বড়লোকের ইসলামের খুটি রক্ষার ধর্মানুভুতি প্রসঙ্গে

এক

জেনে রেখো, দুই কা’বা খোদার রাস্তায়,
এক কা’বা হৃদয়ে, আরেক মক্কায়।
হৃদয়ের কা’বায় করো হজ্জ, পারো যতোবার,
এক হৃদয়ের দাম হাজার কা’বার।
— ওমর খৈয়াম (রুবাইয়াত)

দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও সুফি কবি ওমর খৈয়াম (১০৪৮-১১৩১) যেহেতু মক্কার কা’বার চাইতে মানব হৃদয়কে হাজার গুন শ্রেষ্ঠ ভেবেছেন, তাই মক্কায় হজ্জ করার চাইতে নিশাপুরের মানমন্দিরে বসে গবেষনা এবং কবিতা লেখাকেই বড় ইবাদত ভাবতেন। কিন্তু খৈয়ামের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তৎকালিন মুসলিম দুনিয়ার রাজনীতিতে শিয়া বনাম সুন্নি রাজনৈতিক সংঘাত ও পারস্যের সাচুক সালতানাতের অন্তর্গত দ্বন্দ চরমে উঠেছিল। এইসকল রাজনৈতিক দ্বন্দে খৈয়ামের পৃষ্ঠপোষক সুলতান মালিক শাহ এবং তার মন্ত্রী নিজাম উল মুলক দুইজনই নিহত হয়েছিলেন। শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে মুসলিম সমাজ তখন চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠলো এবং দার্শনিক বিরোধী ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকহীন ওমর খৈয়ামকেও ধর্মীয় ইনকুইজিশনের হুমকিতে পরতে হয়েছিল। ইনকুইজিশন থেকে বাঁচতে, শেষ পর্যন্ত তিনি মক্কার কা’বাতেই হজ্জ করতে চলে যান। মুসলিম পন্ডিতদের ইতিহাস লেখক আল কিফতি (১১৭২-১২৪৮) তার ‘তারিখ আল হুকামা’য় এই ঘটনা সম্বন্ধে লিখেছেন –

“ আমাদের যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবি, খোরাসানের ইমাম ওমর খৈয়াম ছিলেন গ্রিক বিজ্ঞান বিষয়ে একজন মহাপন্ডিত।…… সাম্প্রতিক সময়কার সুফিরা তার কবিতার বাহ্যিক সৌন্দর্যে অভিভুত হয়ে নিজেদের ধর্মচিন্তা অনুসারে তার ব্যাখ্যা করছে, এমনকি তাদের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানেও এইসব কবিতার ব্যবহার করছে। তারা বুঝতে পারছে না যে এইসব কবিতা হলো সুন্দর অথচ বিষাক্ত সাঁপের মতো, যা বাইরে খুবি আকর্ষনিয় কিন্তু ভেতরে বিষাক্ত আর পবিত্র আইনকে মরণ কামড় দিতে উদ্যত। তার সময়কার মানুষেরা যখন তাকে নিয়ে কথা বলা এবং তার ধর্মবিশ্বাসের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করলো, তখন ওমর খৈয়াম নিজের জীবনের ভয় পেয়েছিলেন। তখন তিনি কলম গুটিয়ে নিলেন, এবং জনরোষ থেকে বাঁচতে হজ্জ করতে চলে গেলেন”।

দুই

“নিশ্চয় সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর প্রতিকের অন্তর্গত। সুতরাং, কেউ যদি কা’বায় হজ্জ অথবা উমরা করতে যায় সাফা এবং মারওয়ার মাঝখানে তাওয়াফ করার জন্যে তবে তার কোন পাপ হবে না”। (আল কুরান, ২/১৫৮)

আমি আনাস বিন মালিক’কে জিজ্ঞাস করলাম, “আপনি কি সাফা এবং মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করা অপছন্দ করতেন? তিনি বললেন, “হ্যা, কারন এইসব ইসলামপূর্ব জাহেলিয়া যুগের ধর্মাচার ছিল। কিন্তু ততক্ষন পর্যন্ত, যতক্ষন না আল্লাহ নাজিল করেছেন – নিশ্চয় সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর প্রতিকের অন্তর্গত। সুতরাং, কেউ যদি কা’বায় হজ্জ অথবা উমরা করতে যায় সাফা এবং মারওয়ার মাঝখানে তাওয়াফ করার জন্যে তবে তার কোন পাপ হবে না।” (সহিহ বুখারী)

হজ্জের সমালোচনা করতে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকী একটা ভুল করেছিলেন। তিনি দাবি করেছেন, আরবের লোকজনের ব্যবসা বানিজ্য করার বন্দবস্ত করার খাতিরে আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ হজ্জ আবিস্কার করেছেন। বাস্তবে হজ্জ ইসলামপূর্ব আরবের একটি পৌত্তলিক ধর্মাচার ছিল। মুহাম্মদ এবং তার সময়কার মুসলমানরা শুরুতে জেরুজালেমের দিক মুখ করে নামাজ পড়তেন। কুরানের আয়াত থেকে পরিস্কার হয় যে, শুরুর দিকের মুসলমানরা এমনকি সাফা এবং মারওয়ার মঝে দৌড়াদৌড়ি করাকে পৌত্তলিক ধর্মাচার হিসাবে অপছন্দও করতো। কিন্তু মুহাম্মদ তার ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের পথে আবিস্কার করেছিলেন এবং ওহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন যে আল্লাহ কেবল ইহুদী-খ্রিষ্ঠান একত্ববাদীদের জেরুজালেমে থাকেন না, তিনি পৌত্তলিক আরবদের কা’বাতেও থাকেন। এমনকি আরবের পৌত্তলিকদের কাছে পবিত্র পাহাড় সাফা এবং মারওয়াও আল্লাহর প্রতিক। ফলে আরব ঐতিহ্য ইসলামের ঐতিহ্য হতে পেরেছিল। তেমনি বাঙলার ঐতিহ্যও ইসলামের ঐতিহ্য হতে পারে। আল্লাহ যেহেতু জেরুজেলামে আছেন এবং কা’বাতেও আছেন, সুতরাং তিনি শাহবাগেও আছেন নিশ্চয়। এবং আল্লাহ নিশ্চয় মানুষের অন্তরেও আছেন। কা’বায় হজ্জ করা তাই মুসলমানের কাছে বাধ্যবাধকতা নয়। মুসলমানরা যদিও পরবর্তিতে হজ্জকে ইসলামের পাঁচটি খুটির একটি বানিয়েছে, কিন্তু হজ্জ হলো ইসলামের এমন একটি খুটি যা শুধু বড়লোকের ইসলামকেই দাঁড় করিয়ে রাখে। গরিবের ইসলামের জন্যে বাকি চারটি খুটিই যথেষ্ঠ।

তিন

নবী মুহাম্মদ গরিব ছিলেন, কিন্তু তিনি থাকতেন মক্কা-মদিনায়। তাও তিনি জীবনে হজ্জ করেছেন মাত্র একবার। বড় লোক শেখ হাসিনা অথবা খালেদা জিয়া কিংবা বাংলাদেশের অধিকাংশ এমপি মন্ত্রী মুহাম্মদের চাইতে অনেক বেশিবার হজ্জ করেছেন। ইনু এবং মেনন এখন পর্যন্ত একবার হজ্জ করেছেন। কা’বা কেন্দ্র করে কুরাইশদের ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সোচ্চার ছিলেন। তার জীবদ্দসায় কা’বাকে তিনি ইসলামভুত করেছিলেন বটে কিন্তু ব্যবসাটি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন নাই। বর্তমানে হজ্জ ব্যবসার কর্তৃত্ব সৌদ রাজবংশের হাতে। ইতিহাসের যেকোন সময়ের হিসাবে সৌদ রাজবংশ হজ্জ ব্যবসাকে সবচাইতে বেশি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। ব্যবসায় অধিক লাভের খাতিরে তারা গত প্রায় একশ বছর যাবৎ ক্রমাগত ধ্বংস করে চলেছে মক্কা ও মদিনায় মুহাম্মদ, তার পরিবার ও সঙ্গীদের বহু স্মৃতিচিহ্ন। কা’বার চারপাশ ঘিড়ে গড়ে তুলেছে বড়লোকদের জন্যে আকাশচুম্বি ও ভোগ বিলাশে পরিপূর্ণ সুউচ্চ দালান। বাঙালি মুসলমানের মন থেকে পৌত্তলিকতা এখনো দূর হয় নাই। আর বাঙালি মুসলমানের পৌত্তলিকতা যেহেতু কালচারের চাইতে ধর্মাচারে প্রবল, তাই মুহাম্মদের ধর্মব্যবসা বিরোধী সংগ্রামে তারা আল্লাহ অথবা ইসলামকে খুঁজে পায় না, তারা ইসলাম খুঁজে পায় সৌদ রাজবংশের ব্যবসায়। বড়লোকের ইসলামের খুটি নিয়ে কেউ কিছু বললে তার ধর্মানুভুতি আহত হয়, কিন্তু সৌদ রাজবংশের ধর্মব্যবসায় তার ধর্মানুভুতি আহত হয় না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “বড়লোকের ইসলামের খুটি রক্ষার ধর্মানুভুতি প্রসঙ্গে

  1. লেখা পড়ে মনে হল লেখকের জ্ঞান
    লেখা পড়ে মনে হল লেখকের জ্ঞান বইপত্রে সীমাবদ্ধ। এমন হলে সব টাকা ওয়ালাই হজ্জ করে আসত, আর কত গরীব লোক হজ্জ করতে যায় সেটা সম্মন্ধে আপনাদের কোন ধারনাই নেই। ঈমানী হালত কমজোড় হলে তা প্রকাষ পায়ই। এত কম আই কিউ নিয়ে লাখালেখি ঠিক না… এর চাইতে চাকরী করেন কাজে দিবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

81 − = 74