গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব -৫)

উটের যুদ্ধ প্রথম ফিতনার প্রথম যুদ্ধ। এই যুদ্ধ মুসলমানদের অন্তর্গত ক্ষমতার লড়াই। এই যুদ্ধের কোন পক্ষই নিজেদের যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলে দাবি করে নাই, বা অপরপক্ষের মুসলমানিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে নাই। এই যুদ্ধ ছিল মুসলমানের সাথে মুসলমানের যুদ্ধ। বহু মুসলমানের চোখে এই যুদ্ধ ছিল ভাতৃঘাতি। আলী নিজেই যুদ্ধের পর দুই পক্ষের নিহতদের জানাজা পড়িয়ে এই ভাতৃত্ব বিষয়টাকে স্বিকৃতী দিয়েছেন। মৌখিক ভাবে ফিতনার বিপক্ষে ছিলেন সবাই, আর রাজনৈতিকভাবেও অনেকেই ফিতনার বাইরে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ফিতনা অব্যাহত ছিল। উটের যুদ্ধে বিজয়ের পর মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলে আলীর খেলাফত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সিরিয়ায় মুয়াবিয়া তাকে খলিফা হিসাবে মেনে না নিয়ে খেলাফতের একজন দাবিদার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেন। উসমান হত্যার বিচার দাবীর আন্দোলন পুজি করেই তিনি আলীর খেলাফত অস্বিকার করেছিলেন। খলিফা উমরের সময় মিশর বিজয়ী সেনাপতি আমর ইবনে আল আস মুসলমানদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং আলীর বিরুদ্ধে মুয়াবিয়ার অন্যতম প্রধান সমর্থক ও বন্ধু হিসাবে আবির্ভুত হন। মারওয়ান ও অন্যান্য উমাইয়ারাও মুয়াবিয়াকে কেন্দ্র করেই নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা বাঁচিয়ে রাখে।

উটের যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ৬৫৬ সালের নভেম্বর মাসে। যদিও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমানের চোখে আলী খলিফা হিসাবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু তিনি দ্রুততার সাথে মুয়াবিয়াকে দমন করার মাধ্যমে সব ধরণের বিরোধ নিস্পত্তি করে ফিতনার সমাপ্তি টানতে চেয়েছিলেন। উটের যুদ্ধের কিছুদিনের মধ্যে আলী তার বাহিনী নিয়ে সিরিয়ার পথে যাত্রা করেন। মুয়াবিয়াও আলীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যে যুদ্ধযাত্রা করেন। দুই সেনাবাহিনী ৬৫৭ সালের জুলাই মাসে সিরিয়ার সিফফিনের ময়দানে মুখোমুখি যুদ্ধে অবতির্ণ হয়। যুদ্ধে দুই পক্ষেই বড় ধরণের হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে শেষ পর্যন্ত আলীর বাহিনীই সম্ভাব্য জয়ের পথে ছিল। প্রায় নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে মুয়াবিয়া ধর্মের আশ্রয় নিলেন। মুয়াবিয়ার সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুরানের পাতা লাগিয়ে যুদ্ধ করতে নামলো। এতে আলীর বাহিনীর মধ্যে দ্বিধা তৈড়ি হয়। উটের যুদ্ধের রক্তক্ষয়ের স্মৃতি তখনো মলিন হয়ে যায় নাই। সিফফিনের যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ছিল তার চাইতে অনেক বেশি। ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবনের মতে এই যুদ্ধে আলীর পক্ষের ২৫ হাজার এবং মুয়াবিয়ার পক্ষের ৪৫ হাজার সৈনিক নিহত হয়েছিল। এই অবস্থায় মুয়াবিয়ার সেনাবাহিনী কুরান সামনে রেখে যুদ্ধ করতে নামায় আলীর বাহিনীর অনেকেই যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে আলী মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধি করতে সম্মত হন। সন্ধি অনুযায়ী স্বিদ্ধান্ত হয় যে, সালিশের মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান করা হবে এবং সালিশের রায় দুই পক্ষ মেনে নেবে। আলী ও মুয়াবিয়ার এই সন্ধি এবং তারপরের সালিশের ইতিহাস বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন ভাবে লিখেছে। এরমধ্যে সঠিক ইতিহাসটা পাওয়া কঠিন। তবে সিফফিনের যুদ্ধ, সন্ধি চুক্তি এবং সালিশের এইসব ঘটনাবলী মুসলমানদের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী ভুমিকা রেখেছিল। এইসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আলীর পতন এবং মুয়াবিয়ার উত্থানের সুচনা হয়। সিফফিনের ময়দান থেকেই মুসলমানদের রাজনৈতিক বিভেদ মতাদর্শিক অর্থাৎ মজহাব কেন্দ্রীক বিভেদের রূপ নেয়।

প্রথমত, সন্ধি চুক্তিতে আলী একটি বড় ধরণের রাজনৈতিক ভুল করেন। সন্ধিপত্রে আলীর নামের পাশে ‘আমির উল মুমিনিন’ টাইটেলে মুয়াবিয়ার আপত্তি ছিল। তার যুক্তি ছিল, আলীকে যদি তিনি বিশ্বাসীদের নেতা বা খলিফা মেনেই নিতেন তাহলে তো বিরোধীতা কিংবা যুদ্ধের প্রশ্ন আসতো না। মহনাবীর সুন্নত চিন্তা করে আলী এই যুক্তিটি মেনে নেন। ৬২৮ খ্রিষ্ঠাব্দে মুহাম্মদ মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়ার শান্তি চুক্তি করেছিলেন যাতে মুহাম্মদের নামের পাশে ‘আল্লাহর নবী’ টাইটেলের বিরোধীতা করে কুরাইশরা। তাদের যুক্তি ছিল, আল্লাহর নবী মেনে নিলেতো আর বিরোধীতা কিংবা শান্তি চুক্তির দরকার পরে না। মুহাম্মদ তাদের যুক্তি মেনে নেন। আলী নিজ হাতে হুদাইবিয়ার চুক্তিপত্র লিখেছিলেন। নবীর ঘটনাটিকে উদাহরণ হিসাবে নিয়ে তিনিও সিফফিনের শান্তি চুক্তিতে নিজের টাইটেল উহ্য রাখেন। কিন্তু মুহাম্মদ এবং আলীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ছিল না। মুহাম্মদের অনুসারীদের মাঝে তার নবুয়াত নিয়ে সন্দেহ ছিল না, চুক্তিপত্রে টাইটেল থাকুক বা না থাকুক। ‘আল্লাহর নবী’ টাইটেলের দাবিদার কোন প্রতিদ্বন্দীর সাথে মুহাম্মদ এই চুক্তিটি করেন নাই, চুক্তিটি ছিল মক্কার পৌত্তলিকদের সাথে। অন্যদিকে আলীর সাথে মুয়াবিয়ার যুদ্ধটি ছিল খলিফার টাইটেল নিয়েই। সুতরাং, চুক্তিতে নিজের টাইটেল উহ্য রেখে আলী বড় ধরণের একটি রাজনৈতিক ভুল করেন। সিফফিনের যুদ্ধের পূর্বে সিরিয়া বাদে মুসলিম দুনিয়ায় আলীই ছিলেন প্রায় সর্বজন স্বিকৃত খলিফা, মুয়াবিয়া একজন আঞ্চলিক বিদ্রোহীর বেশি কিছু ছিলেন না। কিন্তু এই চুক্তিপত্রের মাধ্যমে মুয়াবিয়া আলীর সমকক্ষ হিসাবে আবির্ভুত হলেন। চুক্তির স্বিদ্ধান্ত ছিল দুই পক্ষ থেকে দুইজন প্রতিনিধী মিলে একটি সালিশ কমিটি হবে যার রায় দুই পক্ষ মেনে নেবে। মুয়াবিয়ার পক্ষে প্রতিনিধী ছিলেন তার অন্যতম সমর্থক আমর ইবনে আস। আলী তার প্রতিনিধী করতে চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে (আব্বাসিয়দের পূর্বপুরুষ), কিন্তু তিনি যেহেতু আলীর চাচাতো ভাই ছিলেন তাই মুয়াবিয়া পক্ষ তাকে মেনে নিতে রাজি ছিল না। আলী একরকম বাধ্য হয়েই আবু মুসা আল আশারি’কে প্রতিনিধী নির্বাচন করেন। আবু মুসা ছিলেন ফিতনার ঘোরতর বিরোধী এবং নিজেকে ফিতনার বাইরে রাখতে চাইতেন, আলীর খেলাফতের প্রতি তার আলাদা কোন সহানুভুতি ছিল না। সিফফিনের যুদ্ধের প্রায় আট মাস পর আমর ইবনে আস এবং আবু মুসা আল আশারী দুমাত আল জান্দালের ময়দানে জনসম্মখে তাদের রায় ঘোষনা করেন। আমরের অনুরোধে মুসা প্রথমে তার রায় ঘোষনা করেন। তিনি আলী এবং মুয়াবিয়া দুইজনকেই তাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ এবং নতুন খলিফা নির্বাচনের পক্ষে রায় দেন। খুব সম্ভবত দুইজন একি রায় ঘোষনা করবেন বলে স্বিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু আবু মুসার পর আমর যখন রায় ঘোষনা করতে আসলেন, তখন তিনি আলীকে অপসারণের রায় কিন্তু মুয়াবিয়ার খেলাফতের পক্ষে রায় দেন। আবু মুসা বিশ্বাসঘাতকের ভুমিকা পালন করেছেন না কি মুয়াবিয়া ও আমরের কুটকৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন এই বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত আছে। তবে দুমাত আল জাব্বালে ঘোষিত সালিশের এই রায় আলীর পতন এবং মুয়াবিয়ার উত্থানের পেছনে সবচাইতে শক্তিশালী ভুমিকা পালন করেছিল।

আলী এই রায়টি মেনে নেন নাই। অন্যদিকে আলীর সেনাবাহিনীতে এই রায়ের পরপরই বড় ধরণের গোলযোগ তৈড়ি হয় এবং অন্তর্কলহ ও বিভেদের সৃষ্ঠি হয়। রায় ঘোষনার সাথে সাথেই আলীর বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোন শাসক নাই’ এবং ‘কুরান ছাড়া কোন বিচারক নাই’ ঘোষনা দিয়ে এই রায় প্রত্যাখ্যান করে এবং একপর্যায়ে আলীর বিরুদ্ধচারণ করা শুরু করে। এই অংশটি আলীর সেনাবাহিনী ত্যাগ করে এবং আলী ও মুয়াবিয়া দুইজনের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষনা করে। ইসলামের ইতিহাসে এরাই প্রথম ‘খারেজি’ মজহাব হিসাবে পরিচিত। খারেজিদের বিরুদ্ধে যেহেতু শিয়া এবং সুন্নি দুই পক্ষই পক্ষপাতমূলক ইতিহাস রচনা করেছে তাই খারেজিদের পরিচয় ও মতাদর্শ নিয়ে নিরপেক্ষ ধারণা পাওয়া কঠিন। আধুনিক যুগের ঐতিহাসিকরা খারেজিদের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন বৈশিষ্টকে সামনে এনে কেউ তাদেরকে ঈতিবাচক আবার কেউ নেতীবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে হাজির করেছেন। মোটাদাগে আলী ও মুয়াবিয়া দুইজনের বিরুদ্ধেই যে মুসলমানরা বিদ্রোহ করেছেন এবং পরবর্তি সময়ে সুন্নি সমর্থিত খেলাফত এবং শিয়া সমর্থিত ইমামত এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই যে মুসলমানরা বিদ্রোহী ছিলেন এবং নিজেদের জন্যে আলাদা শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং করেছেন, তাদেরকে খারেজি বলা হয়। ঐতিহাসিকভাবে খারেজিরা তাই ঠিক একক কোন পক্ষ নয়। মূলত বিভিন্ন পক্ষ, যারা বিশ্বাস করতো ও প্রচার করতো যে, “আল্লাহর খলিফা হওয়ার জন্যে কুরাইশ গোত্রের কিংবা মুহাম্মদের পরিবারের সদস্য হওয়ার দরকার নাই বরং সৎ ও যোগ্য একজন দাসের পক্ষেও খলিফা হওয়া সম্ভব”, তাদেরকেই খারেজি বলা হয়। খারেজিদের মতাদর্শ ও রাজনীতির কিছু কট্টর বৈশিষ্টের কারণে আধুনিক কালের জিহাদী বিশেষ করে আইসিসের সাথে অনেকে তাদের তুলনা করে থাকেন। আধুনিক কালের জিহাদীদের মধ্যে তাকফিরি প্রবনতা প্রবল, আর ইসলামের ইতিহসে খারেজিরাই প্রথম তাকফিরি হিসাবে পরিচিত। তাকফিরি তারা যারা নিজেদের মতাদর্শের বাইরের অন্য সব মুসলমানকে কাফির বলে ঘোষনা করে এবং তাদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। আলীর পক্ষ ত্যাগ করে খারেজিরা প্রচার করতে থাকে যে, আল্লাহর দেয়া পদকে পায়ে ঠেলে দিয়ে এবং মানুষের হাতে সেই পদের বিচারের ভার ছেড়ে আলী মহা পাপ করেছেন। মুয়াবিয়ার সাথে যুদ্ধে জয় পরাজয়ের মধ্য দিয়েই আল্লাহর স্বিদ্ধান্ত জানা যেতো। যুদ্ধ ত্যাগ করে সালিশ কমিটির হাতে তার খেলাফতের বৈধতার ভবিষ্যত তুলে দিয়ে আলী শুধু পাপই করেন নাই, বরং তার মুসলমানিত্ব খারিজ হয়ে গেছে। মুসলমানিত্ব সম্পর্কে খারেজিদের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল কট্টর, তাদের মতে কেউ পাপ করলেই কাফির হয়ে যাবে যদি না সে তওবা করে। খারেজিরা ছিল প্রবল ধর্মনিষ্ঠ এবং আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়াকে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিতো। আলীর পক্ষ ত্যাগ করার পর তারা বিদ্রোহ শুরু করে এবং অন্যান্য মুসলমানদের উপর হামলা ও হত্যাকান্ড চালাতে থাকে। আলী অথবা মুয়াবিয়ার সমর্থকরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রকৃত মুসলমান ছিল না, সুতরাং এইসব হত্যাকান্ড তাদের ভাষায় বৈধ ছিল। নিজের মতাদর্শের বাইরে অন্যদেরকে কাফির ঘোষনা করা এবং তাদের হত্যাকান্ড বৈধ প্রচার করার এই তাকফিরি প্রবনতার কারনেই আধুনিক জিহাদীদের সাথে অনেকে খারেজিদের তুলনা করেন। কিন্তু অনেকদিক থেকে খারেজিদের সাথে আধুনিক জিহাদীদের বড় ধরণের ফারাক আছে। নেতা নির্বাচন ও স্বিদ্ধান্ত গ্রহণে খারেজিরা সেই সময়কার মুসলমানদের তুলনায় অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ছিল। উমাইয়া খেলাফতের আমলে বেশকিছু জনপ্রিয় বিদ্রোহ হয়েছে খারেজি মতাদর্শের ব্যানারে এবং সফল কিছু খারেজি স্টেটের জন্ম হয়েছিল। পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব বিষয়ে আইসিসের মতো সালাফি জিহাদী সংগঠনগুলোর সাথে খারেজিদের বড় ধরণের তফাৎ আছে। খারেজিরা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যেমন গোত্র অথবা পারিবারিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না, তেমনি পুরুষের পাশাপাশি নারী নেতৃত্বের পক্ষে তাদের একটা অবস্থান ছিল বলে জানা যায়। যেমন, উমাইয়া আমলের হারুরিয়া খারেজিদের ইমাম ছিলেন ঘাজালা আল হারুরিয়া নামে একজন নারী। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি পুরুষদের নামাজেও ইমামতি করেছেন বলে জানা যায়। খারেজিদেরকে তাই আধুনিক কালের কোন মুসলিম মজহাব বা সংগঠনের সাথে তুলনা করে পুরাপুরি বুঝা যাবে না।

মুলত খারেজিদের কারনেই আলীর পক্ষে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সম্ভব হয় নাই। মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান স্থগিত করে আলী খারেজিদের দমনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে বাধ্য হন। ৬৫৯ খ্রিষ্ঠাব্দে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তিনি খারেজিদের মুখোমুখি হন। এই যুদ্ধে খারেজিরা পরাজিত হয়, তাদের অধিকাংশই নিহত হয় অথবা দলত্যাগ করে। খারেজি বিদ্রোহীদের অল্প কয়েকজন মাত্র পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পলাতকরা মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে এবং তাদের মতাদর্শের প্রচার ও নতুন রিক্রুট সংগ্রহ করতে থাকে। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর আলীর ইচ্ছা ছিল সিরিয়ায় মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো। কিন্তু একের পর এক যুদ্ধে ক্লান্ত আলীর সৈন্যদের মধ্যে আবার যুদ্ধে জড়ানোর তেমন ইচ্ছা ছিল না। ফলে আলী অভিযান বাদ দিতে বাধ্য হন। আলী যখন খারেজি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত সেই সময় সিরিয়া ও তার আশেপাশে মুয়াবিয়া কোন ঝামেলা ছাড়াই ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। আলীর অনুগত বিভিন্ন এলাকায় মুয়াবিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। বিশেষ করে মিশরে আলী বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখিন হন। আলী মিশরের প্রশাসক নিয়োগ করেছিলেন তার পালক পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে। মুয়াবিয়ার নির্দেশে আমর ইবনে আস মিশরে হামলা চালান। মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে সহায়তা করার জন্যে আলী তার সবচাইতে অনুগত সেনাপতি মালিক আশথারকে পাঠান, কিন্তু যাত্রাপথেই তিনি নিহত হন। আমর ইবনে আসের সেনাবাহিনীর হাতে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর গ্রেফতার ও পরে নিহত হন। মিশরের নিয়ন্ত্রন এবং নিজের প্রধান দুই সেনাপতিকে হাড়িয়ে আলী রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পরেন। আমর ইবনে আস মিশরের শাসক হয়ে বসেন। আমর মুয়াবিয়ার অনুগত ছিলেন। কিন্তু মুয়াবিয়া যেহেতু খাতা কলমে খলিফা ছিলেন না, তাই আমর একরকম স্বাধীন ভাবেই মিশর শাসন করতেন। ৬৬১ খ্রিষ্ঠাব্দে খারেজিরা আলী, মুয়াবিয়া এবং আমরকে একদিনে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ি একিদিনে ফজর নামাজ পড়ানোর সময় কুফা, সিরিয়া ও মিশরে মুসলিম দুনিয়ার এই তিন নেতার উপর তিনজন খারেজি আততায়ী হামলা চালায়। আবদুল রহমান ইবনে মুলজাম নামের একজন খারেজি আলীকে হত্যা করতে সক্ষম হয়, কিন্তু বাকি দুই আততায়ী মুয়াবিয়া ও আমরকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়। ফজরের নামাজ পড়ানোর সময় বিষ মাখানো ছুড়ি দিয়ে আলীকে আহত করা হয়। এই আঘাতেই পরে আলী মৃত্যুবরণ করেন।

আলীর মৃত্যুর পর অপ্রতিদ্বন্দী মুয়াবিয়া গোটা মুসলিম জাহানের খলিফা হয়ে বসেন। আলী পুত্র হাসান খেলাফতের দাবিতে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হন কিন্তু পরে শান্তি চুক্তি করে মুয়াবিয়াকে খলিফা মেনে নেন। পরবর্তিতে হাসান বিষ প্রয়োগে নিহত হন। মুয়াবিয়া প্রথম বড় ধরণের সমালোচনার মুখে পরেন নিজ পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তি খলিফা হিসাবে নির্বাচিত করে। এর ফলে ইসলামী খেলাফত একটি পারিবারিক ডাইনেস্টিতে পরিণত হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতামত হলো মারওয়ানের পরামর্শে মুয়াবিয়া এই কাজ করেছিলেন। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর মারওয়ান ছিলেন উমাইয়াদের মধ্যে সবচাইতে সিনিয়র ব্যক্তি। ইয়াজিদ খলিফা হলে তিনি তার উপর নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন এই রাজনৈতিক অভিলাষ থেকেই মারোওয়ান পরামর্শটি দিয়েছিলেন। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খলিফা হয়ে বসেন এবং আলী পুত্র হুসাইন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় ফিতনার সুত্রপাত হয়। হুসাইন কারবালার যুদ্ধে নিহত হন। ইয়াজিদও খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে নাই। ইয়াজিদ অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এবং এরপর খলিফা হয়ে বসেন মারওয়ান। ভবিষ্যত উমাইয়া খলিফারা ছিলেন মূলত মারওয়ানের বংশধর। অধিকাংশ সুন্নি ঐতিহাসিক প্রথম ফিতনার সবচাইতে নেতীবাচক চরিত্র হিসাবে মারওয়ানকে চিহ্নিত করে থাকেন। খলিফা উসমানকে কুপরামর্শ প্রদান, আলীর বিরুদ্ধে আয়েশাকে খেপিয়ে তোলা, উটের যুদ্ধে তালহাকে হত্যা করা, মুয়াবিয়াকে কুপরামর্শ দিয়ে ইয়াজিদকে খলিফা বানানো এবং সবশেষে নিজেই খলিফা হয়ে নিজের ডাইনেস্টি প্রতিষ্ঠা করা, সব মিলিয়ে প্রথম ফিতনার সবচাইতে কুটিল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সফল ব্যক্তি হিসাবে ঐতিহাসিকরা তাকে চিহ্নিত করে থাকে। মারওয়ান হয়তো বাস্তবেই কুটচালে ওস্তাদ ছিলেন। কিন্তু শুধু কুটচালে সে মুসলিম দুনিয়ার খলিফা হতে পেরেছিল এই দাবি করা ভুল হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, উসমান অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছিলেন বলেই, আলী উসমান হত্যার বিচার করতে পারেন নাই বলেই, আয়েশা উসমান হত্যার বিচার দাবীর রাজনীতিকে আলী উৎখাতের রাজনীতিতে পরিণত করার পরেই, উটের যুদ্ধে তালহা ও জুবায়ের নিহত হওয়ার পরেই আলী নিহত হয়েছিলেন এবং মুয়াবিয়া নিজ পুত্রকে খলিফা নির্বাচন করার পরেই, এবং খেলাফতের মসনদ নিয়ে মুয়াবিয়া ও আলীর পুত্রের প্রতিদ্বন্দীতার পরেই, হুসেইন এবং ইয়াজিদ উভয়ের মৃত্যুর পরেই, সবশেষে মারওয়ান খলিফা হতে পেরেছিলেন। উসমান, আলী, আয়েশা, তালহা, জুবায়েরের মতো সাহাবীরা ক্ষমতার মসনদ নিয়ে যে লড়াইয়ে জড়িয়ে পরেছিলেন, একে অপরের হত্যাকান্ডের দায়ে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তার পথ ধরেই মারওয়ানের মতো একজন ব্যক্তি খলিফা হতে পেরেছিলেন। এই সত্যকে অস্বিকার করা উচিত হবে না।

দরকারি পাঠঃ
Modern Intellectual Readings of the Kharijites By Hussam S. Timani
The Echoes of Fitna: Developing Historiographical Interpretations of the Battle of Siffin By Aaron M. Hagler

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব -৫)

  1. খুব ভালো লেখা। বাংলা ভাষায় এই
    খুব ভালো লেখা। বাংলা ভাষায় এই রকমের লেখা বিরল। বাংলা ভাষাভাষী জনগন ভীশন উপকৃত হোল এই লেখাটির মাধ্যমে। বাঙ্গালী মুসলমানের এগিয়ে জাবার জন্যে এই ধরনের বুদ্ধি দীপ্ত লেখা খুব প্রয়োজনীয়। লেখক কে অনেক ধন্যবাদ, এই ধরনের একটি অতীব জরুরী লেখা প্রকাশের জন্যে।

  2. খুব ভাল লাগল লেখাটি পড়ে।
    খুব ভাল লাগল লেখাটি পড়ে। লেখাটি পড়ে এই মনে হল যে পৃথীবির আর দশটা ডাইনেষ্টির মতই মুহাম্মদের ডাইনেস্টি ছিল। মুহাম্মদের এত কাছের সাহাবারা যদি বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের মত স্বাধারন মুসলমানরা যখন ইসলামি রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করি, তা কতটা বাস্তব? সাহাবাদের তো আধাত্মিক বা আলৌকিক ক্ষমতা থাকার কথা ছিল, কোন সমাস্যার মুখামুখি হলে কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে তা তো কোরানে লিখা আছে। তারপরেও তাদের এই অবস্থা হল কোন? আল্লাহ কেন তাদের সাহায্য করেন নি? কেন মুহাম্মদ তার উত্যোরাধিকারি নির্বাচন করে যান নি? এইটি কি অপরিনামদর্শিতা নয় কি?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 − = 77