অজয় রায়ের বিশেষ প্রবন্ধ : “বিজ্ঞানের ধর্ম”

[নোট : অজয় রায় বাংলাদেশী পদার্থ বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী। তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ‘মুক্তান্বেষা’ নামক পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হিসবে কাজ করছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবকল্যাণবোধ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুক্তমনা এবং মুক্তচিন্তক লেখকদের লেখা নিয়ে সংকলন-গ্রন্থ ‘স্বতন্ত্র ভাবনা’ তার পরিচালনায় প্রকাশিত হয়েছে অঙ্কুর প্রকাশনা থেকে ২০০৮ সালে। আলোচ্য লেখাটি তার বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর ধর্ম শীর্ষক রচনার প্রথমাংশ। লেখাটির দ্বিতীয়াংশ ‘বিজ্ঞানীর ধর্ম’ দেখতে এখানে ক্লিক করুন। লেখাটি ইতোপূর্বে ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত-এ ছাপা হয়েছিল।]

?oh=19576150b29668fe24af0dbf0874af37&oe=5534516B&__gda__=1429407955_cdb13462819c8ed72b03387527352481″ width=”400″ />

বিজ্ঞান বলতে আমরা কী বুঝি এ নিয়ে মতৈক্যে আসা কঠিন ব্যাপার নয়। বিজ্ঞান হল শতাব্দী-প্রাচীন এমন একটি প্রচেষ্টা যা পদ্ধতিগত চিন্তার মাধ্যমে বিশ্বের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রপঞ্চসমূহকে যতদূর সম্ভব সম্পূর্ণভাবে একটি সংস্থার মধ্যে একত্রিত করে। সাহসের সাথে বলতে হলে বলা যায়, যে ধারণা-প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের উত্তরকালীন পুনর্গঠনের এটি একটি প্রয়াস। ১ আলবার্ট আইনস্টাইন

বিজ্ঞান-ধর্ম-দর্শন নিয়ে একাডেমিক ও মুক্ত আলোচনা আমাদের সমাজে কখনও স্বস্তিপ্রদ ছিল না, আজও নেই, বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদী উগ্র পরিবেশে।
বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় ‘ধর্ম’ শব্দটির বিশালতা রয়েছে, রয়েছে বহুমাত্রিকতা। আমি ব্যাপক অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেছি, সঙ্কীর্ণ ‘রিলিজিয়ন’ অর্থে নয়। রিলিজিয়ন বা উপাসনা-ধর্মই মানুষের একমাত্র ধর্ম নয়, এর বাইরেও মানুষের রয়েছে বৈচিত্র্যময় গুণাবলি বা ধর্ম, যাকে এক কথায় আমরা বলতে পারি ‘মানব বা মনুষ্য ধর্ম’, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ‘অতি মানবীয়তা’ (Super Humanism)। ইংরেজীতে প্রোপার্টি, কোয়ালিটি, ক্যারেক্টারিস্টিকস, এট্রিবিউটস প্রভৃতি শব্দের সাথে যুক্ত অর্থকেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে বাংলায় ধর্ম শব্দ দিয়ে প্রকাশ করি।

বিজ্ঞান শব্দের সংজ্ঞা
শব্দগত অর্থে বলা হয়ে থাকে বিজ্ঞান হল ‘বিশেষ জ্ঞান’ বা অনুপুঙ্খ জ্ঞান। এই বিশেষ জ্ঞান কী কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর অথবা পরিপূর্ণ জ্ঞানের সামগ্রিকতাকে বোঝাবে, তা অবশ্য শব্দগত অর্থ থেকে বোঝা যাবে না।

ভারতীয় প্রাচীন দার্শনিকেদের হাতে পড়ে বেদান্তবাদীরা বিজ্ঞানকে ‘ব্রহ্মজ্ঞানে’ দাঁড় করিয়েছিলেন আর বৌদ্ধাচার্যেরা বিজ্ঞানকে পরিণত করেছেন ‘বিজ্ঞানবাদে’ এবং ‘শূন্যবাদে’।২

আধুনিক বিজ্ঞান
আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা বলা যায় গ্যালিলিওর (১৫৫৯-১৬৪২) হাত থেকে সপ্তদশ শতকে৩ যার পূর্ণতা পায় নিউটনের (১৬৪২-১৭২৭) প্রতিভার স্পর্শে প্রিন্সিপিয়ার প্রকাশের (১৬৮৭) মধ্য দিয়ে। আধুনিক বিজ্ঞানের একটি সংজ্ঞা আইনস্টাইনের (১৮৭৯-১৯৫৫) উদ্ধৃত উক্তির মধ্য দিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি। এরও আগে ১৯ শতকের ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসার (১৮২০-১৯০৩) বলেছিলেন ‘বিজ্ঞান হল সুসংগঠিত জ্ঞান’, আর উইলিয়াম হাজ্জিটির (William Hayiiti: ১৭৭৮-১৮৩০) ভাষায় বিজ্ঞান হচ্ছে ‘কারণকে জানার তীব্র এষণা’। সরল কথায় বলা যায় আধুনিক বিজ্ঞান হল একটি প্রক্রিয়া যার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানীরা দৃশ্যমান জগৎ সম্পর্কে সত্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করে থাকেন। বিজ্ঞানীর ‘দেখা সত্য’ এবং ধর্মবাদী বা দার্শনিকের ‘দেখা সত্য’ এক নাও হতে পারে, এমন কি দার্শনিক যদি বস্তুবাদীও হন। বস্তুবাদী দার্শনিকের দেখা বস্তু বা বহির্জগৎ আর বিজ্ঞানীর দেখা বহির্জগৎ এক নয়। একটি সহজ উদাহরণ দেই, যেমন মার্কসবাদী বস্তুবাদীরা বলে থাকেন ‘গতি হল জড়ের ধর্ম’-কথাটা এক অর্থে সত্য আবার আরেক অর্থে সত্য নয়। কারণ পরম গতি বলে কিছু নেই, গতি বিষয়টি আপেক্ষিক। স্থির দর্শকের কাছে যে বস্তুটি গতিময় বলে মনে হবে, বস্তুটির সাথে চলমান কোন দর্শকের কাছে মনে হবে সেটি স্থির।

বস্তুর যান্ত্রিক ধর্ম (Mechanical Properties) হল তার জড়তা বা জাড্যগুণ (Inertia)। বস্তুর এই জাড্যগুণের আর এক প্রকাশ হল জড়ের ভর (Mass)। বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধানের পথ মূলত পরীক্ষা নির্ভর, একই সাথে তা বুদ্ধিবৃত্তিকও। এই অর্থে অবশ্যই বিজ্ঞান হল বুদ্ধি বা ইনটেলেক্ট। পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণকে বিজ্ঞানী যখন বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে একটি সাধারণ সূত্র বা তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন তখন তাকে বলা হয় আরোহী পদ্ধতি। এই তত্ত্ব থেকে তিনি হয়তো সমকালীন ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানী তাঁর মনন মেধা স্বজ্ঞা-প্রজ্ঞার মাধ্যমে বহির্জগৎ বা কোন স্থানিক ঘটনার বর্ণনার উদ্দেশ্যে কতকগুলো ধারণার মধ্য দিয়ে একটি মডেল নির্মাণ করেন এবং এর মাধ্যমে জাগতিক ঘটনাবলির চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন, ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণে তা টিকলে মডেলটি তত্ত্বে উন্নীত হয়। এই পদ্ধতিকে সাধারণভাবে অবরোহী (Deductive) বলে চিহ্নিত করা হয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ১৮৬৪ সালে ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব ও আলোকের নানা জানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ‘ত্বড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্রে’ নামে একটি একীভূত তত্ত্বে উপনীত হন, যার সারকথা মাত্র চারটি সাধারণ সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় পদ্ধতির চমৎকার উদাহরণ হল, নিউটনের গতির নিয়ম ও অভিকর্ষ তত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব। এ রকম অনেক উদাহরণ উল্লেখ করা যায়।

বিজ্ঞান সাধনার উদ্দেশ্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সামান্য মতভেদ রয়েছে। নির্ধারণবাদী (Deterministic) বৈজ্ঞানিকেরা বলেন যে বিজ্ঞান সাধনার মুখ্য উদ্দেশ্য হল বহির্জগৎ ও প্রকৃতির নিয়ম কানুন আবিষ্কার করে তার রহস্য ভেদ করা। অন্যদিকে অনিশ্চয়তাবাদী বিজ্ঞানীদের মত হল প্রকৃতির নিয়ম ও বিধি উদ্ঘাটন করা বিজ্ঞানীর কাজ নয়, বরং প্রকৃতি কী, তার প্রকৃত চিত্র উপস্থাপনের চেষ্টাই বিজ্ঞানের কাজ। কিন্তু বিজ্ঞানের আসল বৈশিষ্ট্য হল জনকল্যাণে (অকল্যাণেও?) এর প্রয়োগ-ধর্মিতা ও প্রযুক্তি। উদাহরণ দেবার কি প্রয়োজন আছে? প্রয়োগ-ধর্মিতা না থাকলে বিজ্ঞান বিজ্ঞান হতো না।

বিজ্ঞানের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে এর কিছু কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। যেমন, বিজ্ঞান হল পর্যবেক্ষণ-পরীক্ষণে অভীক্ষা সাপেক্ষে যুক্তিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। এটিই হল বিজ্ঞানের মূল ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান মনে করে পর্যবেক্ষণ অনপেক্ষ একটি বহির্জগতের অস্তিত্ব আছে, যা কেবল আমাদের মনোজগতের সৃষ্ট কোন ভাবসমষ্টি নয়। আমরা প্রকৃতি বলতে যা বুঝি তা এই ভৌত জগতের প্রকাশ মাত্র।

বিজ্ঞানচর্চা কয়েকটি মৌলিক নীতির ওপর দণ্ডায়মান। (১) কোন বৈশ্বিক ঘটনাকে যতদূর সম্ভব সরলতম তত্ত্ব বা নিয়মের মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব।

(২) সমতুলক্ষ্যতাও বিজ্ঞানের একটি ধর্ম-যেমন নিউটনের ‘অভিকর্ষ ভর’ এবং ‘জাড্য ভর’ সমতুলক্ষ্য। আইনস্টাইন দেখিয়েছেন যে জড় ও শক্তি পরস্পরের সমতুলক্ষ্য। এই সমতুলক্ষ্যতারই বাস্তব প্রয়োগ পারমাণবিক চুল্লি ও অ্যাটম বোমা। আবার কোয়ান্টাম জগতে কণা ও তরঙ্গ সমতুলক্ষ্য। অর্থাৎ একটি ইলেকট্রন কণা মূলত কণিকারূপে আমাদের কাছে সাধারণভাবে দৃশ্যমান হলেও অবস্থা বিশেষে জড়-তরঙ্গ রূপে আচরণ করতে পারে। চলমান ইলেকট্রন কণিকাসমষ্টি বিদ্যুৎ শক্তি রূপে দেখা দেয়, যার বাস্তব প্রয়োগ তো আমরা অহরহই দেখছি। আবার ঐ ইলেকট্রনসমষ্টিই কেলাসের মধ্যদিয়ে গমনকালে পরমাণুগুচ্ছের সাথে তরঙ্গরূপে মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়ে আলোর মতই ইলেকট্রন অপবর্তন প্রতিভাসের জন্ম দেয়। এই ইলেকট্রন তরঙ্গকেই ব্যবহার করে আমরা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ক্ষুদ্র কণাকে বহুগুণ বর্ধিত করে দৃশ্যমান করে তুলি। আবার তরঙ্গ চরিত্রের আলোক রশ্মিই বস্তুকণা ‘ফোটন’ রূপে দেখা দিয়ে আলোক-তড়িৎ প্রপঞ্চের (Photoelectric Effect) জন্ম দেয়। রশ্মি ও কণার সমতুলক্ষ্যতার আর একটি নিদর্শন হল ‘যুগ্ম কণিকার সৃজন’ (Pair Production) এবং এর বিপরীত প্রক্রিয়া ‘রশ্মির বিকাশ’। প্রথম প্রক্রিয়ায় রশ্মি থেকে কণিকা-প্রতিকণিকার (ইলেকট্রন-পজিট্রন) সৃষ্টি হয়, ফলে রশ্মির বিনাশ ঘটে (Annihilation of Radiation) আর দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় একটি কণিকা-যুগ্ম (ইলেকট্রন-পজিট্রন) মিলিত হয়ে ত্বড়িৎ-চৌম্বক তরঙ্গ, যেমন গামা রশ্মি, সৃষ্টি করে। বাহুলক্ষ্যবোধে অধিক উদাহরণ দেয়া থেকে বিরত রইলাম।

(৩) কতকগুলো ভৌত সত্তার সমতুলক্ষ্যতা প্রতিষ্ঠার সম্প্রসারিত ও সার্বজনীন রূপই হল বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন, একীভূত তত্ত্বের ধারণা। এটিকে আমরা বলতে পারি বিজ্ঞানের, বিশেষ করে পদার্থবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি; যথাসম্ভব কম সংখ্যক প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে জাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া। এর অগ্রপথিক ছিলেন মহামতি নিউটন যিনি অভিকর্ষ থেকে প্রাকৃতিক নানা ঘটনাকে বলবিদ্যার (মেকানিকসের) আওতায় নিয়ে এসেছিলেন, এমন কি আলোকেও তিনি মেকানিকসের ধর্ম হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন; অবশ্য এতে তিনি সফল হননি। তাপের গতীয়তত্ত্ব ও তাপবলবিদ্যাও (Thermodynamics) একীভূত হয়ে গেল। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে ক্লার্ক ম্যাকসওয়েল যিনি আলোক-বিদ্যুৎ-চুম্বকত্ব আপাতদৃষ্টিতে স্বতন্ত্র প্রপঞ্চসমূহকে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সামগ্রিক একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন।

নিউটনের বিশ্বে ‘স্থান ও কাল’ হল দুটি স্বতন্ত্র পরম সত্তা। নিউটনীয় সীমাবদ্ধ আপেক্ষিক তত্ত্বানুযায়ী-‘সকল জাড্য প্রসঙ্গ কাঠামোয় বলবৈদ্যিক নিয়মাবলি একই রূপে দেখা দেয়’-যা পরম স্থানের ধারণাকে নস্যাৎ করে দেয়। কিন্তু সমস্যা রয়ে গেল নিউটনীয় বলবিদ্যার সাথে ম্যাক্সওয়েলের ক্ষেত্রত্বত্তকে মেলানো যাচ্ছিল না-দু’টি শৃঙ্খলা স্বতন্ত্র পথে এগিয়ে চলল। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো গ্যালিলীয় স্থানান্তরে অপরিবর্তিত থাকে না, যা বিজ্ঞানীদের বিচলিত করে তুলেছিল। এই আপাত বিরোধিতা থেকে পদার্থবিদ্যাকে মুক্ত করলেন আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রস্তাবনা করে (১৯০৫)।

বিশদে না গিয়েও বলা যায় যে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব মেকানিকস ও ত্বড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্রত্বত্তের মধ্যে আপাত বিরোধ মিটিয়ে দু’এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করল, গ্যালিলীয় স্থানান্তরের পরিবর্তে আরও সর্বজনীন লরেঞ্জীয় স্থানান্তর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নতুন ব্যবস্থায় নিউটনীয় বলবিদ্যা ‘আপেক্ষিক তত্ত্বীয় বলবিদ্যা’ (Relativistic Mechanics) নামে নতুন রূপ ধারণ করল। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এল যে আমাদের বহির্জগৎ চতুর্মাত্রিক তিনটি স্থানিক মাত্রার সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত ‘কাল’। স্থান ও কাল দুয়ে মিলে রচনা করল ইউক্লিডীয় চতুর্মাত্রিক স্থান-কাল সঙ্গতি (Space Time Continuum)। দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান বা দুটি স্থানিক বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব ধ্রুব নয়, নির্ভর করবে জাড্য প্রসঙ্গ কাঠামোর আপেক্ষিক গতির ওপর। গতির সাপেক্ষে দূরত্ব সঙ্কুচিত (Contraction) হয়, আর কাল-ব্যবধান বর্ধিত (Time Dilation) হয়; ফলে কাল-ব্যবধানের প্রসঙ্গ-কাঠামোর নির্ভরতার কারণে দুটি দূরবর্তী ঘটনার কাল-‘যুগপত্ততা’ (Simultanity) আর রইল না। ফলে দুটি বস্তু কণিকার মধ্যে তাৎক্ষণিক দূর-ক্রিয়া (Action at a Distance) বলেও কিছু থাকতে পারে না (যেমনটি নিউটন ভেবেছিলেন)।৪ আর একটি বিষয় ভরবেগের সংবরণ নীতি ও শক্তির সংবরণ নীতি একত্রে একটি নীতিতে পরিণত হয়েছে।

?oh=e964056fb3e15c4f92b03bffa619c01e&oe=556E73A1&__gda__=1429405498_6544f224f10f82a2f66e9fb40db2d00f” width=”400″ />
বিজ্ঞানী আইনস্টাইন

পদার্থবিদদের আর একটি হচ্ছে চেষ্টা তাঁদের সূত্রে ব্যবহৃত সমীকরণসমূহে ধ্রুবকের সংখ্যা যত কম রাখা যায়। ফলে কেবলমাত্র মাত্রাহীন ধ্রুবকসমূহই স্থান পাবে পদার্থবিদ্যার মৌলিক সমীকরণসমূহে। এটিকে বলা যেতে পারে বিজ্ঞানের সরলীকরণের প্রকাশ। আইনস্টাইন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন:

আমি একটি উপপাদ্যের অবতারণা করতে চাই যা বর্তমানে কেবল প্রকৃতির ‘সরলতা অর্থাৎ বোধগম্যতা’-এই বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, অন্য কিছুর ওপর নয়: এ ধরনের স্বেচ্ছা আরোপিত কোন ধ্রুবক স্থান পাবে না; অর্থাৎ প্রকৃতি এমনভাবে গঠিত যে দৃঢ়ভাবে নির্ধারিত নিয়মসমূহ যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যে সব নিয়মে যৌক্তিকভাবে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত ধ্রুবকসমূহই স্থান পাবে।৫

কিন্তু সমস্যা রয়েই গেল। নিউটনীয় ‘জাড্য ভর’ আর ‘অভিকর্ষ ভর’ কি সমতুল্য? চমৎকার একটি পরীক্ষায় দেখা গেল যে দুটি ভর অবিকল ও অভেদমূলক। আর একটি মুশকিল হল ম্যাক্সওয়েলীয় তত্ত্ব রশ্মির শক্তি-ধর্ম নিয়ে কিছু বলতে পারে না; এ ব্যাপারে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বও কোন সাহায্য করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে ম্যাকের প্রশ্ন ছিল: ‘এটি কি করে হয় যে জাড্য প্রসঙ্গ ব্যবস্থাসমূহ অন্য সকল স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার চাইতে অনন্য’-এর একটি সদুত্তর খুঁজে পাওয়া চাই। আইনস্টাইনের মন্তব্য ছিল: ‘এই অবস্থাদৃষ্টে আমি নিশ্চিত হলাম যে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাঠামোয় অভিকর্ষ তত্ত্বের কোন সন্তোষজনক স্থান নেই’।৬

‘জাড্য ভর’ আর ‘অভিকর্ষ ভরে’র সমতুলক্ষ্যতা তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত ও সরলরৈখিক জাড্য কাঠামোয় বন্দি পদার্থবিদ্যাকে মুক্তি দিতে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করলেন (১৯১৫)। তিনি দেখালেন যে জাড্য ও অজাড্য (কোন জাড্য প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে ত্বড়িৎ প্রসঙ্গ কাঠামো) কাঠামো নির্বিশেষে পদার্থবিদ্যার নিয়মসমূহের রূপ (Form) অপরিবর্তিত (Invarient) থাকে। দেখা গেল কোন আপাত স্থির কাঠামোর সাপেক্ষে কোন ‘ত্বরমান প্রসঙ্গ কাঠামোয়’ অবস্থিত কণিকাকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে কণিকাটির ওপর যেন একটি বল ক্রিয়া করছে (এই বলকে বলা হয় ছদ্মবল)। এ থেকে আইনস্টাইন অবশেষে দেখালেন অভিকর্ষ আসলে স্বতন্ত্র কোন ভৌত সত্তা নয়। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসে যে স্থান-কাল যা ইউক্লিডীয় চতুর্মাত্রিক নয়, বরং রাইমেনীয় চতুর্মাত্রিক বক্র-জ্যামিতিক সঙ্গতি -যা কি না বন্ধহীন কিন্তু সসীম (Boundless and Finite)। এই নতুন স্থান-কাল আর নিষ্ক্রিয় নয়, জড়ের উপস্থিতিতে এর বক্রতার পরিবর্তন হয় যা অভিকর্ষক্ষেত্র রূপে দেখা দেয়। অভিকর্ষকে আর ভৌত প্রতিভাস হিসেবে নয়, বিবেচনা করা হল স্থান-কালের জ্যামিতিক ধর্মের প্রকাশ হিসেবে।

পরবর্তী ধাপ ছিল ত্বড়িৎ চৌম্বক তত্ত্বসহ সাধারণ ক্ষেত্রকে এর অধীনে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা। বলাবাহুলক্ষ্য, আইনস্টাইনের পরবর্তীকালের নিরলস প্রায় একক প্রচেষ্টা সার্থক হয়নি। তিনি অভিকর্ষক্ষেত্রে ও ত্বড়িৎ চৌম্বকক্ষেত্রকে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাঠামোতে একীভূত করতে পারেননি। যদিও, সমগ্র ক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য তাত্ত্বিকভাবে চমৎকার চারটি ক্ষেত্রে সমীকরণ তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এই সমীকরণ চতুষ্টয় থেকে বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে আমরা সহজেই বিশুদ্ধ অভিকর্ষ ক্ষেত্রে উপনীত হতে পারি যা নিউটনের অভিকর্ষ তত্ত্বকে সার্বজনীনতা প্রদান করে। আমরা উপনীত হতে পারি সন্নিকর্ষের মধ্য দিয়ে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বেও। এই সমীকরণগুলো সম্পর্কে আইনস্টাইনের নিজের বক্তব্য ছিল: ‘আমার বিশ্বাস যে এই সমীকরণগুচ্ছ রচনা করবে অভিকর্ষ সমীকরণ সমূহের সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক সাধারণীকরণ। এদের ভৌত উপযোগিতা প্রমাণ করা সত্যিই হবে একটি দুঃসাধ্য সাধনা, কেবলমাত্র কিছু কিছু সন্নিকর্ষণ আনয়ন করা যথেষ্ট হবে না। তবে আসল প্রশ্ন হল: এ সকল সমীকরণের সর্বত্র প্রযোজ্য নিয়মিত সমাধান কী হবে?…’

আইনস্টাইন সফল না হলেও প্রকৃতিতে বিদ্যমান অভিকর্ষ, ত্বড়িৎ চৌম্বক, দুর্বল নিউক্লিয় ও সবল নিউক্লিয় বলসমূহকে একীভূত করার সাধনা বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে এগিয়ে চলছে, তবে ভিন্ন পথে। ইতিমধ্যেই ষাটের দশকের শেষার্ধে গ্লাসো, সালাম ও ভাইনবার্গ ত্বড়িৎ চৌম্বক ও দুর্বল নিউক্লিয় বল দুটিকে একীভূত করেন (১৯৬৭); এই দুটি বলের একত্রিত নাম ‘ত্বড়িৎ দুর্বল’ (Electro Weak)। এ কাজের জন্য ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তাঁরা। এখন চেষ্টা চলছে ‘ত্বড়িৎ দুর্বল’ ও ‘সবল নিউক্লিয় বল’ দুটির একত্রীকরণের নিরলস চেষ্টা ‘মহা একীভূত তত্ত্বাবলি’র মাধ্যমে।৭ অভিকর্ষকে ‘মহা একীভূত তত্ত্বের’ ভাঁজে আনার চেষ্টা চলছে আধুনিকতম সুপার স্ট্রিং তত্ত্বভিত্তিক ১০-মাত্রিক স্থান-কালের প্রেক্ষাপটে। এই সর্বব্যাপী তত্ত্বের নাম দেয়া হয়েছে ‘সর্ববিষয়ের তত্ত্ব’ (Theory of Everything: TOE) বা ‘একীভূত সর্ববিষয়ের তত্ত্ব’ (Unified Theory of Everything: UTE)।

অসম্ভাব্যতার নীতি
পদার্থবিজ্ঞানে যেমন সমতুলক্ষ্যতার নীতির প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তেমনি নীরবে এই বিজ্ঞানে কতকগুলো অসম্ভাব্যতার নীতি স্থান পেয়েছে। এই নীতিসমূহকে নিম্নভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে:
* তাপ বলবিদ্যা থেকে দেখান হয়েছে যে ‘এমন কোন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা সম্ভব নয় যা দিয়ে চিরন্তন’ গতি (Perpetual Motion, i.e. Perpetuum Mobile) সৃষ্টি করা যায়; এবং কোন ভৌত গবেষণাগারে পরম শূন্য তাপমাত্রায় (Absolute Tempareture) উপনীত হওয়া যায় না।
* কোন জড় বস্তুর গতিবেগ মহাশূন্যে আলোর গতিবেগকে অতিক্রম করতে পারে না।
* কোয়ান্টাম জগতে দুটি ক্যানোনিকাল রাশির একই সাথে একশত ভাগ নিশ্চয়তা নিয়ে পরিমাপন অসম্ভব (যেমন কোন কণিকার গতি ও অবস্থান) ।
* একই সাথে কোন ভৌত সত্তা (যেমন আলো বা ইলেকট্রন) তার বিকিরণ ধর্ম ও জড় ধর্ম প্রকাশ করতে পারে না। প্রকৃতি তা করতে দেয় না।
এ ধরনের আরও উদাহরণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞানের নীতি ও পথ
বিজ্ঞানের সমস্যা হল প্রাকৃতিক কোন ঘটনার ব্যাখ্যায় কোন তত্ত্বের অবতারণা করতে হলে কোন পথে অগ্রসর হওয়া যায়। এই অনুচ্ছেদে আমরা বিজ্ঞানের ধ্যান-ধারণা ও পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো, এবং এতে বিজ্ঞানের দর্শনের প্রসঙ্গটিও আসবে।

প্রকৃতির কোন ঘটনার ব্যাখ্যায় প্রস্তাবিত কোন তত্ত্বকে গ্রহণ বা অগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি হল: তত্ত্বটি অবশ্যই অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যসমূকে অস্বীকার বা বিরোধিতা (Contradiction) করবে না, বরং অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যাবলির তত্ত্বীয় ভিত্তির সুনিশ্চিতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট হবে।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটি অবশ্য বস্তুগত পর্যবেক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, বরং তা স্বয়ং তত্ত্বটির অঙ্গনের (Premises) সাথে সম্পর্কিত-অর্থাৎ অঙ্গনটির ‘স্বাভাবিকতা’ (Naturalness) বা ‘যৌক্তিক সরলতা’র (Logical Simplicity) সাথে সম্পর্কিত। এই দৃষ্টিভঙ্গিটির যথাযথ সূত্রায়ন কঠিন হলেও, স্মরণাতীত কাল থেকে এটি তত্ত্বের নির্বাচনে এবং মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

এ সব কথা অবশ্য আমাদের কালের শ্রেষ্ঠতম বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইনের চিন্তাধারার অনেকটা প্রতিধ্বনি। আইনস্টাইন তত্ত্ব নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেন:

A theory is more impressive, the greater the simplicity of its premises is, the more different kinds of things it relates, and the more extended is its area of applicability.৮

এ প্রসঙ্গে আমরা তাপবলবিদ্যার (Thermodynamics) বিশাল ও ব্যাপক প্রয়োগের কথা বলতে পারি। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক কর্তৃক বিকিরণের কোয়ান্টাম ধারণার (Quantam Concept of Radiation) মধ্যদিয়ে ‘কৃষ্ণকায় বিকিরণে’র তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় দেখা গেল প্রকৃতিতে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে সমকালীন পদার্থবিদ্যার আলোকে তার সমাধান দেয়া অসম্ভব। কেবলমাত্র জ্ঞাত তথ্যাদির ভিত্তিতে প্রকৃত নিয়মাবলি আবিষ্কার করা সম্ভব নয় এমনটা ভেবে আইনস্টাইন হতাশ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন:

The longer and more despairingly, the more I came to the conviction that only the dicovery of a universal formal principle could lead us to assured results.৯

তাপবলবিদ্যার ক্ষেত্রে এই সার্বজনীন নীতিটি এই ছিল যে ‘প্রকৃতির নিয়মসমূহ এমন যে তাতে চিরন্তন গতি (Perpetuum Mobile) সৃষ্টি করা অসম্ভব’। প্লাঙ্কের বিকিরণ সূত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই সার্বজনীন নীতিটি হচ্ছে ‘বিকিরণের রয়েছে কোয়ান্টাম চরিত্র’ (Quantam Character)। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় আইনস্টাইনের কাছে প্রতীয়মান হয়েছিল যে, এই সার্বজনীন নীতিটি হচ্ছে প্রথমত মহাশূন্যে ‘আলোর দ্রুতি সকল জাড্য কাঠামোয় সমান এবং দ্বিতীয়ত লরেঞ্জ স্থানান্তরের সাপেক্ষে পদার্থবিদ্যার নিয়মাবলি অপরিবর্তনীয় (Invarient)।’

অন্যদিকে কোয়াণ্টাম বলবিদ্যা উদ্ভাবন কালে হাইসেনবার্গের কাছে ‘অপর্যবেক্ষণ-যোগ্য ভৌত রাশি পদার্থবিদ্যার তত্ত্বের সূত্রায়নে স্থান পেলে তা হবে অসম্পূর্ণ’-এটি সাধারণ নীতি রূপে প্রতিভাত হয়েছিল। আবার তরঙ্গ বলবিদ্যার জনক স্রোডিংগারের কাছে কণিকার যে তরঙ্গ-চরিত্র রয়েছে তাকে একটি স্থান ও কালের অপেক (j(r,t)) রূপে প্রকাশ করা যায়-এটিই ছিল তার কাছে সাধারণ নীতি এবং এর ভিত্তিতেই তরঙ্গ-অপেক্ষকের জন্য তিনি একটি চমৎকার সমীকরণ দাঁড় করিয়েছিলেন।

কিন্তু অযুত ডলার মূল্যের প্রশ্ন হল ‘এই সার্বজনীন নীতি কী ভাবে পাওয়া যাবে?’ আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষণ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা সূচনায় সামান্য প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে মাত্র, এর বেশি নয়। কোন ঘটনা বিশ্লেষণকারী নিয়মের আবিষ্কার করতে হলে বিজ্ঞানীকে ঘটনার সাথে সম্পর্কিত সার্বজনীন নীতিকে উদ্ভাবন করতে হবে। এই উদ্ভাবন কেবল পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতামূলক উপাত্ত (Empiric Datum) বিশ্লেষণ করে পাওয়া যাবে না; এটি আসবে বিজ্ঞানীর মুক্ত চিন্তার (Free Thinking) ফসল হিসেবে। অভিজ্ঞতামূলক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা বড়জোর ঘটনার ব্যাখ্যাদায়ী একটি (বা একাধিক) অভিজ্ঞতাধর্মী সূত্র (Empirical Formula) আবিষ্কার করতে পারি, প্রকৃতির রহস্যভেদকারী কোন তত্ত্ব উদ্ভাবন করতে পারব না। প্ল্যাঙ্ক কর্তৃক ১৯০০ সালে প্রথমে অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতিতে (Empirical Method) কৃষ্ণকায়া বিকিরণের সূত্র প্রতিষ্ঠা এবং ১৯০৪ সালে বিশুদ্ধ তত্ত্বীয়ভাবে একটি সার্বজনীন নীতিকে আশ্রয় করে বিকিরণের সূত্রের উদ্ভাবন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই অনুমিতিটি ছিল, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে: ‘কৃষ্ণকায় বস্তুটি (Black Body) রশ্মি শোষণকালে এবং নিঃসরণকালে ত্বড়িৎ চৌম্বক তরঙ্গকে গুচ্ছাকারে (In Quantum) শোষণ বা নিঃসরণ করে থাকে।’

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বলতেন যে বিজ্ঞানের দর্শনে দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণা বর্তমান: একটি হল অধিবিদ্যাগত (Metaphysical) ও অন্যটি হল দৃষ্টবাদীসুলভ (Positivistic)। আইনস্টাইনকে কিন্তু অধিবিদ্যার প্রবক্তা তো বলা যাবেই না, এমন কি তিনি প্রচলিত অর্থে দৃষ্টবাদী ছিলেন তাও প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

?oh=0826f2009dff124209d1856eee8fb408&oe=552157D4″ width=”300″ />
বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

দৃষ্টবাদের আদি প্রবক্তা আগস্ট কোঁৎ-এর (August Comte: ১৭৯৮-১৮৬৭) মতে বৈজ্ঞানিক তথ্যই জ্ঞানের ভিত্তি ও সত্যে পৌঁছাবার পথ। পরবর্তীকালে পদার্থবিদ আর্নস্ট ম্যাকের হাতে এই তত্ত্ব আরও উন্নতি ও ব্যাপকতা পায়। বিংশ শতাব্দীতে ভিয়েনাগোষ্ঠীর হাতে আধুনিক পদার্থবিদ্যার অভূতপূর্ব উন্নয়নের আলোকে এই দৃষ্টবাদ ‘যৌক্তিক দৃষ্টবাদে’ (Logical Positivism) পরিণত হয়েছিল। অনেকে আবার এই বিজ্ঞান-দর্শনকে ‘যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদ’ (Logical Empiricism) নামেও অভিহিত করে থাকেন। ১৮২৯ সালে কোঁৎ-এ লিখেছিলেন১০:

… Every positive theory has to be based on observations, it is on the other hand, also true that our mind needs a theory in order to make observations.

আর্নস্ট ম্যাক (Ernst Mach: ১৮৩৮-১৯১৬) যে দৃষ্টবাদ গড়ে তোলেন তার সার কথা হল: বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলি আসলে পরীক্ষালব্ধ ঘটনাবলির সংক্ষিপ্তসার; জটিল উপাত্তসমূহকে মানবীয় বোধের উপযোগী করে এসব (নিয়মাবলি) তৈরি করা হয়। তাহলে অনেকে এ থেকে ভাবতে পারেন যে, বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলি মনের বাইরে স্থিত বাস্তবতার সাথে যতখানি না সম্পর্কিত তার চাইতে মনের সাথেই এদের সম্পৃক্ততা নিবিড়তর। তিনি বলতেন যে ভৌত বিজ্ঞানের লক্ষ্য হতে হবে পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাবলিকে সরলতম এবং যতদূর সম্ভব স্বল্প পরিসরে সংক্ষিপ্ত আকারে (Economical Abstract Expression) তুলে ধরা। স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের মন কী ভাবে প্রকৃতির বিশালতাকে ধারণ করে তা উপস্থাপন করে-তা বোঝা বেশ শক্ত ব্যাপার, এর সামান্যই ব্যক্তি অনুভব করতে পারে। একজন বৈজ্ঞানিক কী ভাবে বিজ্ঞানের গবেষণায় ও তথ্য বিশ্লেষণে অগ্রসর হোন সে সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হল১১:

In mentally seperating a body (representating a physical reality) from the changeable environment in which it moves, what we really do is extricate a group of sensetaions on which our thoughts are fastened and which is of relatively greater stability than the others, from the stream of all our sensations.

ম্যাক ‘প্রত্যক্ষ বর্ণনা আর অপ্রত্যক্ষ বর্ণনার’ মধ্যে পার্থক্য করেছেন। প্রথমটি সরাসরি অভিজ্ঞতালব্ধ উপাত্তের সাথে জড়িত; অন্যদিকে, শেষোক্ত বর্ণনায় পর্যবেক্ষণলব্ধ পদের কোন স্থান নেই। এই বর্ণনা দেয়া হয় গাণিতিক পরিকল্পনার (Mathemetical Scheme) সাথে তুলনা করে।

বিজ্ঞানকে অনেক সময়ই ‘বিচার ও ভ্রান্তি’র (Trial and Error) মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাবলির তুলনা এবং তাকে সুবিন্যস্ত করতে এ ধরনের পদ্ধতি বিজ্ঞানীরা প্রয়োগ করেন। এই সুশৃঙ্খলকরণের ফলে বিমূর্ত ধারণা ও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিধিগুলো বেরিয়ে আসে। ধারণাগুলো অর্থবহ তখনই হয়ে ওঠে যখন আমরা যে বস্তুর সাথে এ ধারণাগুলো যুক্ত সেই বস্তুটিকে নির্দেশ করতে পারি।১২

অনেকে বলে থাকেন আইনস্টাইনের বিজ্ঞানের গবেষণায় ম্যাকের চিন্তাধারা যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব উদ্ভাবনকালে কিন্তু আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন যে ম্যাকের এই প্রত্যয় অতিসরলীকৃত। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে পদার্থবিদ্যার সাধারণ বাক্যগুলো প্রতীকসমূহের মধ্যে (যেমন সাধারণ স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা, অভিকর্ষ বিভব ইত্যাদি…) পারস্পরিক সম্পর্কাদির প্রকাশ, যা থেকে সিদ্ধান্ত টানা যায়, এবং সে সব সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে পর্যবেক্ষণীয় রাশিগুলো সম্পর্কিত বাক্যাদির মধ্যে স্থানান্তরযোগ্য। পর্যবেক্ষণ থেকে সাধারণ নীতিতে উত্তরণের যে সহজ রাস্তা ম্যাক দেখাতে চেয়েছেন, আইনস্টাইন কিন্তু তা সহজে মানতে রাজি নন। ১৯৩৩ সালে তিনি এ প্রসঙ্গে যে উক্তি করেছিলেন তা হল উনবিংশ শতাব্দীর প্রাকৃতিক দার্শনিকেরা মনে করতেন যে, পদার্থবিদ্যার ধারণাগুলো ও স্বীকার্যসমূহকে (Postulates) নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার (Abstraction) মধ্যদিয়ে অর্থাৎ যৌক্তিক উপায়ে অভিজ্ঞতা থেকে তুলে আনা যায় (Deduce); এগুলো যৌক্তিক ধারণায় মনুষ্য মেধার মুক্ত উদ্ভাবন নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন:

A clear recognition of the erroneousness of this notion really only came with the general theoy of relativity… the ficititous characters of the fundamental principles is perfectly evident from the fact that we can point to two essentially different principles. both of which correspond with experience to a large extent…

এই ভিত্তিগুলো হচ্ছে নিউটন এবং আইনস্টাইনের দুটি অভিকর্ষ নীতি। আইনস্টাইন আরও বলেছেন, এ থেকে প্রমাণিত হয় বলবিদ্যার মৌলিক ধারণাসমূহ ও স্বীকার্যসমূহ প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থেকে যৌক্তিকভাবে আহরণের প্রতিটি প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। নিঃসন্দেহে এটি বেশ কঠোর উক্তি। বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে বলা যায় পদার্থবিদ্যার সাধারণ নীতিসমূহ সূত্রায়িত হয়েছে এমন সব শব্দ ও প্রতীক ব্যবহার করে-যারা গাণিতিক ও যৌক্তিক উপাদানের দীর্ঘ শৃঙ্খলের দ্বারা পর্যবেক্ষণীয় ধারণাগুলোর সাথে সম্পর্কিত। আইনস্টাইন এর সাথে আরও যুক্ত করেছেন: এ সব সাধারণ নীতিমালার কিছু ফল অবশ্য থাকতে হবে, আর তা হল নীতিমালা পর্যবেক্ষণীয় ধারণাসমূহের মাধ্যমে সূত্রায়িত করা যাবে এবং সেগুলোকে অবশ্যই প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ দ্বারা যাচাই করা সম্ভব। এই অর্থে আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যাপকতর অর্থে দৃষ্টবাদী বলে অনুযোগ করা যেতে পারে।

তবে আইনস্টাইন, ম্যাকের বিপরীতে মনে করেন যে বিজ্ঞানের নিয়মাবলি ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে পথটি হল দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর, মোটেই সহজ ও সরল নয়, যেমনটি ম্যাক বা তাঁর অনুসারীরা ভাবতেন। বরং নব্য যৌক্তিক দৃষ্টবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি আইনস্টাইনের কাছাকাছি। এঁদের মতে আধুনিক পদার্থবিদ্যায় নিয়মাবলিকে সরল ধারণার মধ্যদিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই নীতিসমূহকে মনে করা হয় মুক্ত মানবীয় কল্পনা শক্তির (Emagination) ফসল এবং এসব নীতিমালায় যে কোন ‘বিমূর্ত পদ’ বা প্রতীক অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এসব নীতি কোন ক্রমেই কল্পনার দ্বারা, স্বজ্ঞার (Intution) মাধ্যমে, কিংবা এমন কি যৌক্তিক সারলক্ষ্য বা সৌন্দর্যের প্রতি আবেদন করে প্রমাণ করা বা এর বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। নীতিসমূহকে ‘সত্য’ বলে গণ্য করা হবে যদি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত দ্বারা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোকে আহরণ করা সম্ভব হয়, যা প্রকৃত অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে। আইনস্টাইন বেশ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, বিজ্ঞানের নীতিমালা অর্থাৎ পদার্থবিদ্যার তত্ত্বসমূহে এমন সব অস্ত্র মজুত থাকে যেগুলোর সাহায্যে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতাকে সযত্নে জরিপ করতে পারি। তবে একথা মনে রাখতে হবে এসব অস্ত্র-কৌশল মানবীয় ধী-শক্তিরই (Human Ingenuity) উদ্ভাবন। এ প্রসঙ্গে তিনি পূর্ণসংখ্যার উদাহরণ টেনে উক্তি করেছেন:

… The series of integers is obviously an invention of human mind, a self created tool which simplifies the ordering of certain censory experience.১৩

বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য পথ-পন্থা নিয়ে আইনস্টাইনের চিন্তাধারার চৌম্বক কথাগুলো হচ্ছে:
১. প্রাকৃতিক বিজ্ঞানই হোক আর মনোবিজ্ঞানই হোক, সকল বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হল আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে সমন্বিত করা এবং একটি যৌক্তিক পদ্ধতির মধ্যে তাদের নিয়ে আসা। যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখলে বলতে হয় যে, বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট ধারণাগুলো হলো “মনুষ্য মনের মুক্ত সৃজন”।১৪ বিজ্ঞানীর মেধার ‘মুক্ত উদ্ঘাটনের’ ওপর গুরুত্ব দিলেও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ভূমিকার কথা তিনি ভুলে যাননি; একই সাথে পরপরই তিনি বলেছেন, “Experience may suggest the appropriate mathematical concepts, but they most certainly can not be deduced from it” আরও বলেছেন যে, ‘কোন গাণিতিক গড়নের ভৌত উপযোগিতার একমাত্র নির্ণায়ক, এখনও অবশ্য অভিজ্ঞতা; কিন্তু সৃজনশীল নীতি রয়েছে গণিতের মধ্যেই। এজন্য কোন কোন ক্ষেত্রে…আমি সত্যি বলে মনে করি যে বিশুদ্ধ চিন্তার মধ্য দিয়েই আমরা বাস্তবতাকে সম্যকভাবে অনুধাবন করতে পারি, যা আমাদের পূর্বসূরিরা কল্পনা করেছিলেন।’

২. তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার উদ্ভাবনী তত্ত্বের মধ্য দিয়েই ভৌত বাস্তবতাকে বোধগম্য করে তোলা যায়। আইনস্টাইন বলেছিলেন যে; জগৎ বোধ্য, আর এটি হল সবচাইতে অবাক করা কাণ্ড।১৫
৩. আইনস্টাইন ভৌত তত্ত্বের সরলতার ওপর জোর দিয়েছেন: Nature is the realization of the simplest concieving mathematical ideas। উদাহরণস্বরূপ আমরা ম্যাক্সওয়েলের অনুপম সমীকরণসমূহের কথা অথবা আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বেরক্ষেত্রে-সমীকরণগুলোর চমৎকারিত্বের কথা উল্লেখ করতে পারি।

৪. তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিলে দেখা যায়, আমরা জ্ঞানের দুটি আপাত অ-পৃথকযোগ্য উপাংশের মুখোমুখি হয়েছি: অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞান এবং যুক্তিসিদ্ধ (Rational) জ্ঞান। আইনস্টাইনের মতে, বিশুদ্ধ যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জগতের কোন জ্ঞান আহরণ করা যায় না। তিনি একটি চমৎকার উক্তি করেছেন: “All knowledge of reality starts from experience and ends in it”।

প্রশ্ন হল, এমন কি কোন নীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব যার সাথে সঙ্গতি রেখে ধারণাগুলোর সাথে সংবেদনগুলোর একটি সুসমন্বয়ী নির্বাচন সম্পাদন করা যেতে পারে? এডিংটনের মতো বিষয়াশ্রিত দার্শনিক-বিজ্ঞানী হয়তো বলতেন ‘অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে’, কিন্তু আইনস্টাইনের উত্তর খুব সম্ভব হবে-সুনির্দিষ্ট না, কারণ আইনস্টাইন বারবার দৃঢ়তার সাথে বলেছেন ‘ধারণা’ নিষ্কাশন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা থেকে উদিত হয় না।

?oh=36aca2017422186f59d9940868c9f1d3&oe=5567A226&__gda__=1433141498_f5738d4c2eba1ec8ac02e6516f972019″ width=”350″ />
লেখক অজয় রায়

দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের এই যে বিশ্বাস, বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো মনুষ্য কল্পনাপ্রসূত, তা থেকে অনেকেই সিদ্ধান্ত টানতে পারেন যে আমরা বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট মৌলিক নীতিমালায় (Definitive Basic Principles) হয়তো কখনও পৌঁছতে পারব না। অনেকেই, যেমন পদার্থবিজ্ঞানী এবং ‘যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদের’ (Logical Empiricism) প্রধান প্রবক্তা হেনরী পয়ঁকার (Henri Poincare) প্রশ্ন তুলেছেন, পদার্থবিদ্যায় এ ধরনের কোন ‘সঠিক ভিত্তি’ কি থাকতে পারে? আইনস্টাইন কিন্তু এসব বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন। ১৯৩৩ সালে হার্বার্ট স্পেনসার তাঁর বক্তৃতায়, মন্তব্য করেছেন :

If it is true that this axiomatic basis of theoritical physics can not be extarcted from experience but must be freely invented, can we ever hope to find the right way? Nay more, has this right way any existence outside our illusion… I answer without hesitation that there is, in my opinion, a right way, and that we are capable of finding it. Our experience hitherto justifies us in believing that nature is the realization of the simplest conceiving mathematical ideas. I am convinced that we can discover by means of purely mathematical constructions the concepts and the law connecting them with each other, which furnish the key to the understanding of natural phenomena.১৬

যেহেতু তত্ত্বীয় উপাংশটি অভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করা যায় না, তাই প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক ধারণাতে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা নিজস্ব কিছু অবদান রাখতে পারে। এর অর্থ হল বিজ্ঞানের পদ্ধতিতে দৃষ্টবাদের কোন স্থান নেই, কারণ দৃষ্টবাদী তত্ত্বানুসারে সকল তত্ত্বীয় তাৎপর্য আমাদের অভিজ্ঞতাপ্রসূত। জ্ঞানতত্ত্বে এর একটি গূঢ় তাৎপর্য রয়েছে, কারণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমাদের বিজ্ঞানের বিষয় ও বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান দেয়, শুধুমাত্র বিষয় আশ্রিত গড়নের (subjective construct) জ্ঞান নয়। এই সিদ্ধান্ত থেকে যে অভিমত বেরিয়ে আসে তা হল বস্তুর স্ব-সত্তাকে (thing in itself) বৈজ্ঞানিক পন্থায় জানা যায় এবং বৈজ্ঞানিক পন্থায় সেই বস্তুটিকে নিয়ে আমরা নাড়াচাড়া করতে পারি। যেমন একঝাঁক ইলেকট্রনের ওপর গবেষণাগারে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারি-টিভিতে ছবি উৎপাদনে ব্যবহার করি, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ‘আলোক বীম’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, এবং দৈনন্দিন জীবনে ধাতব তারের ভেতর দিয়ে প্রবাহ সৃষ্টি করে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করি। সুতরাং বিজ্ঞান দাবি করতে পারে সে তত্ত্ববিদ্যাকে (Ontology) ও জ্ঞানতত্ত্বকে (Epistemology) প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মর্যাদায় পুনঃস্থাপন করেছে।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দৃষ্টিভঙ্গি
অন্যদিকে বহির্জগতের বোধগম্যতা নিয়ে প্ল্যাঙ্কের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। আমরা বহির্জগতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি, কিন্তু এর অনুসন্ধান করা সম্ভব নয়। পদার্থবিদ্যায় আমরা যে প্রতীকগুলো ব্যবহার করি তা বিশ্বচিত্রের উপাদান যা অনেকটাই স্বেচ্ছাক্রমে নির্বাচিত; বিশ্বচিত্রে পর্যবেক্ষণীয় রাশির স্থান নেই। পর্যবেক্ষণীয় রাশিগুলো অভিজ্ঞতার বিশ্বের অধিবাসী; এই অভিজ্ঞতা নির্ভর বিশ্বের পেছনে রয়েছে প্রকৃত বা আসল জগৎ (Real World) যা আমরা উপলব্ধি করতে পারি কেবলমাত্র আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। প্ল্যাঙ্ক এই ‘প্রকৃত জগৎকে’ মনে করেন ‘পরম’ (Absolute) রূপে, আর এই পরমকেই তিনি পদার্থবিদ্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন শক্তির এবং এনট্রপি’র পরম মান দিয়ে (Absolute Value), এমন কি স্থান-কালের পরিমাপন বিষয়েও। প্ল্যাঙ্ক তাঁর আত্মকথায় বলেছেন:

… In this it is of essential significance that the external world represents something independent of ourselves, something absolute that we are facing, and the search for the law that hold for this absolute seem to me the most satisfying task for the life’s work as a scientist.১৭

অভিজ্ঞতার জগৎ ও ধারণাগত জগতের মধ্যে যে ব্যবধান, তার সেতুবন্ধনের চেষ্টা অনেকের কাছে মনে হতে পারে কান্টীয় সমাধানের মতো। প্ল্যাঙ্ক যখন বলেন, চিন্তন প্রক্রিয়ার নিয়মসমূহ ইন্দ্রিয়ানুভূত সংবেদনের পথের সাথে মিশে যায়, তখন মনে হয় তা কান্টের সংজ্ঞার রূপরেখা ও বিশুদ্ধ বুদ্ধির মধ্যে সেতুবন্ধনের মতো, যার ফলে বহির্জগতের বোধগম্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই দুই জগতের মধ্যে আইনস্টাইনের সেতুবন্ধনের প্রয়াস কিছুটা ভিন্নতর, বিষয়টি তিনি ব্যক্তি-বিজ্ঞানীর হাতেই ছেড়ে দিতে চান, তবে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস সেতুবন্ধনের যথাযোগ্য পথ অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। পথ অনুসন্ধানের যে ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন তার একটি উক্তির ভেতর দিয়ে তা প্রকাশ করেছেন:

… Without hesitation there is, in my opinion, a right way, and that we are capable of finding it. Our experience hitherto justifies us in believing that nature is the realization of the simplest conceivable mathematical ideas. I am convinced that we can discover by means of purely mathematical constructions the concepts and the laws connecting them with each other, which furnish the key to the understanding of natural phenomena.১৮

অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন যে তিনি তাঁর বিজ্ঞানানুসন্ধানে ‘বহির্জগতের বাস্তবতা্থকে প্ল্যাঙ্ক যে ভাবে বিবেচনায় এনেছেন, সেভাবে আনেননি। কিন্তু অভিযোগটি সত্য নয়। আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি থেকেই তা স্পষ্ট:

The belief in an external world independent of the perceiving subject is the basis of all natural science. Since, however, sense perception only gives information of the external world or of the physical reality indirectly, we can only grasp the later by speculative means.১৯

প্ল্যাঙ্কের উক্তির সাথে এই উক্তির কোন গুণগত ভেদ আছে বলে মনে হয় না। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে আইনস্টাইনের পূর্বানুমতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, কোন ভৌত তত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণের একটি আবশ্যিক শর্ত হওয়া চাই সরলতার নীতি, আর এই ভিত্তি থেকে বেরিয়ে আসা পদার্থবিদ্যার যৌক্তিক তত্ত্বটিও ধারণ করবে সারলক্ষ্য ধর্ম। আসল কথাটি হল, একটি ভৌত তত্ত্বের জন্য এক জাতের গণিতকে নির্বাচন করতে হবে যা সামগ্রিকতার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি সুসংহত অর্থাৎ সংযুক্ত তত্ত্বকে সুন্দরভাবে বর্ণনাদানে সক্ষম। তবে বৈজ্ঞানিক কী ভাবে গবেষণা পদ্ধতি নির্বাচন করেন সে সম্পর্কে তাঁর শেষ কথা হল:

If you want to find out anything from the theoretical physicists about the methods they use, I advise you to stick closely to one principle: don’t listen to their words, fix your attention on their deeds.২০

দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞানের জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির সাথে দর্শনের পদ্ধতির পার্থক্য রয়েছে; দার্শনিকের জ্ঞান মনোজগৎ নির্ভর, এবং জ্ঞানীর তা নিজস্ব ভুবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানতত্ত্ব একদিকে যেমন বিশুদ্ধ চিন্তার ফসল, তেমনি অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তব জগতের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। কাজেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কেবল ব্যক্তি বিষয়ীগত অধ্যাত্মীয় (Subjective) ব্যাপার নয়, এই জ্ঞান অতি অবশ্যই বস্তুগত (Objective)।

ঐ যে আইনস্টাইন প্রায়শ: বলতেন I hold it true that pure thought can grasp reality, as the ancient dreamed’-এই উক্তির তাৎপর্য উপরের আলোচনায় নিশ্চয় খানিকটা পরিস্ফুট হয়েছে। একটি উদাহরণ দিয়ে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনে বিষয়টির তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করা যাক। আমাদের ভৌতজগৎ একটি চতুর্মাত্রিক সঙ্গতি (স্থান-কাল) (four dimensional continuum) মাত্র, যা রিম্যান্নীয় বক্র জ্যামিতিক ধর্ম মেনে চলে, ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নয়। এই সাধারণ তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসে যে, প্রকৃতির অভিকর্ষক্ষেত্রে আসলে স্থান-কালের বক্রতার প্রকাশ। স্থান-কালের সাথে প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ অভিকর্ষের সম্পর্ক আইনস্টাইন কী ভাবে স্থাপন করলেন সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “If I assume a Riemannian metric in it (space-time) and ask what are the simplest laws which such a metric system can satisfy, I arrive at the relativistic theory of gravitation”

অনুরূপভাবে, মুক্তস্থানে একটি ভেক্টর ক্ষেত্রের উপস্থিতি অনুমান করে তিনি ম্যাক্সওয়েল সমীকরণসমূহে উপনীত হয়েছিলেন। স্থান-কাল কোন বিমূর্ত ধারণা নয়, অতি অবশ্য ভৌত বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত। সুতরাং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানতত্ত্বে স্থান-কালের গড়ন হল জ্ঞানের বৈজ্ঞানিক বস্তুরই গড়ন। স্থান-কালের রূপরেখা ভৌত প্রকৃতিতে অবস্থান করে, কোন জ্ঞানীর মস্তিষ্কে নয়।২১ এ থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি আইনস্টাইনের উক্তিটির তাৎপর্য। আর এখানেই নিহিত রয়েছে কান্টীয় জ্ঞানতত্ত্বের সাথে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানতত্ত্বের পার্থক্য, যিনি বলেন স্থান ও কাল দুটি স্বতন্ত্র সত্তা, উপরন্তু: ‘space and time are empirically real, but transcendentally idea’। স্থান ও কাল সম্পর্কে এই ধারণা মানব মনে পূর্ব থেকেই প্রোথিত (A Priori)। এই অর্থে আইনস্টাইনসহ সকল বিজ্ঞানীই অকান্টবাদী।

বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের তাত্ত্বিক উপাদানটি যে মনুষ্য মেধার ‘মুক্ত উদ্ভাবন’-এ কথাটি উল্লেখ কালে আইনস্টাইন নিউটনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘নিউটন, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ব্যাপক এবং কার্যকর পদ্ধতির স্রষ্টা হয়েও, বিশ্বাস করতেন তাঁর পদ্ধতির মৌলিক ধারণাসমূহ এবং নিয়মাবলি অভিজ্ঞতা থেকে বের করে আনা সম্ভব। সন্দেহ নেই এটিই হল তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি hypotheses non fingo (I feign no hypotheses)’’র তাৎপর্য।’ আইনস্টাইন খেদের সাথে বলেছিলেন যে, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নিউটনীয় সিস্টেমের অভূতপূর্ব সাফল্য স্বয়ং নিউটন ও সমকালীন বিজ্ঞানী ও দার্শনিককুলকে ওই পদ্ধতির ভিত্তির কাল্পনিক চরিত্রকে বুঝতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উপরন্তু সেকালের প্রাকৃত দার্শনিকেরা (natural philosopher) বিশ্বাস করতেন যে পদার্থবিদ্যার মৌলিক ধারণাসমূহ ও স্বীকার্যসমূহ যৌক্তিক বিবেচনায় মনুষ্য মেধার ‘মুক্ত উদ্ভাবন’ হতে পারে না; বরং নিষ্কাশন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করা যেতে পারে।

নিউটন তাঁর বৈজ্ঞানিক পন্থার যে পরিচয় দিয়েছেন তা তাঁর উক্তি থেকে বেরিয়ে আসে:
I have not as yet been able to discover the reason for these properties of gravity from phenomena, and I do not feign hypotheses. For whatever is not deduced from the phenomena must be called a hypothesis; and hypotheses, whether metaphysical or physical based occult qualities or mechanical, have no place in experimental philosophy. In this philosophy particular propositions are inferred from the phenomena, and afterwards rendered general by induction. ২২

বোঝাই যাচ্ছে আইনস্টাইনের বিপরীতে নিউটন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরোহী পথ অনুসরণের পক্ষপাতী, যার শুরুটা হবে প্রতিভাস থেকে, কিন্তু তিনি অবরোহী পদ্ধতিই প্রয়োগ করেছেন।

দ্বিতীয় পর্ব : অজয় রায়ের বিশেষ প্রবন্ধ দ্বিতীয়াংশ : “বিজ্ঞানীর ধর্ম”

তথ্যসূত্র
১। A. Einstein, Science, Philosophy and Religion, a speech delivered in a symposium in 1940 (Published, New York, Harper, 1941); “It would not be difficult to come to an agreement as to what we understand by science. Science is the century-old endeavor to bring together by means of a systematic thought the perceptible phenomena of this world into as thoroughgoing an association as possible. To put it boldly, it is the attempt at the posterior reconstruction of existence by the process of conceptualization.”
২. বস্তু জগতের কোন অস্তিত্ব নেই বস্তু হল মনোজগতের সৃষ্ট প্রতিলিপি (Replica) মাত্র। আর নাগার্জুন (১ম শতাব্দী) প্রবর্তিত শূন্যবাদের মর্মকথা হল বহির্জগৎ ও মনোজগৎ কোনটিরই অস্তিত্ব নেই সবই শূন্য (Void) নাগার্জুনের দর্শন চিন্তার প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় হিউম ও বার্গসোঁর চিন্তাধারায়।
৩. গ্যালিলিও’র বিখ্যাত গ্রন্থ Dialogue প্রকাশিত হয় ১৬৩২ সালে।
৪. নিউটনের মতে দূরবর্তী দুটি জড় কণিকার মধ্যে আকর্ষণ তাৎক্ষণিক, এর জন্য সময়ের প্রয়োজন হয় না। একেই বলা হয় দূর ক্রিয়া।
৫. I would like to state a theorem which at present can not be based upon anything more than upon a faith in the simplicity, i.e., intelligibility, of nature: there are no arbitrary constants of this kind; that is to say, nature is so constituted that it is possible logically to lay down such strongly determined constants occur,……
৬. This convinced me that, within the frame of the special theory of relativity, there is no room for a satisfactory theory of gravitation. (Ref: Autobiographical notes, Albert Einstein: Philosopher z Scientist, Editor Paul Arthur Schilpp, The Library of Living Philosophers, Inc., Evanston, Illinois, 1049)…
৭. তাত্ত্বিকভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনও পরীক্ষিত হয়নি; এই মহান তত্ত্বের ইংরেজি নাম: Grand Unified Theories: GUTs.
৮. Autobiographical Notes, Albert Einstein; Albert Einstein: Philosopher-Scientist, Editor: Paul Arthur Schilpp, The Library of Living Philosophers, Inc., Evanston, Illinois, 1949
৯. ঐ, পৃষ্ঠা ৫৩
১০. Positive philosophy (A. Comte, Cours de philosophie positive, Premiere Lecon)
১১. Ernst Mach, The Principle of Comparison in Physics, Popular Scientific Lectures, 1894
১২. . Physikalische Zeitschrift (XVII, 1916) ’এ প্রকাশিত আর্নস্ট ম্যাকের ওপর আইনস্টাইন লিখিত জীবনগাথা-এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য।
১৩. Albert Einstein, Remarks on Bertrand Russel®’s Theory of Knowledge, (Paul A. Schilpps, The Philosophy of Bertrand Russel, 1944, p 287)
১৪. Albert Einstein; ‘On Physical Reality’ in Franklin Institute Journal; 121; 1936.
১৫. ‘The most incomprehensible thing about the world is that it is comprehensible.’ Albert Einstein, On Physical Reality in Franklin Institute, Journal, 121, 1936.
১৬. Albert Einstein, Herbert Spencer Lecture, in The World As I see
It, p 36, 1933
১৭. M. Planck, Wissenschaftliche Selbstbiographie, Leipzeig, 1948
১৮. Albert Einstein, ‘Clerk Maxwel®’s influence on the Evolution of the Idea of Physical Reality’ in The World as I see it, New York,
1934, p 36
১৯. ঐ, পৃ ৬০
২০. ঐ, পৃ ৩০
২১. এ প্রসঙ্গে নর্থপ উক্তি করেছেন: … … ‘Ultimate basis of space-time in the public, contingent, physical object of knowledge, rather than in the necessary constitution of the epistemological knower …’ (F.S.C Northrop, Einstein’s Concept of Science in Albert Einstein: Philosopher Scientist, Ed. Paul Arthur Schilpp, The Library of Living Philosopher, Inc., Evanston, Illinois, 1949)
২২. Sir Isaac Netwon, Philosophiae Naturalis Principia, 1687

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 3 =