ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসিঃ ইসলামী আইনের ইতিহাস। পর্ব -১

৮৫১ খ্রিষ্ঠাব্দের ২৪ নভেম্বর মুসলিম স্পেনের (তৎকালিন ‘আল আন্দালুস’) কর্ডোবায় ব্লাশফেমি (নবী অবমাননা) ও এপোস্টেসির (ইসলামধর্ম ত্যাগ) অভিযোগে ফ্লোরা ও মারিয়া নামে দুই তরুনিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। দুই তরুনিই খ্রিষ্ঠান ও মুসলিম আন্তঃবিবাহের ফলে জন্ম নিয়েছিলেন। ফ্লোরার পিতা ছিলেন মুসলিম এবং মা খ্রিষ্ঠান। শিশু বয়সে তার পিতার মৃত্যু হয়, এবং মায়ের খ্রিষ্ঠান ধর্মের অনুসারী হিসাবেই সে বড় হয়েছিল। অন্যদিকে মারিয়ার পিতা ছিল খ্রিষ্ঠান এবং মা মুসলমান। তার মা বিয়ের পর বাপ্তিস্ম করে খ্রিষ্ঠান হয়েছিলেন। এপোস্টেসির অভিযোগে তাদের বিচার হতে পারে এই ভয়ে এই পরিবারটি শহর ছেড়ে গ্রামের জীবন বেছে নিয়েছিল। মারিয়ার মা তার শিশুকালেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন, এবং মারিয়া খ্রিষ্ঠান হিসাবেই বড় হয়েছেন। এই দুই তরুনি একদিন কাজির দরবারে হাজির হয়ে ইসলামের নবী মুহাম্মদের নবুয়াত অস্বিকার করলেন এবং নিজেদেরকে খ্রিষ্ঠান বলে ঘোষনা করলেন। স্পেনে মালেকি সুন্নি আইন প্রচলিত ছিল। মালেকি আইন অনুসারে কেউ যদি খ্রিষ্ঠান ধর্ম পালন করে তা কোন সমস্যা না, কিন্তু কেউ যদি ইসলামের নবীর নবুয়াতকেই মিথ্যা বলে বা অস্বিকার করে তবে এই ধরণের ব্লাশফেমির শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। মারিয়াকে তাই ব্লাশফেমির অপরধে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো আর ফ্লোরাকে তওবা করে ইসলাম ধর্মে ফেরত আসার সুযোগ। ফ্লোরার যুক্তি ছিল যে সে খ্রিষ্ঠান হিসাবেই বড় হয়েছে সুতরাং ইসলাম ধর্মে ফেরত আসার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু আইন অনুসারে যেহেতু মুসলিম পিতার ঔরষে জন্ম নেয়া সন্তান অবশ্যই মুসলিম, তাই ফ্লোরার অপরাধ ব্লাশফেমির বদলে এপোস্টেসি হিসাবে বিবেচিত হলো। অপরাধ যাই হোক, ২৪ নভেম্বর ৮৫১ খ্রিষ্ঠাব্দে শিরচ্ছেদের মাধ্যমে উভয়ের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যে ফ্লোরা এবং মারিয়া দুইজনই চাইলে এই মৃত্যুদন্ড এড়াতে পারতেন, খ্রিষ্ঠান থেকে গিয়েও। মারিয়ার মা যেমন ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে এবং একজন খ্রিষ্ঠান ব্যক্তিকে বিয়ে করেও বিচার এড়াতে পেরেছিলেন, সেই সুযোগ এই দুইজনেরও ছিল। কিন্তু ফ্লোরা ও মারিয়া রীতিমত কাজীর দরবারে হাজির হয়ে তাদের খ্রিষ্ঠান পরিচয় এবং ইসলামবিরোধী অবস্থান জানান দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছিলেন। ফ্লোরা আর মারিয়ার এই বিদ্রোহ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ৮৫০ থেকে ৮৫৯ খ্রিষ্ঠাব্দ পর্যন্ত সময়কালে মোট ৪৮ জন খ্রিষ্ঠান এইভাবে মৃত্যুদন্ড বেছে নিয়েছেন, যাদেরকে স্পেনের খ্রিষ্ঠান ইতিহাসে একযোগে ‘কর্ডোবার শহীদ’ নামে ডাকা হয়।

 


ছবিঃ স্পেনের খ্রিষ্ঠানদের কাছে সাধু হিসাবে গন্য ফ্লোরা ও মারিয়ার মুর্তি

এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল পারফেক্টাস নামে একজন খ্রিষ্ঠান যাজককে মহানবীর অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদন্ড দেয়ার ঘটনা কেন্দ্র করে। পারফেক্টাস কোন বিদ্রোহী ছিলেন না, তিনি আগ বাড়িয়ে মহানবীর বদনাম করতে গিয়েছেন বলে জানা যায় না। খ্রিষ্ঠান ইতিহাস মতে, পারফেক্টাসকে একদিন দুইজন মুসলমান “কে শ্রেষ্ঠ নবী? ঈসা না মুহাম্মদ?” এই বিষয়ক একটি বিতর্কে আহবান জানায়। মুহাম্মদের নবুয়াত অস্বিকার করার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হতে পারে পারফেক্টাস তা জানতেন তাই তিনি বিতর্ক এড়াতে চেয়েছেন। কিন্তু এই দুই মুসলিম তাকে আশ্বাস দিয়েছিল যে ঐ বিতর্ক তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তার কোন মতামতের জন্যে তারা তাকে বিচারের সম্মুখিন করবেন না। বিতর্কের শুরুতে পারফেক্টাস ঈসার মাহত্ব সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেন, কিন্তু মুহাম্মদের নবুয়াত বিষয়ে তার মতামত ছিল নেতীবাচক। পারফেক্টাস মুহাম্মদের নবুয়াতের সত্যতা এবং তার চারিত্রিক গুনাবলী নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তিনি কুরানের সুরা আহজাবে’র বরাত দিয়ে বললেন যে মুহাম্মদ যেহেতু তার পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন, তাই তার চারিত্রিক গুনাবলী প্রশ্নবিদ্ধ। বিতর্কটি শান্তিপূর্ণভাবেই সমাপ্ত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তিতে ঐ দুই মুসলমানের একজন পারফেক্টাসের বিরুদ্ধে ব্লাশফেমির অভিযোগে বিচার দাবি করলেন। বিচারে পারফেক্টাসকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো। ৮৫০ খ্রিষ্ঠাব্দের ১৮ এপ্রিল তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। পার্ফেক্টাসের মৃত্যু কর্ডোবার খ্রিষ্ঠানদের মধ্যে গভির প্রতিক্রিয়ার সৃষ্ঠি করেছিল। খ্রিষ্ঠানদের মধ্যে এই চিন্তা ছড়িয়ে পরে যে, মুহাম্মদের নবুয়াত স্বিকার করে নিলে তো তাদের খ্রিষ্ঠান থাকার দরকার পরে না, তারা মুসলিম হয়ে গেলেই পারে। তাদের মতে, মুহাম্মদের নবুয়াতের অস্বিকৃতী হলো খ্রিষ্ঠান ধর্মবিশ্বাসের স্বাভাবিক প্রকাশ। এই অস্বিকৃতীর জন্যে যদি মৃত্যু হয় তবে তা শহিদী মৃত্যু। প্রথম এইরকম শহিদী মৃত্যু বেছে নিলেন আইজাক/ইসহাক নামে একজন খ্রিষ্ঠান। আইজাক আরবী ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং কর্ডোবার মুসলিম সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ছিলেন। পরবর্তিতে তিনি সরকারী দায়িত্ব ত্যাগ করে খ্রিষ্ঠান সন্নাসীর জীবন বেছে নেন। ৮৫১ খ্রিষ্ঠাব্দে তিনি কর্ডোবার পাবলিক স্কয়ারে কাজীর সামনে হাজির হয়ে শুরুতে ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং কাজীকে অনুরোধ করলেন তাকে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানাতে। যখনি কাজী তাকে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানতে গেলেন, তিনি পালটা তর্ক করা শুরু করলেন এবং এক পর্যায়ে নবী মুহাম্মদের বদনাম করা শুরু করলেন। হতভম্ব কাজী শুরুতে আইজাকের কাছে জানতে চাইলেন তিনি মাতাল অথবা সুস্থ্য মস্তিস্কে আছেন কি না? এতে বুঝা যায় যে মাতাল অথবা মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ্য না থাকলে কাজী তার অপরাধকে ব্লাশফেমি হিসাবে বিবেচনা করতেন না। আইজাক যখন জানালেন যে তিনি মাতাল অথবা অসুস্থ্য না তখন কাজী তাকে ব্লাশফেমির শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড এটা তিনি জানেন কি না সেই প্রশ্ন করলেন। আইজাক জানালেন তিনি তার পরিণতি সম্বন্ধে অবগত আছেন, এবং পরিণতি মেনে নিয়েই যা করার করছেন। তিনি বরং কাজীকে খ্রিষ্ঠান ধর্ম গ্রহণ করার আহবান জানান, যা না করলে তাকে দোযখের আগুনে পুড়তে হবে বলে ঘোষনা দেন। পারফেক্টাস এবং আইজাকের ব্লাশফেমির ঘটনার সময় স্পেনের শাসক ছিলেন দ্বিতীয় আবদ আল রহমান। আইজাকের এই বিদ্রোহের ঘটনাটি কাজীর কাছে এতোটাই অদ্ভুদ ঠেকেছিল যে তিনি নিজে কোন স্বিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরাসরি আমির আবদ আল রহমানের কাছে খবর পাঠালেন তার স্বিদ্ধান্ত জানার জন্যে। আবদ আল রহমান আইজাককে মৃত্যুদন্ড দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সেইসাথে তিনি একটি ফরমান জারি করলেন যে ভবিষ্যতে অন্য কোন খ্রিষ্ঠান যদি মহানবীর বদনাম অথবা অবমাননা করে তবে তাকেও একিরকম শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু এর পরের চারদিনে আরো সাতজন খ্রিষ্ঠান কাজির সামনে হাজির হয়ে মুহাম্মদের নবুয়াত অস্বিকার করে মৃত্যুর পথ বেছে নিলেন।

এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আবদ আল রহমান খ্রিষ্ঠানদের এই বিদ্রোহকে দেখেছেন প্রধানত রাজনৈতিক বিদ্রোহ হিসাবে। আইজাককে তিনি স্পেনের মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে একজন রাজনৈতিক বিদ্রোহী হিসাবেই গন্য করেছেন। হত্যার পর আইজাকের লাশ কর্ডোবার আমিরের প্রাসাদ ও বড় মসজিদের বিপরীতে নদীর ধারে জনগণের সামনে প্রদর্শনির জন্যে লটকে দেয়া হয়। কর্ডোবান আমিরাতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিদ্রোহীদের লাশ এই জায়গাটিতে প্রদর্শনির জন্যে রাখা হতো। মধ্যযুগে একজন রাজনৈতিক শাসক তার শাসনের বৈধতার জন্যে নির্ভর করতেন ধর্মীয় পৌরহিত্যের উপর। বড় ধর্ম হিসাবে ইউরোপের বিভিন্ন রাজা ও রাজবংশের বৈধতা দিতো খ্রিষ্ঠান পৌরহিত্ব। আর মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও তৎকালিন স্পেনে ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে বহু রাজনৈতিক শাসক ও রাজবংশ তাদের শাসনের বৈধতা আদায় করে নিয়েছিল। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে স্পেনে খ্রিষ্ঠান ধর্ম ছিল রাজনৈতিক বৈধতার মানদন্ড। স্পেনের মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপের যে রাজারা যুদ্ধ করেছেন তারাও তাদের রাজনৈতিক যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ হিসাবেই প্রচার করেছেন। স্পেন থেকে যে পরবর্তিতে রিকঙ্কুয়েস্টারা মাধ্যমে মুসলমানদের উৎখাত করা হয়েছে, তাও হয়েছে ধর্মযুদ্ধের নামে। স্পেনের খ্রিষ্ঠান রিকঙ্কুয়েস্টার সময় জোর করে মুসলমান ও ইহুদীদেরকে খ্রিষ্ঠান বানানো হয়েছিল, যারা রাজি হয় নাই তাদের দেয়া হয়েছিল মৃত্যুদন্ড। আবদ আর রহমানকে তার সময়কার প্রতিপক্ষ খ্রিষ্ঠান রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হতো নিয়মিত। স্পেনের মুসলিম শাসক হওয়ায় তার কাছে ‘সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ’ ধর্ম হিসাবে ইসলাম ধর্মের ডিসকার্সিভ হেজিমনি টিকিয়ে রাখটা তাই যতোনা ধর্মীয় তার চাইতে রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোন প্রজা যদি মহানবীর নবুয়াত অস্বিকার করে তবে সে আবদ আর রহমানের শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। আবদ আর রহমানের পরবর্তি শাসক আমির মুহাম্মদের আমলে এই ধরণের বিদ্রোহ অব্যাহত ছিল। আমির মুহাম্মদ বিদ্রোহ দমনে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি খ্রিষ্ঠানদেরকে সরকারী চাকড়ি থেকে বহিস্কার করেন, খ্রিষ্ঠানদের উপর নতুন ট্যাক্স চাপিয়ে দেন এবং খ্রিষ্ঠান সৈন্যদের পেনশন বন্ধ করে দেন। (চলবে)

দরকারি পাঠঃ
Defining Boundaries in al-Andalus Muslims, Christians, and Jews in Islamic Iberia by Janina M. Safran
Christian Martyrs in Muslim Spain by Kenneth Baxter Wolf

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসিঃ ইসলামী আইনের ইতিহাস। পর্ব -১

  1. বিকেলেই পড়েছিলাম তবে কি
    বিকেলেই পড়েছিলাম তবে কি মন্তব্য করব ভেবে পাইনি । ভাল লেগেছে ,সেটা জানিয়ে গেলাম এবং পরবর্তী পর্ব অতিদ্রুতই পাওয়ার আশা করছি ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 71