বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হরতাল ও তার গ্রহনযোগ্যতা কতটুক ?

আমাদের দেশের সকল রাজনৈতিক ও অ-রাজনৈতিক সংগঠন গুলোর একটা ট্রেডিশন হলো কথায় কথায় হরতাল দেয়া, দেশ অচল করে দেয়া জনগণকে অবরুদ্ধ করা। আমার ধারনা মতে যদি এদেশে গণভোট হয় শতকরা ৯৫% এই হরতাল নামক তথাকথিত গণতান্ত্রিক দানবের হাত হতে মুক্তি চাইবেন। যারা চাইবেন না তারা হলেল কট্রর রাজনীতিক বা সুবিধাবাদী।

কিন্তু আফসোস যুগে যুগে ভারত উপমহাদেশে এ হরতাল নামক দানবটি চলমান হয়ে আছে। কেউ এটাকে কখনও ভালো কাজে ব্যবহার করেছেন, কেউ এটাকে খারাপ কাজে বা নিজেদের ব্যাক্তি ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্যে ব্যবহার করেছেন।

হরতাল শব্দটি মূলত একটা গুজরাটী শব্দ (গুজরাটিতে હડતાળ বা હડતાલ হাড়্‌তাল্‌) যা সর্বাত্মক ধর্মঘটের প্রকাশক। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।এটা হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত আন্দোলন। হরতালের সময় সকল কর্মক্ষেত্র, দোকান, আদালত বন্ধ থাকে। তবে সাধারণত এ্যাম্বুলেন্স, ফায়ারসার্ভিস, গণমাধ্যমসমূহ এর আওতার বাইরে হয়ে থাকে। [উইকিপিডিয়া]

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দোকানপাট-যানবাহন বন্ধ করে এক অভিনব অসহযোগের কর্মসূচি নিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম হরতাল কর্মসূচি পালনের নজির পাওয়া যায়। স্বাধিকারের এই আন্দোলন যাত্রা থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধকাল পর্যন্ত প্রতিবাদে মুখর বাঙালি জীবনে হরতাল ছিল নিত্যনৈমিত্তিক এক কৌশল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে, পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সম্মিলিত বিদ্রোহের প্রকাশই ছিল তখনকার হরতাল।

এরপর ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে এ হরতাল নামক আন্দোলনকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর পর হতে এ হরতাল নামক দানবটা আস্তে আস্তে জাতীর জীবনে এক বিভিষিকাময় হয়ে উঠতে শুরু করে। যা এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

এখন প্রশ্ন হলো আমরা জনগণ কি হরতা্ল চাই ? আমার জানামতে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শতকরা ৯৫ ভাগ সাধারণ জনতাই হরতালের বিপক্ষে।

তাহলে কেন এই হরতাল ?

কার বা কাদের বিরুদ্ধে এ হরতাল নামক দানবটি ব্যবহার করা হচ্ছে ?

বাস্তবিক অর্থে আজকের বাংলাদেশে এটা কতটা গণতান্ত্রিক অধিকারের আওতায় পড়ে ?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর হলো আমরা সাধারণ জনতা কেউই হরতাল চাইনা বা হরতালের পক্ষে নই। আমাদের দেশের ইতিহাসের আলোকে বলা যায় যখন যে দল বিরোধী দলে থাকে তাদের কাছে অতি প্রিয় আর সরকারের কাছে অতি অ-প্রিয় হলো হলো এ হরতাল। যখন যে ক্ষমতায় থাকে তাদের ভাষায় “হরতাল দেশের ও অর্থনীতির জন্যে ক্ষতিকর”। কিন্তু বিরোধী দলে গেলেই এটা রাজনৈতিক বা তথা কথিত গণতান্ত্রিক অধিকারে রুপ নেয় !

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে, অবস্থার বা হরতালের ঘোষনার আলোকে বুঝায় যে, মুলত সরকারের বিরোদ্ধেই এ হরতাল। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান সময়ে যে সকল হরতাল হচ্ছে তা মুলত বাস্তবিক অর্থে সরকারের বিপক্ষে নয়, পুরোটাই সাধারণ জনগণের বিপক্ষে। যদি সরকারে বিপক্ষে হতো তাহলে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ভবন অবরুদ্ধ থাকত, কিন্তু থাকেনা। যদি সরকারের বিরুদ্ধে হতো তাহলে সচিবালয় বন্ধ থাকত, কিন্ত তা থাকে না। সরকার তার আপন মনে কাজ করে যাচ্ছেন, বিরোধীদল তার সুরের মুর্ছনা দিয়ে রাস্তায় গাড়ী ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও, পিকেটিং, কলকারখানা বন্ধ, হত্যা, গুম সহ জনমনে আতংক তৈরী করে হরতাল করে যাচ্ছে। তাহলে কি দাড়ালো হরতাল পুরোটাই সাধারণ জনতার বিরুদ্ধে। দেশের বিরুদ্ধে।

দেশের বিরুদ্ধে যে কোন কার্যকলাপ অবশ্যই দেশদ্রোহীর আওতায় পড়ে। তাহলে হরতাল কেন দেশদ্রোহী হবে না ? আমাদের দেশে বর্তমানে যেভাবে হরতালকে ব্যাক্তি বা দলের স্বার্থে ব্যবহার করে জাতীয় অর্থনীত পঙ্গু করা হচ্ছে, মানুষ মারা হচ্ছে, রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন চলা-চলে বাধা প্রদান সহ ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগ করা হচ্ছে তা কোন মতেই গ্রহন যোগ্য হতে পারে না। তাই সার্বিক অর্থে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো -হরতাল জাতী, দেশ ও সাধারণ জনতার স্বাভাবিক ও স্বাধীন জীবন যাপনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সন্ত্রাস বৈ আর কিছুই নয়।

তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর অনেক সোজা ও সহজ। বর্তমান সময়ের হরতাল বাস্তবিক অর্থে মোটেই গণতান্ত্রিক কোন কর্মসূচীর আওতায় পড়েনা বা পড়তে পারেনা। আমেরিকার ফর্মূলার তথাকথিত গণতন্ত্রের আলোকেও যদি বলি তাহলে বলা যায়, তুমি হরতাল দিয়েছ, আমি মানিনা । হরতাল দেয়াটা যেমন তোমার অধিকার, তেমনি তা মানা বা পালন করা বা না করা আমার অধিকার। এখানে জোর করে বা ভয়-ভীতি দেখিয়ে মানতে বাধ্য করা কোন গণতন্ত্রের আওতায় পড়ে ? কেউ কি বলতে পারেন ?

যে ভারত হতে হরতালের জন্ম, সেই ভারতেই আদলাত আইন করে দেশ ধ্বংসের বা জন-দুর্ভোগের দানবটাকে বাতিল করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের শাসক শ্রেণীরা তা পারেনাই। কারন ওরা ক্ষমতায় না থাকলে যাতে ওটা ব্যবহার করে আবার জনগণ ও দেশের বারোটা বাজাতে পারে এবং নিজেদের ক্ষমতায় আসার পথ ত্বরা্ন্নিত করতে পারে, তাই ।

ভারতে ১৯৯৮ সালে হরতাল বন্ধের জন্য আদালত রায় দেয়।। হরতাল বা বন্‌ধ’এর বিষয়টিকে রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি মনে হওয়ায় আদালতের রায়ে বন্‌ধ বা হরতাল কর্মসূচী নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এ ধরনের কর্মসূচিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করে তাকে নিরুৎসাহীত করার রায় দেন ভারতীয় আদালত।

সেই সূ্ত্র ধরে বাংলাদেশেও ১৯৯৯-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি কেন হরতালকে একটি গণবিরোধী, অনৈতিক এবং সন্ত্রাসী কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হবে না এ মর্মে একটা সুয়োমোটো রুল জারি করেন বাংলাদেশের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বেঞ্চ। একই বছরে শুরু হওয়া বিচার প্রক্রিয়ায় হাইকোর্ট বেঞ্চ হরতালকে একটি রাজনৈতিক অধিকার বলে রায় ঘোষণা করেন ১৩ মে, ১৯৯৯। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০০৭-এর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সিদ্ধান্তই নেয়। তবে হরতাল চলাকালে এর বিরুদ্ধে বা পক্ষে কোনো রকম সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত হলে তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমের বিধান জারি করার কথাও বলেন উভয় আদালত।

বাংলাদেশের আদালতে যেটা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে দেখানো হয়েছে, সেটাই হরতালের জন্মদাতা মহাত্মা গান্ধীর দেশে রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি বলে বন্ধ করার জন্য রায় দেয়। হায়রে বাংলাদেশ, হায়রে বাংলাদেশের মাথা মোটা বিচারকের দল ! যেখানে হরতাল প্রতিনিয়ত মানুষের জান-মালের হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে, যেখানে হরতাল দেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, যেখানে হরতালের কারনে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, যেখানে হরতালের কারনে সাধারন মানুষদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনের গণতান্ত্রিক অধিকার হরন করা হচ্ছে, সেখানে মাথা মোটা দলেরা ওটাকে একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর মতই রাজনৈতিক অধিকার বলে রায় দিল ! বাহ !!

অতএব, হরতাল কোন মতেই গণতা্ন্ত্রিক অধিকার বা হাতিয়ার নয়, এটা সম্পূর্ন দেশ বিরোধী, দেশের অর্থনীতি বিরোধী, দেশের স্বার্থ বিরোধী, সাধারন জনগণের গনতান্ত্রিক অধিকাররের বিরোধী একটি অ-গণতান্ত্রিক, অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ।

এক্ষেত্রে আমাদের দেশের মিডিয়া গুলোও বেশ ভালো ভুমিকা রাখেন। তারা যখন দেখেন বিরোধী দল কোন হরতাল দিচ্ছেনা, আন্দোলনে নামছেনা (ইস্যু থাকুক বা না থাকুক) তখনই তারা একে ওকে ধরে নিয়ে একখানা সাক্ষাৎকার নেন। সাক্ষাৎকারটার মুল বিষয়টিই থাকে কেন আন্দোলনে নামছেন না, কবে নামবেন, কেন হরতাল হচ্ছেনা, কবে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে তাদের মুখ হতে একখানা আন্দোলনের ডাক নিয়ে ঐ দিনই তা হেড লাইন করে ছেপে দেন, এরপর আর পায় কে ! ব্যবসা শুরু !!! হায়রে মিডিয়া, হায়রে নৈতিকতা ও দায়-দায়ীত্ব !

তাই বিরোধী দল ও হরতাল আহবান কারী সকল সংগঠনগুলোকে অনুরোধ করব আসুন, হরতাল পরিহার করি, আন্দোলনের বিকল্প ও শান্তি পূর্ন কোন পথ তৈরী করে সেই পথে আন্দোলন করে আপনাদের যৌক্তিক ও জাতীয় দাবী আদায়ের জন্যে আন্দোলন করুন, সাধারণ জনগণকে সাথে পাবেন, নতুবা একদিন এদেশের মানুষ আপনাদের এর সমুচীত জবাব দিবে, সেদিন বেশী দুরে নয়।

অন্যদিকে সরকারকে অনুরোধ করছি, দয়া করে দেশ চালানোর যোগ্যতা নিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসুন, যোগ্য মন্ত্রী ও আমলা দিয়ে দেশকে প্রকৃত একটি দেশ-প্রেমিক ও উন্নয়কামী সরকারে পরিনত করুন। যাতে কেউ আন্দোলন করার নামটি পর্যন্ত না নিতে পারে। আপনারা যদি সঠিক ও সুষ্ঠভাবে দেশ পরিচালনা করেন এবং এরপরও যদি বিরোধী দল আপনাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও অপ-প্রচার করে বেড়ায় তাহলে দেখেবেন জনগণই তার প্রতিবাদ করবে । এর বিপরীত হলে জনগণই আবার আপনাদের আস্তাকুরে ফেলে দিবে।

আর বর্তমান সরকারের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ, রাজনীতি নয়, দেশের স্বার্থেই “হরতাল” নামক দানবটাকে আজই কবর দিন। সংসদে বিল আনুন । আপনাদের সংখ্যা গরিষ্টতা আছে। পাস করে নিন। জাতীকে এ দানবটির হাত হতে মুক্তি দিন। আমরা আর লাশ দেখতে চাইনা, দেশের ধ্বংস দেখতে চাইনা, উম্মুক্ত রাজপথে গাড়ীতে দ্বগ্ধ হয়ে কারো আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী তা চাই না। আমরা শান্তি চাই, চাই প্রকৃত অর্থের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার।

আমিন আহম্মদ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হরতাল ও তার গ্রহনযোগ্যতা কতটুক ?

  1. আইন বানানোটা কঠিন কিছু
    আইন বানানোটা কঠিন কিছু নয়,কঠিন হল মানা।হরতাল এসেছে আইন অমান্য করে প্রতিবাদ জানানোর জন্য।যে আইনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও আস্থা নেই সে আইন অমান্য করে প্রতিবাদ জানানো এবং একই সাথে জনগণের কাছে কমিটমেন্ট করা-ক্ষমতায় গেলে এ আইন পরিবর্তন করব,এরই নাম হরতাল।কিন্তু যারা হরতাল করেন তারা নিজেরাই বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে ক্ষমতায় থাকা কালে তৈরি করেছেন,প্রয়োগে সচেষ্ট ছিলেন,রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করেছেন।ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে একই কাজ করবেন।তাই যারা হরতালের নামে এর অপব্যবহার করছেন তাদের কে নিষিদ্ধের দাবি তোলাটাই যৌক্তিক।একথা শুনে হয়তো লোকে পাগল বলবে,তা বলুক।
    সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ পাগলামি একটি সংক্রামক ব্যাধি।

    1. যারা হরতালের অপব্যবহার করেন
      যারা হরতালের অপব্যবহার করেন তারা আজীবন করবেন। তারা তাদের নিষিদ্ধের জন্যে আইন কোনদিনই করবে না।

      তাই হরতাল বন্ধের বিকল্প কোন কিছু জাতীর সামনে খোলা নাই। অন্তত ২০-২৫ বছরের জন্যে হলেও হরতাল বন্ধ করে, এর বিকল্প আন্দোলনের উপায় খুজে দেখা উচিত। ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. ধৈর্য্য ধরে আপনার পোস্টটি
    ধৈর্য্য ধরে আপনার পোস্টটি পড়লাম। খুব ভাল লাগলো। কিন্তু এ মুহুর্তে আপনার আমার কথা কানে সরকার কানে নিলে তো? কারণ বিরোধী দলে গেলে তারাও এই অসস্ত্রটিই ব্যবহার করবে। তাই হরতালের বিরুদ্ধে এখন জনগণকেই হরতাল দিতে হবে। কথায় আছে না লোহাই লোহাকে কাটে……..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3