শাহবাগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভাস

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের কথা আমরা সবাই বলে থাকি। শাহবাগ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকেই পুষ্টি পায়।

সবাই বারবার বহুল ব্যাবহৃত শব্দবন্ধটুকু ব্যাবহার করে। বিশেষত: নেতারা। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাসি নেতারা।
তারা আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কি বুঝাতে চায় তা স্পষ্ট নয়। জাতীয়তাবাদী হওয়াটাই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? আমরা মনে করি তা নয়। বারবার সভা সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলাটাও মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের চেতনার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।
শাহবাগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটা অংশের স্বপ্ন দেখে। সেই অংশটা হল:
ন্যায়বিচার পাওয়া। সে দেশে অপরাধীর বিচার হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার ন্যায়বিচারের অনুরোধে। প্রতিহিংসা চরিতার্থের প্রয়োজনে নয়। ঘৃণা বাঁচিয়ে রাখার দাবিতে নয়। প্রতিহিংসাপরায়নেরা তাদের ক্ষতগুলো শুকাতে দেয় না। বাঁচিয়ে রাখে। ক্ষতগুলো বাঁচিয়ে রাখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিনিধিত্ব দাবি করা রাজনীতিও। যতদিন সে ক্ষত বেঁচে আছে ততদিন সে রারনীতির মাঠ সে ক্ষত দেখিয়ে গরম রাখতে পারবে, ক্ষত শুকিয়ে গেলে তো আর কোন রাজনৈতিক পুঁজি নেই তার। বিভেদ বাড়লে, জনগণ ঐক্যবদ্ধ না হলে তাদের লাভই তো সর্বাগ্রে।

দেশে ন্যায় বিচার পাবার আকাঙ্খার পরিপুরক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আরেকটি অংশ:
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। যেখানে সব বর্ণ-ধর্ম-জাতি-গোত্রের সমঅধিকার।

শাহবাগে আন্দোলনে যুদ্ধাপরাধী রাজনীতির প্রতিক্রিয়া আমরা সবাই লক্ষ করেছি। যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের রক্ষার স্বার্থে প্রথমেই যে অস্ত্র প্রয়োগ করেছে তা হল, সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে যাচ্ছে। আমার দেশে আজো হিন্দুরা আক্রান্ত হয়। বৌদ্ধরা আক্রান্ত হয়। পাহাড়ি আর সমতলের আদিবাসীরা আক্রান্ত হয়। তাদের সংখ্যালঘু করে রাখা হয়। এইটা তো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন না, চেতনা না। অন্য যেকোন গোষ্ঠির তুলনায় হিন্দুরা মুক্তিযুদ্ধেও বেশি আক্রান্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাদের প্রাণের দাবি। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তারা কখনোই গ্রহণ করেনি। অথচ বাংলাদেশেও তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছে।

শাহবাগে আলোচিত হয়নি এমন অনেক অংশও আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার।

যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা। ভিন্ন ভিন্ন চার রকম শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আমাদের দেশে। কোন মানুষ কি রকম হবে তা নির্ধারণ করে দেয় এই রকম বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা। মাদ্রাসায় পড়লে সে কূপমণ্ডুক হবার সম্ভাবনা বাড়ে। উৎপাদন পদ্ধতি ও সম্পর্কের সাথে তার ন্যুনতম সম্পর্ক দূর করে দেয়া হয় এ শিক্ষা ব্যবস্থায়। তার কাজ করে খাবার কোন উপায় থাকে না। সাধারণত গরীব লোকেই সে ধারায় শিক্ষিত হয়। এবং গরীবই রয়ে যায়। কারণ সে মাধ্যম বাস্তব জগতে কিছু করে-কেটে নিজের উন্নতির কোন পন্থা তাকে দেয় না।

মধ্যবিত্ত সাধারণ বাংলা মাধ্যমে পড়ে। তাই কিছুটা উন্নতি তারা করতে পারলেও এক যায়গায় গিয়ে তাদের পথ শেষ হয়ে যায়। তারা ঐ মধ্যবিত্তই রয়ে যায়। একই পদ্ধতিতে।
ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে উচ্চবিত্ত। তারা উচ্চবিত্তই হয়। বিত্ত সংগ্রহের সব তরিকাই তাকে শেখানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এটা নয় যে শিক্ষা ব্যবস্থায় তাকে নানা শ্রেণিতে বিভক্ত করবে। বৈষম্য জারি রাখবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একইভাবে বাস্তবায়িত হয়না ভূমি ব্যবস্থাপনায়। পাহাড়ে আর সমতলে জমি কেনার মালিক হবার ক্ষত্রে বৈষম্য ধরে রাখা হয়। আদিবাসীদের ভূমি দান করে দেয়া হয় সমতলের বসতিস্থাপনকারীদের। শত্রু সম্পত্তি আইনে বঞ্চিত করা হয় হিন্দুদের।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয় না হিন্দু মুসলমান উভয়ের জন্য প্রচলিত ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক আইনে, বিবাহ নীতিতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয়না সমাজে নারী বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। নারীকে পণ্যে পরিণত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হয় না স্বাস্থ্যখাতে। সেখানে বড় লোকেরা বেশি খাতির পায়। ফাইভ স্টার হোটেলের মত হাসপাতালে থাকে। নারীর শরীরকে একটা পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে।

শাহবাগে সেসব কিছু অনালোচিত থেকে গেছে। অনেক সময় গড়িয়ে গেলেও সেগলো আনা যায় নাই। কারণ শাহবাগের যে লক্ষ্য তাই অর্জন করা যায় নাই আজো পর্যন্ত। সেটাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ ক্ষমতাসীনারা সব সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও সে চেতনা বাস্তবায়ন করতে চায় না। ’৭২ থেকে আজো পর্যন্ত কেউ চায়নি। সবখানে বৈষম্য বাঁচিয়ে রাখা হয়। আমাদের বিভক্ত রাখা হয়। আমাদের শোষণ করার স্বার্থে। গণজাগরন তাই বেপথু হবার সম্ভবনা বাড়ে।

সত্যিকার মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব না। একটা বৈপ্লবিক সরকারই সে চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারে। আর কেউ নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “শাহবাগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভাস

  1. যা বলেছেন তা অতি অবশ্যই
    যা বলেছেন তা অতি অবশ্যই সত্য।শতভাগ সহমত জানাচ্ছি।কিন্তু বৈপ্লবিক সরকারের জন্য তো চাই বিপ্লবী সংগঠন বা পার্টি।সে সংগঠন বা পার্টি কোথায়?

  2. সত্যিকারের মানুষের সরকারের
    সত্যিকারের মানুষের সরকারের অপেক্ষায় রইলাম। :ভালাপাইছি:

    ইস্টিশনে স্বাগতম মাহবুব ভাই। :ফুল:

  3. ইস্টিশনে স্বাগতম মাহবুব ভাই।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    ইস্টিশনে স্বাগতম মাহবুব ভাই। রথী-মহারথীদের ইস্টিশনে দেখে ভালই লাগছে। 😀

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =