বৃদ্ধাশ্রম ও কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গী কেবল দীর্ঘশ্বাস!

মহাভারতের বনকাণ্ডে যক্ষের প্রশ্নের জবাবে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন,পিতা আকাশের চাইতেও উঁচু, আর মা পৃথিবীর চাইতেও ভারী। যুগে যুগে মনীষীদের উচ্চারণ ছিল,মাতা-পিতা স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হাসপাতালের লাল ইমারতটিতে গেলে কষ্টে বুক ভারী হয়ে আসে।
শ্যামলীর হোলি লেনের সুবার্তা বৃদ্ধনিবাসে প্রবীণ মায়ের আর্তিতে আকাশ ভেঙে পড়ে।
রাজধানীর পথে-ঘাটে তরুণদের ঠেলা-ধাক্কা উপেক্ষায় প্রবীণদের অসহায় দৃশ্য তো চোখ-সওয়া। জীবনপথের শেষ স্টেশনের যাত্রী এই প্রবীণদের সঙ্গী কেবল দীর্ঘশ্বাস!অফিসিয়াল আস্যাইনমেন্টেই একটা দিন কাটিয়েছিলাম এই বৃদ্ধদের সঙ্গে।

দশ মাস দশ দিন করে পেটে রেখেছি দু’জনকে। নিজের সবকিছু ত্যাগ করেছি শুধু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। ছিলাম আদর্শ মা। আজ ওরা প্রতিষ্ঠিত। আমি বৃদ্ধ, উটকো ঝামেলা। আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা ছেলেমেয়েরা এখন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। আমার বৃদ্ধাশ্রমের মাসিক ভাতা দেওয়া নিয়েও কথা শোনায়।’ চোখে পানি বৃদ্ধ নিশাত বেগমের । আঁচলের কোনায় চোখ মুছে তিনি বললেন, ‘আরে, তোদের কাজের মেয়েদের জন্যও তো আলাদা ঘর আছে। আমাকে না হয় একবেলাই খেতে দিতি। আমি শুধু তোদের দেখে আমার চোখ ভরাতাম। তোদের মুখগুলোই তো আমার মনে শান্তি দেয়। মা ডাকে প্রাণ জুড়ায়। এখানে কে মা ডাকবে? বড় ইচ্ছা করে, কান জুড়িয়ে মা ডাক শুনি।

ওদের কাছে থাকার জন্য প্রাণটা আকুলি-বিকুলি করে। ওরা কেউ বোঝে না।’ এবার আর ছলছল চোখ নয়। অঝোর ধারায় ঝরছে পানি। প্রবীণ এই নারীর সঙ্গে কথা হয় শ্যামলীর হোলি লেনে সুবার্তা বৃদ্ধনিবাসে। বর্তমানে এ নিবাসে ১৮ জন প্রবীণার বাস। আবাসনের পাশাপাশি রয়েছে সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা। আছে প্রার্থনা কক্ষ, গ্রন্থাগার, টেলিভিশন আর ইনডোর গেমসের সুবিধা। প্রবীণা, শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ, অক্ষম, দুস্থ ও সংকটগ্রস্ত নারীরা এখানে একটি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে থাকতে পারেন। অত্যন্ত অসুস্থ প্রবীণাকেও এখানে রেখে বিশেষ সেবা, চিকিৎসা ও খাদ্য দিয়ে সুস্থ করে তোলার ব্যবস্থা রয়েছে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন অনেকেই বৃদ্ধনিবাসে আশ্রয় নেন। কেউ হয়তো স্বাধীনভাবে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় আসেন বৃদ্ধাশ্রমে। কেউবা নিতান্ত বাধ্য হয়েই নিঃসঙ্গতার এমন ভাগ্য বরণ করেন। প্রচলিত আছে_ বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ আমাদের। সে পার্বণে সবাই আমন্ত্রিত। এমনকি পাখিরাও। সেখানে বৃদ্ধদের কেন এই নিঃসঙ্গতা? কেন এই দূরত্ব? বৃদ্ধনিবাসে থাকাকালীন দুটো ঈদ পার করেছেন নাসিমা বেগম। ছেলে তাকে নিতে আসেনি ঈদে। ‘ছেলেটাকে প্রতিদিন দেখতে ইচ্ছে করে। নাতি দুটোকে একটু বুকে জড়াতে ইচ্ছে করে।’ আফসোসের সুর নাসিমা বেগমের কণ্ঠে।

একাকী ফ্ল্যাটে দুই দিন অভুক্ত থেকে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে এসেছেন ইয়াসমিন আরা। তার বাড়ি ঢাকার অভিজাত এলাকায় রয়েছে। আছে ব্যংক ব্যালেন্সও। ছেলেমেয়ে দু’জনই থাকে আমেরিকায়। তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, প্রথম প্রথম অনেকেই আমার দায়িত্ব নিতে চাইত। কিন্তু পরে বুঝেছি, সবাই আমার টাকা আত্মসাৎ করার জন্য আমার দেখাশোনা করে। আমার কয়েকজন আত্মীয় টাকা পাওয়ার পর আর আমার খোঁজ রাখেনি। দুই দিন না খেয়ে বিছানায় পড়ে ছিলাম। পরে বৃদ্ধনিবাসে ফোন করলে ওরাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। এখানে ভালোই আছি। তারপরও প্রার্থনা করি, বৃদ্ধনিবাস যেন প্রবীণদের শেষ ঠিকানা না হয়।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রয়েছে প্রবীণ হাসপাতাল। এখানে নিঃসঙ্গতার ঘোর এমনই যে, ঈদ-পূজার মাতম এসে ধরা দেয় না লাল ইটের ইমারতে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৫০টি বেড এবং সংলগ্ন প্রবীণ নিবাসে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। এ নিবাসে বেড ও রুম ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, ওষুধসহ সব ব্যয় বসবাসকারীকেই বহন করতে হয়। হাসপাতালের ১৭টি বিভাগে ৩২ জন চিকিৎসকসহ মোট ৮৭ জন সেবাকর্মী রয়েছেন। প্রবীণ হাসপাতালের বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন সমকালকে বলেন, বুড়ো বয়সে এই ছিল আমার ভাগ্য! ছেলেমেয়েরা ঢাকায় থাকলেও দেখতে আসে না। তাদের অত সময় নেই।

সিরাজ উদ্দিন বা নাসিমা বেগমের মতো বৃদ্ধনিবাসে যারা আছেন, তাদের অনেককেই তাদের ছেলেমেয়েরা দিয়ে গেছে। কারও বা নিকটাত্মীয়। এখানে যারা থাকেন, তারা সবাই মিলে একটা নতুন পরিবার তৈরি করে নেন। এখানে তারা নির্ভাবনায়, সম্মানের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে বাকি দিনগুলো কাটাতে পারেন।

সব প্রাপ্তির মাঝেও এখানে যা নেই তা হলো পরিবারের সানি্নধ্য। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একত্রে থাকতে চান। তাদের সঙ্গে জীবনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চান। অথচ বিভিন্ন উৎসব, যেমন ঈদের দিনেও যখন তারা তাদের সন্তানদের কাছে পান না, সন্তানের কাছ থেকে একটি ফোনও পান না, তখন অনেকেই নীরবে অশ্রুপাত করেন।
কেউ থাকে না সঙ্গে। তখন তাদের সঙ্গী কেবল ‘দীর্ঘশ্বাস’!
একফাকে কথা বললাম বৃদ্ধনিবাস যে চালায় সেই সেলিনা আখতারের সংগে। তিনি বললেন,
প্রবীণরা উপেক্ষার শিকার হন মূলত পারিবারিক স্বার্থগত কারণে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনা আর নিজে সুখে থাকার চিন্তা কাছের মানুষকেও পর করে দেয়। আমরা চাই না কোনো পিতা মাতা বৃদ্ধনিবাসে এসে থাকুক। তারা নাতি-নাতনিসহ সন্তানদের সঙ্গে একত্রে থাকবেন_ এটাই প্রত্যাশা। তার পরও যারা পরিবারে কিছুটা অসহায়, নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারেন না, সঠিক দেখাশোনা পান না, কিছুটা অনিরাপত্তায় থাকেন; সেই বৃদ্ধরা আমাদের আশ্রয়ে থাকুন। শেষ বয়সে পৃথিবী থেকে একটু ভালোবাসা পান। এটাই চাওয়া। অন্তত যার সামর্থ্য আছে, তিনি যেন চিলেকোঠায় একাকী মারা না যান।

বৃদ্ধনিবাস থেকে যখন বের হলাম তখন দেখলাম মনের অজান্তেই দু চোখ ভিজে গেছে। যে কয়েক জনের ইন্টারভিউ করেছি সবাই সবাই একবার করে আমাকে হাত ধরে কাছে বসিয়েছে। সে হাতে পরম মমতার ছোয়া ছিল, যা তার সন্তানকে দিতে পারেননা। কারা এই কুলাঙ্গার সন্তান যারা এমন মমতাকে পায়ে ঠেলে দেয়???

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৬ thoughts on “বৃদ্ধাশ্রম ও কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গী কেবল দীর্ঘশ্বাস!

  1. এসব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সন্তানদের
    এসব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সন্তানদের জীবনটাই বৃথা…. আর কিছু বলতে চাই না। কারণ যারা তাদের পিতা-মাতাকে এ জায়গায় পাঠিয়েছে তাদের জন্য আরেকটি আশ্রমে সিট বরাদ্দ আছে…. সময় হলেই আগমন ঘটবে……….

    1. যারা তাদের পিতা-মাতাকে এ

      যারা তাদের পিতা-মাতাকে এ জায়গায় পাঠিয়েছে তাদের জন্য আরেকটি আশ্রমে সিট বরাদ্দ আছে…. সময় হলেই আগমন ঘটবে..

      সহমত

  2. কি বলব…… এইসব কুলাঙ্গার
    কি বলব…… এইসব কুলাঙ্গার সন্তানেরাই দেখবেন বাসায় পোষা বিদেশী কুকুরের শোকে পাগল হয়। কারন, ওরা আসলে মানুষ না। পোস্টের জন্য মিতু আপুকে স্যালুট। এই পোস্ট পড়ে একজনও যদি সচেতন হয় একজন মা কিংবা বাবা সেই অসহ্য বেদনার হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

  3. ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এভাবেই
    ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এভাবেই ধ্বংস করে মানব সভ্যতার সমস্ত মহত্‍ অর্জনকে।সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় কিন্তু হীন ব্যক্তিস্বার্থের চোরাবালিতে হারিয়ে যায় তাদের মনুষ্যত্ব-বিবেক।ব্যক্তিসম্পত্তিজাত মানসিকতাকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয় ব্যক্তিস্বার্থের।আজকের যুগে এই চরম অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তিসম্পত্তিজাত মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প নাই।

    1. বৃদ্ধ বয়সের এই সব বাবা মায়ের
      বৃদ্ধ বয়সের এই সব বাবা মায়ের সন্তানের কাছ থেকে কিছুই চাওয়া নাই। সন্তানরা শুধু একটু সামনে থাকবে। সন্তানের মাথায় একটু মমতা বুলাতে চায় এরা। সেই মমতাটুকুকে যারা পায়ে ঠেলে তাদের মতো অভাগা আর কুলাঙ্গার কে আছে

  4. বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে লেখা
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে লেখা আমারও পড়তে ভাল লাগেনা। বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে যদি আমার কোন কিছু বলার থাকে, সেটা একটাই- দিন দিন আমরা পশুর চেয়েও খারাপ হয়ে যাচ্ছি। পশুর মধ্যেও একতা আছে। তারা মিলেমিশে থাকে। কিন্তু আমাদের সেই যোগ্যতাও দিন দিন লোপ পাচ্ছে।

    সুন্দর এই পোস্টটার জন্য মিতু আপুকে ধন্যবাদ।

  5. ‘আরে, তোদের কাজের মেয়েদের

    ‘আরে, তোদের কাজের মেয়েদের জন্যও তো আলাদা ঘর আছে। আমাকে না হয় একবেলাই খেতে দিতি। আমি শুধু তোদের দেখে আমার চোখ ভরাতাম। তোদের মুখগুলোই তো আমার মনে শান্তি দেয়। মা ডাকে প্রাণ জুড়ায়। এখানে কে মা ডাকবে? বড় ইচ্ছা করে, কান জুড়িয়ে মা ডাক শুনি।

    কিছুই বলার নাই, কষ্ট ছাড়া! এ কী করে সম্ভব!

  6. বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ
    বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ আমাদের। সে পার্বণে সবাই আমন্ত্রিত। এমনকি পাখিরাও। সেখানে বৃদ্ধদের কেন এই নিঃসঙ্গতা? কেন এই দূরত্ব? বৃদ্ধনিবাসে থাকাকালীন দুটো ঈদ পার করেছেন নাসিমা বেগম। ছেলে তাকে নিতে আসেনি ঈদে। ‘ছেলেটাকে প্রতিদিন দেখতে ইচ্ছে করে। নাতি দুটোকে একটু বুকে জড়াতে ইচ্ছে করে। ………
    🙁 🙁 🙁
    ***বৃদ্ধনিবাস থেকে যখন বের হলাম তখন দেখলাম মনের অজান্তেই দু চোখ ভিজে গেছে। যে কয়েক জনের ইন্টারভিউ করেছি সবাই সবাই একবার করে আমাকে হাত ধরে কাছে বসিয়েছে। সে হাতে পরম মমতার ছোয়া ছিল, যা তার সন্তানকে দিতে পারেননা। কারা এই কুলাঙ্গার সন্তান যারা এমন মমতাকে পায়ে ঠেলে দেয়???

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 29