ধর্ম পরিচয়ের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চা। পর্ব -১

ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আফগানিস্তানে প্রায় হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য ছিল। আফগানিস্তানের বামিয়ান প্রদেশে দেড় হাজার বছরের পুরনো পৃথিবীর সবচাইতে বড় দুটি বৌদ্ধ মুর্তি সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে একবিংশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। ২০০১ সালের মার্চ মাসে কয়েক সপ্তাহ যাবৎ এন্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল ও ডিনামাইট দিয়ে হামলা চালিয়ে তালিবানরা মুর্তি দুটি ধ্বংস করে ফেলে। আহমদ ছফা সেই সময়ে ‘তালেবানদের বুদ্ধমূর্তি ভাঙার প্রেক্ষাপট’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এই প্রবন্ধে তিনি একটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রশ্নটি মোটাদাগে এইরকম – “সুলতান মাহমুদ যেই মূর্তি ভাঙেন নাই, মোল্লা ওমর সেই মূর্তি কেনো ভাঙলেন?” গজনীর সুলতান মাহমুদ দক্ষিন এশিয়ার ইতিহাসে সবচাইতে বড় ‘আইকোনক্লাস্ট’ চরিত্র হিসাবে পরিচিত। প্রায় সতের বার তিনি উত্তর ভারতে হামলা চালিয়েছেন। সোমনাথসহ বহু মন্দির ও বহু মুর্তি ধ্বংসকারী হিসাবে তিনি পরিচিত। গজনী আফগানিস্তানের একটি প্রদেশ। সুলতান মাহমুদ পুরো আফগানিস্তান শাসন করেছেন। তার মতো একজন মূর্তিবিদ্বেষী যেই মূর্তিগুলো ভাঙে নাই, সেই মূর্তিগুলো তালেবানরা কেনো ভাঙলো? খালি তালেবানদের নিন্দা করলেই হবে না, মূর্তি ভাঙার পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা বোঝাও জরুরি, এই ছিল ছফার বক্তব্য। তার ভাষায় –

“সুলতান মাহমুদ সতেরবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন। রাজ্যবিস্তারের চাইতে লুটোপাটই ছিল তার প্রধান আকর্ষণ। তিনি সপ্তদশবারে সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করে শ’ শ’ মণ সোনা-রূপা এবং মণি-মাণিক্য কাবুলে নিয়ে যান। সাধারণত ভারতীয় ঐতিহাসিকদের অনেকেই সুলতান মাহমুদকে একবাক্যে পরধর্মবিদ্বেষী এবং মন্দির লুন্ঠনকারী মনে করেন। সুলতান মাহমুদের ভারতবর্ষ অভিযানের সঙ্গে পরধর্ম বিদ্বেষ বা মন্দির ধ্বংস করার কোন পরিকল্পনা ছিল একথা মনে করা ভুল হবে। আবার অনেকে মনে করেন সুলতান মাহমুদ অন্যান্য সম্পদলোভী রাজার মতো সোনা-রূপা ও মণিক্যের আকর্ষণে সোমনাথ মন্দির আক্রমন করেছিলেন। একথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা আছে মনে করা হয়। যদি সুলতান মাহমুদ শুধুমাত্র মূর্তি ধ্বংসের কারণে সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করতেন, তার পূর্বে অবশ্যই তিনি আফগানিস্তনের বুদ্ধমূর্তি এবং মন্দিরসমূহ ধ্বংস করে ফেলতেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি ইতিহাসে মন্দির এবং মূর্তি ধ্বংসকারী হিসেবে খ্যাত সুলতান মাহমুদও এই বুদ্ধ মূর্তিগুলোর গায়ে কোনরকম আচড় কাটেননি।

যে বুদ্ধমূর্তিগুলো সুলতান মাহমুদের রোষের শিকার হতে পারেনি সেগুলো এতদিন পর কী কারণে তালেবানদের রুদ্ররোষের কারণ হয়ে দাঁড়াল সেটা ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখার ব্যাপার। শুধুমাত্র তালেবানদের নিন্দা করলে, তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে ধিক্কার তুললে সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের ইতিহাসে যে পরিবর্তন এবং রূপান্তর ঘটে গেছে তার ব্যাখ্যা মেলে না। দু’হাজার সালে এসে পরিস্থিতি এমন একটা মারাত্মক দিকে মোড় নিল আফগানিস্তানের শাসকেরা মৌলবাদের এমন একটা চূরান্ত পন্থা উদ্ভাবন করলেন যা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সঙ্গে কোনরকম আপস করতে রাজি নয়। তারা মূর্তি ভাঙার স্বিদ্ধান্ত নিলেন ”।

প্রবন্ধটি লেখার কয়েক মাস পরেই আহমদ ছফা (২৮ জুলাই, ২০০১) মৃত্যুবরণ করেন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। তার জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালায়। এর ধারাবাহিকতায় ইসলাম কেন্দ্রীক রাজনীতি এবং দুনিয়ার মুসলিম জনসংখ্যার দেশগুলোর ইতিহাসে বড় ধরণের পরিবর্তন ও রূপান্তরের ঘটনা ঘটে গেছে। তালেবান থেকে আমরা এখন আইসিসের যুগে প্রবেশ করেছি। তালেবানরা বৌদ্ধ মূর্তি ভেঙেছে, আইসিসের হাতে মুসলমানদের মসজিদ-মাজারও নিরাপদ নয়। ইরাক-সিরিয়ায় বহুত্ববাদী সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, পুরো দুনিয়া জুরেই সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি ও ধর্মীয় সহনশিলতা এখন হুমকির মুখে। বেঁচে থাকলে আহমদ ছফা এই পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতেন, ‘‘তালেবানদের বুদ্ধমূর্তি ভাঙার প্রেক্ষাপট’ নামক লেখাটি থেকে আমরা তার কিছুটা ধারণা করতে পারি। ছোট এই প্রবন্ধটি তাই খুবি গুরুত্বপূর্ণ।


আফগানরা যে নিজেদেরকে মুসলমান ভাবার পাশাপাশি বিশুদ্ধ আর্য বলেও মনে করতো এই বিষয়টি আহমদ ছফা উল্লেখযোগ্য মনে করেছেন। আফগানিস্তানের জাতীয় বিমান পরিবহন সংস্থার নাম যে ‘আর্য আফগান এয়ার লাইন্স’ এবং কাবুলের প্রাণকেন্দ্রের নাম যে ‘আর্য-চত্বর’ তা তিনি আমাদের স্ম্বরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর্যত্ব ও ইসলাম দুই নিয়েই তাদের গর্ব। আহমদ ছফার ভাষায় ‘আর্যরক্ত এবং ইসলামি ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে একটা সমন্বয় সাধনের ব্যাপারে আফগানদের কোনরকম বেগ পেতে হয়নি’। তিনি মূলত ‘মুসলমান’ এবং ‘আর্য’ এই দুই পরিচয়ে সমন্বয় সাধন বুঝিয়েছেন। একটি দেশের মানুষ একাধিক এমনকি বহু ধরণের ঐতিহ্যের মাঝে তার পরিচয় খুঁজে পেতে পারে, যেমন কেউ একিসাথে বাঙালি এবং মুসলমান হতে পারে। কিন্তু একটি পরিচয় মূখ্য হয়ে উঠে যখন অন্য পরিচয়গুলোকে বিলুপ্ত করতে চায় তখন সমাজে বিরাজমান বহুত্ব হুমকির মুখে পরে। এতে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পায়। একটি ধর্ম পরিচয়ের মানুষ যখন অপর একটি ধর্মের মানুষকে কেবলি তার ধর্ম সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কারনে নাগরিক ও মানবাধিকারের দিক থেকে অসমান বলে মনে করে, তখন তাকে আমরা সাম্প্রদায়িকতা বলি। এই সাম্প্রদায়িকতাকে কেবলি ‘মূর্তি ভাঙা’র মধ্যে বুঝতে গেলে কখনোই বুঝা যাবে না, বরং তাতে ‘আমি’ বনাম ‘তুমি’র সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৈনিক হয়ে যাওয়ার অবকাশ আছে। সাম্প্রদায়িকতাকে বুঝতে গেলে তাই ‘মূর্তি ভাঙার ইতিহাস চর্চাকে’ও বিচার বিবেচনার বাইরে রাখার উপায় নাই। সুলতান মাহমুদের হিন্দু ও হিন্দু মূর্তি বিদ্বেষ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ডিসকোর্সগুলোর দিকে আমরা নজর দিতে পারি। ১৯৯২ সালে ভারতের অযোধ্যায় হিন্দু মৌলবাদীরা ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদে হামলা চালিয়ে মসজিদটি ধ্বংস করে। ভারতের মৌলবাদী হিন্দুদের মধ্যে সেই সময় আওয়াজ উঠেছিল যে মাহমুদের সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের জবাব হিসাবে তারা বাবরী মসজিদ ধ্বংস করেছে। হিন্দু জনগোষ্ঠি, তাদের ঐতিহ্য ও ধর্মের উপর একজন বর্বর হামলাকারী হিসাবে সুলতান মাহমুদের কাহিনী ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, ঐতিহাসিক এবং হাল জমানার ইসলোমোফোব নাস্তিকরা বেশ ঢালাও ভাবে প্রচার করে থাকেন। এর মূল উদ্দেশ্য ঠিক সুলতান মাহমুদের বদনাম নয়, বরং ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠি ও সংস্কৃতির জন্যে হুমকিস্বরূপ ও ভিনদেশ থেকে আসা একটি বর্বর জাত হিসাবে মুসলমানদের একটি স্টেরিওটাইপ দাঁড় করানো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে মুর্তি ভাঙার ইতিহাস কেবল অতীতের ইতিহাস না, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক ডিসকোর্সের অংশ। ভারতের মার্কসবাদী ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘সোমনাথঃ একটি ইতিহাসের বহু কন্ঠস্বর’ (Somanatha: The Many Voices of a History) নামক বইয়ে সুলতান মাহমুদ ও সোমনাথ মন্দির সংক্রান্ত জনপ্রিয় ধারণাগুলিকে ঐতিহাসিকভাবে বেঠিক এবং আধুনিক কালের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সৃষ্ঠি বলে দাবি করেছেন। থাপার দেখিয়েছেন যে তৎকালিন হিন্দু ও জৈন ইতিহাসে সোমনাথ মন্দির হামলার ঘটনার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে মূর্তি ও মন্দির বিদ্ধংসী ‘সুলতান মাহমুদে’র চিত্র মূলত মুসলমান ঐতিহাসিকরা একেছেন। সুলতান মাহমুদের ধন সম্পদ লুটপাটকে ধর্মীয় কর্মসূচী হিসাবে মহিয়ান করার উদ্দেশ্যেই মুসলিম ঐতিহাসিকরা খুব সম্ভবত এই কাজটি করেছেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের ভাষ্যমতে, সুলতান মাহমুদ সোমনাথ মন্দির ও তার মুর্তি ধ্বংস করার মাধ্যমে ভারতের সবচাইতে বড় ‘আইডল’টি ধ্বংস করেছেন। অথচ সমসাময়িক হিন্দুরা সোমনাথ মন্দিরকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ মন্দির হিসাবে বিবেচনা করতো না। এই বিবেচনা মধ্যযুগের মুসলিম ঐতিহাসিকদের কল্পনাপ্রসূত যা বর্তমানের হিন্দু জাতীয়তাবাদিরাও বিশ্বাস করেন। রোমিলা থাপার দেখিয়েছেন যে, যুগে যুগে সুলতান মাহমুদের ভারত জয়ের এইধরণের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস মুসলমান ঐতিহাসিকদের হাতেই ফুলে ফেপে অতিরঞ্জিত হয়েছে, সুলতান মাহমুদের ধর্মিয় আকাঙ্খা এবং মন্দিরের ধন সম্পদের পরিমানও পরবর্তি যুগের বর্ণনায় একটু একটু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যযুগের এইসব ঐতিহাসিক ডিসকোর্সই ঔপনিবেশিক এবং উত্তর ঔপনিবেশিক যুগের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস ও রাজনীতি চর্চায় জায়গা করে নিয়েছে, যার সূত্রপাত হয়েছিল। উনবিংশ শতকে গড়ে ওঠা এই ধরণের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চা আমাদের সময়ে নতুন শক্তি লাভ করেছে। যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার প্রথম ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের ইতিহাসের হিন্দুকরণের জোরদার প্রচেষ্টা হিসাবে পাঠ্যপুস্তক এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত গবেষনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে এই ধরণের ইতিহাস প্রচার করছে। ফলে ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকেও, রোমিলা থাপার ভাষায়, সুলতান মাহমুদ ও তার ভারত অভিযান নিয়ে এই ধরণের বেঠিক, অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক প্রভাবদূষ্ট ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখানে যেই বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার, তা হলো সুলতান মাহমুদ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে হামলা ও লুটতরাজ করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। রোমিলা থাপার যা বলতে চেয়েছেন, তা হলো ‘সুলতান মাহমুদ’কে ভারতবর্ষের ‘মুসলমান ঐতিহ্যের প্রতিনিধী’ এবং তার লুটতরাজের ইতিহাসকে ভারতবর্ষের ‘হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ইতিহাস’ হিসাবে প্রচার করাটা বর্তমানের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ডিসকোর্সের অংশ।

সুলতান মাহমুদকে ভারতবর্ষের মুসলমানদের প্রতিনিধী হিসাবে প্রচার মুসলমানরাই করেছে। ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে যখন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক পরিচয় কেন্দ্র করে ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছে সেই সময়কার বিভিন্ন রাজনৈতিক ডিসকোর্সের প্রয়োজনীয়তা মেটাতেই ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় নায়ক অথবা ভিলেন হিসাবে চিত্রায়িত করেছে। হিন্দু বিদ্বেষী সুলতান মাহমুদ তেমনি একটি চরিত্র। বাস্তবে সেই সময়কার হিন্দু শাসিত রাজ্যগুলোর সাথে তিনি যে পরিমান যুদ্ধ করেছেন, মুসলিম শাসিত রাজ্যগুলোর সাথেও তার চাইতে কম যুদ্ধ করেন নাই। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের আগমনও সুলতান মাহমুদের হাত ধরে হয় নাই। কিন্তু ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে দক্ষিন এশিয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের যে উত্থান ঘটেছিল তাতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জাতীয়তাবাদীদের কাছে তিনি ভারতের মুসলমানদের প্রতিনিধী ও নায়কে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে হিন্দুদের কাছে তিনি চিত্রিত হয়েছেন হিন্দু ভারতে মুসলিম আগ্রাসনের প্রতিক ও ভিলেন হিসাবে। হিন্দু ও মুসলমানদের এই ইতিহাস চর্চার মাঝে মধ্যযুগে ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বিভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যকার সম্পর্কগুলো বুঝা যায় না, ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাও আবিস্কার করা যায় না, বরং বর্তমান সময়কার হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ের রাজনীতির আকাঙ্খাগুলো বোঝা যায়। বাস্তবে সুলতান মাহমুদ মধ্যযুগের একজন সামন্তপ্রভু ছিলেন যার সেনাবাহিনীতে হিন্দু যোদ্ধারাও (দাস এবং মার্সেনারি) ছিল, ভারতের যেসব অঞ্চল তিনি জয় করেছেন সেসব জায়গায় স্থানীয় হিন্দু ও জৈন শাসকদেরকেই তিনি তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযান মধ্যযুগের একজন সামন্ত প্রভুর রাজনৈতিক অভিযানের উদাহরণ মাত্র, ইসলাম বিস্তার অথবা হিন্দু মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ইতিহাস নয়। ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু বনাম মুসলমানের দ্বন্দ সঙ্ঘাতের ইতিহাস হিসাবে দেখার এই প্রচেষ্টা আধুনিক কালের সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ। এই ইতিহাসে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা আড়ালে থেকে যায়। এই বহুমাত্রিকতার খোঁজ পাওয়া যাবে ভারতে মুসলমান আগমনের ইতিহাসের একেবারে গোড়া থেকেই। তলোয়ার হাতে মুসলমানরা আসার আগেই ভারতবর্ষে সমুদ্রপথে ব্যবসায়ী মুসলিমদের আবির্ভাব ঘটেছিল যারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। দলে দলে মুসলিম সুফিরা এসেছেন, কেউ বসতি স্থাপন ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আবার কেউবা ভারতের আধ্যাত্বিক জ্ঞান শিক্ষা লাভ করার বাসনায়। উমাইয়া খেলাফতের আমলে প্রথম মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধ জয়ের মাধ্যমে ভারতিয় উপমহাদেশে মুসলমানদের রাজনৈতিক আবির্ভাব হয়েছিল। বিজিত ভারতীয় তথা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার বিচারের মাপকাঠি নির্ধারণে এই সময় যে স্বিদ্ধান্ত টানা হয়েছিল তা খুবি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ধর্ম ও খেলাফতের বিকাশের শুরুর দিকে ইহুদী, খ্রিষ্ঠান, জোরাষ্ট্রিয়ানসহ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা নতুন ইসলামী সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে। এরমধ্যে ইহুদী, খ্রিষ্ঠান তথা ইব্রাহিমী ধর্মের অনুসারীরা মুসলিম শাসনের অধিনে ‘আহলে কিতাব’ মর্যাদা লাভ করেছিল। অর্থাৎ, তাদের নিজেদের মতো করে ধর্ম পালন ও নিজ শাস্ত্রের আইন অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। পাশাপাশি আহলে কিতাবদের সাথে মুসলমানদের সামাজিক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক (শুধু মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে) ইসলামী আইন অনুযায়ী বৈধ ছিল। মুহাম্মদ বিন কাশিম সিন্ধ বিজয়ের পর ইরাকে ফেরত যান এবং সমসাময়িক উলামাদের সাথে আলাপ আলোচনা করে ভারতের হিন্দুদেরকে ‘আহলে কিতাব’ বলে ঘোষনা করেন। অথচ হিন্দু ধর্ম ইহুদী, অথবা খ্রিষ্ঠান ধর্মের মতো ইব্রাহিমী ধর্ম ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যের ইব্রাহিমী ধর্মসমূহের বাইরের কোন ধর্মের অনুসারীদেরকে ‘আহলে কিতাব’ হিসাবে চিহ্নিত করা এটাই ইতিহাসে প্রথম। ভারতীয় ধর্ম হওয়া এবং ইব্রাহিমী ধর্মের ঐতিহ্যের অংশ না হওয়া সত্ত্বেও উমাইয়াদের সময়কার উলামারা ঠিক কি কি বিষয় বিবেচনায় হিন্দুদেরকে আহলে কিতাব হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন তার বিস্তারিত আমাদের জানা নাই। আঠারো শতকের দিল্লীর সুফি কবি মির্জা মাজহার জানে জানান ‘বেদ’কে আসমানী কিতাব এবং হিন্দুদেরকে আহলে কিতাব বলে প্রচার করেন। তিনি হিন্দুদের মূর্তি পুজাকে ‘শিরকে’র বদলে ‘উলুহিয়া’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ধর্ম পরিচয়ের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চা। পর্ব -১

  1. হিন্দুরা ‘ আহলে কিতাব ‘ !
    হিন্দুরা ‘ আহলে কিতাব ‘ ! খুব ইন্টারেস্টিং । যুক্তিগুলো জানার কোন সুযোগ আছে ? ” উলুহিয়া ” মানে বুঝাইয়া বলবেন ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − = 82