অজয় রায়ের বিশেষ প্রবন্ধ দ্বিতীয়াংশ : “বিজ্ঞানীর ধর্ম”

[নোট : অজয় রায় বাংলাদেশী পদার্থ বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী। তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ‘মুক্তান্বেষা’ নামক পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হিসবে কাজ করছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবকল্যাণবোধ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুক্তমনা এবং মুক্তচিন্তক লেখকদের লেখা নিয়ে সংকলন-গ্রন্থ ‘স্বতন্ত্র ভাবনা’ তার পরিচালনায় প্রকাশিত হয়েছে অঙ্কুর প্রকাশনা থেকে ২০০৮ সালে। আলোচ্য লেখাটি তার বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর ধর্ম শীর্ষক রচনার দ্বিতীয়াংশ। প্রথম পর্ব ‘বিজ্ঞানের ধর্ম’ পড়তে এখানে ক্লিক করুন। লেখাটি ইতোপূর্বে ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত-এ ছাপা হয়েছিল।]

এই পর্বে আমরা বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ধর্ম সম্পর্কে তাঁদের অভিমত নিয়ে আলোচনা করবো।

বিশ্বাসের রকমফের
বিশ্বাসের স্তর ও শ্রেণীভেদে আমরা বিশ্বাসীদের মূলত চার শ্রেণীতে চিহ্নিত করতে পারি। এই চার শ্রেণীর ঈশ্বর বিশ্বাসের নাম: ঈশ্বরবাদ বা আস্তিকতা (Theism), প্রত্যাদেশ-বিরোধী নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরবিশ্বাস (Deism), সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism) এবং নিরীশ্বরবাদ বা নাস্তিকতা (Atheism)। আস্তিকতা ও নাস্তিকতা নিয়ে বিশেষ কিছু বলবার নেই। আস্তিকতার মূলে রয়েছে একজন ব্যক্তি-ঈশ্বর যিনি শুধু জগৎ সৃষ্টি করেন নি, মানুষের ভালো মন্দের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন। আর নাস্তিকতা হচ্ছে যেকোন ধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস। প্রত্যাদেশবিরোধী নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরবাদ হল ‘Deism’। সর্বেশ্বরবাদে (Pantheism) ঈশ্বর শব্দটি তাঁরা ব্যবহার করেন প্রকৃতির স্থলে ‘নাতিপ্রাকৃত সমার্থক শব্দ’ (Non- supernatural synonym) রূপে; অথবা মহাবিশ্ব, কিংবা নিয়মানুবর্তিতা বোঝাতে, যে নিয়মাদির মাধ্যমে প্রকৃতির ক্রিয়াদি সম্পাদিত হয় থাকে। এঁদের ঈশ্বরধারণা হল আলঙ্কারিক বা রূপক (Metaphoric), যাকে বলা যেতে পারে মহাবিশ্বের নিয়মাবলির জন্য কবিত্বময় প্রতিশব্দ। এক কথায় সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism) হল প্রকৃতিকেই ঈশ্বর কল্পনার মাধ্যমে ব্যক্তি-ঈশ্বরের অনস্তিত্বের প্রকাশ, আর প্রত্যাদেশবিরোধী ঈশ্বরবাদ (Deism) হল জল দিয়ে তরলকৃত আস্তিকতা। আসলে যে কোন ধরনের ঈশ্বরের অনুকল্প অন্তত বিজ্ঞানচর্চার দৃষ্টিতে ‘অপ্রয়োজনীয়’-যেমনটি ল্যাপলাস বলেছিলেন। এ ধরনের ঈশ্বর অনুকল্পকে অনেক বিজ্ঞানী সম্ভাব্যতা তত্ত্বের (Theory of Probability) ভিত্তিতে নাকচ করে দিয়েছেন।

বিজ্ঞানীদের ধর্ম কী
এর উত্তর এক কথায় দেয়া যায় না। ব্যক্তিবিশ্বাসের দিক থেকে বিজ্ঞানীরা অনেকেই আস্তিক, কেউ কেউ প্রকাশ্যে নিরিশ্বরবাদী, তবে অধিকাংশই সন্দেহবাদী এবং এক ধরনের প্রকৃতিবাদী। আবার অনেক বিজ্ঞানী আছেন যাঁরা এ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান না। বার্ট্রান্ড রাসেল এ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার উক্তি করেছেন:
“The immense majority of intellectually eminent men disbelieve in God in Christian religion, but they conceal the fact in public, because they are afraid of loosing their incomes.”

১৯১৬ সালে সকল শ্রেণীর বিজ্ঞানীর (জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ…) মধ্যে সমীক্ষা চালান হয়েছিল যে তাঁরা ব্যক্তি-ঈশ্বরভিত্তিক ঈশ্বরবাদে (Theism) বিশ্বাসী কি না। ফলাফল হল ৪০% বিজ্ঞানী এ ধরনের ঈশ্বরে আস্থাশীল। আশি বছর পরে ১৯৯৭ সালে পুনরায় চালিত সমীক্ষায় একই ফলাফল বেরিয়ে আসে।২৩ ২০০০ সাল পরবর্তী আর এক সমীক্ষায় এই সংখ্যাটি কিঞ্চিৎ হ্রাস পেয়েছিল তবে তা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক পত্রিকা নেচার ১৯৯৮ সালে দু’জন গবেষক লারসন ও উইথাম’কে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের সংস্থা ‘ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের’ সদস্যদের ওপর একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন।২৪ তাঁদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল যে পবিত্র বাইবেলে কথিত ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি না? উত্তর চাওয়া হয়েছিল তিনটি গুরুত্ব অনুযায়ী : ১. সম্পূর্ণ অসম্মতি, ২. মাঝামাঝি, ৩. পুরোপুরি একমত। ফলাফলে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে মাত্র ৭% ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাসী। বাকিরা বিপুলভাবে নিরিশ্বরবাদী, অন্তত বাইবেলীয় ঈশ্বরবাদের নিরিখে। অর্থাৎ ৭২.২ শতাংশ সরাসরি নাস্তিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, এবং ২০.৮ শতাংশ বিজ্ঞানী নিজেদের অজ্ঞেয়বাদী (Agnostic) বলে অভিহিত করেছেন।

এই চমকপ্রদ তথ্য সাধারণ আমেরিকাবাসীদের ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত; যাঁদের মধ্যে ৯০% কোন না কোন ধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তায় (supernatural being) আস্থাবান। স্বল্পখ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের মধ্যে, যাঁরা একাডেমি অব সায়েন্সে নির্বাচিত হতে পারেন নি তাঁদের মধ্যে বিশ্বাসীদের সংখ্যা মধ্যবর্তী অবস্থানে। সব ধরনের বিজ্ঞানীর মধ্যে বিশ্বাসীরা সংখ্যালঘু, মাত্র ৪০%। তাহলে দেখা যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ আমেরিকাবাসীর তুলনায় সেদেশের বিজ্ঞানীরা কম ধর্মপ্রাণ আর প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা তো মোটেই ধর্মবিশ্বাসী নন।২৫

লারসন ও উইথাম প্রবন্ধটির সমাপ্তি টেনেছেন এই মন্তব্য করে:
“আমরা যখন আমাদের ফলাফল সম্পাদনা করছিলাম, সে সময় এনএএস (NAS) কর্তৃপক্ষ একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন যেখানে সাধারণ স্কুলগুলোতে বিবর্তনবাদ পড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়, এ নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বৈজ্ঞানিক সমপ্রদায় ও রক্ষণশীল খ্রিস্টানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। পুস্তিকাটি পাঠকদের নিশ্চিত করেছে, ‘ঈশ্বর আছেন কি নেই এ প্রশ্নে বিজ্ঞান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।’ এনএএস সভাপতি ব্রুস আলবার্ট বলেন: ‘এই একাডেমির অনেক বিশাল মাপের সদস্য রয়েছেন যাঁরা গভীর ধর্মপরায়ণ মানুষ, যাঁরা বিবর্তনে বিশ্বাসী এবং এঁদের মধ্যে অনেকেই জীব-বিজ্ঞানী।’ কিন্তু আমাদের সমীক্ষা ভিন্ন কথা বলছে”।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সুখ্যাত ও বহুলপরিচিত ‘রয়্যাল সোসাইটির’ ফেলোদের ওপর আরও বিস্তৃত সমীক্ষা চালিয়েছিলেন আর. এলিজাবেথ কর্নওয়েল এবং মাইকেল স্টিরাট প্রায় একই সময়ে, মোটামুটি একই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে: অর্থাৎ ‘আমি ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’। তাঁরা সপ্তপদী মাত্রা ব্যবহার করেছিলেন, ত্রিপদী মাত্রার পরিবর্তে। ১ম মাত্রা ছিল ‘সম্পূর্ণ অসম্মতি’ (নিরীশ্বরবাদ বা নাস্তিকতা), আর ৭ম মাত্রাটি ছিল ‘সম্পূর্ণ সম্মতি’ (ঈশ্বরবাদ বা আস্তিকতা)। ১,০৭৪ জন এফআরএস (FRS- Fellow of the Royal Society) এর মধ্যে ২৪৭ জন ফেলো এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায় মাত্র ৩.৩ % ফেলো (৩৫ জন) প্রস্তাবটির সাথে সম্পূর্ণ একমত (পুরোপরি ঈশ্বরবাদী-৭ নং মাত্রা) অর্থাৎ ‘একজন ব্যক্তি-ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে’; অন্যদিকে ৭৮.৮ % জন ফেলো (অর্থাৎ ১৯৫ জন) বেশ গভীরভাবে প্রস্তাবের বিপক্ষে (১নং মাত্রা) মত প্রকাশ করেছেন (নিরীশ্বরবাদী)। আবার ৭ অথবা ৬নং মাত্রার পক্ষে উত্তরদাতাকে যদি বিশ্বাসী হিসেবে এবং ১ অথবা ২নং মাত্রার পক্ষে উত্তরদাতাকে অবিশ্বাসী গণ্য করা হয় তাহলে বিশ্বাসীদের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১২ জনে এবং অবিশ্বাসীদের সংখ্যা ২১৩ জন।

এত গেল বিলেত আর আমেরিকার অভিজাত বিজ্ঞানীদের কথা; সাধারণ বিজ্ঞানী বা বুদ্ধিমান শিক্ষিতজনের মধ্যে ধর্ম বা ঈশ্বর বিশ্বাসের অবস্থানটি কি? শিক্ষাগত অবস্থান ও ধর্মপরায়ণতার সম্পর্ক নিয়ে বা ধর্মপরায়ণতার সাথে বুদ্ধিমত্তার সূচকের (IQ) সম্পর্কের বিষয়ে বেশ কিছ গবেষণা আমাদের দেশে না হলেও পাশ্চাত্যে হয়েছে। এ ধরনের কিছু গবেষণার ফলাফল মাইকেল শেরমার রচিত ‘How We believe: The Search for God in an Age of Science’ গ্রন্থটিতে পাওয়া যাবে।২৬ আমেরিকায় ইতস্তত চয়িত নমুনার ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে শিক্ষার স্তরের সাথে ধর্মপরায়ণতার রয়েছে না-ধর্মী সহ-সম্পর্ক (negative correlation), অর্থাৎ কিনা ব্যক্তি যতই উচ্চতর শিক্ষিত হয় ধর্মের প্রতি তার অনুরাগ কমতে থাকে। আরও দেখা গেছে যে বিজ্ঞানের প্রতি যতই আকর্ষণ বাড়তে থাকে ধর্মানুরাগ ততই ক্রমশ হ্রাস পায়; রাজনৈতিক উদারতার সাথে ধর্মানুভূতি তাৎপর্যময় ভাবে কমে আসে। মাতাপিতার বা পারিবারিক ধর্মানুরাগের সাথে সন্তানদের ধর্মবিশ্বাস প্রত্যক্ষভাবে সহ-সম্পর্কিত। যুক্তরাজ্যের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে ১২টি শিশুর মধ্যে মাত্র ১টি শিশু মাতাপিতার ধর্মবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসেছে। আইকিউ (IQ)’র সাথে ধর্মপরায়ণতার ওপর সমীক্ষার একটি ফলাফল ২০০২ সালে পল বেল কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল মেনসা ম্যাগাজিনে।২৭ এত দেখা যায় যে বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির সাথে ধর্মবিশ্বাসে শৈথিলক্ষ্য দেখা যায়। পল বেল এই সমীক্ষা সম্পর্কে বলেছেন:২৮

Of 43 studies carried out since 1927 on the relationship between religious belief and one’s intelligence and/or educational level, all but four found an inverse connection. That is, higher the one’s intelligence or educational level, the less one is likely to be religious or hold ‘beliefs’ of any kind.

২০০৪ সালে সাধারণ আমেরিকাবাসীর ওপর বিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্টি সম্পর্কিত একটি সমীক্ষার প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তাঁদের সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব রাখা হয়েছিল: ১. আদি অনুন্নত জীবন থেকে কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের অভ্যুদয় ঘটেছে, তবে ঈশ্বর এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছেন; ২. আদি অনুন্নত জীবন থেকে কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের অভ্যুদয় ঘটেছে, তবে এই প্রক্রিয়ায় ঈশ্বরের কোন ভূমিকা ছিল না; ৩. বর্তমানে মানুষের যে রূপ ও আকৃতি রয়েছে ঈশ্বর সেই রূপ ও আকৃতির মানুষ এক মাহেন্দ্রক্ষণে গত ১০,০০০ বৎসর বা সে রকম সময়ের মধ্যে সৃষ্টি করেছিলেন। ফলাফল ৪৫% আমেরিকাবাসী ৩নং প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন অর্থাৎ ঈশ্বর স্বয়ং স্বহস্তে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এর মধ্যে প্রাকৃিতক প্রক্রিয়া বা বিবর্তনের কোন অংশ ছিল না; ৩৮% মত দিয়েছেন ২নং প্রস্তাবের পক্ষে আর অর্থাৎ নিরঙ্কুশ বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের কোন ভূমিকা ছাড়াই মনুষ্য জাতি ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিল; বাকি ১৩% বিশ্বাস করেন যে বিবর্তনের প্রক্রিয়াতেই মনুষ্যের আবির্ভাব, তবে এতে ঈশ্বরের সহায়তা ছিল। সুতরাং ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বাদ রাখলে বিবর্তনবাদীর সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৫১%।

খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের ধর্মবিশ্বাসের প্রকৃতি
খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত অনেকেই প্রচলিত অর্থে ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু তাঁদের ধর্মবিশ্বাস বিজ্ঞান সাধনায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় নি। অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল বরং তাঁদের ধর্ম প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার, মেন্ডেল এঁরা সকলেই ছিলেন স্ব স্ব ধর্মের প্রতি পরম অনুরক্ত। কোপার্নিকাস ও মেন্ডেল তো সরাসরি চার্চের পাদ্রী ছিলেন। ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা থাকা সত্ত্বেও গ্যালিলিওকে তাঁর নিজের ইনক্যুইজিশনের কাছে নিগৃহীত হতে হয়েছিল; তাঁর আজীবনের জ্ঞান-সাধনার ফসলকে নিজ মুখে ‘অসত্য’ বলে ঘোষণা করতে হয়েছিল নতজানু হয়ে। কোপার্নিকাসকে শাস্তি পেতে না হলেও তাঁর কালজয়ী সৌরকেন্দ্রিক গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।২৯

নিউটন, মেন্ডেল, ডারউইন সেদিক থেকে পরম সৌভাগ্যবান যে তাঁদের প্রকাশনাগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় নি। নিউটন তো ইংল্যান্ডের চার্চের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে প্রিন্সিপিয়ার প্রকাশ (১৬৮৭) বিলম্বিত করেছিলেন রচনা শেষ হওয়ার ২০ বছর। হয়তো এ মহাগ্রন্থ কোনদিনই প্রকাশিত হতো না যদি না নিউটনের বন্ধু হ্যালি উদ্যোগ গ্রহণ করতেন।

নিউটন যে গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। শেষ বয়সে তিনি ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কিত নানা চিন্তাভাবনা নিয়ে লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর ধর্মশাস্ত্র নিয়ে গবেষণার একটি চিত্তাকর্ষক বিষয় হল-গূঢ় রহস্যময় ড্যানিয়েলের পুস্তকটির (Cryptic Book of Daniel) অনুসরণে জগতের শেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন ২০৬০ সালের পর। তিনি এটি ধর্মবিশ্বাস থেকে করেন নি; করেছিলেন গ্রন্থটির রহস্য উদ্ঘাটনে এবং তা বৈজ্ঞানিক পন্থায়। আর একটি উদ্দেশ্য ছিল এই পুস্তকটিকে ভিত্তি করে অনেক ধূর্ত ধর্মব্যবসায়ীর শেষ দিন সম্পর্কে মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণীর বিভ্রান্তি থেকে জনগণকে দূরে রাখা। এ প্রসঙ্গে নিউটন স্বয়ং মন্তব্য করেছিলেন:

It may end later, but I see no reason for its ending sooner….This I mention not to assert when the time of the end shall be, but to put a stop to the rash conjectures of fanciful men who are frequently predicting the time of the end, and by doing so bring the sacred prophesies into discredit as often as their predictions fall.

নিউটনের ধর্মবিষয়ক গভীর অনুশীলন দেখে আইনস্টাইন ১৯৪১ সালে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিলেন যে, এসব লেখা থেকে আমরা পাই a variety of sketches and ongoing changes that give us a most interesting look into the mental laboratory of this unique thinker.৩০

নিউটন ছিলেন বাইবেলীয় ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাসী। নিউটনের ঈশ্বর মহাবিশ্ব পরিচালনায় যে প্রাইম গতি সঞ্চার করে দিয়েছিলেন তারপর থেকে বিশ্বপ্রকৃতির নিয়মেই তা চলতে থাকে, ঈশ্বর এতে আর হস্তক্ষেপ করেন নি (হয়তো করতেও পারেন না)।

প্রসঙ্গত আমরা ক্লাসিকাল অর্থাৎ প্রাচীন ধ্রুপদী কয়েকজন দার্শনিক, বিজ্ঞানীর যেমন স্পিনোজা, লেইবনিজ ও ল্যাপলাসের বৈজ্ঞানিক দর্শন ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করছি। সপ্তদশ শতাব্দীর ওলন্দাজ দার্শনিক-বিজ্ঞানী বারুচ স্পিনোজার মতে ঈশ্বরের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও অচলা ভক্তিই হল সকল ধর্মের মূল নীতি; ধর্মের বাকি সবকিছুই এ থেকে বেরিয়ে আসে। ঈশ্বরবিশ্বাসীরা অবশ্য যুক্তি দেখিয়ে বলতে পারেন যে, ঈশ্বরানুগত্য ও ভক্তি ছাড়াও ধর্মবিশ্বাস আরও অনেক কিছুর অনুসন্ধান করে, যেমন মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং সর্বোপরি ঈশ্বরকে বুঝবার ঐকান্তিক ইচ্ছা। বিবেকানন্দ ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন: ‘জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ কিন্তু মুশকিল হল এসব মহৎ কার্যক্রম একান্তভাবেই নির্ভরশীল ঐ নীতিটির ওপর যেটি হলো ঈশ্বরানুগত্য ও তাঁর প্রতি ভক্তিপ্রদর্শন।

প্রচলিত অর্থে স্পিনোজা ধর্মবিশ্বাসী নন, তাঁর ধর্মবিশ্বাস অনেকটা সর্বেশ্বরবাদের (Pantheism) অনুরূপ, প্রকৃতির মধ্যেই তিনি ঈশ্বরের স্বরূপ খুঁজে পেতেন; সেই অর্থে তাঁর ঈশ্বর হলেন প্রকৃতি-ঈশ্বর (Nature God)। এ কারণেই প্রকৃতিবাদী বিজ্ঞানী ও উদারমনা মানুষের তিনি প্রিয়পাত্র। আইনস্টাইনীয় বিশ্বাসও স্পিনোজার বিশ্বাসের কাছাকাছি, আর এ কারণেই আইনস্টাইন উক্তি করেছিলেন যে তিনি এমন এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন যিনি মানুষের কাজকর্ম বা ভালোমন্দ নিয়ে মাথা ঘামান না, কিন্তু প্রকৃতির ঐকতানের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেন।৩১ স্পিনোজা কিন্তু ধর্মকে বাতিল করে দেন নি, এর ভিত্তি ‘আনুগত্য’ হলেও এর মধ্য থেকে ধর্মের যে কার্যকর ভূমিকা তা হল নৈতিকতা বিষয়ে। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন ধর্মের শাস্ত্রীয় মতবাদ ভিন্ন হলেও নৈতিকতার প্রসঙ্গে প্রায় অভিন্ন। জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে স্পিনোজা ছিলেন সম্পূর্ণরূপে দার্শনিক বা বিজ্ঞানী। নিচের উক্তি থেকেই তার প্রমাণ মেলে:
Philosophy has no end in view save with truth; faith looks for nothing but obedience and piety.৩২

গটফ্রেইড লেইবিনজ ছিলেন নিউটনের সমসাময়িক বিখ্যাত জার্মান গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক, জার্মান ভাববাদের অন্যতম রূপকার। লেইবনিজ ছিলেন মূলত একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, যদিও তাঁর ধর্মবিশ্বাস গণিতসাধনায় প্রতিবন্ধক হয় নি। জার্মান জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি যুক্ত করেছিলেন নৈতিক ও এক ধরনের ধর্মীয় সুবাস যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জার্মান ভাববাদের বৈশিষ্ট্য। জার্মান দর্শনে প্রকৃতির বলবৈদ্যিক নিউটনীয় প্রতিচ্ছবিকে উদ্দেশ্যবাদী নীতি (teleolog)৩৩ দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে চেয়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় সুবাস মিশ্রিত দার্শনিক পদ্ধতি জার্মানীতে বস্তুবাদ ও সংশয়বাদের অগ্রগতিতে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল এতে সন্দেহ নেই। লেইবিনজ শুধু যে ঈশ্বরের কর্ম প্রকৃতিতে, বিশ্বচিত্র উপস্থাপনায় নিউটনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তাই নয়, ক্যালকুলাসের মূল নীতি আবিষ্কারেও তিনি ছিলেন তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী; যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রে লেইবিনজ পরাজিত হয়েছিলেন নিউটনের কাছে।

অষ্টাদশ শতকের আর একজন খ্যাতনামা ফরাসী গণিতজ্ঞ, সাংখ্যায়নিক, পদার্থবিদ এবং বৈজ্ঞানিক দার্শনিক পিয়ের সাইমন ল্যাপলাস ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য ও মনীষার অধিকারী। বলবিদ্যা, গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্য, পদার্থবিদ্যা, সাংখ্যায়নিক বিদ্যা ও রসায়ন বিদ্যাতে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বলবৈদ্যিক বিশ্লেষণ’ (Traite de mécanique analytique), ‘সম্ভাব্যতার দার্শনিক প্রবন্ধাবলী’ (Essai philosophique sur less probabilities), ‘নিহারীকা তত্ত্ব’ (Exposition du systeme du monde), ‘জ্যোতির্মণ্ডলীর বলবৈদ্যিক আচরণ’ পাঁচ খণ্ড (Traite de Mécanique Céleste), ‘সম্ভাব্যতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ (Theorie analytique des probabilities) ইত্যাদি। ল্যাপলাসের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায় তাঁর নিম্নোক্ত উক্তি থেকে:

If men were restricted to collecting facts the sciences were only a sterile nomenclature and he would never have known the great laws of nature. It is in comparing the phenomenon with each other, in seeking to grasp their relationships, that he is led to discover these laws.৩৪

অন্যত্র পদার্থবিদ্যার গবেষণা পদ্ধতি প্রসঙ্গে বলেছেন:
I have sought to establish that the phenomena of nature can be reduced in the law of analysis to actions at a distance between molecule and molecule, and that the consideration of these actions must serve as the basis of the mathematical theory of these phenomena.
আমরা তাঁর এই উক্তি দু’টির সাথে আইনস্টাইনের বিভিন্ন উক্তির তুলনা করতে পারি।

ল্যাপলাস যে প্রচলিত অর্থে নিষ্ঠাবান ধার্মিক ছিলেন না তা একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি Traite de Mécanique Céleste গ্রন্থটি রচনার পর প্রকাশের জন্য সম্রাট নেপোলিয়নের অনুমতি চেয়েছিলেন। পরে বইটি তাঁর নামে উৎসর্গ করতে চাইলে নেপোলিয়ন পরিহাস ছলে বলেছিলেন, ‘মসিঁয়ে ল্যাপলাস, আপনি আপনার বইয়ে বেশ ভালোভাবেই মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের চালচলনের ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু আমি দেখলাম আপনি কোথাও ঈশ্বরের উল্লেখ করেন নি। আপনার এই মডেলে ঈশ্বরের স্থান কোথায়?’ ল্যাপলাস উত্তরে বিনয়ের সাথে বলেছিলেন: : ‘Monseigneur ,Je n’ai pas besoin de cette hypothese.’ অর্থাৎ ‘Sir, I have no need of that hypothesis.।

উনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন প্রচলিত অর্থে ধর্মবিশ্বাসী, এই তালিকায় রয়েছেন খ্যাতনামা পরীক্ষণবিদ মাইকেল ফ্যারাডে, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, ব্রিটিশ পদার্থবিদ উইলিয়াম উইলসন, জে জে থমসন, লর্ড রাদারফোর্ড প্রমুখ। বিবর্তনবাদের জনক স্বয়ং ডারউইন প্রথম জীবনে চার্চ অব ইংল্যান্ডের মিনিস্টার হতে চেয়েছিলেন এবং এ উদ্দেশে ক্যামব্রিজ থেকে ১৮৩১ সালে ধর্মতত্ত্বে ডিগ্রি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিগল জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রা তাঁর সেই ইচ্ছার সবকিছু ওলট পালট করে দেয়।

এবার সমকালীন খ্যাতনামা দু’একজন বিজ্ঞানীদের দিকে চোখ ফেরানো যাক। বিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যায় যে ঈশ্বরবিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা ক্রমশ ক্ষীয়মান। রিচার্ড ডকিন্স তো আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন যে, সৃষ্টিশীল বিজ্ঞানী হতে হলে তাঁকে ঈশ্বর অবিশ্বাসী হতেই হবে। এতদসত্ত্বেও, মনেপ্রাণে ঈশ্বরবিশ্বাসী নিষ্ঠাবান বৈজ্ঞানিকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শাখার সরকারি ‘হিউম্যান জেনোম প্রকল্পের’ (Human Genome Project) প্রশাসক প্রধান, খ্যাতনামা বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী ফ্রান্সিস এস কলিন্স সর্বপ্রধান, এবং বলা যায় বাইবেলীয় ব্যক্তি-ঈশ্বর বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের মুখপাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর লিখিত The Language of God সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আধুনিক কালের ব্যক্তি-ঈশ্বরবাদী খ্যাতনামা ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন আর্থার পিকক, রাসেল স্ট্যানার্ড, জন পোলকিংহোর্ন প্রমুখ। অন্যদিকে অসংখ্য ঈশ্বর অবিশ্বাসী বিজ্ঞানীর মুখপাত্র হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন খ্যাতনামা বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স। এই দলে উল্লেখযোগ্য খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন কার্ল সাগান, ভিক্টর জে স্ট্রেংগার, স্টিফেন ভাইনবার্গ, পল ডেভিস, পল কার্জ, হাইসেনবার্গ, অ্যান্থনি অ্যাগুরি, ক্রেগ ভেনটার (বেসরকারি ‘হিউম্যান জেনোম প্রকল্পের’ প্রধান) প্রমুখ।

ঈশ্বর-বিশ্বাসের পেছনে একটি বড় যুক্তি হল যে, শূন্য থেকে কোন কিছুই সৃষ্টি হয় না, অতএব একমাত্র সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই পারেন ‘নাস্তি’ থেকে সৃষ্টি করতে, যেমন তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতি কেমন করে নাস্তি থেকে কোন কিছু সৃষ্টি করে পদার্থবিদরা কিন্তু প্রকৃতির সেই পথের সন্ধান পেয়েছেন। বিস্তৃত আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলি: পদার্থবিদ্যা দেখিয়েছে যে, ‘অনিশ্চয়তা তত্ত্ব’ (uncertainty principle) অনুসরণ করে শূন্য থেকে পদার্থ ও শক্তি তৈরি হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘শূন্য দোদুল্যমানতা’ (Vacuum Fluctuation)। আমরা একজন খ্যাতনামা পদার্থবিজ্ঞানী পল ডেভিসের উক্তি এ প্রসঙ্গে তুলে ধরছি:

চিরায়ত পদার্থবিদ্যার প্রধান ভিত্তি হল ‘শক্তির নিত্যতা’ নীতি (principle of conservation of energy)। কিন্তু কোয়ান্টাম আণুবীক্ষণিক জগতে শক্তি ‘অনস্তিত্ব’ (nowhere) থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অনিশ্চিতভাবে আবির্ভূত এবং অদৃশ্য হতে পারে।৩৫

নাস্তি বা শূন্য থেকে যে বিশ্ব উদ্ভূত হতে পারে এ নিয়ে পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ভিক্টর স্ট্রেংগার তাঁর একটি সাড়া জাগানো পুস্তকে বিশদ আলোচনা করেছেন। এতে পদার্থবিজ্ঞানের নিত্যতার সূত্রের লঙ্ঘন হয় নি। এবং এর মধ্যে সৃষ্টিকর্তার কোন অলৌকিকতাও নেই। আমরা তাঁর একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

…অন্য কথায়, মহাবিশ্ব ‘সৃষ্টিতে’ বাইরের থেকে আনা কোন শক্তির প্রয়োজন হয়নি। অধিকন্তু, এটি হল মহাস্ফীতি মহাবিশ্ব তত্ত্বেরও একটি ভবিষ্যদ্বাণী, যা পর্যবেক্ষণ দ্বারা সমর্থিত।…৩৬

পদার্থবিদ্যার ভাষায় বিগ-ব্যাং (Big Bang) বা বিশ্বসৃষ্টির মুহূর্তটি ছিল একটি ‘অদ্বৈত বিন্দু’ (Singularity), ঈশ্বরবিশ্বাসী বৈজ্ঞানিকেরা দাবি করেন যে মহাবিস্ফোরণের সময় ঈশ্বর ‘ইচ্ছে করলেই’ ‘অদ্বৈত বিন্দু’তে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন এই অর্থে যে, তিনি মহাবিস্ফোরণের সময়টি নির্ধারণ করে দিতে পারতেন। এবং যে নিয়মাবলিতে ভবিষ্যৎ মহাবিশ্ব ও প্রাণীজগৎ বিকশিত ও পরিচালিত হবে তাও ঈশ্বর ঠিক করে দিতে পারতেন। কিন্তু সমালোচকরা বলে থাকেন এ পন্থায় ঈশ্বর কর্তৃক মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রাণের বিকাশ ও মনুষ্যজাতির অভ্যুদয় একটি অযৌক্তিক এবং বিশৃঙ্খল পদ্ধতি; এটি ঈশ্বরের সুশৃঙ্খল চরিত্রের সাথে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমন কি সনাতন বিশ্বাসীরাও এ তত্ত্বে মোটেই আস্থাবান নন, তাঁরা বাইবেল বা কোরআন বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বে দৃঢ় বিশ্বাসী। নোবেলবিজয়ী পদার্থবিদ স্টিফেন ভাইনবার্গের মন্তব্য হল: ‘যে বিশ্ব একেবারে বিশৃঙ্খল (Chaotic), তেমনি একটি বিশ্বকে কোন মূর্খের সৃষ্টি ধরে নেয়া যেতে পারে।’৩৭

সাম্প্রতিক ঈশ্বরান্ত বিজ্ঞানীরা ‘সূক্ষ্ম সমন্বয়’ (fine tuning), ‘নৃ-কেন্দ্রিক যুক্তি’ (anthropic arguments) নামের আপাত বৈজ্ঞানিক পদ ব্যবহার করে ঈশ্বর-অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিবর্তনবাদের স্থলে একটি ছদ্মবেশী বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হাজির করেছেন; এই প্রস্তাবনার নাম ‘বুদ্ধিমত্তা নকশা’ (intelligent design ID)। খুব সংক্ষেপে বিষয়টি এইরকম: সৃষ্টিকর্তার খেয়াল হয়েছিল তিনি আমাদের মতো মানুষ সৃষ্টি করবেন, তাই ভবিষ্যৎ মানুষের জন্য (অর্থাৎ আদম ও তার বংশধরদের অভ্যুদয়কে কেন্দ্রে রেখে) যোগ্য পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি ‘মহাবিশ্বের নিয়ম-নীতি-সূত্রসমূহ’ প্রণয়ন করে রেখেছিলেন, এমনকি সূত্রসমূহে ব্যবহৃত সর্বজনীন ধ্রুবকগুলোর (যেমন অভিকর্ষ ধ্রুবক g, আলোর দ্রুতি c, ইলেকট্রন, প্রোটন ইত্যাদির ভর m, চার্জ e…) মানও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই প্রয়াসকেই বলা হয় নৃ-কেন্দ্রিক যুক্তি। একেবারে সর্বাঙ্গ সুন্দর ও সম্পূর্ণ নিখুঁত পরিকল্পনা। আর এ ধরনের পরিকল্পনা কেবলমাত্র অতিমাত্রায় বুদ্ধিদীপ্ত নকশাকারীর পক্ষেই সম্ভব-যার নাম ঈশ্বর।৩৮

এই আপাত চমকদার অনুকল্পটি শুধু জ্যোতির্বিদ্যায় নয়, এর পরিধিকে টেনে প্রসারিত করে জীব ও প্রাণীজগতেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে মুশকিল হচ্ছে জীবজগতের সূক্ষ্ম সমন্বয়ীরা যেভাবে যুক্তি সাজান তা পদার্থবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম সমন্বয়ীর সাজানো যুক্তির একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো। তাছাড়া ঈশ্বরবাদীরা বিশ্ব-ধ্রুবকগুলোর যে মান রয়েছে তা ভবিষ্যতে আদম-ইভের বংশধরদের আগমনের পথকে প্রশস্ত করার জন্যই সৃষ্টিকর্তা পূর্ব থেকেই স্থির করে রেখেছিলেন এই দাবি সন্তোষজনক নয়; প্রথমত ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়টি এই অনুকল্পের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ একইভাবে প্রকৃতিবাদীরাও বলতে পারেন যে প্রকৃতিই আমাদের বর্তমান বিশ্বের জন্য এই মানগুলো স্থির করে দিয়েছে, নইলে অন্য এক বিশ্ব সৃষ্টি হতো।

পদার্থবিদগণ গণনা করে দেখিয়েছেন যদি প্রকৃতির নিয়ম ও কোন ধ্রুবকের মানকে সামান্য পরিবর্তন করা যায় তাহলে জগৎ এমন ভাবে পরিবর্তিত হবে যে এখানে বর্তমান জীবনের অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিভিন্ন পদার্থবিদ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলেও সিদ্ধান্ত একই। উদাহরণস্বরূপ মার্টিন রীস মহাবিশ্বের সাথে যুক্ত সুসমন্বয়ী ছয়টি ধ্রুবক নির্বাচন করেছেন। যেমন সবল নিউক্লিয় বলের পরিমাপক ‘ঊ’ সংখ্যাটির মান আমাদের মহাবিশ্বের জন্য ০.০০৭। রীস দেখিয়েছেন যে এই মানটির সামান্য তারতম্য ঘটলে বিদ্যমান রসায়নের অস্তিত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর রসায়ন হল প্রাণের উন্মেষের মূল চাবিকাঠি। যদি এর মান কম হয়, ধরা যাক ০.০০৬ বা তার নিচে, তাহলে মহাবিশ্বে কেবল হাইড্রোজেনই থাকবে, আর রসায়ন হয়ে পড়বে অনাকর্ষণীয়। অন্যদিকে এই মান বেশি হলে, ধরা যাক ০.০০৮, হাইড্রোজেনসমূহ সম্মিলিত হয়ে উচ্চতর মৌলসমূহ তৈরী করে নিঃশেষিত হয়ে যাবে, ফলে হাইড্রোজেনবিহীন রসায়ন থেকে যে জীবন সম্পর্কে আমরা জানি তা উন্মেষিত হবে না।

একদল পদার্থবিদ রয়েছেন যাঁরা মনে করেন যে, যখন স্বপ্নের ‘সর্ববিষয়ের তত্ত্ব’ (TOE: Theory Of Everything) বা স্টিফেন হকিং-এর ভাষায় ‘সর্ববিষয়ের একীভূত তত্ত্ব’ (Unified Theory of Everything: UTE) অর্থাৎ প্রকৃতির সকল বলকে একীভূত করা সম্ভব হবে, তখন দেখা যাবে বৈশ্বিক ধ্রুবকগুলোর পক্ষে যেকোন মান পরিগ্রহ করার স্বাধীনতা আর থাকবে না। সুতরাং প্রকৃতি একটি বিশ্বই আমাদের উপহার দেবে, আর সেটি ‘আমাদেরই বিশ্ব’। অন্যদলের পদার্থবিদরা অবশ্য বৈশ্বিক ধ্রুবকগুলোর নিজ নিজ যে কোন মান পরিগ্রহের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন না, ফলে একাধিক মহাবিশ্বের অভ্যুদয়কে অস্বীকার করা যায় না। যে একগুচ্ছ ধ্রুবকের মান আমাদের বিশ্বের সাথে মিলবে সেখানেই আমরা পাবো আমাদের বিশ্ব; অন্য এক সেট মান যা বিশ্বের অভ্যুদয় ঘটাবে সেখানে হয়তো ভিন্ন প্রকৃতির জীবের আবির্ভাব ঘটতে পারে…এমনি করে মহাবিশ্বের এক ক্রমিক ধারার সৃষ্টি হতে পারে। অনেকটা একদলা সাবানের ফেনার মধ্যে অসংখ্য বুদবুদের মতো। কেউ এই ধরনের মহাবিশ্বের ক্রমিককে বলেছেন ‘বহু-মহাবিশ্ব’ (multiverse) আবার অন্যেরা বলেছেন ‘মহা মহাবিশ্ব’ (megaverse)।৩৯

ঈশ্বরবাদী পদার্থবিদগণ, যাঁদের নাম ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা অবশ্য নিজেদের গোঁ ধরে রেখে বলেছেন যে, উপরে একজন রয়েছেন যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্রুবকসমূহের মানগুলোকে সুসমন্বয় করে রেখেছিলেন দৃশ্যমান মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছায়, যেখানে তাঁরই ইচ্ছায় মানুষের অভ্যুদয় ঘটবে (নাকি তিনি সৃষ্টি করবেন?)। ব্রিটিশ পদার্থবিদদের যুক্তিকে খণ্ডন ও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে রিচার্ড ডকিন্স একটি চমৎকার উক্তি করেছেন যা আমরা তুলে ধরছি:৪০

I have already dismissed all such suggestions as raising bigger problems than they solve. But what attempts have theists made to reply? How do they cope with the argument that any God capable of designing a universe carefully and foresightfully tuned to lead to our evolution, must be a supremely complex and improbable entity who needs an even bigger explanation than one he is supposed to provide?

নানা বৈজ্ঞানিক মহল থেকেও এই তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে এবং একে ছদ্মবেশী বিজ্ঞান (pseudo science) নামে অভিহিত করা হয়। স্টিভেন ভাইনবার্গ এই অনুকল্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন:

কোন কোন পদার্থবিদ আছেন যাঁরা বলেন, প্রকৃতির কতিপয় ধ্রুবকের মানগুলোর এমন কিছু মানের সাথে খুব রহস্যময়ভাবে সূক্ষ্ম সমন্বয় ঘটেছে যেগুলো জীবন তৈরির সম্ভাব্যতা প্রদান করে। এভাবে একজন মানবদরদী সৃষ্টিকর্তাকে কল্পনা করে বিজ্ঞানের সব রহস্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। আমি এ ধরনের সূক্ষ্ম সমন্বয় ধারণায় মোটেই সন্তুষ্ট নই।৪১

ঈশ্বরবিশ্বাসীদের একটি বিরক্তি-উদ্রেককারী ঝোঁক হল যেখানেই কোন প্রাকৃতিক প্রপঞ্চের বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যাদান সম্ভব হচ্ছে না, সেখানেই তাঁরা ঈশ্বরের প্রসঙ্গ টেনে এনে সমস্যা সমাধানের প্রয়াস চালান। রিচার্ড ডকিন্স এ ধরনের প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেছেন:

সরলতা থেকে কী ভাবে জটিলতার উদ্ভব ঘটে তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আমাদের কাছে হাজির করে। কিন্তু ঈশ্বরের অনুকল্প (hypothesis of God) কোন কিছুর জন্যেই গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারে না, কারণ আমরা যা কিছুর ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করি এই অনুকল্প তা স্বীকার করে নেয়।৪২

ঈশ্বরবাদীরা বলে থাকেন যে, সৃষ্টি বেশ জটিল প্রক্রিয়া, তাই যে কোন সৃষ্টির পেছনে যেমন বুদ্ধিমান প্রকৌশলবিদের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি মহাজটিল বিশ্ব ও জটিলতম প্রাণীজগৎ সৃষ্টির পেছনেও দরকার সর্বজ্ঞ, দক্ষ সর্বকুশলী ঈশ্বর নামক একজন বুদ্ধিমত্ত সত্তার। কিন্তু বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীদের কাছে এর উত্তর রয়েছে, যে এটি হল ডারউইনবাদের মূল স্তম্ভ ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ (natural selection); যতদূর জানা যাচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন পদ্ধতিই সরলতর থেকে জটিলতর জীবনে নিয়ে যেতে সক্ষম।

ঈশ্বরবিশ্বাসের আর একটি ভিত হল মানুষের দুর্বলতা, দোদুলক্ষ্যমানতা এবং সুবিধাবাদমনস্কতা; এটি যে কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, শিক্ষিত ও বিজ্ঞানীদের বেলাতেও সমভাবে প্রযোজ্য। এ রকম অনেক বিজ্ঞানী রয়েছেন যাঁরা সুবিধার খাতিরে ঈশ্বরে বিশ্বাস করে থাকেন। ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন তবে শেষ বিচারের দিন তাঁরা মাথা উঁচু করে বলতে পারবেন-আমি বিশ্বাসী ছিলাম সারা জীবন। যদি ঈশ্বর না থাকেন তো বেঁচেই গেলেন জবাবদিহিতার হাত থেকে। আর ঈশ্বর অবিশ্বাসী হয়ে যদি দেখেন সত্যি তিনি আছেন, তাহলে তো দোজখের আগুনে দগ্ধ হতে হবে। সুতরাং সুবিধাবাদী নীতি হল ‘চান্স নেয়া কেন?’ ‘ঈশ্বরে বিশ্বাস কর’। এই নীতিকেই পশ্চিমের জগতে বলা হয় ‘প্যাস্কেলের ওয়েজার’ বা ‘প্যাস্কেলের বাজি’ (Pascal’s wager)।

রিচার্ড ডকিন্স হলেন ঈশ্বর অবিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের মুখপাত্র। তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন কোন ধরনের ঈশ্বরেই তাঁর আস্থা নেই। যেমন তিনি বলেছেন:৪৩

I decry supernaturalism in all its forms, and the most effective way to proceed will be to concentrate on the form most likely to be familiar to my readers … (the three great monotheistic religions)… I know you don’t believe in an old bearded man sitting on a cloud, so let’s not waste aû more time on that. I am not attacking any particular version of God or gods. I am attacking God, all gods, anything and everything supernatural, wherever and whenever they have been or will be invented.

ডকিন্সের সংজ্ঞায় যে কোন ধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তা হল ঈশ্বর পদবাচ্য। তিনি মনে করেন যে আমাদের নৈতিকতার উৎসও বিবর্তনবাদ থেকে উৎসারিত, এর সাথে কোন ধর্মীয় শাস্ত্রের যোগ নেই, যা সাধারণত ধর্মবাদীরা দাবি করে থাকেন।

ঈশ্বরবাদী ফ্রান্সিস কলিন্স এমন একজন বিজ্ঞানী যিনি একাধারে নিষ্ঠাবান খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, আবার বাইবেলীয় ঈশ্বরের অকৃত্রিম ভক্ত এবং ধর্মশাস্ত্রের প্রতিটি বাক্যে তাঁর রয়েছে প্রশ্নাতীত বিশ্বাস; আরো বিশ্বাস রয়েছে ‘অতিপ্রাকৃতিকতায়’ (supernaturalism) এবং বাইবেলীয় অলৌকিকতায় (miracle)। তাঁর ঈশ্বর মানুষের প্রতি যত্নশীল এবং বাস্তব (real) সত্তা; যেমন, তাঁর ঈশ্বর যেমন পর্বতে বা উপাসনালয়ে ভক্তের ডাকে নেমে আসতে পারেন, তেমনি উঁকি মারতে পারেন ফিজিঙ ল্যাবরেটরিতেও। তবে তিনি ঐশ্বরিক অলৌকিকতার সাথে প্রকৃতির দৈব প্রতিভাসকে (chance phenomena) গুলিয়ে ফেলেছেন। কেননা তেজষ্ক্রিয়তা আর মৃত যীশুর পুনরুত্থান এক ব্যাপার নয়। এই দুই বিপরীতধর্মী বিষয়ে নিষ্ঠা নিয়ে তাঁর মনে কোন সংশয় নেই, এটিই আশ্চর্য।

কলিন্স বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী; সর্বোপরি জীবনের সংকেত ডিএনএ গবেষণায় তাঁর রয়েছে তাৎপর্যময় অবদান এবং মানবীয় জেনোম প্রকল্পের প্রধান হিসেবে পরিচয় তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে। এই বাইবেলীয় বিশ্বাস তাঁর সম্প্রতি প্রণীত The Language of God পুস্তকের মাধ্যমে তিনি একদিকে প্রথাগত ধর্মবাদীদের বিজ্ঞানের ওপর আক্রমণকে, তেমনি বিজ্ঞানের ধর্মশাস্ত্রের ওপর অবিশ্বাস-নিরাসক্ততাকে প্রশমিত ও প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের পথের মধ্যে সামঞ্জস্য ও ঐকতান প্রতিষ্ঠার সমন্বয়বাদী চেষ্টার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তিনি নিশ্চয় প্রশংসিত হবেন। ফলে The Language of God পুস্তকটি সমকালীন ঈশ্বর বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের কাছে হয়ে উঠতে পারে একটি স্বস্তির আশ্রয়। আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু প্রশংসায় আপ্লুত হয়ে মন্তব্য করেছেন :

What an elegantly written book. In it Francis Collins, the eminent scientist, tells why he is also a devout believer…A real godsend for those with questioning minds but who are also attracted to things spiritual…

পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা বিজ্ঞানের সকল শাখা নিঃসন্দেহে মিশে যেতে পারে ঈশ্বর ও বাইবেলের বিশ্বাসের অন্তরে, তিনি এটি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ। কলিন্স তাঁর পরিণত বয়সের জীবন শুরু করেছিলেন প্রথমে অজ্ঞেয়বাদী (Agnostic) হিসেবে ও ‘নাস্তিকতা’ দিয়ে; কিন্তু জীবনের একপর্যায়ে তিনি সি এস লুইসের Mere Christianity ও অন্যান্য রচনার প্রভাবে বাইবেলীয় ঈশ্বরে ও ধর্মশাস্ত্রে অগাধ বিশ্বাসীতে পরিণত হন।৪৪ কলিন্স মনে করেন যে মানুষের মধ্যে নৈতিকতাবোধ, লুইস যাকে বলেছেন ‘নৈতিক নিয়ম’ (Moral laws), মানুষকে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসী করে তোলে, আর প্রকৃতির রহস্যময় জগতের নিয়মাবলি উদ্ঘাটনে অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞানী হতে উদ্বুদ্ধ করে। কলিন্স মনে করেন যে, মনুষ্য প্রজাতির মধ্যে যে ঔচিত্যবোধ অর্থাৎ ‘উচিত ও অনুচিত’ (right and wrong) বোধ রয়েছে তা বিশ্বজনীন এবং ‘নৈতিক নিয়মাবলির ভিত্তি’-যা থেকে সৃষ্টি হয় ঈশ্বরানুভূতি। তিনি এমনও বলেছেন যে, এই নিয়ম প্রকৃতির নিয়ম অভিকর্ষ বা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের মতই প্রাতিভাসিক। কিন্তু নৈতিকতা যে ঈশ্বর বা ধর্মবিশ্বাসের উৎস এ প্রশ্নের তো সমাধা হয় নি, কলিন্সও এর পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থিত করতে পারেন নি। তাহলে আইনস্টাইনসহ কোন বিজ্ঞানীই ঈশ্বর অ-বিশ্বাসী হতেন না।

কলিন্সের বক্তব্যের বিপরীতে রিচার্ড ডকিন্সের ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে বলেছেন:
‘… a belief in evolution demands atheism.’ He further says, Faith is the great cop-out, the great excuse to evade the need to think and evaluate evidence. Faith is belief in spite of, even perhaps because of, the lack of evidence… Faith, being belief that isn’t based on evidence, is the principal vice of any religion.’৪৫

অন্যদিকে বাইবেলপন্থী (এবং আমাদের দেশের কোরআনপন্থী) সৃষ্টিবাদীরা বিবর্তনে বিশ্বাস করেন না। এই বিবর্তনবাদবিরোধী জনৈক নেতা হেনরি মরিস পরিষ্কার ভাষায় দাবি করেন:
বিবর্তনবাদ মিথ্যা প্রচারণা করে থাকে এবং আধুনিক চিন্তাজগতের তা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করেছে। যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যম্ভাবীভাবে স্বীকার করতে হয় যে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক রাজনৈতিক অবস্থা, বিশৃঙ্খল নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়…ইত্যাদির জন্য বিবর্তনবাদী চিন্তাধারাই দায়ী…।৪৬

কিন্তু ঈশ্বরবাদী কলিন্স নিজে ডারউইনিজমে বিশ্বাসী, তিনি বলেন, , ‘Science reveals that the universe, our own planet, and the life itself are engaged in an evolutionary process. এমনকি বিবর্তনের পক্ষে এমন কথাও বলেছেন, ‘…in my view evolution might have been God’s elegant plan for creation of humankind….’। তখন মনে হয় না তিনি ডকিন্সের বিরুদ্ধপক্ষ। তবে তিনি সাধারণ বাইবেলীয় অনুসারের বিপরীতে সাহসী উচ্চারণ করেন যে, বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে এবং মানুষের অভ্যুদয় ঘটেছে ঈশ্বরনির্দেশিত পথে। আর পাঁচজন বিজ্ঞানীর মতোই তিনি আশাবাদী যে, … mathematics has led scientists right to the doorstep of some of the most profound questions of all. First among them how did all began? এর উত্তর এখন আমরা জানি; তা হচ্ছে পদার্থবিদ্যার ভাষায় বিগ ব্যাং (Big Bang) বা মহাবিস্ফোরণ।

কলিন্স একই সাথে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে যে বৈজ্ঞানিক পথ ছাড়া অন্যকোন পথ নেই সেকথাও সোচ্চারে বলেন, ‘প্রকৃতিকে অনুসন্ধানে বিজ্ঞানই হল একমাত্র বৈধ পথ। আণবিক গড়নের অনুসন্ধানই হোক, অথবা মহাবিশ্বের প্রকৃতি উদ্ঘাটনই হোক, অথবা মানবীয় জেনোমের ডিএনএ ধারাবাহিকতার পঠনই হোক; বৈজ্ঞানিক পন্থাই হচ্ছে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সব থেকে বিশ্বস্ত উপায়।’ একই সাথে তিনি আবার বলেন:

Nevertheless, Science alone is not enough to answer all questions… Science is not the only way of knowing. The spiritual world view provides another way of finding the truth. Scientists who deny this would be well-advised to consider the limits of their own tools…৪৭

কলিন্স চেয়েছেন বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মবাদের মধ্যে একটি সমন্বয়। শেষ কথা হল, এ দুয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিষয়ে ‘সময় এসেছে বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধে শান্তি স্থাপনের, যে যুদ্ধ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।’ কলিন্স মনে করেন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথ ঈশ্বরের পথ, ‘ঈশ্বরের ভাষা’ (The Language of God)। কিন্তু ‘আমরা কখন এসেছি, কেন এসেছি, কোন উদ্দেশ্যে?’, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ঈশ্বরের কাছে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেছেন।

অন্যদিকে ডকিন্সের দৃষ্টিতে যেহেতু বিবর্তনবাদ জীবনের সকল জটিলতার এবং মানুষের অভ্যুদয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে, সুতরাং ঈশ্বরের, অন্তত প্রাকৃতিক জগতে, প্রয়োজন নেই। বলাবাহুলক্ষ্য, নাস্তিকতার পক্ষে আধুনিক চার্বাক ডকিন্স নিঃসঙ্গ নন। বিখ্যাত বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উলসনও মনে করেন যে, বিবর্তনবাদ যে কোন ধরনের অতিপ্রাকৃতের (supernatural) বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে সক্ষম:

The final decisive edge enjoyed by scientific naturalism will come from its capacity to explain traditional religion, its chief competition, as a wholly material phenomenon. Theology is not likely to survive as an independent intellectual discipline.৪৮


বিজ্ঞানী আইনস্টাইন

আইনস্টাইনীয় ধর্ম
‘বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্ম’ বিষয়ক সিম্পোজিয়ামে আইনস্টাইন বিজ্ঞানের সংজ্ঞা সহজেই দিতে পারলেও ধর্মের কোন সংজ্ঞা দিতে পারেন নি। তিনি বলেছিলেন, ‘But when asking myself what religion is I cannot think of the answer so easily’ সুতরাং আইনস্টাইন সে-চেষ্টা না-করে যাঁরা নিষ্ঠার সাথে ধর্ম পালন করে সমাজে ধার্মিক নামে পরিচিতি পেয়েছেন তাঁদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন এভাবে : সমস্ত সংকীর্ণতাবর্জিত অর্র্থাৎ স্বার্থপরতার নিগড় থেকে মুক্ত, সৎ-ভাবনা ও অনুভূতির সাথে আত্মগত থাকা এবং মানবীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত, অর্থাৎ অতিমানবীয় গুণাবলি ধারণ করা। আমরা যদি প্রথাগত ও আচারনিষ্ঠ গণ্ডীবদ্ধ ধর্মবাদের ঊর্ধ্বে না উঠতে পারি তাহলে গৌতম বুদ্ধ ও স্পিনোজার মতো মহৎ ব্যক্তিকেও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হবো। আইনস্টাইন তাই মন্তব্য করেন, , ‘Accordingly, a religious person is devout in the sense that he has no doubt of the significance and loftiness of those super-personal objects and goals which neither require nor are capable of rational foundation.’ ।

আইনস্টাইনের ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি ও লেখা বিশ্লেষণ করে তাঁর ধর্মচিন্তাকে আখ্যা দেয়া হয়েছে ‘কসমিক রিলিজিয়ন’ বা ‘মহাজাগতিক ধর্ম’। তাহলে মহাজাগতিক ধর্মের উৎস কি, এর ভিত্তিই বা কি? সাধারণ গবেষক থেকে আইনস্টাইনের মতো মহান বিজ্ঞানী পর্যন্ত যে কোন বিজ্ঞানী যখন কোন চমকপ্রদ আবিষ্কার করেন তখন তিনি এক ধরনের বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং আনন্দ-আপ্লুত হন, যাকে বলা যায় স্বর্গীয়। এই স্বর্গীয় আনন্দময় অনুভূতিকেই অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন ‘ধর্মানুভূতি’। এই অর্থে প্রতিটি বিজ্ঞানীই ধর্মপ্রাণ। এই ধর্মানুভূতিকেই বিজ্ঞানীরা আখ্যা দিয়েছেন ‘কসমিক রিলিজিয়ন’ (cosmic religion) বা ‘মহাজাগতিক ধর্ম’।

বিজ্ঞানীদের এই বিচিত্র প্রতিক্রিয়াকে নানা জনে নানা নাম দিয়েছেন। একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদের এই সত্যে উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেকে বলেন ‘কঠিন সত্য’ (hard fact), আবার এই অভিজ্ঞতাকে কেউ আখ্যা দেন ‘রহস্যময় অভিজ্ঞতা’ (mysterious experience)। আইনস্টাইন এই সত্যানুভূতিকেই বলেছেন ‘কসমিক রিলিজিয়নের’ ভিত্তি (… this fact is the basis of cosmic religion) । এই ধরনের প্রতিক্রিয়া, যা বিজ্ঞানীর মনে সৃষ্ট হয়, বিজ্ঞানে সেটি তাঁর সৃষ্টিশীল ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত। তাই তো আইনস্টাইন দৃঢ়তার সাথে বলতে পারেন যে এই জ্ঞান,

This feeling is at the Centre of true religiousness. In this sense, and in this sense only, I belong to the ranks of devoutly religious men.

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে আইনস্টাইনের কাছে ‘গাণিতিক পদার্থবিদ্যার সম্ভাবনায়’ (Possibility) বিশ্বাস ধর্মের সাথে অভিন্ন। আইনস্টাইনের মহাজাগতিক ধর্ম হচ্ছে একটি অপার সৌন্দর্যময় ও ধারণাগতভাবে সরল প্রতীকী পদ্ধতির সম্ভাবনায় বিশ্বাস, যা থেকে নিরীক্ষিত তথ্যসমূকে যৌক্তিকভাবে বের করে আনা সম্ভব। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা সপ্তদশ শতকে মহাজাগতিক ধর্মকে প্রথম তুলে ধরেছিল সেই অর্থে, ঠিক যে অর্থে বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যা মহাজাগতিক ধর্মকে তুলে ধরেছে।

ধর্মবাদীরা আইনস্টাইনের প্রথাগত ধর্মবিশ্বাস প্রমাণ করতে তাঁর একটি উক্তিকে, ‘science without religion is lame, religion without science is blind.’,-পূর্বাপর সমন্বয় না রেখে ভুল উদ্ধৃত করে থাকেন। প্রথমত আইনস্টাইন কথিত এই ‘religion’ বাইবেলীয় বা ইহুদি একেশ্বরবাদী ধর্ম নয়। আইনস্টাইন প্রকৃতির মধ্যে যে সুশৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা দেখে বিমোহিত হন, ঠিক ধর্মের মধ্যেও এ-ধরনের নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা তিনি দেখতে পান। আর এই অর্থেই তিনি বলে থাকেন যে, প্রকৃতিতে নিয়মানুবর্তিতার অস্তিত্বে বিশ্বাস ধর্মেরই অন্তর্গত। ধর্মকে এখানে প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্ম’ শিরোনামে একটি সিম্পোজিয়ামে তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেখানে বিষয়টিকে তিনি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন:

To this [sphere of religion] there also the faith in the possibility that regulations valid for the world of science are rational, that is comprehensible to reasons. I cannot conceive of a genuine scientist without that profound faith. The situation may be expressed by an image: science without religion is lame, religion without science is blind.৪৯

আইনস্টাইন এখানে যা বলতে চেয়েছেন তা হল ধর্মে যেমন কঠোর নিয়মনিষ্ঠতা ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান, ঠিক তেমনি একজন প্রকৃত বিজ্ঞানীর মধ্যেও সেই শৃঙ্খলা থাকতে হবে বিশ্বাসের মতই দৃঢ়। এক কথায় শৃঙ্খলা ব্যতীত বিজ্ঞান অগ্রসর হতে পারে না। আইনস্টাইন ওই বক্তৃতাতেই বলেছিলেন, ‘ধর্মীয় জগতের সাথে বিজ্ঞান জগতের বর্তমান বিবাদের (পড়হভষরপঃ) উৎস ব্যক্তি-ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে নিহিত। বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হল সাধারণ বিধিমালা প্রতিষ্ঠা করা যা নির্ধারণ করবে স্থান ও কালের বস্তুনিচয় ও ঘটনাবলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক।’ আবার অন্যত্র আইনস্টাইন এও বলেছেন:

আমার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে আপনারা যা পড়েন তা অবশ্যই মিথ্যা, এটি এমন এক মিথ্যা যা ক্রমান্বয়ে পদ্ধতিগতভাবে পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। আমি কোন ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না এবং কখনও অস্বীকার করি নি, বরং পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছি। আমার মধ্যে যদি এমন কোনকিছুকে ধর্মীয় বলে শনাক্ত করা যায় তা হল বিশ্বের গড়নের জন্য আমার অনাবিল প্রশংসা, যে বিশ্ব-গড়নকে আমাদের বিজ্ঞান এ পর্যন্ত উন্মোচিত করেছে।

এই দুটি বক্তব্য থেকে কি মনে হতে পারে যে, আইনস্টাইন স্ববিরোধিতা করেছিলেন? তাঁর কথাগুলো কি উভয়পক্ষের সমর্থনে তুলে এনে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়? উত্তর হল-না। ‘ধর্ম বা রিলিজিয়ন’ শব্দটিকে আইনস্টাইন একেবারেই ভিন্ন কিছু অর্থে ব্যবহার করেছেন যা প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত ‘ধর্ম’ শব্দ হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

আইনস্টাইন থেকে আরও কতিপয় উদ্ধৃতি চয়ন করা যাক, যা থেকে তাঁর ধর্ম-প্রকৃতির কিছুটা সৌরভ পাওয়া সম্ভব :৫০
এর মধ্যে কয়েকটি সরাসরি তাঁর বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত; যেমন, ১. আমি ব্যক্তি-ঈশ্বরের কল্পনা করতে চাই না; ২. আমরা আমাদের অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়ের সহায়তায় যে মহাবিশ্বের গড়ন এখনো পর্যন্ত সম্যক বুঝতে পেরেছি এতেই আমি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ে আপ্লুত; ৩. ঈশ্বর পাশা খেলেন না; ৪. কোন কিছুর পশ্চাতে, যা অভিজ্ঞতা-উপলব্ধনীয়, তা অনুধাবন করতে হলে ‘এমন কিছুর’ অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয় যা আমাদের অন্তর সম্যকভাবে বুঝে উঠতে পারে না এবং এর সৌন্দর্য ও গরিমা আমাদের কাছে উপনীত হয় অপ্রত্যক্ষভাবে এবং অতিদুর্বল প্রতিফলনের আকারে। আর এটি হচ্ছে ধর্মপরায়ণতা। এই অর্থেই আমি ধর্মপরায়ণ।

১৯৪০ সালে আইনস্টাইন তাঁর সেই যে বিখ্যাত উক্তি, ‘আমি ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না’, এর সমর্থনে একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এই প্রবন্ধ এবং এ ধরনের অনেক বক্তব্যে ধর্মীয় গোঁড়াদের কাছ থেকে আসা চিঠির ঝড় উঠেছিল সেসময়। নমুনাস্বরূপ আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় অবস্থিত ‘ক্যাভালরি তাবের্নাকল এসোসিয়েশনের’ প্রতিষ্ঠাতার একটি চিঠির বক্তব্য তুলে ধরছি:

প্রফেসর আইনস্টাইন, আমার বিশ্বাস আমেরিকার প্রতিটি খ্রিস্টধর্মাবলম্বী আপনাকে জবাব দেবে, ‘আমরা আমাদের ঈশ্বর এবং তাঁর পুত্র যীশুখ্রিস্টের ওপর থেকে বিশ্বাস সরিয়ে নেব না, কিন্তু আপনি যদি এই জাতির জনগণের ঈশ্বরকে বিশ্বাস না করেন তাহলে আমরা আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি-আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানেই ফিরে যান।

আইনস্টাইন যে অর্থে নিজেকে ধর্মপরায়ণ বলেছেন সেই অর্থে আমাদের ধর্মপরায়ণ হতে বাধা নেই, শুধু সেই ব্যাক্যাংশটি সম্পর্কে যেখানে বলা হচ্ছে, যা ‘আমাদের অন্তর সম্যকভাবে বুঝে উঠতে পারে না’ সেটি সম্পর্কে আমরা ভিন্নমত পোষণ করি। এই বাক্যটির অর্থ কখনও হতে পারে না যে, এই মুহূর্তে অবোধ্য কোন সত্তা ‘চিরকালের জন্যই অবোধ্য’ হয়ে থাকবে।

ডকিন্সের সুচিন্তিত মূল্যায়নে আইনস্টাইন হলেন সর্বেশ্বরবাদের (Pantheism) আড়ালে একজন ছদ্মবেশী নিরিশ্বরবাদী। উপরের উক্তিসমূহের মধ্যে ব্যবহৃত ঈশ্বর শব্দটিকে আইনস্টাইন যে বিশুদ্ধ রূপক (Metaphoric) ও কাব্যিক অর্থে ব্যবহার করেছেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। ডকিন্সের মতে, ‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না’ (God does not play dice), এ বাক্যটির অর্থ হওয়া উচিত, ‘সকল বস্তুর অন্তরে ‘ইতস্তততা’ (randomness) বিরাজ করে না’। ‘মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে ঈশ্বরের কী কোন পছন্দ ছিল’, এ কথার অর্থ ‘মহাবিশ্ব কী অন্যকোন প্রক্রিয়ায় বা পদ্ধতিতে শুরু হতে পারত?’ এসব উক্তির অর্থ উপরি-উপরি বিবেচনা না করে অভিনিবেশ সহকারে অনুশীলন করলে এবং কোন প্রসঙ্গে এসব কথা বলেছেন সে-পটভূমি মনে রাখলে, এসব উক্তি সর্বেশ্বরবাদের (Pantheism) তাৎপর্য বহন করে; প্রত্যাদেশবিরোধী নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরবাদও (Deism) নয়, এবং নিশ্চিতভাবেই ঈশ্বরবাদ (Theism) তো নয়ই। ঈশ্বরের পাশা খেলা নিয়ে ম্যাক্স বরন্‌ ও আইনস্টাইনের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিল তা বেশ চিত্তাকর্ষক। বরন্‌ ছিলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাংখ্যয়নিক বর্ণনায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ অনিশ্চয়তাবাদী, অন্যদিকে আইনস্টাইন ছিলেন নিশ্চয়তাবাদী, কঠোর নির্দিষ্টবাদী এবং কার্যকারণবাদে বিশ্বাসী। আইনস্টাইনের এই মতামত সম্পর্কে বরন্‌ বলেছেন:৫১

… that, in order to predict little parts of it, we need not solve innumerable differential equations but can use dice with fair success. I think, this situation has not changed much by the introduction of quantum statistics; it is still we mortals who are playing dice for our little purpose of prognosis.

এর উত্তরে আইনস্টাইন লিখেছিলেন:
In our scientific expectation we have grown antipodes. You believe in God playing dice and I in perfect laws in the world of things existing as real objects, which I try to grasp in a wildly speculative way. (Einstein to Born, November 7, 1944)

একইভাবে খ্যাতনামা জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও মহাজাগতিজ্ঞ (cosmologist) স্টিফেন হকিং-এর ঈশ্বর সম্পর্কীয় দু’একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে অনেকেই তাঁকে ঈশ্বরবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর দু’একটি উক্তি বিবেচনা করা যাক।

হকিংয়ের এসব উক্তির সাথে তাঁর অধীত বিষয়ের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। ‘বিশ্ব কেন যেমনটি আছে তেমন রূপে আবির্ভূত হল?’, ‘আমরা এবং বিশ্বের অস্তিত্ব কেন’, বা বিশ্বসৃষ্টির পেছনে ঈশ্বরের কী মনোভাব ছিল তা পাঠ করা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে পদার্থবিদ্যার ন্যূনতম সম্পর্ক নেই এবং সর্বাংশে পদার্থবিদ্যার পরিধি-বহির্ভূত। তিনি এখানে পদার্থবিদ্যার জগৎ ছেড়ে দর্শনের জগতে আরও সুনির্দিষ্টভাবে অধিবিদ্যার জগতে প্রবেশ করেছেন। উপরের উক্তিগুলো স্টিফেন হকিংয়ের ঈশ্বরবাদী মনের যত না প্রকাশ তার চাইতেও বেশী অলঙ্কারিক, প্রতীকী এবং উচ্ছ্বাসময় নাটকীয় ও কাব্যিক। তাঁর প্রথম বক্তব্যটির কথা ধরা যাক। উদ্ধৃত বাক্যটির আগে তিনি বলেছিলেন যদি আমরা ‘একীভূত সর্ববিষয়ের তত্ত্ব’ (UTE) প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলেই আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব (অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকদের) মহাবিশ্বের অভ্যুদয় কেন, কেন এর অস্তিত্ব, ইত্যাদি। এখানে ধর্ম বা ঈশ্বরের কোন ভূমিকা নেই। তিনি যে ঈশ্বরের নামোল্লেখ করেছেন তা নেহায়েত প্রতীকী (Metaphoric) অর্থে। খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিকেরা অনেক সময়ই আলঙ্কারিক ও দর্শনের পরিভাষা ব্যবহার করতে কেন জানি পছন্দ করেন। ঠিক আগের অধ্যায়ের (১০ম অধ্যায়) শেষে মূল গ্রন্থটি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেও তিনি হুবহু একই ধরনের একটি উক্তি করে বইটির সমাপ্তি টেনেছেন:

A complete, consistent, unified theory is only the first step: our goal is a complete understanding of the events around us, and our own existence.
এখানে হকিং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিকের মতই কথা বলেছেন, অপ্রাসঙ্গিক ঈশ্বর প্রসঙ্গ বা অধিবিদ্যাকে প্রশ্রয় দেন নি।

তবে আমাদের বক্তব্য হল ধর্ম, ঈশ্বর, অধ্যাত্মবাদ শব্দগুলো প্রচলিত অর্থেই বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করা উচিত, অন্যকোন অর্থে (এমন কি আলঙ্কারিক অর্থেও) নয়; এতে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ থাকে ও ভুল অর্থ বহন করে। এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর ও ভ্রান্ত অর্থবাহী, কারণ জনগণের বৃহত্তর অংশের কাছেই ‘ধমের্র’ অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে ‘অতিপ্রাকৃত’ (supenatural)। কার্ল সাগান সুন্দরভাবে এটি উত্থাপন করেছেন,৫২

…যদি ‘ঈশ্বর’ শব্দ দিয়ে মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী একগুচ্ছ পার্থিব নিয়মকে কেউ বুঝতে চান, তাহলে নিশ্চয় সে-ধরনের ঈশ্বর রয়েছে। এ-ধরনের ঈশ্বর ভাবাবেগের দিক থেকে কিন্তু একেবারেই অসন্তোষজনক…অভিকর্ষ নিয়মের কাছে মাথা ঠেকিয়ে নামাজ, পুজা বা প্রার্থনা করার কোন অর্থ হয় না।

বিজ্ঞানীদের ধর্ম-স্পর্শকাতরতা বিষয়ে পদার্থবিদ স্টিভেন ভাইনবার্গ (Steven Weinberg) তাঁর ‘ড্রিম অব ফাইনাল থিওরি’ গ্রন্থে (Dream of Final Theory)৫৩ অনেকের মতই এ বক্তব্য রেখেছিলেন:
অনেকে ঈশ্বর সম্পর্কে বেশ উদার, প্রশস্ত এবং নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, ফলে এটি অসম্ভব নয় যে তাঁরা যেখানেই ঈশ্বরকে খুঁজবেন সেখানেই তাঁর দেখা মিলবে। আমরা এমন কথাও বলতে শুনি, ‘ঈশ্বরই হলেন চরম বা শেষ পরিণতি’, কিংবা ‘ঈশ্বর হলেন প্রকৃতির সুন্দরতম প্রকাশ’, অথবা ‘ঈশ্বরই হলেন মহাবিশ্ব’। অবশ্যই, যে কোন শব্দের মতো ‘ঈশ্বর’ শব্দের ওপরও আমরা পছন্দ মতো অর্থ আরোপ করতে পারি। আপনি যদি বলতে চান ‘ঈশ্বরই শক্তি’ অবশ্যই তা বলতে পারেন, এবং তাহলে আপনি একখণ্ড কয়লাতেও তাঁর সন্ধান পাবেন।

আমার কথা
বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এ যাবৎ কোন অর্থবহ অনুশীলন হয়েছে বলে আমার জানা নেই, সুতরাং এ নিয়ে এখানে কোন মতামত প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি বিরাট সংখ্যক ঈশ্বরবিশ্বাসী। আমার পরিচিত সহকর্র্মীদের মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু সংখ্যক রয়েছেন যাঁরা নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী বা প্রকৃতিবাদী ও সংশয়বাদী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দু’জন শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষকের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই-যাঁদের কাছে আমি পদার্থাবদ্যার পাঠ নিয়েছি। এঁদের মধ্যে একজন অধ্যাপক সুশীলচন্দ্র বিশ্বাস, যিনি ছিলেন একাধারে নিষ্ঠাবান গবেষক ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। তিনি সেই ত্রিশের দশকে রাসায়নিক পদার্থবিদ্যার (chemical physics) গবেষণার ছিলেন পথিকৃৎ। অন্যদিকে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু, নিয়মিত ধ্যান-ধারণ করতেন। একদিন তাঁকে অবিশ্বাসের ঔদ্ধত্য নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম আধ্যাত্মিক জগৎ ও পদার্থবিজ্ঞানের জগৎকে নিয়ে। তিনি জবাব দিয়েছিলেন মৃদু হেসে-দু’টি সমান্তরাল জগৎ, দুটিকে মেলাতে চেষ্টা করলেই বিসম্বাদ।

অন্যজন আমার প্রিয় শিক্ষক নব্বই-ঊর্ধ্ব বয়সী অধ্যাপক ইন্নাস আলী, আমাদের দেশের সবচাইতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পদার্থবিদ। তিনি একনিষ্ঠ কোরানিক ঈশ্বরে বিশ্বাসী। নিজের জীবনের অর্জনকে তিনি দেখেছেন ঈশ্বরের মহিমাদীপ্ত প্রকাশ হিসেবে, যে অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন Revealing the Glory of God in Life গ্রন্থে। তিনি যেন কেমন করে ধর্মের জগতের সাথে বিজ্ঞানের জগৎকে সমন্বয় করেছিলেন সন্তোষের সাথে, যেমনটি কলিন্স মিলিয়েছিলেন বিজ্ঞানী-জীবনকে ধর্মীয় জীবনের সাথে।৫৪

একটি গুরুতর প্রশ্নের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ধর্ম ও ধর্মশাস্ত্রোক্ত ‘সত্যের’ সাথে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যখন মিলবে না, তখন একজন বুদ্ধিদীপ্ত মুক্তমনা মানুষ কী অবস্থান নেবেন? বাইবেলীয় ধর্মপ্রাণ ঈশ্বরভক্ত বা কোরআনের ঈশ্বরে নিষ্ঠাবান বিশ্বাসীর কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে মুহূর্ত দেরি হবে না, যেমন বাইবেলীয় ঈশ্বরবাদী হেনরি মরিস দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা দিয়েছেন:
When science and the Bible differ, science has obviously misinterpreted its data.৫৫

কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টারনেটের একটি ফোরামে প্রকাশিত ‘Science and Quran’ প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় একাধিক পত্রলেখক মত প্রকাশ করেছেন যে, কোরআন ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের মধ্যে বিরোধ বাধলে তারা কোরআনের মতকেই প্রধান্য দেবেন, কারণ বিজ্ঞান শূন্য থেকে কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, অন্যদিকে আল্লাহতায়ালা সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন ‘কোন কিছু না’ (nothingness) থেকে।

সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বাষ্পে দগ্ধ বাংলাদেশের চলমান পরিপ্রেক্ষিতে মানবতাবাদী শ্রদ্ধেয় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের একটি অনন্য উক্তি স্মরণ করে এবং তাঁর পাদপদ্মে আর একবার প্রণতি জানিয়ে আমার এই বক্তব্যের সমাপ্তি টানতে চাই:

‘আমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে মসজেদে
ওরে ও পরম গুরু সাঁই
তোর পথ দেখতে না পাই
আমায় রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মুরসেদে’৫৬

‘প্রাচীন বাউল কবির মুখে সহজেই এই মনোহারিণী বাণীর উদয় হইয়াছিল।… মানুষে-মানুষে ঐক্যের প্রচেষ্টা ছিল তাঁহাদের সাধনা। উদারতার এই এক অদ্বিতীয় সংজ্ঞা।…মানুষে-মানুষে বিভেদ আছে সত্য। এই বিভেদকে জয় করাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি ঐক্যের বাহন, বিভেদের চামুণ্ডা নয়।

প্রথম পর্ব : অজয় রায়ের বিশেষ প্রবন্ধ : “বিজ্ঞানের ধর্ম”

/ALTERNATES/w640/02_Professor+Ajay+Roy_Article+19_030715_0002.jpg” width=”400″ />
লেখক অজয় রায়

তথ্যসূত্র
২৩. ফ্রান্সিস কলিন্স তাঁর পুস্তকে এই তথ্য দিয়েছেন: (Francus S. Collins, The Language
of God, Free Press, New York, ২০০৭
২৪. খ্যাতনামার মানদণ্ড ছিলেন যে সব বিজ্ঞানী National Academy of Sciences (equivalent to a Fellow of the Royal Society in Britain এর সদস্য।
২৫. E. J. Larson and L. Witham, Leading Scientists Still Reject God, Nature, 394, 1998, 313
২৬. M. Shermer, How We Believe: The Search for God in an Age of Science, W H Freeman, New York, 1999.
২৭. Mensa is the Society of Individuals with high IQ
২৮. P. Bell, ‘Would you believe it’, Mensa Magayine, Feb, 2002, p12-13
২৯. ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটির নাম: de Revolutionbus Orbium Clestum
৩০. http://w.wusatoday.com…/2007-6-19-newton-religious-papers …
৩১. I believe in Spinoza’s God who reveals himself in the ordinary Harmony of what exists, not in a God who concerns himself with fates and actions of human beings.
৩২. Baruch Spinoza, Tractatus Theologico-Politicus, 1670; Short Treatise on God Man and His Well Being (English translation: A. Wolf), London, 1910
৩৩. The doctrine that the existence of everything in nature can be explained in terms of purpose
৩৪. Exposition du system du monde; Pierre-Simon Laplace, http://w
-whistorz:mcs.st-andesw.ac.uk/Biograhies/Laplace.html
৩৫. Paul Davis, God and the New Physics, J M Dent and Sons, London, 1983, p 162
৩৬. Victor J Strenger, Has Science Found God? The Latest Results in the search of for Purpose in the Universe, New York: Prometheus Books, 2003
৩৭. Steven Weinberg, A Designer of Universe? ;http://w.physlink.com/Education/ essay_weinberg.efm
৩৮. বুদ্ধিদীপ্ত নকসা তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন: মাইকেল বিহে, উইলিয়াম ডেম্বস্কি ও জর্জ এলিস। The theist says that God, when setting up the universe, tuned the fundamental constants of the universe so that each one lay in its Goldilocks zone for production of life. P ( Richard Dokins, The God Delusion, Bantam Press, London, 2006, p 143.
৩৯. এই ‘মহা মহাবিশ্ব’ (megaverse) অনুকল্পের অন্যতম প্রবক্তা লিওনার্ড সাসকিন্ড বলেছেন (Leonard Sussskind, 2006) the idea is hatred by most physicists. I can’t understand why. I think it is beautifully perhaps because my consciousness has been raised by Darwin.
৪০. Richard Dawkins, The God Delusion, Bantam Press, London, 2006, p 147
৪১. Steven Weinberg, A Designer of Universe,
http://w.physlink.com/Education/essay_weinberg.efm
৪২. A lecture entitled ‘The Kno-wnothings, the kno-walls, and the no-contests’ given by Richard Dawkins, The Nullifidian, December 1994.
৪৩. Richard Dawkins, God Delusion, Bantam Press, London, 2006
৪৪. C S Lewis, Mere Christianitz, Westwood: Barbour and Company, 1952; Francis Collins, The Language of God, Free Press, New York, 2007, p
৪৫. Richard Dawkins, Is Science a Religion?, The Humanist, 57, 1997, p 26-29.
৪৬. H R Morris, The Long War Against God, New York: Master Books, 2000
৪৭. পূর্বোক্ত, পৃ ২২৮-৯
৪৮. E. O. Wilson, On Human Nature, Cambridge: Harvard University Press, 1978, p 192
৪৯. Albert Einstein, Science, Philosophy and Religion, A symposium, New York, Harper, 1941; ১৯৪১; বস্তুত তিনি এই বক্তৃতাটি দিয়েছেলেন ১৯৪০ সালে।
৫০. M. Jammer, Einstein and Religion, Princeton: Princeton University Press, 2002
৫১. Max Born, Einstein’s Statistical Theories, Albert Einstein: Philosopher-Scientist, p 178, Ed Paul A. Schilpp, The Library of Living Philosophers, Inc., Evanston, Illinois, 1949
৫২. Carl Sagan, the Demon-Haunted Worlds: Science as a Candle in the Dark, London: Headline, 1996; also see Pale Blue Dot, London: Headline, 1995
৫৩. S. Weinberg, Dream of a Final Theory, London: Vintage, 1993
৫৪. M. Innas Ali, Revealing the Glory in Life, Asiatic Civil Military Press, Bangladesh, 1997
৫৫. H. R. Moris, The Long War against God, New York: Master Books, 2000
৫৬. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পঞ্চম স্মারক বক্তৃতা (১০ নভেম্বর ২০০৭)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “অজয় রায়ের বিশেষ প্রবন্ধ দ্বিতীয়াংশ : “বিজ্ঞানীর ধর্ম”

  1. জ্ঞানচর্চা এদেশে কোন অবস্থায়
    জ্ঞানচর্চা এদেশে কোন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে, এই পোস্টের পাঠক দেখলেই তা যে কেউ অনুধাবন করতে পারবেন। হুজুগ আর গসিপ ছাড়া জনতার পাঠে আগ্রহ কম। এই প্রবণতা নির্দেশ করে যে, আমাদের সমাজে ভয়াবহ সাংস্কৃতিক দৈন্যতার পুনঃপৌনিক বিকাশ ঘটে চলেছে।

    1. তবে আমাদের বক্তব্য হল ধর্ম,

      তবে আমাদের বক্তব্য হল ধর্ম, ঈশ্বর, অধ্যাত্মবাদ শব্দগুলো প্রচলিত অর্থেই বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করা উচিত, অন্যকোন অর্থে (এমন কি আলঙ্কারিক অর্থেও) নয়; এতে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ থাকে ও ভুল অর্থ বহন করে। এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর ও ভ্রান্ত অর্থবাহী

      অনেক বিজ্ঞানী সম্ভবত অর্থের লোভে ইচ্ছে করেই বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মকে গুলিয়ে ফেলেন । মরিস বুকাইলির মত বিজ্ঞানীরা কোরআনকে কোন মানব রচিত নয় বলে ঘোষণা দেন অথচ নিজে ইসলাম গ্রহন করেন না । রাসেল যথার্থই বলেছিলেন

      “The immense majority of intellectually eminent men disbelieve in God in Christian religion, but they conceal the fact in public, because they are afraid of loosing their incomes.”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 8