফা ওমর নিজ হাতে বায়তুল মুকাদ্দাসের ময়লা পরিস্কারের কাজ শুরু করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের স্থান পরিস্কার করার কাজে ইহুদীরাও অংশগ্রহণ করেছিল জানা যায়। মসজিদের কাজ শুরু করার পর কা’ব খলিফাকে বলেছিলেন যে তার কাজে একটি প্রাচীন ভবিষ্যতবানী পূরণ হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কা’ব আল আহবারের মতো ইহুদীদের এপোকেলিপ্টিক সংগ্রাম তারা মুসলমান হওয়ার পর ইসলামের সংগ্রামের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কা’ব ইয়েমেনের একজন ইহুদী রাব্বী ছিলেন। খলিফা ওমরের সময় তিনি মদিনায় আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানদের মধ্যে তিনি অল্পসময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন মূলত ইসরায়লিয়াত বিশেষজ্ঞ হিসাবে। বনী ইসরায়েলের ইতিহাস, তাদের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ বিশেষ করে তাওরাত এবং সেসবের ভবিষ্যতবানী সম্পর্কে তার জ্ঞানের কারনে মুসলমানদের মধ্যে তার বেশ কয়েকজন ভক্ত ও বন্ধু তৈড়ি হয়েছিল। এই ভক্ত ও বন্ধুদের মধ্যে আবু হুরাইরা প্রধানতম। কা’ব এবং আবু হুরাইরার মধ্যে মানুষের ইতিহাস (ইহুদীদের ইতিহাস) এবং দুনিয়ার ভবিষ্যত, শেষ জমানা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা হতো। এসব আলোচনায় কা’ব মূলত আবু হুরাইরার গুরুর ভুমিকা পালন করেছেন। শেষ জমানা সংক্রান্ত বহু হাদিসের বর্ণনাকারী হিসাবে কা’বের নাম পাওয়া যায়, বিশেষ করে নুয়াইম বিন হাম্মাদের ‘কিতাব আল ফিতান’এ। তবে মুসলমানদের হাদিস শাস্ত্র যখন সুসংবদ্ধ রূপ নেয়া যখন শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই কা’বের বিরুদ্ধে ইহুদী ধর্ম বিশ্বাস ইসলাম ধর্মে আমদানী করার একটি অভিযোগ উঠেছিল। শিয়া উলামারা এই অভিযোগ হাজার বছর ধরে করে আসছে। হাদিসশাস্ত্র কোডিফায়েড আকাড় লাভ করার সময়টাতেই কা’বকে অনেক হাদিস সংকলকই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছেন। যেমন, ইমাম বুখারি তার বুখারি শরিফে কা’ব বর্ণিত কোন হাদিস গ্রহণ করেন নাই, তবে আবু হুরাইরার হাদিস দেদারসে গ্রহণ করেছেন। মুসলিম শরিফে কা’ব বর্ণিত একটি মাত্র হাদিস পাওয়া যায়। আবার মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা বর্ণিত সাত দিনে দুনিয়া সৃষ্টির একটি হাদিস ইমাম বুখারি তার বুখারি শরিফে গ্রহণ করেন নাই। গ্রহণ না করার কারন হিসাবে বুখারি দাবি করেছেন, এই হাদিসটি মহানবীর বক্তব্য না (যদিও হাদিসটি ‘আল্লাহর নবী বলেছেন’ দিয়ে শুরু হয়েছে), বরং এটা কা’ব আল আহবারের বক্তব্য।

বায়তুল মুকাদ্দাসের ধ্বংসস্তুপের উপর খলিফা ওমরের মসজিদ নির্মানকে একটি ভবিষ্যৎবানী পুরণ হওয়ার দাবির পাশাপাশি কা’ব সমসাময়িক মুসলিমদের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে নানারকম ‘প্রফেসি’ পুরণ হওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। কা’ব দাবি করতেন যে ইহুদীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ তাওরাত শরিফে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল ঘটনার ইতিহাস লেখা আছে। তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনাকে তাওরাতের প্রফেসি পুরণ হওয়ার দাবি করেছেন। তাওরাত পাঠ করে সয়ং খলিফা ওমরের মৃত্যুর ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন। দুইদিনের মাথায় ওমর আততায়ির আক্রমনে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শিয়া উলামাদের কেউ কেউ এই ঘটনাটি কা’বের খলিফা ওমর হত্যায় জড়িত থাকার প্রমান হিসাবে হাজির করে। তাদের যুক্তি হলো ষড়যন্ত্রে জড়িত না থাকলে কা’বের পক্ষে খলিফার মৃত্যুর বিষয়ে আগে থেকে জানার কথা না, কারন তাওরাতে আদৌ খলিফা ওমর সম্পর্কে কোন ভবিষ্যৎবানী করা নাই। কা’বের প্রতি শিয়াদের মতো বিদ্বেষ না রেখে চিন্তা করলে মনে হতে পারে কা’ব এই হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন না, বরং ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে জানতেন এবং খলিফাকে সাবধান করার চেষ্টা করেছেন। খলিফা ওমরের মৃত্যুর পর কা’ব সিরিয়ায় চলে যান এবং মুয়াবিয়ার উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করা শুরু করেন। মুয়াবিয়ার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক কা’বের বিরুদ্ধে শিয়া বিদ্বেষের একটি কারন। শিয়া ঐতিহাসিকদের মতে, কা’ব ওমরের পর উমাইয়াদেরকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলেন, আলীকে নয়। সিরিয়াতেই, খলিফা ওসমানের আমলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শতাধিক বছর জীবিত ছিলেন।

শিয়া ইতিহাসে কা’ব একজন ভন্ড চরিত্র, যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ভান করে ইসলাম ধর্ম দুষিত করার জন্যে ইহুদি খ্রিষ্টান ধর্ম বিশ্বাস আমদানি করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, কা’বের বিরুদ্ধে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের অভিযোগও এইরকমই ছিল। কা’ব ছিলেন সমসাময়িক ও পরের যুগের ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের জন্যে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। তার বিরুদ্ধে পলেমিক রচনায় ইহুদী-খ্রিষ্টান পন্ডিতরা যথেষ্ট পরিমান সময় ব্যয় করেছেন। ইহুদী-খ্রিষ্টান পন্ডিতরা দাবি করেছেন যে, কা’ব একজন ইহুদী ছিলেন যিনি সুপরিকল্পিতভাবে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ ও কেয়ামতত্ত্বের শিক্ষাকে ‘অপবিত্র’ করেছেন মুহাম্মদের নবুয়তির স্ট্যাটাস বৈধ করার জন্যে। ইহুদী-খ্রিষ্টানদের এসব অভিযোগ থেকে প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাসে কা’বের ভুমিকা সম্পর্কে আমরা একটা সচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারি। কা’ব যেহেতু একজন ইহুদী রাব্বী ছিলেন, তাই তৎকালিন সমাজে তার স্ট্যাটাস ছিল আমাদের সময়কার একজন একাডেমিক ইন্টেলেকচুয়ালের সমান। তিনি নতুন ধর্ম ইসলামকে একধরণের একাডেমিক বৈধতা দিয়েছিলেন, প্রচলিত ইব্রাহিমী ডিসকোর্সেগুলোর মধ্যে নতুন ধর্মটির জায়গা পোক্ত করেছেন। অনেকে মনে করেন, ইসলাম ধর্মটি শুধুমাত্র তলোয়ারের জোরেই প্রচার পেয়েছে, যে ধারণাটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য না। এটা সত্য যে, আজকের যুগেও গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে বিমান হামলা চলে, এবং খ্রিষ্টান কিংবা ইসলাম ধর্ম কায়েমের নামে তলোয়ারের ব্যবহার মধ্যযুগিয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র তলোয়ারের জোরে ইসলামকে একটি জনপ্রিয় ধর্মে পরিণত করা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি বিরাট সংখ্যক ইহুদী ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠিকে শাসন করার জন্যে ‘সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ’ ইব্রাহিমী ধর্ম হিসাবে ইসলামের একটি ডিসকার্সিভ হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করার দরকার পরেছিল। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব, মুসলিমদের সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও ভবিষ্যত মিশনকে ইহুদী-খ্রিষ্টান ট্রাডিশনের বিভিন্ন ভবিষ্যতবানীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে ও আবু হুরাইরার মতো সাহাবীদেরকে ইসলামপূর্ব সময়কার ইতিহাস ও ‘ইব্রাহিমী লেক্সিকন’ শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে এই দরকারি দায়িত্বটা তিনি পালন করেছেন। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে, কার্ল মার্ক্স এবং ডারউইনের যুগেও ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ এমনকি বড় বড় বহু পন্ডিতও বিশ্বাস করতেন তাওরাতের বর্ণনামতোই পৃথিবীর ইতিহাস মাত্র ছয় হাজার বছরের এবং তাওরাতে যেভাবে সপ্তাহের সাত দিনে একটু একটু করে আল্লাহর দুনিয়া সৃষ্ঠির বর্ণনা আছে তাই সঠিক। সাত শতকের মধ্যপ্রাচ্যের পন্ডিত ও জনমানুষের কাছে সাত দিনে দুনিয়া তৈরির কাহিনীই ছিলো দুনিয়ার সৃষ্ঠি ও মানুষের ইতিহাসের সুচনা সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান, একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। মুসলমানদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কুরান শরীফে তাওরাতের মতো সাত দিনে দুনিয়া তৈড়ির এইসব বিস্তারিত কাহিনী নাই। ঠিক তাওরাতের মতো বিস্তারিত কাহিনী পাওয়া যায় হাদিস শাস্ত্রে, আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদিসে। আবু হুরাইরা জীবনে কোনদিন তাওরাত পড়েছেন এই তথ্য পাওয়া যায় না। আমরা ধারণা করতে পারি যে, কা’বের মাধ্যমেই তিনি এইসব জ্ঞান লাভ করেছেন। কা’বের মাধ্যমে প্রাথমিক যুগের ইসলাম ইব্রাহিমী ইতিহাস ও ডিসকোর্সে এভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো আবু হুরাইরার এইসব হাদিস খোদ মহানবীর মুখের কথা হিসাবে সুন্নি ইসলামে স্বিকৃত হয়ে আধুনিক কালে এসে পৌছেছে, এবং ইহুদী-খ্রিষ্টান-ইসলামিক এপোকেলিপ্টিক ট্রাডিশনের ফশল বহু হাদিস আমাদের সময়ের মুসলমান তরুনদের বিভ্রান্ত করার ও টেরোরিজমে প্ররোচিত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দরকারি পাঠঃ
* JEWISH APOCALYPTIC LORE IN EARLY ISLAM:RECONSIDERING KAʽB AL-AHBAR by John C. Reeves
* Ascent to Heaven in Islamic and Jewish Mysticism By Algis Uzdavinys
* An Introduction to the Science of Hadith by Dr. Suhaib Hasan

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “কা’ব আল আহবার ও হাদিস শাস্ত্রে ইহুদী-খ্রিষ্টান প্রভাব

  1. সব দোষ দেখি ইহুদীদের!ইসলাম
    সব দোষ দেখি ইহুদীদের!ইসলাম নির্দোষ! সায়েন্টিফিকেট ধর্ম! মানবতাবাদী ধর্ম! জিহাদীদের জন্য দায়ী কা’ব!

  2. কিন্তু শুধুমাত্র তলোয়ারের

    কিন্তু শুধুমাত্র তলোয়ারের জোরে ইসলামকে একটি জনপ্রিয় ধর্মে পরিণত করা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি বিরাট সংখ্যক ইহুদী ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠিকে শাসন করার জন্যে ‘সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ’ ইব্রাহিমী ধর্ম হিসাবে ইসলামের একটি ডিসকার্সিভ হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করার দরকার পরেছিল।

    হুম! কথা সত্য। লিখাটা ভাল লাগলো অনেক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − 39 =