আইসিসের দাবিক প্রোপাগান্ডা ও কনস্টান্টিনোপল প্রসঙ্গে

সিরিয়ার ছোট একটি শহর দাবিক। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন হাজার। অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক দিক থেকেও শহরটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গত অক্টোবর মাসে বেশ ঘটা করেই দাবিক শহরটি দখল করেছে আইসিস। এবং তারপর থেকে ‘দাবিক’ নামে একটি গ্লসি ম্যাগাজিন তারা প্রকাশ করছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য রিক্রুটমেন্ট। আইসিসের কাছে দাবিক শহরটির এপোকেলিপ্টিক গুরুত্ব আছে, তাদের ধারণা মালাহিম (আরমাগেডন) শুরু হবে এই শহর থেকেই। তাদের এই বিশ্বাসের উৎস সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস। এই হাদিস মোতাবেক, দাবিক থেকেই শুরু হবে শেষ জমানার সেই যুদ্ধ যেই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় মুসলমানদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খিত বিজয় সম্পন্ন হবে এবং দাজ্জাল ও ঈসা নবীর আবির্ভাব ঘটবে। এটি মুসলিম শরিফে ‘আবু হুরাইরা বর্ণিত’ এপোকেলিপ্টিক হাদিসগুলোর একটি। হাদিসটি শুরু হয়েছে এইভাবে – “ আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর নবী বলেছেনঃ শেষ জমানা আসবে না যতক্ষন পর্যন্ত রোমানরা আল আমাক অথবা দাবিকে এসে হাজির না হয়। মদীনা থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৈন্যদের একটা বাহিনী মদিনা থেকে বের হয়ে আসবে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্যে”। ……… (পুরো হাদিস এখানে)

আইসিস দাবিক ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যাতেই হাদিসটি প্রকাশ করেছে। হাদিসটিতে রোমানদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ এবং তার ধারাবাহিকতায় কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের কথা বলা আছে। কনস্টান্টিনোপল বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে এই ভবিষ্যৎবানী করা হয়েছে। আধুনিক জিহাদীরা খুব সম্ভবত ‘রোমান’ শব্দটিকে এই যুগের পাশ্চাত্য রাজনৈতিক শক্তির রূপক হিসাবে ধরে নিয়েছে। কনস্টান্টিনোপল বলতে তারা আধুনিক যুগের কোন শহর বা দেশকে গন্য করছে আমার জানা নাই। কিন্তু রোমান বলতে যদি রোমান এবং কনস্টান্টিনোপল বলতে যদি কেবল কনস্টান্টিনোপলই চিন্তা করা হয়, তাহলে এই হাদিসের এপোকেলিপ্টিক রহস্য আর থাকে না, তার বদলে বাস্তব ইতিহাস উঠে আসে। কারন, এই হাদিসের শুরুর দিকের বেশকিছু বর্ণনা একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের সাথে মিলে যায়। হাদিসটিকে সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে ব্যর্থতার সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে বুঝার চেষ্টা করাটাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

ইসলামের ইতিহাসের সবচাইতে বিখ্যাত একটি যুদ্ধ যাত্রা শুরু হয়েছিল দাবিক থেকে। সেই যুদ্ধ যাত্রার লক্ষ্যও ছিল পূর্ব রোমান তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়। যুদ্ধে মুসলমান সৈনিকদের বড় অংশই নিহত হয়েছিল, একাংশ পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হাদিসের মতো বাকিরা কনস্টান্টিনোপল জয় করতে পারে নাই, বরং পরাজিত হয়ে সিরিয়ায় ফিরেছিল। মুসলিম খলিফাদের আরাধ্য শহর কনস্টান্টিনোপল। খলিফা ওমরের আমলেই পারস্য সাম্রাজ্য মুসলমানদের হাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। খ্রিষ্টান বাইজেন্টাইনের প্রধান তিন শহরের মধ্যে জেরুজালেম এবং আলেক্সান্দ্রিয়া মুসলমানদের দখলে চলে আসে। কিন্তু বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল যেহেতু টিকে ছিল, তাই এশিয়া মাইনর এবং ভুমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন আধিপত্ব বহাল ছিল। খলিফা ওমর সর্বপ্রথম ভুমধ্যসাগরে নৌ বহর পাঠিয়ে কনস্টান্টিনোপল দখল করার চেষ্টা করেন, কিন্তু পরাজিত হয়েছেন। দ্বিতীয়বার (৭১৭-৭১৮খ্রিষ্টাব্দ) কনস্টান্টিনোপল জয় করার চেষ্টা করেন উমাইয়া খলিফা সোলায়মান ইবনে আবদুল মালেক। খলিফা সোলায়মানকে কেউ একজন মহানবীর একটি হাদিসের কথা বলেছিলেন যাতে ভবিষ্যতবানী করা হয়েছিল, কুরানে উল্লেখিত কোন একজন নবীর নামে যে খলিফার নাম হবে, তিনিই কনস্টান্টিনোপল জয় করবেন। খলিফা সুলাইমান ছাড়া উমাইয়া বংশে অন্য কারো নাম যেহেতু কুরানে উল্লেখিত কোন নবীর নামে ছিল না তাই সুলাইমান বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে তিনিই কনস্টান্টিনোপল জয় করবেন। ভবিষ্যতবানী সংক্রান্ত হাদিস উমাইয়া খলিফাদের কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই ঘটনায় তার ধারণা পাওয়া যায়।

কনস্টান্টিনোপল শহরটি গড়ে তুলেছিলেন রোমান সম্রাট কনস্টেন্টাইন। খ্রিষ্টান ধর্মের ইতিহাস অনুযায়ি তিনি প্রথম খ্রিষ্টান রোমান সম্রাট। এশিয়া ও ইউরোপের মিলনস্থলে এবং ভূমধ্যসাগর তীরের এই শহরটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব প্রাচীনকালে ছিল অপরিসিম। সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন এই শহরকে রাজধানী করে ইউরোপ ও এশিয়া বিস্তৃত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করতেন। পরবর্তিতে রোমকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা রোমান এবং কনস্টান্টিনোপলকে কেন্দ্র করে পূর্ব রোমান (বাইজেন্টাইন) এই দুইভাগে রোমান সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের আধিপত্ব ইউরোপে এবং পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের আধিপত্ব এশিয়ায় টিকে থাকে। মুসলমানদের উত্থানের শুরুতেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রন হাড়িয়ে ফেলে। কিন্তু কনস্টান্টিনোপল টিকে ছিল আরো প্রায় আটশত বছর, ফলে আকাড়ে ছোট হয়ে গেলেও সাম্রাজ্যটি হাড়িয়ে যায় নাই, বরং বারবার পুনরুত্থানের চেষ্টা করেছে। কনস্টান্টিনোপলের বিখ্যাত দেয়ালগুলো বারবার তার শত্রুদেরকে ঠেকিয়ে দিয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে কনস্টান্টিনোপল বিখ্যাত ছিল দূর্ভেদ্য দেয়ালঘেড়া শহর হিসাবে, যেসব দেয়াল ধ্বংস করার মতো ‘সিজ উইপন’ বানাতে মানুষের সময় লেগেছে। দীর্ঘদিন অবরোধে থেকেও সমুদ্র পথে শহরটি নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারতো, অন্যদিকে সমুদ্রে বাইজেন্টাইন নৌ বাহিনী ছিল সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ নৌ বাহিনী। ‘গ্রিক ফায়ার’ নামে এক ধরণের জাহাজ বিদ্ধ্বংসী প্রযুক্তি তাদের হাতে ছিল, খলিফা ওমর এবং সোলাইমান দুইজনের নৌ বাহিনীই এই গ্রিক ফায়ারের কবলে পরে ধ্বংস হয়েছিল। দূর্ভেদ্য দেয়াল এবং গ্রিক ফায়ার এই দুই প্রযুক্তির সামনে হাদিসের ভবিষ্যতবানী তাই কাজে লাগে নাই। খলিফা সোলাইমান সমুদ্র ও স্থল দুই পথেই কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন, যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানদের রসদের কমতিও ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা অবরোধটি ইউরোপের শীত কালের কবলে পরে বিপর্যস্ত হয়। এক পর্যায়ে রসদ ফুরিয়ে গিয়ে দুর্ভিক্ষের মুখে পরে খলিফার বাহিনী। শেষ পর্যন্ত স্থলে বুলগেরিয়ানদের হামলায় এবং সমুদ্রে বাইজেন্টাইন নৌ বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়। রি ইনফোর্সমেন্ট হিসাবে পাঠানো সৈনিকদের বড় একটি অংশ যুদ্ধ না করেই পালিয়ে গিয়েছিল। যারা বেঁচে ছিল তারা পরাজিত হয়ে সিরিয়ায় ফিরেছিল। ঐ আমলের মুসলমানদের উপর এই যুদ্ধের প্রভাব ছিল প্রবল। প্রথমবারের মতো মুসলমানদের মধ্যে দুনিয়া বিজয় নিয়ে হতাশার জন্ম হয়। কনস্টন্টিনোপল বিজয়ের চেষ্টাও বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধে পরাজয়ের হতাশা এবং কনস্টান্টিনোপল জয়ের স্বপ্ন রূপ নেয় জনশ্রুতি ও এপোকেলিপ্টিক সাহিত্যে। যুদ্ধটি শেষ হয়েছিল ৭১৮ খ্রিষ্টাব্দে। সহিহ মুসলিমের সংকলক ‘মুসলিম বিন হাল্লাজ’ জন্মগ্রহণ করেছেন তার ঠিক একশ বছর পর। ততোদিনে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের রাজনৈতিক আকাঙ্খা এপোকেলিপ্টিক হাদিসের ভবিষ্যতবানীতে পরিণত হয়েছিল।

মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষরা এপোকেলিপ্টিক সাহিত্যের মাধ্যমে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামগুলোকে দৈব মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা করতো এবং কঠিন সময়ে ধর্মের অনুসারীদের অনুপ্রানিত করতে এসব সাহিত্য ব্যবহার করতো। ইহুদী-খ্রিষ্টান ঐতিহ্যের বুক অফ দানিয়াল, বুক অফ রিভেলেশন, সেফের জেরুব্বাবেল কিংবা এপোকেলিপ্স অফ সিউডো মেথোডিয়াসের মতোই মুসলমানদের কিতাব আল ফিতানে উল্লেখিত এবং অন্যান্য ফিতান ও মালাহিম সংক্রান্ত হাদিসগুলো একি ধারার এপোকেলিপ্টিক সাহিত্যের অংশ। বুক অফ দানিয়ালে বেবিলনের সম্রাট নেবুচাদনিসারের একটি স্বপ্নের বিভিন্ন প্রতিক ব্যাখ্যা করে নবী দানিয়াল একের পর এক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের ভবিষ্যতবানী করেছিলেন। এইসব ভবিষ্যতবানী বেবিলনের পর পারস্য, তারপর গ্রিক এবং সবশেষে রোমানদের উত্থানের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাথে মিলে যায়। কিতাবের একাংশে ইহুদীদের যে বিপদের কাহিনী লেখা আছে তা ১৬৭-১৬৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জেরুজালেমে ইহুদীদের ধর্মচর্চার উপর সিরিয়ার গ্রিক রাজা এন্টিয়োকাসের আগ্রাসনের কাহিনী। অথচ ইহুদী-খ্রিষ্টান ট্রাইডিশন অনুযায়ী এই কিতাবটি স্বয়ং নবী দানিয়াল লিখেছেন নেবুচাদনিসারের(৬০৫-৫৬২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) আমলে। আধুনিক যুগের গবেষকরা ইতিমধ্যে প্রমান করেছেন যে এই বইয়ের কোন একক লেখক নাই। ইহুদী লোকসাহিত্যের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন লেখকের সম্মিলিত অবদানে দানিয়ালের কিতাবটি রচিত হয়েছে। মোটামুটি ২৫০-১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মাঝে কিতাবটির বিভিন্ন অধ্যায় লেখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগের এধরণের এপোকেলিপ্টিক সাহিত্য মিথোলোজির উপাদান থাকলেও এগুলো একধরণের ঐতিহাসিক দলিল। যেমন, আইসিসের দাবিক প্রোপান্ডায় ব্যবহৃত শেষ জমানা সংক্রান্ত হাদিসটিতে উমাইয়াদের কনস্টান্টিনোপলের ইতিহাস পাওয়া যায়। পল জে আলেক্সান্দার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বাইজেন্টাইন বিষয়ক পন্ডিত এইধরণের সাহিত্যকে বলেছেন, “ক্রনিকলস রিটেন ইন ফিউচার টেন্স”। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসবীদ নাদিয়া মারিয়া এল শেইখ তার ‘বাইজেন্টানিয়া – ভিউড বাই দা আরবস’ নামে একটি বই লিখেছেন, তাতে এই বিষয়ে খুবি গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা করেছেন। আমি বই থেকে সরাসরি কিছু কথা তুলে দিচ্ছি –

আরবদের কাছে যখন পরিস্কার হয়ে গেলো যে অদূর ভবিষ্যতে আর কনস্টান্টিনোপল জয় করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন কনস্টান্টিনোপল বিজয় সংক্রান্ত ভবিষ্যতবানীর জায়গা দখল করেছে এপোকেলিপ্টিক আশা আকাঙ্খা। এই হাদীসগুলো কি আসলেই এই শহরটি দখলে বারবার ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া? একটি হাদিসে সান্তনার সূর পাওয়া যায়, “দুনিয়ায় যদি অন্তত একটি দিনও বাকি থাকে, আল্লাহ এই দিনটি এতো বড় করে তুলবেন যে সেই সময়ের মধ্যে আমার পরিবারের একজন আল দালাইলামের পার্বত্য অঞ্চল এবং কনস্টান্টিনোপল জয় করে নেবে”। নবী মুহাম্মদের ভবিষ্যতবানী হিসাবে প্রচলিত বহু হাদিসে শেষ জমানার ছয়টি চিহ্নের একটি চিহ্ন হিসাবে কনস্টান্টিনোপল বিজয়কে উল্লেখ করা হয়েছে। ছয় নম্বর চিহ্ন প্রকাশিত হওয়ার আগেই মুসলমানরা বাইজেন্টাইনদের (রোমান) কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে এবং দাজ্জালের আবির্ভাবের খবর শোনা যাওয়ার পর শহটি জয় করে নেবে। মুসলমানদের এপোকেলিপ্টিক সাহিত্যের অংশ এই কেয়ামততত্ত্ব সংক্রান্ত ভবিষ্যতবানীগুলোকে বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া থেকে আলাদা করে দেখা তাই খুবি কঠিন। এধরণের হাদিসগুলো কবে তৈড়ি হয়েছে তা নির্নয় করা কঠিন, তবে খলিফা আবদ আল মালেক এবং তার পরবর্তি শাসকদের পূর্বে এধরণের হাদিসের সম্ভবত অস্তিত্ব ছিল না।

শেষ জমানা ও কেয়ামত সংক্রান্ত এধরণের আরো বহু হাদিস আছে যাতে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটে যাওয়া ঘটনা পাওয়া যায়। কারন হাদিসগুলো তৈড়ি হয়েছিল সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়। যেমন, বুখারি শরিফে উল্লেখিত কেয়মতের পূর্বে ছয়টি চিহ্নের একটি হাদিসে ৬৩২ থেকে ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে মুসলমানদের জীবনে ঘটে যাওয়া ছয়টি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম চিহ্নটি মহানবীর মৃত্যু, যা ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ঘটেছে, দ্বিতীয় চিহ্নটি হলো জেরুজালেম বিজয় যা খলিফা উমরের সময় ঘটেছিল। তৃতীয় চিহ্নটি বহু মুসলমানের মৃত্যু ঘটানো একটি প্লেগ যা সম্ভবত খলিফা উমরের আমলে সিরিয়ায় ঘটে যাওয়া একটি প্লেগ যাতে বেশ কয়েকজন সাহাবিসহ বহু মানুষ নিহত হয়েছিল। চতুর্থ চিহ্ন হলো গৃহযুদ্ধ যা খলিফা উসমানের হত্যাকান্ড থেকে শুরু হয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে মুখতারের বিদ্রোহ পর্যন্ত সময়ে সংগঠিত হয়েছে (প্রথম ও দ্বিতীয় ফিতনা)। পঞ্চম চিহ্নটি হলো মুসলমানদের অঢেল সম্পদ, যা খলিফা উসমান থেকে শুরু উমাইয়া খেলাফতের সময়কার একটি চিত্র। ছয় নম্বর চিহ্ন হলো রোমানদের সাথে একটি চুক্তি যা ভঙ্গ করে রোমানরা যুদ্ধ শুরু করবে, বাইজেন্টাইনের সাথে উমাইয়া খেলাফত একটি চুক্তি করেছিল ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে, কারন দ্বিতীয় ফিতনার বিদ্রোহ সামাল দিতে গিয়ে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ চালানো উমাইয়াদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। শেষ জমানার হাদিস হিসাবে এই হাদিসটি বুখারি শরিফে জায়গা করে নিলেও বাস্তবে ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিক কিছু ঘটনাকে শেষ জমানার ভবিষ্যতবানীর মতো করে লেখা হয়েছে, তাও আবার খোদ মহানবীর ভবিষ্যতবানী হিসাবে। দ্বিতীয় ফিতনা সামাল দিতে ব্যস্ত উমাইয়ারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান সম্পর্কে যে আশংকায় ভুগছিল তা হাদিসটিতে প্রতিফলিত হয়েছে। এসব হাদিস নিখাদ প্রোপাগান্ডা অথবা পুরনো কোন হাদিসে নতুন নতুন সংযোজনের মাধ্যমে বহুজনের মুখে মুখে তৈড়ি হওয়া। পুরনো হাদিসগুলাও সব মুহাম্মদের বানী কি না তাও সন্দেহের বিষয়। কারন শেষ জমানা সংক্রান্ত একটি হাদিসে ভবিষ্যতবানী করা হয়েছে যে কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে মুসলমানদের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে। তাকবিরে ধ্বসে পরবে কনস্টান্টিনোপলের দেয়াল। মুসলমানদের জেরুজালেম বিজয়ের পূর্বে সিরিয়ার ইহুদীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল এবং সেই লড়াইকে এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধের মর্যাদা দিতে বিভিন্ন এপোকেলিপ্টিক সাহিত্য রচনা করেছিল। ইহুদীদের এপোকেলিপ্টিক সাহিত্যে প্রাচীন টায়ার শহরের রূপকে কনস্টান্টিনোপল শহরের দেয়াল ইহুদী সেনাদের শেমা ধ্বনিতে ধ্বসে পরার ভবিষ্যতবানী পাওয়া যায়। কা’ব আল আহবারের মতো ইহুদী থেকে ধর্মান্তরিত প্রাথমিক যুগের মুসলিম পন্ডিতদের ইসলাম ধর্ম ও তৎকালিন মুসলমানদের সংগ্রামকে ‘ইব্রাহিমী ডিসকোর্সে’র মাঝে জায়গা করে দেয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে বহু ইহুদী এপোকেলিপ্টিক সাহিত্য মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছিল।

বাস্তবে অবশ্য আল্লাহু আকবর ধ্বনীতে নয়, কনস্টান্টিনোপলের দেয়াল ধ্বসে পরেছিল অরবান নামক একজন হাঙ্গেরিয়ান অস্ত্র প্রস্তুতকারকের তৈড়ি বিরাট সাইজের একটি কামানের গোলায়। কামানটি ব্যবহার করেছিল ওসমানি (অটোমান) তুর্কি খলিফা সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের সেনাবাহিনী। তৎকালিন দুনিয়ার সবচাইতে বড় গোলন্দাজবাহিনী নিয়ে তুর্কি সেনারা কনস্টান্টিনোপলের উপর হামলা চালিয়েছিল। এই হামলায়, ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মে কনস্টান্টিনোপল ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। তুর্কি খেলাফতের অধিনে শহরটির নতুন নাম রাখা হয় ইস্তাম্বুল। এখনো এই নামই জারি আছে। হাদিসের ভবিষ্যতবানী ব্যবহার করে উমাইয়ারা কনস্টান্টিনোপল জয় করতে পারে নাই, তারজন্যে তুর্কিদের কামানের দরকার পরেছে। আইসিসের দাবিক প্রোপাগান্ডা আধুনিক যুগের কোন ‘কনস্টান্টিনোপলে’র ভিত্তিমূলে সামান্য ঝাকিও দিতে পারবে না। এই যুগের রোমানদেরকে পরাজিত করার বদলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্বের বৈধতা যুগিয়ে যাবে। শেষ জমানা সংক্রান্ত এইসব প্রোপাগান্ডায় শুধু কিছু মুসলিম তরুণ বিভ্রান্ত হবে, আইসিসের রিক্রুটমেন্ট বাড়বে। আইসিসের উদ্দেশ্যও তাই, রিক্রুটমেন্ট।

দরকারি পাঠঃ
* JEWISH APOCALYPTIC LORE IN EARLY ISLAM:RECONSIDERING KAʽB AL-AHBAR by John C. Reeves
* Byzantium Viewed by the Arabs by Nadia Maria El-Cheikh

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আইসিসের দাবিক প্রোপাগান্ডা ও কনস্টান্টিনোপল প্রসঙ্গে

  1. THE MALHAMA (ARMAGEDDON)
    THE MALHAMA (ARMAGEDDON) DRAWS CLOSER

    Imran N. Hosein

    US air strikes against ISIS in Syria, which seem to have been coordinated with the Ukraine ceasefire, are a smoke-screen hiding an effort to get even with Russia over a NATO black-eye received in Ukraine. If the US can get away with such air strikes – and that appears very likely – then the strikes will escalate until NATO takes on the Syrian armed forces in a final effort to achieve a Libyan-style regime-change in Syria.

    There should be no illusion concerning implications of an ISIS take-over of Syria. The Orthodox Christians will be slaughtered in a genocide intended to put paid to any possible End-time alliance between the Muslim world and the world of Rūm.

    Secondly, while the Russian government may be able to get away with a policy of avoidance of nuclear war with NATO over Syria, public opinion in Russia will not tolerate such a policy in response to a slaughter of Orthodox Christians in Syria.

    The ultimate implication of such a success in Syria is that NATO will then get what the Zionists desperately want, i.e., nuclear war with Russia. It now seems inevitable that such a nuclear war will take place and that it will occur sooner rather than later. When that war takes place within the next 5-10 years time or even sooner, the world will experience the Malhama or Armageddon which Prophet Muhammad (sallalahu ‘alaihi wa sallam) prophesied 1400 years ago.

    It is time enough for analysts around the world to direct primary attention to the coming nuclear war. Islamic eschatology is best equipped to offer a comprehensive explanation of the subject.

    Our Islamic eschatological view is that Pax Judaica is not possible without such a nuclear war which, it is hoped, will wipe out both Russia and her NATO rivals. Our view is that Dajjāl’s ‘day-like-a-week’ will commence with the Malhama when Israel emerges from the nuclear holocaust to succeed USA as the ruling State in a post-nuclear world.

    ​http://www.imranhosein.org/news/522-the-malhama-armageddon-draws-closer.html
    https://www.youtube.com/watch?feature=player_embedded&v=ZyNuvMlIAYk

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =