সহি ইসলামঃ কানার হাতি অথবা রাজনৈতিক ডিসকোর্স

‘সহি ইসলাম’ জিনিসটা কি? এই ভেজাল দুনিয়ায় ‘সহি’ বলিয়া কি কিছু আছে নাকি মশাই?

অভিজিৎ রায়, আসিফ মহিউদ্দিন যখন ইসলামিক নানা ঘটনা উল্লেখ করে জানান দেন- এটাই সহি ইসলাম, তখন ঠিক একমত পোষণ করতে পারি না। বাস্তবে, আমার মতে ‘সহি ইসলাম’ বলে কিছুই নেই। কোন ‘সহি’ ই আসলে সহি নয়। সহি হিন্দুইজম, সহি ইহুদি, সহি খ্রিস্টানিজম- এসব বলে কিছুই নাই। কেননা, সমস্তই মানুষের তৈরি, একটা নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট ভূখন্ডে- মানুষের হাত ধরে এসব ধর্মের উতপত্তি, আরো অসংখ্য মানুষের হাত ধরে এসব ধর্মের দেশ কালের সীমা পাড়ি দেয়া … সুতরাং প্রতিটা পর্যায়েই এগুলোর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ঘটেছে- এমনকি অনেক ধর্মের উৎপত্তিকালকেও যদি ধরি- সেখানে এক বা একাধিক মানুষের আস্ত জীবনকালে নানা ঘটনা, নানা পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ, বক্তব্য দেখা যায়- যেগুলো ধর্ম হিসেবে স্থান পেলে- সেসবের মধ্যে ঠিক কোনটি সহি- কোনটি অসহি এমন বিপাকে পড়তে হয়! হিন্দুরা এককালে গরু খেলেও, ইন্দোনেশিয়ার বালির হিন্দুরা আজকেও গরু খেলেও- বলতে পারি না যে, বালির হিন্দুদের গরু খাওয়াই সহি বা ভারতের হিন্দুদের গরু মাতাকে না হত্যা করাই সহি। ইসলামের কোরআন এর লিটারাল ব্যাখ্যাকেও সহি বলতে পারি না, কেননা ওসমান আমলে এরকম আরো অনেক খন্ড কোরআন পুড়ে ধ্বংস করা হয়েছে। নবীর জীবনকেও সহি ইসলাম বলতে পারি না, কেননা তিনি নিজেই তো একেক সময়ে একেক আচরণ করেছেন। মক্কায় থাকা অবস্থায় যখন চাপে ছিলেন- তখন আল্লাহ প্রেম, মানব প্রেম এর বানী ছেড়েছেন- যার যার ধর্ম তার তার- এসব ভালো ভালো কথা বলেছেন, আবার যখন মদীনায় গিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেন- আরো ক্ষমতা করায়ত্ত্ব করতে গিয়ে ঠিক উল্টো কাজ করেছেন- রাজনীতির প্রয়োজনে হিংসার বানী ছড়িয়েছেন। নিজের প্রয়োজনমত, সুবিধামত আল্লাহর বানী পয়দা করেছেন- কোনটাকে সহি বলবো? নবী মারা যাবার পর পরেই তার সাহাবীদের মধ্যে, আত্মীয়দের মধ্যে খেলাফত নিয়ে ক্যাচাল হয়েছে। সাহাবীদের মধ্যেই কোরআনের ব্যাখ্যা নিয়ে, হাদীস নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে, কোরআন সংকলন নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য হয়েছে; ক্ষমতায় থাকা খলিফাদের রাজনীতির স্বার্থেই যেসব কোরআন হাদীস টিকেছে- সেগুলো পরবর্তী আমলে যেতে পেরেছে! খলিফাদের বেশিরভাগই মুসলমানের হাতে খুন হয়েছেন। কারবালায় দুই গ্রুপ মুসলিমের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছে। এইসব সাহাবীরাই তো মুহম্মদ সাঃ পরবর্তী ইসলামকে পরবর্তী যুগে নিয়ে গিয়েছে। ফলে, কোনটা সহি- কিভাবে সিদ্ধান্ত নেই? ফলে, আমার মতে যার কাছে যেভাবে ইসলাম গিয়েছে- সেটাকেই সে সহি ভাবতেই পারে!

– নাস্তিকের ধর্মকথা (সালাফি সেক্যুলার, সহিহ ইসলাম, কোরআনের contextual পাঠ, বিশ্বাসের ভাইরাস ও বিবিধ বিষয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে)

উপরের কথাগুলো ব্লগার ‘নাস্তিকের ধর্মকথা’ লিখেছিলেন। সহি ইসলাম সম্পর্কে নাস্তিকের ধর্মকথার এই বক্তব্যের সাথে আমি অনেকাংশেই একমত। স্থান কাল ভেদে সহি ইসলামের একটি একক ও নিরবিচ্ছিন্ন রূপ অনেকেই কল্পনা করে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে এইরকম কোন একক, নিরবিচ্ছিন্ন ‘সহি ইসলামে’র খোঁজ পাওয়া আজ অবধি সম্ভব হয় নাই। বিশ্বজোরা বিভিন্ন মজহাবি ধারা, উপধারা এবং একেবারেই আমধারার মুসলমানদের ইসলামের মধ্যে কিছু সাধারণ মিল বের করার চেষ্টা হতে পারে, কিন্তু আদৌ ‘সহি ইসলাম’ বলতে কোন কিছু খুঁজে পাওয়া সম্ভব কি না সেই সন্দেহ থেকেই যায়। জার্মান দার্শনিক নিৎসে তার শেষ দিকের লেখালেখিতে খ্রিষ্ঠান ধর্ম বিশেষ করে খ্রিষ্ঠান নৈতিকতার উৎস সন্ধ্যনে যথেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন, বিশেষ করে তার প্রভাবশালি বই ‘অন জেনোলজি অফ মরালিটি’তে। নিৎসে সত্য অথবা সহি ধারণার সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেনন, তার দাবি অনুসারে মানুষের প্রেক্ষিত (perspective) এবং ব্যাখ্যা(interpretation)র বাইরে কোন সহি ধারণার অস্তিত্ব নাই। নিৎসের মতে জগতের সব ধর্মের একটি bi-partite কাঠামো আছে, খ্রিষ্ঠান ধর্মেরও তাই। অর্থাৎ খ্রিষ্ঠান ধর্মের কিছু পূর্ব থেকে প্রচলিত চর্চা, আচরণ, দৃষ্ঠিভঙ্গী এবং অনুভুতি ছিল যেসবের উপর পরবর্তিতে নতুন অর্থ বা ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যা অতীতে অনুপস্থিত ছিল। নিৎসে মত দিয়েছেন যে, খ্রিষ্ঠান ধর্ম বলতে প্রথমে ছিল ঈসা প্রবর্তিত অথবা উম্মাতি ঈসার জীবনাচার বা দ্বীন, পরে এই দ্বীনের সাথে যুক্ত হয়েছে দ্বীন সম্পর্কে সাধু পলের ব্যাখ্যা (interpretation)। ঈসার দ্বীন আর পলের দ্বীন ব্যাখ্যা এই দুই মিলে গড়ে উঠেছে খ্রিষ্ঠান ধর্ম। নিৎসের ভাষায়, খ্রিষ্ঠান ধর্মের প্রকৃত ইতিহাস হলো ঈসার দ্বীন পলের হাতে ছিনতাই হওয়ার ইতিহাস। এখানে নিৎসে মূলত ক্যাথলিক খ্রিষ্ঠান ধর্মের ইতিহাসের কথা বলছেন। এমনিতে খ্রিষ্ঠান ধর্মে সাধু পলের ব্যাখ্যার বাইরে অর্থডক্স, প্রটেস্টান্টসহ ঈসার দ্বীনের বহু ব্যাখ্যার অস্তিত্ব এবং ইতিহাস আছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যার বাইরে আদী অকৃত্তিম খ্রিষ্ঠান ধর্ম এবং খ্রিষ্ঠান নৈতিকতার উৎস কি? নিৎসে কি ঈসার দ্বিন সহি খ্রিষ্ঠান ধর্ম বুঝিয়েছেন, যা সাধু পল ছিনতাই করেছেন? নিৎসে বরং খ্রিষ্ঠান নৈতিকতার উৎস খুঁজতে গিয়ে খ্রিষ্ঠান ধর্মের এলাকা ছেড়ে ইহুদী ধর্মের এলাকায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার মতে, খ্রিষ্ঠান নৈতিকতার ইতিহাস হলো ‘নৈতিকতায় দাস বিদ্রোহের ইতিহাস’ এবং এর শুরুটা হয়েছে ইহুদী ধর্মাবলম্বি বিশেষ করে ইহুদী পুরোহিতদের মাঝে।

ইসলাম ধর্মের উৎস খুঁজতে গেলেও আমরা ইসলামের একটি bi-partite কাঠামো দেখতে পাই। অর্থাৎ মুহাম্মদি দ্বিন এবং এই দ্বিনের শিয়া, সুন্নি, সুফি ইত্যাদি ধারা ও উপধারার ব্যাখ্যা মিলে হলো ইসলাম। আবার চারটি আইনি মাজহাবের ব্যাখ্যা একজোট হয়ে সুন্নি ইসলাম। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিদার ছিলেন আবু বকর এবং আলী। শিয়ারা আলীকেই প্রথম বৈধ ইমাম মনে করে, সুন্নিরা আবু বকরকে প্রথম বৈধ খলিফা। অথচ শিয়া এবং সুন্নি সম্প্রদায় বলতে আমরা যা বুঝি তার জন্ম হয়েছে আবু বকর এবং আলী দুইজনের মৃত্যুর পর, অর্থাৎ তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের ক্ষমতা কেন্দ্রিক সংগ্রাম ও সংঘাতের ধারাবাহিকতায়। সহি ইসলাম খুজতে গেলে তাই আমরা উৎস হিসাবে মুহাম্মদের কাছে পৌছানোর আগে শুরুতে বহু এবং সবশেষে অন্তত দুই পক্ষের ব্যাখ্যা পাই। সকল ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে শুধু টেক্সটের মাঝে ইসলামের খোঁজ করতে চায় সালাফিরা, কিন্তু খোঁজ নিলে সেই টেক্সটের মাঝে নাম জানা ও না জানা বহু মানুষের ব্যাখ্যা এবং আকাঙ্খার ছাপ পাওয়া যাবে। এতসব রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত ও ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে খোদ ‘মুহাম্মদের জীবন’ থেকে সহি ইসলাম খুঁজে বের করে আনাও কঠিন হয়ে পরে। নাস্তিকের ধর্মকথা যেমন বলেছেন, ‘নবীর জীবনকেও সহি ইসলাম বলতে পারি না, কেননা তিনি নিজেই তো একেক সময়ে একেক আচরণ করেছেন’, এর সাথে একটু দ্বিমত করে বলতে চাই যে, নবী কি করেছেন আর কি বলেছেন তা আমরা জানি পরবর্তী যুগের বিভিন্ন পক্ষের মুসলমানদের প্রেক্ষিত এবং ব্যাখ্যা থেকে। এইসব এড়িয়ে নবীর জীবন সম্বন্ধে সঠিক তথ্য জানাও একটি কঠিন কাজ। পাশাপাশি কেবল নবী মুহাম্মদের জীবন থেকেই সহি ইসলামের খোঁজ পাওয়া যাবে বলেও মনে হয় না, কারণ ইসলাম আকাশ থেকে পরে নাই, মাটি থেকে জন্ম নিয়েছে। সুতরাং, ইসলামের খোঁজ নিতে গেলে আমাদেরকে অপর ইব্রাহিমী ধর্ম ইহুদী এবং খ্রীষ্ঠান ধর্মের এলাকাতেও প্রবেশ করতে হবে। অবশ্য ইসলামের মধ্যে এই ধারার চিন্তাও প্রচলিত আছে যে মুহাম্মদ আদৌ কোন নতুন ধর্মের প্রচার করতে আসেন নাই, তিনি আবহমান ইব্রাহিমী ধর্মের একজন নবী (অথবা ‘ইন্টারপ্রেটর’) ছিলেন। সেই হিসাবে ইসলাম’কে ছয় শতকের আরব দুনিয়ার প্রেক্ষিতে ইব্রাহিমী ধর্মসমূহের মুহাম্মদি ব্যাখ্যা ধরে নিলে ‘সহি ইসলাম’ খোঁজার অনাবশ্যক সমস্যা অতিক্রম করা সম্ভব হয়।

বিভিন্ন প্রেক্ষিত এবং ব্যাখ্যার বাইরে কোন সহি ধারণার অস্তিত্ব আছে কি না সেই প্রশ্ন ফ্রেডরিক নিৎসেই প্রথম তোলেন নাই। ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধরণের দার্শনিক চিন্তা হাজার বছর ধরে প্রচলিত আছে। জৈন ধর্মের অন্যতম ভিত্তী হলো ‘অনেকান্তবাদ’ (“no-one-perspective-ism) । জৈন ধর্মগুরু মহাবীরের শিক্ষামূলক ‘কানার হাতি দেখা’র গল্পের সাথে অনেকেই পরিচিত আছেন। একদল কানা একটি হাতিকে ছুয়ে দেখে হাতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে গিয়েছিল। কোন কানাই যেহেতু পুরা হাতিটিকে ধরে দেখতে পারে নাই, তাই একেকজনের বর্ণনায় হাতি হয়ে গেলো একেক রকম। যে কানা হাতির লেজ ধরেছে, সে বললো হাতি একটি দড়ির মতো প্রাণী, যে হাতির ঠ্যাং ধরেছে সে বললো হাতি হলো মোটা গাছের গুড়ির মতো, যে হাতির সুর ধরলো সে বললো হাতি হলো সাঁপের মতো, এইরকম বহু কানার বহু ব্যাখ্যা। সহি ইসলাম জিনিসটাও এই কানার হাতি’র মতোই। তবে এখানে যেই বিষয়টা বুঝা দরকার তা হলো যে, কানা হওয়া দোষের কিছু না। দোষ হলো, যখন হাতির স্বরূপ নিয়ে কানারা যুদ্ধ শুরু করে। সমস্যা হয় যখন কোন এক কানার ‘সহি ইসলাম’ রাজনৈতিক ডিসকোর্সে পরিণত হয়ে অন্যসব কানার ইসলামকে অস্বিকার এবং অপর কানাদেরকে দমন করতে চায় তখন। পরমত অসহিষ্ণু ও বিদ্বেষী এই কানাদেরকে আমরা মৌলবাদী বলি। ভারতবর্ষে বিশেষ করে বাঙলায় এই ধরণের মৌলবাদ অতীতে কম ছিল প্রাচীন জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের সত্যের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের প্রভাবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে ইসলামের সুফিবাদী ব্যাখ্যার আবির্ভাব ঘটেছিল। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের সহিত্ব বিষয়ে বহুত্ববাদী ঐতিহ্যময় বাঙলায় ইসলাম আবির্ভাবের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানরা আল্লাহকে ডেকেছে ‘নিরাকার নিরঞ্জন’ নামে। সৈয়দ সুলতানের মতো সুফি সাহিত্যিকরা বৌদ্ধ ধর্মের ‘শূণ্য’ এবং ইসলামের ‘আল্লাহ’কে একাকার করে ফেলেছেন। আল্লাহর নিরাকরত্ব বাঙালি মুসলমানের ধর্মচিন্তার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল, যেই ঐতিহ্য আজ অবধি বহমান। সালাফি মুসলমানের আল্লাহ যতোটা সাকার, বাঙালি মুসলমানের আল্লাহ ততোটাই নিরাকার। সালাফিদের মতো বিভিন্ন অতীতমুখি অর্থডক্স ধারার মুসলমানদের পাশাপাশি এখনকার আধুনিক ও তথাকথিত নাস্তিক লেখকদের অনেকেই ‘এই জাতীয় ইসলাম সহি ইসলাম নয়’ বলে প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। কিন্তু এই ধরণের সহি ও বেঠিক ইসলাম সংক্রান্ত ফতোয়াবাজী সেকুলারদের কর্তব্য হতে পারে না। কানা মৌলবাদীদের রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা ও কর্মসূচীর বাইরে সহি ইসলাম বলতে একক কিছুর দাবি নিয়ে কেউ দাঁড়ায় না। একটি ধর্ম তখনি গণমানুষের ধর্ম হয়ে ওঠে যখন সেই ধর্মটি গণমানুষের ঐতিহ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখে। ইসলাম ধর্ম তার প্রাথমিক যুগে গড়ে উঠেছিল আরব ঐতিহ্য, নৈতিকতা ও আচার আচরণের সাথে খাপ খাইয়ে। পরবর্তিতে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ও ঐতিহ্যের মানুষের মাঝে জায়গা করে নেয়ার মতো ফ্লেক্সিবিলিটি ছিল বলেই ধর্মটি পৃথিবীর এতো বিভিন্ন অঞ্চল ও সংস্কৃতির মানুষের ধর্ম হতে পেরেছে।

যারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠির বহুত্বকে অস্বিকার করে কোন বিশেষ গোষ্ঠির প্রচারিত ইসলামকে সহি এবং অন্যদের ইসলামকে ‘আধা’ অথবা ‘মডারেট’ ইসলাম বলে প্রচার করেন তারা দিনশেষে মৌলবাদের পক্ষেই প্রচারণা চালান। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ‘সহি ইসলাম’ নামক ডিসকোর্স রক্ষায় তারা মুসলমানদের চাইতে অধিক তৎপর। এইধরণের প্রচারণা আমাদের সময়কার সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করার ক্ষেত্রে কোন কাজে আসছে না, বরং দিনে দিনে সাম্প্রদায়িক ডিসকোর্সগুলোকেই শক্তিশালী করছে। ইসলামের পক্ষে অথবা বিপক্ষে কথা বলে যারা দিনে দিনে ইসলামের একটি একক এবং সহি রূপ তৈড়ির চেষ্টা করছেন তারা দুনিয়া জুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমানদের বহুত্বকে অস্বিকার করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মতাদর্শিক ডিসকোর্সগুলোকে শক্তিশালি করছেন। আধুনিক যুগে এসে বিভিন্ন ধারণা, ধর্ম, ডিসকোর্স ইত্যাদি যে একক এবং টোটালিটারিয়ান রূপ লাভ করার চেষ্টা করছে তেমনটা অতীতে আর কখনোই হয় নাই। গণমাধ্যমের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশেষ করে ইন্টারনেটের আবির্ভাবে বহুত্বের বিরুদ্ধে মৌলবাদের এই আগ্রাসন এখন আগের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। আজ থেকে একশ বছর আগেও চেচনিয়ার মুসলমানরা নিজেদের ইসলামপূর্ব ঐতিহ্যের মধ্যে বসবাস করতো, এখনো তারা আল্লাহকে ডাকে তাদের পুরনো দেবতার নামে। নব্বই দশকে চেচনিয়ার জাতীয়তাবাদী ও সুফি ঘড়ানার মুসলমানরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছিল। রাশিয়ার হাতে তাদের জাতীয়তাবাদী নেতাদের অধিকাংশই নিহত হওয়ার পর চেচনিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এখন সালাফি মৌলবাদী ককেশাস আমিরাতের জিহাদী সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে যেমন রাশিয়ার আধিপত্ববাদী ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প দায়ি, তেমনি দুনিয়া জোরা ‘সহি ইসলামে’র ডিসকোর্সের ক্ষমতায়নও দায়ি। চেচেনদের ঘটনা একটা উদাহরণ মাত্র, সারা দুনিয়াতেই এই বিষয়গুলো এখন ঘটছে, বাংলাদেশেও তাই। যারা প্রচার করেন যে বাঙালি মুসলমান, চেচেন মুসলমান, শিয়া মুসলমান অথবা আলাওয়িত মুসলমানরা সহি মুসলমান নয়, শুধুমাত্র সৌদি আরব অথবা আইসিসের মুসলমানরাই সহি, তারা সালাফি হন অথবা সেকুলার, দিনশেষে এরা সবাই ইসলামী মৌলবাদের প্রচার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। এদের উদ্যেশ্যেই ফকির লালন গেয়েছেন –

এক কানা কয় আর এক কানারে
চল এবার ভব পারে।।
নিজে কানা
পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারং বার
এসব দেখি কানার হাট বাজার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “সহি ইসলামঃ কানার হাতি অথবা রাজনৈতিক ডিসকোর্স

  1. দূরত্বের কারণে আগে যেভাবে
    দূরত্বের কারণে আগে যেভাবে স্থানিয়ভাবে মতবাদগুলো দানা বাধতো এখন সেযুগ নেই। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পাঁচজন লোক যদি পাঁচ মহাদেশেও অবস্থান করে তবুও তাঁরা একক কোন মতবাদের অনুসারী হতে পারে। আর সময়ের কথা বললে বর্তমান সময়ে যা চলছে বর্তমানের জন্য তাই সহি। বর্তমানের জন্য ইসলামের জঙ্গি রূপটাই সহি রূপ। বিশেষ কোন দোষের বিষয় নয় এটা, কোন সাম্রাজ্যবাদ বল প্রয়োগ ব্যতিরেকে বিস্তার লাভ করেনি। আরবিয় ধর্ম ইসলামের সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং মারাত্মক দিক হচ্ছে যেখানেই গেছে সেখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি ধংস করে আরবিয়করণের প্রচেস্টা। এবং মানুষ যখন মুসলমান হয় তাঁর মধ্যে আরবিয় ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ ঠিক সে সময় রোপণ করা হয়ে যায়। তাই মুসলমানের কাছে আরবিয় এবং মক্কা মদিনার ইসলাম সহি ইসলাম।ধর্মের রূপান্তরিত রূপ যখন মেনে নেয়া হয় তখন সৌদের ইসলামকেও ইসলাম বলে স্বীকার করতে হয়।
    কোন ধর্ম প্রকৃত কি রূপে ছিল, কিভাবে ক্ষনে ক্ষনে বিভিন্ন ব্যক্তির দ্বারা রূপ বদলিয়ে এই রূপে আসলো; এসব বিতর্কের বিষয়। ভবিষ্যতেও ধর্মের হয়তো এই রূপ থাকবে না। ভ্রান্ত বা ক্ষতিকর মতবাদ সহনশীল পর্যায়ে আসে সেক্যুলারদের প্রচেষ্টায়।

    1. কোন ধর্ম প্রকৃত কি রূপে ছিল,

      কোন ধর্ম প্রকৃত কি রূপে ছিল, কিভাবে ক্ষনে ক্ষনে বিভিন্ন ব্যক্তির দ্বারা রূপ বদলিয়ে এই রূপে আসলো; এসব বিতর্কের বিষয়। ভবিষ্যতেও ধর্মের হয়তো এই রূপ থাকবে না। ভ্রান্ত বা ক্ষতিকর মতবাদ সহনশীল পর্যায়ে আসে সেক্যুলারদের প্রচেষ্টায়।

      সহমত।

  2. অভিজিৎ রায়, আসিফ মহিউদ্দিন

    অভিজিৎ রায়, আসিফ মহিউদ্দিন যখন ইসলামিক নানা ঘটনা উল্লেখ করে জানান দেন- এটাই সহি ইসলাম, তখন ঠিক একমত পোষণ করতে পারি না

    ”সহি ইসলাম” থিউরী অভিজিৎ বা আসিফ কেউ-ই আগ বাড়িয়ে বলতে আসেননি। জিঙ্গবাদকে, ইসলামের সন্ত্রাসী চেহারাকে আড়াল করতে ( অথচ গোপনে গোপনে জিহাদের মাধ্যমে খেলাফতের স্বপ্ন দেখা) মডারেট মুসলিমরা যখন “ইহা সহি ইসলাম নহে” বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন তখনই কুরআন- সহি হাদিস, তাফসির থেকে দেখানো হয়েছে ইসলাম ঠিক যা বলেছে তা-ই করছে তালেবানসহ অন্যান্য জিহাদীরা। সেই প্রসঙ্গেই তাদের বলতে হয়েছে সহি ইসলাম বলতে প্রসিদ্ধ হাদিস, তাফসির ও কুরআনকেই ধরতে হয়। যেখানে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এসবকে মান্য করেন। অন্যান্য যারা বিশেষভাবে ট্যাগ খেয়েছেন “ইসলাম বিদ্বেষী” বলে তারা ধমকে ভুয়া, অসত্য, বিকৃত মানসিকতা বলেই জানেন- সেখানে সহি-অসহির কি আছে। যাই হোক, পোস্টের লেখক কখনোই আলোচনায় আগ্রহ দেখাননি কাজেই এটুকু বলেই শেষ করছি। পোস্ট ভাল হয়েছে।

    1. ইসলাম যা বলছে জঙ্গীরা সেটাই
      ইসলাম যা বলছে জঙ্গীরা সেটাই করছে নাকি জনাব সুষুপ্ত পাঠক ?
      হাঃ হাঃ হাঃ হেসেই মরি ।
      তো জঙ্গীরা আবার আত্মঘাতি বোমা হামলা করে ,ফাঁকে বইলেননা যে ইসলামে আত্মহত্যা জায়েয ,এবং উহাই সহী ইসলাম তাইলে ব্লগধোলাই খাইতে পারেন।
      আরেকটা বিষয় খেয়াল করছি ,আপনার আচরন বরাবরই আমার ব্লগের ফুলবানু নিকের মতন কেন ?

      1. জনাব সজল আহম্মেদ, জিহাদীরা
        জনাব সজল আহম্মেদ, জিহাদীরা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী জিহাদ চালাচ্ছে না- সেটা সহি দলিল দ্বারা প্রমাণ করে দেখান। ফাকা আওয়াজ করলে তো হবে না।

        1. ভাই তার আগে আপনি প্রমাণ করুন
          ভাই তার আগে আপনি প্রমাণ করুন ,জঙ্গীদের আত্মঘাতি বোমা হামলা সহ নারী ও শিশুহত্যা ,বিধর্মীদের বিনাযুদ্ধে কতল কোরআন কিংবা হাদীসের কোন পাতায় লেখা আছে ?
          আশাকরি না প্যাঁচিয়ে সহীহ্ উত্তর দিবেন 🙂

    2. কখনোই আপনার সাথে আলোচনার
      কখনোই আপনার সাথে আলোচনার আগ্রহ দেখাই নাই এই অভিযোগটি বোধহয় সঠিক না। যতোদুর মনে পরে আপনি প্রথম যখন আমার একটি পোস্টে এসে তর্ক শুরু করেছেন আমি সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছি এবং আলোচনা করেছি। কিন্তু আপনি যেহেতু প্রতিনিয়ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে গেছেন এবং বিষয়বস্তুর বাইরে গিয়ে বিভিন্ন আক্রমনাত্বক অভিযোগ করেছেন তখন নেহায়েত অর্থহীন বিতর্কে সময় না দিতে পারার ব্যর্থতা হেতু সেসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছি। অনর্থক তর্ক এড়ানোর অধিকার নিশ্চয় আমার আছে? প্রাসঙ্গিক আলোচনা করলে অবশ্যই উত্তর দেবো।
      নাস্তিকরা কিভাবে সহি ইসলাম সংক্রান্ত বিতর্কে জড়িয়েছে সেটা আমি জানি। আমি নিজেও কখনো সহি ইসলাম নিয়ে মুসলমানদের সাথে এইরকম অহেতুক বিতর্কে জড়াই নাই সেই দাবিও করতে পারবো না। ৫/৬ আবছর আগে ব্লগের কিছু বিতর্ক খুঁজলে দেখা যাবে আমিও কোরন হাদিস ঘেটে মডারেট মুসলিমদেরকে সহি ইসলাম চেনানোর চেষ্টা করেছি নেহাত বিতর্কে জেতার উদ্দেশ্যে। কিন্তু যেহেতু কেবলি বিতর্কে জেতার জন্যে ব্লগিং করি নাই এবং সহি ইসলাম নিয়ে সেকুলারদের এই ধরণের ফতোয়াবাজি মৌলবাদের ডিসকোর্সকেই শক্তিশালী করে এটা বুঝতে পেরেছি, তাই অনেক আগেই এই ধরণের নেতীবাচক প্রচারণা ও তর্ক করা বন্ধ করেছি। ইসলাম অথবা মুসলমানদের সাথে আমার কোন ঝগড়া নাই, ঝগড়াটা সাম্প্রদায়িক এবং মৌলবাদীদের সাথে। সুতরাং, হাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে সময় নষ্ঠ করার কোন মানে দেখি না। সেইসাথে সহি ইসলামের মৌলবাদী ডিসকোর্সের ক্ষমতায়নে কাজ করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

      1. কিন্তু আপনি যেহেতু প্রতিনিয়ত

        কিন্তু আপনি যেহেতু প্রতিনিয়ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে গেছেন এবং বিষয়বস্তুর বাইরে গিয়ে বিভিন্ন আক্রমনাত্বক অভিযোগ করেছেন তখন নেহায়েত অর্থহীন বিতর্কে সময় না দিতে পারার ব্যর্থতা হেতু সেসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছি। অনর্থক তর্ক এড়ানোর অধিকার নিশ্চয় আমার আছে? প্রাসঙ্গিক আলোচনা করলে অবশ্যই উত্তর দেবো।

        কথাগু্লো আমাকে উদ্দেশ্য করে বললে- বলবো, কোথাও একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে পারভেজ।

        ইসলাম অথবা মুসলমানদের সাথে আমার কোন ঝগড়া নাই, ঝগড়াটা সাম্প্রদায়িক এবং মৌলবাদীদের সাথে।

        প্রতিটি অনলাইন নাস্তিক, মুক্তমনা লেখকের একই অবস্থান।

        তবে একটা ব্যক্তিগত মত জানাই, সৌদি ওহাবী ইসলামই প্রসার করবে দিন যত যাবে। আমি নিজে মনে করি, মানুষের বিবেকের কাছে ইসলামের এই অমানবিক, অসুন্দর চিত্রগুলো জানিয়ে ধর্ম সম্পর্কে নিস্পৃহ করে তোলা যাবে। নাস্তিক বানানো যাবে না, তবে ধর্মে ভক্তিতে ভাটা আনা যাবে- সেটাই একজন মানুষকে অসাম্প্রদায়িক হতে সাহায্য করবে। আর আমার লড়াইটাও মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ভাল থাকবেন।

        1. ইসলামের এই অমানবিক ,অসুন্দর

          ইসলামের এই অমানবিক ,অসুন্দর চিত্রগুলো জানিয়ে ধর্ম সম্পর্কে নিস্পৃহ করে তোলা যাবে

          আবার নিজেই দাবী করছেন ,

          আর আমার লড়াইটাও মৌলবাদ,সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে

          আপনার লড়াই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এটা শুনলে অসাম্প্রদায়িকরা লজ্জায় বমি করে দেবেন।আপনি কি মনে করেন একজন ধার্মিক কখনো তার ধর্মের খারাপ দিকটা গ্রাহ্য করে ?যদি তাই ভাবেন তাহলে বলব আপনার মাথায় সর্বদা উল্টো জিনিসটা ঘোরে ,আপনার মষ্তিষ্কই পঁচে গেছে।

      2. সহি ইসলাম নিয়ে সেকুলারদের এই
        সহি ইসলাম নিয়ে সেকুলারদের এই ধরণের ফতোয়াবাজি মৌলবাদের ডিসকোর্সকেই শক্তিশালী করে এটা বুঝতে পেরেছি, তাই অনেক আগেই এই ধরণের নেতীবাচক প্রচারণা ও তর্ক করা বন্ধ করেছি।// এটা আপনার উপলব্ধি। এই উপলব্ধি থেকে যদি প্রচারণা চালানো হয় ইসলাম জঙ্গি নাও হতে পারে, কাফের হত্যার নির্দেশ নাও দিতে পারে, মেয়েদের বোরখা নাও পড়তে বলতে পারে,মোহাম্মদ ৬ বছরের আয়েশাকে বিয়ে নাও করতে পারে,…নাও হতে পারে,……নাও হতে পারে…; তাতে শুধু পানি আরও ঘোলা হয় আর ঘোলা পানিতে নাকি ভালো মাছ ধরা যায়।

  3. “সহি ইসলাম’ বলে কিছুই নেই।
    “সহি ইসলাম’ বলে কিছুই নেই। কোন ‘সহি’ ই আসলে সহি নয়। সহি হিন্দুইজম, সহি ইহুদি, সহি খ্রিস্টানিজম- এসব বলে কিছুই নাই।” ঠিক ঠিক, তবে পৃথিবীতে এখন একটা জিনিসই সহি আছে। আর সেটা হলো,সহি-নাস্তিকতা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − 21 =