জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে স্মৃতিচারণা

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
আবদুর রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় অনার্সের পর। এরপর ৪৩ বছর, মৃত্যু অবধি তার সঙ্গে সেই পরিচয় অটুট ছিল। একবার আইসিইসিআর নামক একটি সংগঠন থেকে স্যারকে ভারত ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানানো হলো। সংশ্লিষ্ট কেউ এসেছিলেন স্যারকে দাওয়াত পৌঁছে দিতে। সেই ব্যক্তিকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন, “আপনারা আনিসুজ্জামানকে দাওয়াত দিবেন না?” সেই লোক নিশ্চয় বিব্রত হয়েছিল। এবং আমতা আমতা করে হয়তো বলেছিল, নিশ্চয় দেব। কিছু দিন পরে দেখা গেল সিনিয়র শিক্ষকদের সেই দাওয়াতের তালিকায় আমার নামও রয়েছে।

অধ্যাপকের নিউম্যানের সঙ্গে স্যারের বিরোধ ছিল। ১৯৫০ সালে স্যার তার পিএইচ.ডি. থিসিস সম্পন্ন না করে দেশে চলে আসেন। নিউম্যান তাকে বলেছিলেন, থিসিসটা ডেভেলপ করতে। প্রয়োজনে তিনি সুপারভাইজ করবেন। নিউম্যানের এ প্রস্তাব স্যারের পছন্দ হয়নি। স্যার হয়তো মুখের ওপরই বলে দিয়েছিলেন যে, নিউম্যান তো ভারতের রাজনৈতিক দলের ওপর এক্সাপার্ট নয়, ফলে থিসিস সুপারভাইজ করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তার নেই। কারও মুখের ওপরে এমন কথাবার্তা নিশ্চয় সম্পর্ক সুমধুর রাখতে সহায়ক নয়। আরও ঘটনা আছে। বিভাগে একটি রিডার পদ খালি হয়েছিল। এই পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন মাদ্রাজের ড. খালিদ বিন সাঈদ। এই খালি পদের জন্য তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপরে ড. খালিদের একটি পিএইচ.ডি.ও ছিল। অধ্যাপক নিউম্যান বললেন রাজ্জাকও যেন উক্ত খালি পদের জন্য আবেদন করে। স্যার বলেছিলেন, এই পদের জন্য ড. খালিদ সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি এবং সে ইতোমধ্যে আবেদনও করেছে। এটা জেনেও নিউম্যান যখন রাজ্জাককে আবদনের জন্য প্ররোচিত করলেন তখন স্যার মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, ‘তুমি লোক সুবিধার না।’

টিউটোরিয়াল ক্লাসে তিনি ছিলেন অনবদ্য। সক্রেটিস স্টাইলে তিনি পড়াতে পছন্দ করতেন। প্রচুর বইয়ের রেফারেন্স দিতেন। তার সেসব বই লাইব্রেরিতে খুঁজে বের করতে গলদগর্ম হতে হতো। স্যার আমাদেরকে জানতে আগ্রহী করে তুলেছিলেন। আর তার নিজের পড়ার মধ্যেও অসাধারণত্ব ছিল, বৈচিত্র্য ছিল। আমাকে দিয়েও প্রচুর বই আনিয়েছেন বিদেশ থেকে। তার ফরমায়েশের সেসব বই আমি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যেতাম। বই ছিল তার সবসময়ের সঙ্গী, সংসার, বইয়ের রাজত্বে ছিল তার বসবাস।

মুসলিম লীগ তার পছন্দের সংগঠন ছিল, তবে তা ১৯৫২ পর্যন্ত। ভাষা-আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগের প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল। এবং তা আর কোনোদিন জোড়া লাগেনি। তিনি জিন্নাকে পছন্দ করতেন এ কথা সত্যি। কারণ তিনি মনে করতেন, জিন্নাহ সেক্যুলার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক রাজ্জাককে ১৪ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। পাকিস্তানের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী জেডএ সুলেরি তখন পত্রিকায় লিখেছিলেন যে, রাজ্জাকের সঙ্গে তারা এক বোটে করে লন্ডন গিয়েছিলেন।

সুলেরি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, রাজ্জাকও যখন শেখ মুজিবের পক্ষে, বিষয়টি তখন আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। রাজ্জাক স্যার পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য ও বঞ্চনার কথা বলতেন। তিনি এটাও বলতেন যে, এই বৈষম্য ও বঞ্চনার বিষয়ে প্রথম কথা তুলেছিলেন ড. সাদেক। ড. সাদেকের কথাবার্তা অগুছালো ছিল। ফলে তখন ড. সাদেকের কথা খুব বেশি প্রচার পায়নি।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন
আমার বাবার স্মৃতিকথায় আবদুর রাজ্জাক সম্বন্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ হয়েছে। পলাশীর যুদ্ধ, ইংরেজ শাসন বিশেষত আইন ও আইনের প্রয়োগ ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ছিল আবদুর রাজ্জাকের বিশেষ আগ্রহের জায়গা। কোম্পানি আমলে নথিপত্রের প্রতি আমি তার মধ্যে চরম আসক্তি লক্ষ করেছি। এসব বিষয়ে গবেষণা করতে তিনি নিয়মিত উৎসাহ দিতেন।

তিনি যাকে পছন্দ করতেন তার জন্য সর্বোচ্চটা করতেও দ্বিধা করতেন না। এ জন্য অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও তার অপত্যস্নেহ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। ড. আতাউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে তার নিয়োগের ব্যাপারে রাজ্জাক স্যার তদবির করেছিলেন। আতাউর রহমানের ফার্স্ট ক্লাস ছিল বটে, কিন্তু মানুষ হিসেবে নৈতিকতার দিক থেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।

চাদরের বিষয়ে রাজ্জাক স্যারের একটি বিশেষ স্টাইল ছিল, কোথাও যাওয়ার সময় তার পুরনো ও শত ভাঁজে মলিন চাদরটা বিশেষ কায়দায় তাঁর বাম কাঁধে দিয়ে হাঁটা শুরু করতেন। বিচিত্রায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ভাষাশহিদ বরকত বিষয়ে একটি মন্তব্যে ১৯৭৬ সালের দিকে ব্যাপক বিতর্ক উঠেছিল।

স্যারের এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন সরদার ফজলুল করিম। আমি তার সঙ্গে ছিলাম। পরে একদিন দেখা হলে স্যার বললেন, ঘরোয়া কথাবার্তায় অনেক কিছুই আলোচনা হয়। তাই বলে তা পত্রিকায় ছেপে দিতে হয় না।

অধ্যাপক এম মোকাম্মেল হক
রাজ্জাক স্যার আমার শ্বশুরের বন্ধু ছিলেন। আমার শ্বশুর মতিন সাহেব ও রাজ্জাক স্যারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে দেখা করতেন। দেখা যেত, তিন বন্ধু এক জায়গায় হয়েছেন এবং তৎক্ষণাৎ তিনজনে তিনটি বই নিয়ে বসে পড়েছেন। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম
আমি রাজ্জাক স্যারকে হার্ভার্ডেও দেখেছি। তিনি, অধ্যাপক মাহমুদ ও আজিজুল হক একই সময়ে হার্ভার্ডে ছিলেন। আমি তখন কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করি। আড্ডা দিতে ইচ্ছে হলে বা সামাজিক কোনো আসরে তারা আমাকে প্রায়ই আসতে বলতেন। আমি এলেই রাজ্জাক স্যার আমাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যেতেন। একে একে বিভিন্ন সময়ে তিনি আমাকে তার সঙ্গে করে ম্যাসাচুসেটস্ ও বসটনের প্রায় সব পুরনো বইয়ের দোকানে নিয়ে গেছেন এবং ঘুরে ঘুরে বই দেখিয়েছেন।

ছয় দফা প্রণয়নের আগে প্রায়ই বঙ্গবন্ধু রাজ্জাক স্যারের কাছে আসতেন। এসব ঘরোয়া আলোচনায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক খান সারোয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখ। সারাদিন কাজ শেষে সাধারণত রাতে তারা আলোচনায় বসতেন। ছয় দফার প্রণেতা ছিলেন মূলত এই অধ্যাপকেরাই। এদের ওপর বঙ্গবন্ধুর অগাধ আস্থা ছিল। আরেকটি ঘটনা থেকে এটি প্রমাণিত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অবমুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৬৯ সালে পিন্ডিতে গিয়েছিলেন সাংবিধানিক দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে। তখন তিনি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী ও রেহমান সোবহানকে সঙ্গে নিয়েছিলেন।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
এটি আমার অহঙ্কার যে আমি রাজ্জাক স্যারের ছাত্র ছিলাম। ইংরেজি ও পলেটিক্যাল সাইন্স পরীক্ষায় পাস করেছিলাম। ফলে সাধারণভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল যে কোন বিভাগে ভর্তি হব। আমার পরিবার চাইতেন, আমি যেন ইংরেজিতে পড়ি। কিন্তু আমি রাষ্ট্রবিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম কারণ, রাজ্জাক স্যার ছিলেন নিবেদিত শিক্ষক। আমাদের এমএ ক্লাসে তিনি লিবারেলিজম পড়াতেন। সব মিলিয়ে ২০ জনের মতো ছাত্র ছিলাম। তিনি বলতেন, আমাদের কারও ডিডেক্টিভ উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা আছে কিনা। তার মতে, লিবারেলিজম বুঝতে হলে আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা কাহিনিগুলো পড়তে হবে। তিনি আমাদেরকে জ্ঞানের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে ভিত্তিগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। হি ওয়াজ নট অ্যা কনভেনশনাল টিচার। তিনি জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন, তিনি আমাদের কনভেনশনাল সেন্সে ক্লাস রুম চিটিং বলতে যা বুঝায় সেই শিক্ষা দেননি। তিনি আমাদের রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে বলতেন। বিস্মিত হয়েছিলাম বাংলা আধুনিক কবিতা সম্বন্ধে তার বিস্তৃত পড়াশোনা ও জ্ঞান দেখে। এমন শিক্ষক হয় না। তিনি সাম্প্রদায়িকতার সমর্থক ছিলেন না, কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজ শিক্ষিত হোক এটা তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন।

আরও পড়ুন : আবদুর রাজ্জাক স্মৃতিবক্তৃতা ২০১৪ – সলিমুল্লাহ খান

————–
[নোট : ২০১৪ সালে ‘জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জন্মশত বৎসর’ পালন করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। এ লক্ষ্যে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ২০ ডিসেম্বর ২০১৪-এ আয়োজন করে আবদুর রাজ্জাক স্মৃতিবক্তৃতা ২০১৪। বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল ‘অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। বক্তা সলিমুল্লাহ খান। বক্তব্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অন্য আলোচকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও এম মোকাম্মেল হক (রাজ্জাকের ছাত্র ও সহকর্মী)। সলিমুল্লাহ খান একুশ পৃষ্ঠা সম্বলিত লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন। আলোচনায় অন্যান্য যারা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্বন্ধে স্মৃতিচারণা করেছেন তাদের বক্তব্য খুব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। আরিফ খান গ্রন্থিত এ প্রবন্ধটি কিছুদিন আগে সংবাদ সাময়িকী ‘সাপ্তাহিক’-এ প্রকাশিত হয়েছে।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে স্মৃতিচারণা

  1. এই রহস্যময় মানুষটি সম্পর্কে
    এই রহস্যময় মানুষটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু ‘ বইটি পড়ে। ওনার সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ আছে। ধন্যবাদ পোস্টদাতাকে।

    1. আহমদ ছফা তো রাজ্জাক স্যারের
      আহমদ ছফা তো রাজ্জাক স্যারের উপর দু’দিন পর পরই এসে হামলে পড়তেন। টাকা আদায় করে ছাড়তেন। রাজ্জাক স্যারও তাঁকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিতেন। আহমদ ছফা’র প্রতি একটা সন্তান বাৎসল্য ছিলো স্যারের।

  2. অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে
    অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে বিস্তর গবেষনা হওয়া উচিত। লেখাটা এই জ্ঞান তাপসকে নিয়ে অনলাইন তথ্য ভান্ডার সমৃদ্ধ হল।

  3. হুমায়ুন আজাদ তাঁর সাক্ষাৎকার
    হুমায়ুন আজাদ তাঁর সাক্ষাৎকার বইটি শুরু করেছেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক -এর সাক্ষাৎকার দিয়ে। অনেক অজানা বিষয় তুলে এনেছেন বইটিতে। এই নিভৃতচারী মানুষটি সম্পর্কে বাঙালি বলতে গেলে প্রায় কিছুই জানে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − = 19