অন্তরে শাহবাগ

শাহবাগের গগণ বিদারি শ্লোগান আর নেই। সেই তরুণ-তরুণীরাও আর নেই। সবাই ফিরে গেছে যার যার কাজে। সবাই হয়তো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজ নিজ অঙ্গনে। কিন্তু তারা হয়তো নিজেরাও জানে না, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ চলায় তারা কি ইতিহাস তৈরি করে দিয়ে গেছে! পত্র-পত্রিকা, টিভির টক-শো ইত্যাদিতে শাহবাগ এখনো জীবন্ত উপাখ্যান। এই বাঁধ ভাঙ্গা তরুণেরা জাতিকে কি দিতে পেরেছে, কি দিতে পারেনি এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে তুমুল আলোচনা। এবং এই আলোচনা হয়তো চলবে আরো বহু দিন!

এই প্রবাসের জীবনকেও শাহবাগ বেঁধে নিয়েছিল। নিত্য দিনের কাজে তিন-চার বার টিভি পর্দায় কিংবা অন্তর্জালে খুঁজে নেবার চেষ্টা করতাম শাহবাগকে। নিজের অস্তিত্বে অনুভব করতাম শাহবাগকে। প্রায় মাসব্যাপী আলোচনা-আড্ডা সর্বত্র ছিল শাহবাগ। এমন বন্ধু-বান্ধবকেও দেখেছি, যারা রাজনীতি কিংবা সামাজিক অঙ্গনে নির্জীব গোবেচারার জীবন বেছে নিয়েছিল, তারাও জেগে উঠেছিল। ফেইস বুক, টুইটার, ব্লগে মন্তব্যের মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছিল। যেন কোন অভিমত, কোন মন্তব্যই ফেলনা নয়!

ইতিহাসের কোনো কোনো পর্যায়ে মানুষ কখনো নিজেকে এমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। নিজের অজান্তেই নিজেকে সাহসী করে তোলে। এভাবে মানুষ সমসাময়িক কালে ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই সম্মিলত আওয়াজেই সমাজে সূচিত হয় পরিবর্তনের ধারা! সংক্ষেপে এই তো সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস!

শাহবাগের হাতিয়ার!

শাহবাগের হাতিয়ার বলতে কম্পিউটার আর বৈশ্বিক অন্তর্জাল। বিশ্ব মানচিত্রে ক্ষুদ্র হলেও বাংলাদেশের তরুণরা নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবতে শুরু করেছে। বর্তমান দুনিয়ায় যেমনটি মনে করা হয়, পৃথিবীর কোন প্রান্তে তুমি আছো, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো মানব কল্যানে তোমার ভূমিকা কি? শাহবাগে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের তরুণরা এই বৈশ্বিক ভাবাবেগে তাড়িত। এটাই যুগের স্পন্দন!

নিজের দেশের শত সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে তারা বেছে নিয়েছে মানব জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘সাম্প্রদায়িকতা’কে। সাম্প্রদায়িকতা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ রচনা করে। সম্প্রীতি ও শান্তিকে নস্যাত করে মানুষের ভেতর গড়ে তুলে ভেদাভেদের কৃত্রিম প্রাচীর। তাইতো বার্লিন প্রাচীরের মতো তারা গুড়িয়ে দিতে চেয়েছে সাম্প্রদায়িকতাকে!

সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করার জন্য ’৭১ সালে বাঙালি জাতি মরনপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েও তাকে সমূলে বিনাশ করতে পারেনি। সাম্প্রদায়িকতার প্রেতাত্মারা যখন আবার তাদের আস্ফালন শুরু করেছে, ঠিক তখনই জেগে উঠেছে শাহবাগ। যারা সেদিন বাঙালি জাতিকে ভেদাভেদের জালে বন্দি করে স্বাধীনতা ও মুক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, যারা সেদিন অখন্ড পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য হাজার-হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম হরণে ইন্ধন যুগিয়েছিল, তাদের বিচার নিশ্চিত করাই ছিল শাহবাগের শ্লোগান। এটাই ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি’।

সৌভাগ্য ক্রমে দেরিতে হলেও নগণ্য সংখ্যক যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছে। কিন্তু এ বিচারকে মাঝ মাঠে রেখে রাজনীতির চোরাগলি পথে কেউ যেন হেঁটে বেড়িয়ে যেতে না পারে সে কারণেই হুঙ্কার দিয়েছে শাহবাগ। বলেছে দেশের আইনে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি কোন উন্নাসিকের দাবি নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর গত একচল্লিশ বছরে মানুষ অনেক হিসাব-নিকাশ করেছে। স্বাধীনতার সুফল থেকে বঞ্চিত বেশিরভাগ মানুষ আজ তাদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছে। যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, তারাই যখন আজ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তখন মানুষের আর বুঝতে বাকি নেই এই রক্তে ভেজা রাষ্ট্রটি তাদের হাত থেকে কারা যেন হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে!

বাংলাদেশের পশ্চাদপদতা, দারিদ্র, অশিক্ষা, পুস্টিহীনতা ইত্যাদির জন্য দায়ি যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষ তাকে আজ চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাই তো মানুষের আজ প্রথম শত্রু ধর্মান্ধ-মৌলবাদী শক্তি এবং তাদের শিখণ্ডী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী। দুর্নীতিপরায়ণ আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিকও অগ্রগতির প্রধান শত্রু। কিন্তু এসব অপশক্তি পরস্পরের সঙ্গে আজ এতটাই গাটছড়া যুক্ত যে এরা সবাই মিলে বাংলাদেশের ক্ষমতার চারপাশে একটি মহা কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছে। রাজনীতিতে এদের এই কমপ্লেক্সের নাম- ‘জোট’, ‘মহাজোট’ ইত্যাদি। তাই এদেরকে পৃথক, শক্তিহীন করে পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর সুযোগ নিতে চায় শাহবাগের তারুণ্য। এখানেই নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা!

তারুণ্যের এই সৃজনশীলতা বুঝতে অক্ষম অনেকেই। তাই তো টিভি’র টক শো, কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় যখন কোটারি স্বার্থগুলো নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে শাহবাগের সমালোচনা করে তখন বুঝতে কস্ট হয় না এরা ব্যাথাটা পাচ্ছে কোথায়!

এই শাহবাগী কারা?

প্রশ্ন আসতে শুরু করেছে- এরা কারা? কোন মন্ত্রে এরা হাজার-হাজার তরুণ-বৃদ্ধ-বণিতাকে একত্রিত করেছিল? দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কিভাবে এরা বাংলাদেশের আওয়াজ পৌছে দিয়েছে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত? যতই দিন যাবে এ সব প্রশ্ন ততই মুখ রোচক হবে সন্দেহ নেই! কেউ কেউ আবিষ্কার করবে এরা ‘র’-এর এজেন্ট, কেউ বলবে আওয়ামী লীগের, কেউ বা বলবে এরা সব কমিউনিস্ট, কিংবা নাস্তিক! কিন্তু আসলে কি তাই?

এই শাহবাগীরা বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যারা গত কুড়ি-বাইশ বছরের সীমিত গণতন্ত্রে বেড়ে উঠেছে। এরা বাংলাদেশের মানুষের রক্তে পোড়া আন্দোলন দেখতে দেখতে অভ্যস্থ। এরা দেখে আসছে বাংলাদেশের রাজনীতি কিভাবে একই বৃত্তে ঘোরপাক খাচ্ছে! কিভাবে ভাগ্যের থালা একবার এর হাত থেকে আরেকবার ওর হাতে হাত বদল হচ্ছে! অথচ একই থালা সাবাড় করে নিচ্ছে সব একই চেনা মুখের মাফিয়া! এদেরকে ক্ষমতাসীন করার জন্য কিভাবে বাংলাদেশের মানুষ বাসের ভেতর পুড়ে, পঙ্গু হয়ে ভাঙ্গাচুরা গণতন্ত্রের স্বাদ নিয়ে ধুকে ধুকে মরছে! অথচ এটা হওয়ার কথা ছিল না!

কাজেই ‘শাহবাগ’ই বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার আন্দোলন। শাহবাগীরা বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য তরুণ সমাজ প্রস্তুত। প্রয়োজন প্রচলিত রাজনীতি আর সমাজের কিছু ক্ষতিকর উপসর্গের চির অবসান। নিজেদের অভিজ্ঞতায় এরা উপলব্ধি করতে পেরেছে ‘লেফাফা দুরস্ত’-এ লাভ নেই। প্রয়োজন গোড়া থেকে শুরু করা। তাই তো এরা চলে গেছে ৭১-এ। ’৭১-এর আগাছা পরিস্কার করেই এরা অগ্রসর হবে পর্যায়ক্রমিক ইস্যুগুলোতে। দুর্নীতিমুক্ত রাস্ট্র ও সমাজ, সার্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর ন্যায় বিচার লাভের অধিকারগুলো স্থান পাবে অচিরেই। শাহবাগ তাই থেমে নেই। এটি কোন নীরব-নিথর অঙ্গন নয়। মুক্তির জয়গানে শাহবাগ সদা জাগ্রত। এর আলোক ছটা ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বময়!

নিউইয়র্ক, ২০শে মার্চ ২০১৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “অন্তরে শাহবাগ

  1. তাই তো এরা চলে গেছে ৭১-এ।

    তাই তো এরা চলে গেছে ৭১-এ। ’৭১-এর আগাছা পরিস্কার করেই এরা অগ্রসর হবে পর্যায়ক্রমিক ইস্যুগুলোতে।

    সঠিক ধরেছেন! ৭১ এর আগাছা পরিস্কার করেই আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার বিশ্বাস নতুন প্রজন্ম এটা পারবে…পারতেই হবে…..

  2. মুক্তির জয়গানে শাহবাগ সদা
    মুক্তির জয়গানে শাহবাগ সদা জাগ্রত। এর আলোক ছটা ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বময়! :থাম্বসআপ:

    দারুন… খুব ভালো লিখেছেন

  3. প্রশ্ন আসতে শুরু করেছে- এরা

    প্রশ্ন আসতে শুরু করেছে- এরা কারা? কোন মন্ত্রে এরা হাজার-হাজার তরুণ-বৃদ্ধ-বণিতাকে একত্রিত করেছিল? দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কিভাবে এরা বাংলাদেশের আওয়াজ পৌছে দিয়েছে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত? যতই দিন যাবে এ সব প্রশ্ন ততই মুখ রোচক হবে সন্দেহ নেই! কেউ কেউ আবিষ্কার করবে এরা ‘র’-এর এজেন্ট, কেউ বলবে আওয়ামী লীগের, কেউ বা বলবে এরা সব কমিউনিস্ট, কিংবা নাস্তিক! কিন্তু আসলে কি তাই?

    চমৎকার লিখেছেন ভাইয়া।দীর্ঘজীবী হোক শাহবাগ,শাহবাগের মূলমন্ত্রে কেটে যাক আরো এক দুই যুগ।জাতি পাক সঠিক পথের দিশা !!

    জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু !!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

47 − 38 =