ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসিঃ ইসলামী আইনের ইতিহাস। পর্ব – ২

মধ্যযুগের একটা বড় সময় যাবৎ মুসলিম স্পেন তথা আল আন্দালুস ছিল ইউরোপের সবচাইতে উন্নত রাজ্যগুলোর একটি। ইউরোপের অন্ধকার যুগে শিক্ষা, দিক্ষা সংস্কৃতির একমাত্র প্রদিপ হিসাবে আল আন্দালুস দীর্ঘদিন আলো ছড়িয়েছে। রেনেসাপূর্ব ইউরোপের মানুষ আরব ও গ্রিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিল আল আন্দালুসের মাধ্যমে। আন্দালুসের খ্রিষ্ঠান ও ইহুদী নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের খ্রিষ্ঠান ও ইহুদীদের চাইতে ভালো ছিল। প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে অমুসলিমদের ভালো সুযোগ ছিল। মুসলমান এবং খ্রিষ্ঠানদের মধ্যে আন্তঃবিবাহ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। মুসলিম পুরুষদের যেহেতু আহলে কিতাব হিসাবে খ্রিষ্ঠান নারী বিবাহে বাধা ছিল না তাই অনেক মুসলমান পুরুষের স্ত্রী ছিল খ্রিষ্ঠান। আবার মুসলিম নারী খ্রিষ্ঠান পুরুষকে বিয়ে করে স্বধর্ম ত্যাগ করেছেন এমন উদাহরণ আমরা দেখেছি। মুসলিম-খ্রিষ্ঠান আন্তঃবিবাহ থেকে জন্ম নেয়া সন্তানদের মধ্যে দুই ধর্মের দিকেই ঝুকে পরার সম্ভাবনা ছিল। কর্ডোবার শহীদদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মুসলিম-খ্রিষ্ঠান পিতা মাতার সন্তান ছিলেন। তাদের মধ্যে ফ্লোরা এবং মারিয়াসহ মোট নয়জন ছিলেন নারী। ৮৫৯ সালের মার্চ মাসে সর্বশেষ দুইজন বিদ্রোহী ইউলোজিয়াস নামে একজন পাদ্রি এবং লিউক্রিশিয়া (অথবা লুক্রেশিয়া) নামে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া একজন তরুনির মৃত্যুদন্ডের মাধ্যমে এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে। ইউলোজিয়াস কর্ডোবার একজন স্বনামধন্য পাদ্রি ছিলেন। তিনি পারফেক্টাসের মৃত্যুদন্ডের শাস্তি থেকে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন এবং মহানবীর নবুয়াত অস্বিকার অথবা তার অবমাননা করার মাধ্যমে বিদ্রোহ করে সেচ্ছায় মৃত্যুদন্ড মাথা পেতে নিতে বিদ্রোহীদের উৎসাহ করতেন। লিউক্রিশিয়ার পিতা মাতা মুসলিম ছিলেন, কিন্তু তিনি একজন খ্রিষ্ঠান আত্মিয়ের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্ঠান ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। ইউলোজিয়াসের পরামর্শে তিনি তার পরিবার ত্যাগ করে আত্মগোপন করেছিলেন। পরবর্তিতে দুইজনকেই গ্রেফতার ও শিরচ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

আলাদাভাবে নারী শহীদদের কথা উল্লেখ করার কারন আছে। প্রচলিত ধারণা যাই হোক না কেনো, মুসলিম আইন তথা শরিয়ার যে কোন একক রূপ ও নিরবিচ্ছিন্ন ইতিহাস নাই তা বুঝা দরকার। ফ্লোরা, মারিয়া কিংবা লিউক্রিশিয়া যদি স্পেনের না হয়ে ভারতবর্ষের মানুষ হতেন তাহলে তাদের মৃত্যুদন্ডের মতো শাস্তি দেয়া হতো না। স্পেনের মালেকি সুন্নি আইনে নারীদেরকে ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসির অপরাধে মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান থাকলেও ভারতবর্ষ, মধ্য ও পূর্ব এশিয়া এবং তুর্কিসহ পৃথিবীর বিস্তির্ণ অঞ্চলে প্রচলিত হানাফি সুন্নি আইনে ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসির অপরাধে নারীদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান ছিল না। হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফার শিষ্য আল শায়বানির মতে ধর্মত্যাগী নারীকে হত্যা করা ঘৃনিত কাজ বলে তার গুরু মত প্রকাশ করেছেন, এবং রাজ্যের শাসক চাইলে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। উল্লেখ করা দরকার যে, হানাফি সুন্নি আইনে এপোস্টেসি এবং ব্লাশফেমির মধ্যে বিশেষ ফারাক করা হয় নাই। সুতরাং, হানাফি আইনে একজন নারী ইসলাম ধর্ম ত্যাগ অথবা আল্লাহ-রসুলের অবমাননা করলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হবে না। তওবা করে আবার ইসলাম ধর্মে ফেরত আসলে শাস্তি পুরোপুরি মওকুফের সুযোগ ছিল। তবে হানাফি আইন মোতাবেক বিবাহিত নারী ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসির মতো অপরাধ করলে তার বিয়ে বাতিল অর্থাৎ সেই নারী তালাক হয়ে যেতেন। মজার ব্যাপার হলো, হানফি সুন্নি আইনে যেহেতু নারীরা পুরুষদের তালাক দিতে পারতেন না অন্যদিকে ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসির কারনে সয়ংক্রিয়ভাবেই তালাক হয়ে যেতো, তাই হানাফি আইনের সুযোগ নিয়ে এককালে অনেক নারী তার স্বামীকে তালাক দিয়েছেন। একজন নারী আল্লাহ-রসুলকে গালাগাল করে অথবা ধর্মত্যাগ করে তালাক হয়ে গেছেন এবং তারপর আবার তওবা করে ইসলাম ধর্মে ফেরত এসেছেন, এই ধরণের ঘটনা মুসলিম সমাজে স্বাভাবিক ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে আজ থেকে মাত্র একশ বছর আগেও এইধরণের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।

১৯১৩ সালে ভারতের ব্রিটিশ আদালতে একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর বৈবাহিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি মামলা করেন। কিন্তু আদালতে স্ত্রী’র পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে ঐ নারী ধর্মত্যাগী (apostate) হয়েছেন, সুতরাং ঐ বিয়ে বাতিল হয়ে গেছে। আদালতের পক্ষ থেকে স্ত্রীর পরিবারের কাছ থেকে এই বিষয়ে ইসলামী আইনের ফতোয়া দাবি করা হয়। এই পরিবার তখন উপমহাদেশের বিখ্যাত দেওবন্দী আলেম মাওলানা আশরাফ আলি থানভি’র কাছ থেকে একটি ফতোয়া সংগ্রহ করেছিলেন। আশরাফ আলি থানবি বিবাহটি বাতিল ঘোষনা করে ফতোয়া দেন। আশরাফ আলির ‘ইমদাদ আল ফতোয়া’ গ্রন্থে প্রশ্ন উত্তরটি যেভাবে দেয়া আছে তা কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকাড়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্যে নিচে তুলে দিলাম –

প্রশ্নঃ এই বিষয়ে ধর্মীয় বিচারকদের মতামত কি? জিয়াদ (ছদ্মনাম) একজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন। কয়েক মাস পর তার স্ত্রীর পরিবার তার স্ত্রীকে নিয়ে যায় এবং পরবর্তিতে ফেরত পাঠাতে অস্বিকৃতি জানায় এবং জিয়াদের কাছে ডিভোর্স দাবি করে। জিয়াদ কোন উপায় না দেখে সরকারের আদালতে মামলা করেছেন। যখন মেয়েটির অভিভাবকরা এই কথা জানতে পারলো তখন তারা মেয়েটিকে অবিশ্বাসী বাক্য শিখিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটি সেইসব অবিশ্বাসী বাক্য উচ্চারণ করেছে। এখন তার অভিভাবকরা দাবি করছে যেহেতু মেয়েটি সুস্থ্য ও প্রাপ্তবয়স্ক, তাই অবিশ্বাসী কথা বার্তা বলায় তার এবং জায়েদের বিয়ে বাতিল হয়ে গেছে। ……প্রশ্ন হলো, তার অভিভাবকদের ইচ্ছায় অথবা সেচ্ছায় ঐ নারী যেহেতু বিয়ে বাতিলের উদ্দেশ্যেই অবিশ্বাসী বাক্য উচ্চারণ করেছেন, সুতরাং আল্লাহর আইনে কি তার বিয়ে বাতিল হয়ে গেছে?

উত্তরঃ বাতিল হয়ে গেছে। সেচ্ছায় অথবা অন্য কারো নির্দেশেই হোক, আর মন থেকে অথবা অভিনয় করেই হোক, ইচ্ছা করে এবং সজ্ঞানে যদি কেউ অবিশ্বাসী বাক্য উচ্চারণ করে, তবে তা অবিশ্বাস বলেই গন্য হবে। যেহেতু অবিশ্বাসের ফলে বিয়ে বাতিল হয়ে যায়, তাই উল্লেখ্য বিয়েটি বাতিল হয়ে গেছে।

সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ইসলামী আইনের ইতিহাসে একদিকে যেমন স্পেনে ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসির অপরাধে মৃত্যুদন্ডের মতো কঠোর শাস্তির উদাহরণ আছে তেমনি আবার আল্লাহ রসুলের নামে অবিশ্বাসী ও অবমাননাকর কথা বার্তা বলে নারীরা স্বামীকে তালাক দিয়েছেন এইরকম উদাহরণও আছে। ভারতবর্ষে যে ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসি অতোটা গুরুতর বিষয় ছিল না, এবং সেই সুযোগে ডিভোর্স নেয়ার খাতিরেও যে বহু ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসির ঘটনা ঘটেছে তার প্রমান আছে।

কিন্তু এরপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে বেশকিছু গুরুতর পরিবর্তন ঘটে গেছে। গত শতাব্দির শুরুর দিকের এই সময়টিতে ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলিম আত্মপরিচয়ের রাজনীতি দিনে দিনে শক্তিশালী হয়েছে এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে হিন্দু ও মুসলিম জনগণ একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। ধর্ম সম্প্রদায়ের রাজনীতি দিনে দিনে যতো শক্তিশালী হয়েছে ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসি ততো গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। ধর্মত্যাগের ঘটনা এই সময় মুসলিমদের কাছে একটি সামাজিক সমস্যা বলে বিবেচিত হতে থাকে। পাঞ্জাবের কিছু মিশনারি ডিভোর্সে আগ্রহী মুসলিম নারীদের খ্রিষ্ঠান ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে উৎসাহিত করেছেন বলে জানা যায়। রেভারেন্ড পল নামের একজন মিশরনারি নতুন ধর্মান্তরিতদেরকে বাপ্তিস্মের সার্টিফিকেট দিতেন। ধর্মত্যাগের মাধ্যমে আদালতে ডিভোর্সের আবেদন ১৯২০-১৯৩০ সাল নাগাদ অতীতের যে কোন সময়ের চাইতে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই সময়টিতে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে এই বিষয়ক হানাফি আইন পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল। পাকিস্তানের আধ্যাত্বিক পিতা মুহাম্মক ইকবাল ১৯২৪ সালে লাহোরে একটি বক্তৃতায় ধর্মত্যাগ বিষয়ে গভির উদ্যেগ প্রকাশ করেন। যে হানাফি আইনের কারণে মুসলিম নারীরা তাদের স্বামীকে তালাক দিতে গিয়ে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে সেই আইনের বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। সেইসাথে তিনি মুসলিম পন্ডিতদের আহবান জানান, ইজতিহাদের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করার জন্যে। ইকবালের মতো একজন মুসলিম ব্যক্তিত্ব এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পর তৎকালিন মিডিয়া ও মুসলিম পন্ডিত সমাজে এই বিষয়ে যথেষ্ঠ বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছিল। সারা ভারতবর্ষের মুফতিদের সাথে আলাপ আলোচনা শেষে মাওলানা আশরাফ আলী থানভি শেষ পর্যন্ত তার ১৯১৩ সালে দেয়া ফতোয়াটি ১৯৩১ সালে বাতিল করেন। অর্থাৎ, কোন মুসলিম নারী ধর্মত্যাগ অথবা ব্লাশফেমি করলেই তার তালাক হয়ে যাবে না। ব্লাশফেমি অথবা এপোস্টেসির অপরাধে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে বেশ কয়েকজন নারীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এধরণের ঘটনা মধ্যযুগের মুসলিম শাসনের ভারতবর্ষেও বিরল ছিল। (চলবে)

দরকারি পাঠঃ
Defining Boundaries in al-Andalus Muslims, Christians, and Jews in Islamic Iberia by Janina M. Safran
Apostasy and Judicial Separation in British India by Muhammad Khalid Masud

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “ব্লাশফেমি ও এপোস্টেসিঃ ইসলামী আইনের ইতিহাস। পর্ব – ২

  1. ইসলামী আইনে তো মেয়েরা তালাক
    ইসলামী আইনে তো মেয়েরা তালাক দিতে পারে। বুখারী শরিফের তালাক অধ্যায়ে অনেক হাদীসই পাওয়া যায় যেখানে মেয়েরা তাদের Husband কে তালাক দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1