আরএসও’র জঙ্গিরা দেশের দুই জেলাকে বিচ্ছিন্নের পরিকল্পনা!

বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ। এ দেশে দিনে দুপুরে অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু দেশের হর্তাকর্তারা কিছুই বলেন না। যখন বিষয়টি বিরাট আকারে ধারণ করে তখন কিছু লম্ফঝম্ফ করা হয় তবে বাস্তবে তা ফল দেয় না। বাংলাদেশে এরকমই একটি বিষয় কক্সবাজার ও বান্দরবনে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এর কার্যক্রম। আরএসও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের দুই জেলা কক্সবাজার ও বান্দরবনকে ঘিরে এবং মিয়ানমারের আরাকান নিয়ে ‘স্বাধীন ইসলামী আরাকানিস্তান’ তৈরীর চেষ্টা করছে। আর বাংলাদেশ সরকার নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে।

কক্সবাজার ও বান্দরবনে আরএসও জঙ্গিদের প্রকাশ্য তৎপরতায় সহায়তা দিচ্ছে আ.লীগ, বিএনপি, জামাত, হেফাজত ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট। এর অর্থ হলো দেশের রাজনীতিতে এসব দলের ভেতর অনৈক্য থাকলে জঙ্গিবাদীরা এসব দলের জেলা পর্যায় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা কর্মীদেরকে ঠিকই নিজেদের পক্ষে রাখতে সমর্থ হয়েছে। কক্সবাজার ও বান্দরবনকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রকল্প কক্সবাজার থেকে আরএসও পরিচালনা করছে তার প্রধান তাত্বিক ও সাংগঠনিক নেতা হলেন হাফেজ সালাউল ইসলাম। আর এই হাফেজ সালাউলকে মদদ দিচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আহম্মাদ হোসেন, ইসলামী ঐক্যজোটের মিজবাউর রহমান, কক্সাবাজার ৪ আসনের এমপি ইয়াবা সম্রাট আবদুর রহমান বদি, টেকনাফ থানা মৎস্যলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক জামায়াত নেতা বখতিয়ার মেম্বার।

?oh=5c9648656290eb8a95eaaffa8a61cdb0&oe=55170A4A&__gda__=1426727989_257c18173c7d33423d683f2c08d6de31″ width=”400″ />
বখতিয়ার মেম্বার গভীর রাতে রহিঙাদের মাঝে মাংশ বিতরন করছেন

যেভাবে শুরু হয় ঘটনার:
রোহিঙ্গা বাবা হাফেজ জিয়াউল হকের হাত ধরে ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নাগপুরা ইউনিয়নের কুয়ারবিলা গ্রাম থেকে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসেছিলেন সালাউল ইসলাম। সে সময় জিয়াউর রহমনানের নিমন্ত্রণে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই আশা আর থামানো যায়নি। হাফেজ সালাউল বাংলাদেশে এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর কী কী করেছেন তার সব নথিপত্র একাধিকবার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঢাকার হেড কোয়ার্টারে পাঠিয়েছেন। তবে উল্লেখ্যযোগ কোন অ্যাকশান নেয়নি প্রশাসন।

বাংলাদেশে ঠাঁয় নেওয়া সালাউল কিশোর বয়সেই জড়িয়ে পড়েন আরএসও সঙ্গে। সেইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবানকে কেন্দ্র করে জঙ্গি নেটওয়ার্কের জাল বুনতে থাকেন। এক সময় রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) প্রধান সামরিক কমান্ডারে পরিণত হন। কক্সবাজার ও বান্দরবানে শক্তিশালী জঙ্গি নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানস্তানের উগ্রবাদী ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। সরকারি জমি দখল করে একের পর এক মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। এসব মাদ্রাসায় রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের জামায়াত ইসলাম সহ ইসলামী জঙ্গিবাদীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে থ্রি মার্ডারের একটি হত্যা মামলাসহ আরো একাধিক মামলায় পুলিশের চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্পন্ন। কিন্তু তিনি প্রকাশ্য যাতায়াত করেন, অব্যাহত রেখেছেন তার জঙ্গিবাদী কার্যক্রম। বিপুল এই শক্তির পেছনে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রভাবশালী একজন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য, বিএনপি ও ইসলামী ঐক্যজোট নেতাসহ সর্বদলীয় নেতারা পাশে থাকায় তার টিকিটিও ছুতে পারেনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

গত ১৩ নভেম্বর পুলিশ হাফেজ সালাউলের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবির কক্সবাজারে চালানো তাণ্ডবে তিন ব্যাক্তি হত্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আরো চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

?oh=dd6cfc0484a28af5488048079ec0c7a2&oe=551DD183&__gda__=1423365820_257205bfbe0c7c91a3f77c0a08a457a0″ width=”400″ />
সালাউল

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার সুশিলপন্থি মানুষ শ্যামল কুমার নাথের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছেন,, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। এ ব্যাপারে স্টাডি না করে মন্তব্য করতে চাই না।’

সরকারি জায়গা দখল করে জঙ্গিবাদের চাষাবাস:
মিয়ানমারের মংডু শহরের নাগপুরা গ্রামের কুয়ারবিলা এলাকার বাসিন্দা সালাউল ইসলাম। ১৯৭৮ সালে তিনি বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে আসেন। মৃত হাফেজ জিয়াউল হক ও মৃত ছাবেদা খাতুনের ছেলে হাফেজ সালাউল সৌদি আরবের রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষা নেন। এরপর রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরএসও এর প্রধান সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পান। যোযোাগ করেন মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানের আল কায়েদা সহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে। গড়ে তোলেন একের পর এক মাদ্রাসা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাজারের লিংক রোডে দক্ষিণ মহুরিপাড়ায় সরকারের বন বিভাগের ৭ একর ও স্থানীয় মানুষের ৩ একরসহ ১০ একর দখল করা জায়গায় গড়ে তুলেছেন ইমাম মুসলিম (রা.) ইসলামিক সেন্টার। মূলত এখান থেকেই আরএসও সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর সালাউলের বড় ধরনের উত্থান শুরু হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণা!
২০১২ সালের জুন মাসের শুরুতে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সংঘটিত সহিংসতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দেশটির জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। ওই বছরের ৮ জুন হাফেজ সালাউলের জন্মস্থান মংডু জেলার কোয়ারবিল মাদ্রাসায় জুম্মার নামাজের খুতবায় স্বাধীন ইসলামী আরাকান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করে আরএসওর সামরিক কমাণ্ডার হাফেজ সালাউলের আপন ভাই কোয়ারবিল মাদ্রাসার মোহাতামিম হাফেজ হুজ্জাতুল ইসলাম। বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাকে স্বাধীন আরাকান রাজ্যের ভূখন্ড হিসেবে এই ঘোষণা দেয়া হয়। আরএসও এর এ স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে তখন একাত্মতা ঘোষণা করে মিয়ানমারের আরো চারটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (আরএনও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন (এআরডিও), আরাকান মুভমেন্ট, আরাকান পিপলস ফ্রিডম পার্টি। আর মিয়ানমারের বাইরে ভারত ও বাংলাদেশের হরকাতুল জিহাদ, ‘অ্যাসেম্বলি অব রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন বাংলাদেশ’সহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন এছাড়া আরএসওকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

অ্যাসেম্বলি অব রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন বাংলাদেশ :
বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবানকে ঘিরে আরএসও ভয়ঙ্কর যে নীল নকশা এগিয়ে চলছে তা আরএসও বাস্তবায়নের পাশাপাশি ‘অ্যাসেম্বলি অব রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ও কাজ করছে। অ্যাসেম্বলি অব রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন বাংলাদেশ নামের সংগঠনের আরবি ভাষায় লেখা এক চিঠিতে হাফেজ সালাউলকে ওই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংগঠনটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন আরাকানিয়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

?oh=1a00145259d99417500b52c91b067907&oe=54D56E7C&__gda__=1423185667_eb4aa9366858ae30206c87e60f03c551″ width=”400″ />

?oh=a707cf00be8fe29f460a90d6c8db25fd&oe=551AED6C” width=”400″ />

?oh=65dcb7688790cb2af2932a66764050f8&oe=54D4B8F1″ width=”400″ />
আরবী ভাষায় এই সেই চিঠি

কোথায় কোথায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শক্তিশালী?
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বান্দরবন ও কক্সবাজার তাদের শক্তিশালী ঘাটি রয়েছে। কক্সবাজারের নাইক্ষ্যংছড়ির গর্জনিয়া এলাকার কচ্ছপিয়া গ্রাম, টেকনাফের বাহারছাড়া ও শাপলাপুর, উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রামুর পোকখালী, লেঙ্গুরছড়ি, কাউয়ারখোপ, জোয়ারিয়া নালায়, এছাড়া মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদমে রয়েছে হাফেজ সালাউলের অনুসারি এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শক্ত ঘাটি রয়েছে।

রোহিঙ্গা জঙ্গি আলী জোহার, হাজি ফজল, রফিক আহমদ, হাফেজ নয়ন, লালু ডাক্তার, শামসু মাঝি, হাফেজ জালাল, মৌলানা শফিউল্লাহ, নুরুল হক মাঝি, নূর মোহাম্মদ, আবদুল রশিদ, মোহাম্মদ সায়েদ, আবু কাদের, আবু ইয়াহিয়া, হামিদ, রুহুল আমিন, আবদুল্লাহ মোহাম্মদসহ অনেক জঙ্গি অবৈধভাবে ক্যাম্পে অবস্থান করে জঙ্গিবাদী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা জঙ্গিদের শতাধিক সদস্য কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিন হিসেবেও কাজ করছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু আফগান ফেরত জঙ্গিও রয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন ২০১৩ এর ২১ মার্চ টেকনাফের হৃীলার একটি মাদ্রাসায় গোপন বৈঠককালে হাফেজ সালাউলকে পুলিশ আটক করে। পরে গত বছরে জামায়াতের নায়েবে আমীর দোলোয়ার হোসেন সাইদীর মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির রায়ের পর গত ২০১৩ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবির কক্সবাজারে তাণ্ডব নিহত তিন ব্যাক্তির জন নিহত এবং কক্সবাজারের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আকতার ও ১৯ জন পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার ৩ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে এ মামলায় তিনি জামিনও পান। গত বৃহস্পতিবার এসব মালায় তার বিরুদ্ধে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দায়ের করেছে।

সালাউলের আছে তিনটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট। এসব পাসপোর্ট দিয়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, দুবাই, ইয়েমেন, কাতার, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, ওমান, মিশর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও কয়েকটি আরব দেশে তার জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাদের একাধিক সংগঠক।

নেপথ্যে সর্বদলীয় নেতারা :
হাফেজ সালাউলের কর্মকাণ্ড নিয়ে গোয়েন্দা বাহিনী একাধিক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন ঢাকায়। রয়েছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও নিরীহ রোঙ্গিরাও রয়েছেন আতঙ্কে। তবে এসব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা খুব বেশি কাজে আসেনি। এর কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে হাফেজ সালাউলের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের গভীর সখ্যতা।

ইয়াবা সম্রাট বদির সাথে সখ্যতা :
কক্সবাজার ৪ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমান বদি নিজেও রোজিঙ্গা জনগোষ্টির হওয়ায তিনি রোহিঙ্গাদের প্রতি সহনুভূতিশীল। কিন্তু তিনি রোহিঙ্গা জঙ্গিবাদীদের মদদ দেওয়ায় সাধারণ রোহিঙ্গারাও পড়েছেন বিপাকে। সালাউলের সাথে বদির রয়েছে ঘনিস্ট সর্ম্পক। এই সম্পর্কের বিষয়টি স্থানীয় সাধারণ মানুষ জানে। সম্পর্কের দায় মেটাতে সর্বশেষ আবদুর রহমান বদি দুনীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর দুর্নীতির মামলায় ১৮দিন হাজত খেটে কক্সবাজারে আসেন। এ সময় কক্সবাজার বিমান বন্দর থেকে ৪’শ গাড়ি নিয়ে আবদুর রহমান বদিকে বিশাল সম্বধনা দেওয়া হয়। এই গাড়ি শোডাউনের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন হাফেজ সালাউল।

জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আহম্মাদ হোসেইন :
বাংলাদেশে আরএসও’র প্রধান ঘাটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাফেজ সালাউলের ইমাম মুসলিম (রাঃ) ইসলামিক সেন্টার নামের মাদ্রাসাটি। এই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আহাম্মদ হোসেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি প্রতি মাসে হাফেজ সালাউলের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়ে তাকে শেল্টার দিয়ে থাকেন।

তবে আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি এ কে আহম্মদ হোসেন নিজের সাথে হাফেজ সালাউলের গভীর সখ্যতার বিষয়টি গোপন রাখেননি। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বললেন, হাফেজ সালাহুলের মাদ্রাসার মূল কমিটির আমি সদস্য ও এতিমখানার সভাপতি। ৭ বছর বয়সে সালাহুল এদেশে আসেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে পড়াশুনা করে সৌদী আরবের রিয়াদে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করেছে। বাংলাদেশর ১০ জন শীর্ষ আলেমের মধ্যে সে একজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় গোয়েন্দারা জামায়াতের পয়সা খেয়ে তাঁকে জঙ্গি বলে অপপ্রচার চালান। আমরা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তাঁকে সর্বাÍক সহযোগিতা করি। তানা হলে জামায়াত ইসলাম তাঁকে অর্থের বিনিময়ে দলে ভিড়িয়ে ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে পড়বে। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ যে অভিযোগে চার্জশিট দিয়েছে তা আদৌ সত্য নয়। সালাউলকে ঢাকায় নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা পাঁচ দিন ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর দোয়াপ্রার্থী হয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সরকার দলের জেলার সভাপতির দায়িত্বে থেকে এরচেয়ে বেশি কিছু বলতে চাইনা।

বখতিয়ার মেম্বার :
এক সময় ছিলেন জামাত নেতা, এরপর বিএনপি এখ তিনি টেকনাফ থানা মৎস্যলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি হাফেজ সালাউলের ডান হাত। রোহিঙ্গা শিবিরে তার রয়েছে অগাধ প্রভাব।

?oh=5b6f74316aa78f440764991d162ecb0f&oe=550FCFB0″ width=”400″ />
বখতিয়ার মেম্বার ও সালাউল

সাবেক ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ ও তার ছেলে জেলা ছাত্রশিবিরের অস্ত্র প্রশিক্ষক নামে খ্যাত হেলাল উদ্দিন। গত কোরবানীর ঈদে রাতের আধারে ১৬’শ কোরবানীর গরুর মাংস তারা বিতরণ করেন।মিয়ানমার থেকে কোন রোহিঙ্গা পার হয়ে এলেই তাকে ঠায় দেয় বখতিয়ার মেম্বার। ইয়াবা ব্যবসায়ী বখতিয়ার মেম্বার শূন্য থেকে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। কক্সবাজার সদরের টার্মিনাল পেট্রোল পাম্পের পিছনে তার আট্টলিকা বিলাস বহুল বাড়ি নির্মাণ ও কুতুপালং ক্যাম্পের চার পাশে তার রয়েছে ৪ টি অস্থায়ী বসত ঘর ও কুতুপালং বাজারে বিলাস বহুল একাধিক মার্কেট তৈরি করেছে।

অন্য মিত্ররা কি বলেন?
আরএসও এই সাবেক প্রধান কমান্ডেরের অন্যতম আশ্রয়দাতা ভারপ্রাপ্ত জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আহাম্মদ হোসেন ছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছে, জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল্লাহ, ওলামা দলের জেলা সভাপতি মাওলানা আলী আহসান, জেলা ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ও হেফাজত ইসলামী নেতা মুফতি ইনামুল হক, জেলা ইসলামী ঐক্যজোট সভাপতি হাফেজ সালামত উল্লাহ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. ইসমাইল। এ ছাড়া হাফেজ সালাউলের ব্যাক্তিগত সহকারি হিসেবে কাজ করছেন জেলা ছাত্রলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সোহেল।

জেলা ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি হাফেজ সালামত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা সালাহুলের একটি মাত্র কমিটিতে শূরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। তাঁর আরো অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে তেমন কিছু জানা নেই।’

হাফেজ সালাউলের আরেক ঘনিস্ট সহচর জেলা ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতে ইসলাম নেতা মুফতি এনামুল হক বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্যগত ও তাদের কর্মকান্ড পছন্দ না হওয়ায় দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি।’

এতো টাকা কোথা থেকে আসে ?
কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২টি মাদ্রাসা ও ১৫টি মসজিদ রয়েছে হাফেজ সালাউলের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে মসজিদগুলোর বেশিরভাগ অবস্থান রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীসংঘের স্মরণার্থি বিষয়ক প্রতিষ্টান ইউএনসিএইচআর পরিচালিত নিবন্ধিত ক্যাম্প উখিয়ার কুতুপালং ও অনিবন্ধিত ক্যাম্প টেকনাফের শামলাপুরে।

?oh=252cee3650359c458f6c296d703a1337&oe=54DC3B0B” width=”400″ />
সালাউলের তৈরি মসজিদ, ইনসেটে সালাউল

ইমাম মুসলিম (রাঃ) ইসলামিক সেন্টার নামক মাদ্রাসাটি একটি টিনসেড ও ছোট একটি মসজিদ দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে অবকাঠামো হিসেবে দেখা যায় একটি এক তলা ভবন, ২টি তিন তলা ভবন, ২টি অত্যাধুনিক চারতলা ভবন, ১টি টিনসেড ভবন, ১টি দোতলা অত্যাধুনিক মসজিদ ১টি টিনসেড ভবন রয়েছে। এছাড়া মাদ্রাসা কমপাউন্ডেই সালাহুলের জন্য ১টি অত্যাধুনিক বাসভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সালাউল নিজে চলাফেরা করার জন্য একটি মাইক্রোবাস ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় ৬’শ অধিক ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মচারী মিলে ৬০ জন রয়েছে। এই মাদ্রাসা সহ আরো বারো মাদ্রাসায় প্রতি মাসের খরচ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে। এসব মাদ্রাসা ও মসজিদের অর্থ ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে সরকারী কোন সংস্থার তদারকি নেই। ইমাম মুসলিম ইসলামিক সেন্টারের নামে কক্সবাজার শাখায় আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকে (হিসাব নম্বর- ১০৬৮) ও একই প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন ওমাইর এতিমখানা নামে কক্সবাজার ঢাকা ব্যাংক শাখায় ( হিসাব নম্বর-৮১.২০০.৭১০৩) হিসাব খুলা হয়েছে। অথচ এই দুই ব্যাংক হিসেবে কোন অর্থ লেনদেন হয় না এ পর্যন্ত।

ইমাম মুসলিম (রাঃ) ইসলামিক সেন্টার মাদ্রাসার বেশির ভাগ শিক্ষকই আহলে হাদিস মতাদর্শী বলে জানা যায়। মাদ্রাসায় মাঝে মধ্যেই দেশ-বিদেশ থেকে আহলে হাদিস মতাদর্শী লোকজন এসে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও বৈঠকে মিলিত হয়। মাদ্রসাটির উত্তর-পশ্চিম পাশে রয়েছে কক্সবাজার-চট্রগাম হাইওয়ের লিংকরোডের কাছে পাহাড়ের উপর প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার সরকারী কলেজ ও কক্সবাজার কলেজিয়েট স্কুল। এছাড়া শিবির ক্যাডার ভিপি বাহাদুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জুনিয়র হাইস্কুলও রয়েছে সেখানে।

এসব কিসের আলামত ?
হাফেজ সালাউলের অনুসারিদের কাছে পুলিশের একটি দল খপ্পরে পড়ে। গত বছরের প্রথম দিকেব বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির কুরিক্যং এলাকার ডলিঝিরি মসজিদের কাছে গিয়ে পুলিশ পৌঁছালে চারদিক থেকে সশস্ত্র আরএসও সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলে এবং হাত-পা বেঁধে অস্ত্র কেড়ে নেয়। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় পাহাড়ের আরএসও ক্যাম্পে। আটক পুলিশ সদস্যদের বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করেন স্থানীয় এক ইউপি সদস্য। পরে অস্ত্রসহ ছাড়া পায় পুলিশ সদস্যরা। অপহৃত পুলিশ সদস্যদের আরএসও’র কুরিক্যং ঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছিল। এ ঘাঁটির দক্ষিণ-পূর্বে ওয়াইচ্চাখালি, পশ্চিম-দক্ষিণে আবু তালেব হাজির বাগান। পশ্চিমে ইটের রাস্তা, পূর্বে কোয়ানজিরি মুখ, উত্তরপূর্বে বাঁশখোলা, উত্তরে কালিনজিরির সীমানা। প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার জুড়ে এই ক্যাম্প এলাকা অবস্থিত।

এই ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন মওলানা ছলিম (৫৫)। ১৯৯৬ সালে এই ক্যাম্পসংলগ্ন লম্বাখালী এলাকায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে গ্রেফতার হয়েছিল ৪১ জঙ্গি। এদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত হয়ে ফের আত্মগোপনে চলে গেছে। আরএসওর প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ ইউনুছ, রোহিঙ্গা নেতা ড. ওয়াকার উদ্দিন, আবুল ফয়েজ জিলানী, সালামত উল্লাহ, মোহাম্মদ শফি উল্লাহ, নাজমুল আলম,লন্ডন প্রবাসী নুরুল ইসলাম, ড. মোহাম্মদ ইউনুস, হাজি মোহাম্মদ জাবের ও রাশেদ আহমদ, ইউনুস আবাদী, আবু আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, নুর মোহাম্মদ মনসুর, আবদুল রশিদ, মোহাম্মদ সায়েদ, আবু কাদের, আবু ইয়াহিয়া মীর আহমদ, হামিদ, রুহুল আমিন ও আবদুল্লাহ মোহাম্মদ, এজাহার হোসেন, নুরুল ইসলাম সহ শীর্ষ কয়েক নেতা সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদে বৈঠক করেছেন।

এনজিওরা কি করে?
আরএসও জঙ্গিদের এ তৎপরতার সাথে মুসলিম এইড, ইসলামী রিলিফ, করুণা, ইমাম মুসলিম, দারুল আনসার, সমন্বিত মানবিক উদ্যোগ নামের কয়েকটি এনজিও সরাসরি সহায়তা রয়েঠেছ।

বাংলাদেশ সরকারের নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের পরিচালিত এনজিও সংস্থা মুসলিম এইড, এসিএফ, এমএসএফ এর সাথে আতাঁত রয়েছে।এর মধ্যে মুসলিম এইড নিষিদ্ধ থাকলেও তারা কাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে।

?oh=c939700b046efe830bb32f52709f0bda&oe=54DD7991&__gda__=1423263169_a735d59a680008591ddc3f561e50d910″ width=”400″ />

মিয়ানমার-বাংলাদেশ কেন্দ্রীক ইয়াবা ও হেরোইন পাচার, মালয়েশিয়া কেন্দ্রীক আদম পাচার ও হুন্ডি ব্যবসাসহ নানা খাত থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা এবং এনজিওর নামে বিভিন্ন দেশ থেকে ৩০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে এ কাজ চালানো হয়।

মার্কিন ওয়ার অন টেররের ফাদে বাংলাদেশ :
ইতোমধ্যে আরএসও গোয়েন্দা লিস্টের দুই জঙ্গি চট্রগ্রামে ধরা পড়েছে। এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজর-বান্দরবান,মিয়ানমারের আরাকান হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত একটি উগ্রবাদী ইসলামী গোষ্টির উত্থান চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রজোট। এই উত্থান ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত ও চীনের ওপর তারা আরো প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হবে।এটা ঘটলে বাংলাদেশ সব থেকে দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্য রাষ্ট্রগুলো অনেক প্রতিরোধ করতে পারলেও বাংলাদেশ এই প্রতিরোধ করতেই পারবে না। দেশটি পরিণত হতে পারে ইরাক বা আফগানিস্তান বা সিরিয়া।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কক্সবাজারের এসব এলাকায় সব থেকে বেশি যাতায়াত করেন মার্কিন অ্যাম্বেসেডর। তিনি সেখানে কি করে? শান্তির অমিয় ধারা খেতে যায়? নাকি ভিন্ন কিছু আছে?

কক্সবাজার থেকে ফিরে সরজমিনে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “আরএসও’র জঙ্গিরা দেশের দুই জেলাকে বিচ্ছিন্নের পরিকল্পনা!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − 59 =