জার্নি টু সুইট হোম

জার্নি টু সুইট হোম
(১-০৩-২০১৩)

বাড়িতে চলে এসেছি আজকে। ঢাকায় ঠিকমত ঘুম হচ্ছিল না, তাই বাড়িতে রওনা দিলাম। ঠিকমত একদিন ঘুমিয়েই কাল আবার ঢাকা চলে যাব। আমার অদ্ভূত একটা অভ্যাস আছে, ঢাকায় প্রতিদিন ১২ ঘন্টা ঘুমালেও ঘুম ঠিকঠাকমত হয় না, সারাদিন যায় আলস্যের মধ্য দিয়ে, পুরো শরীরে ব্যাথা করে। কিন্তু বাড়িতে ৪-৫ ঘন্টা ঘুম দিলেই শরীর ঝরঝরে হয়ে যায়। তাই প্রায়ই ঘুমানোর জন্য বাড়ি চলে যাই, ঝাকানাকা একটা ঘুম দিয়ে পরদিন চলে আসি। কয়েকদিন থেকে মনে হচ্ছিল ঘুমটা ঠিকমত হচ্ছেনা, তাই চিন্তা করলাম বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। যে কথা, সে কাজ। ক্লাশ শেষ করেই ছুটলাম বাড়িতে।

ফার্মগেট থেকে বাদুরঝোলা হয়ে মহাখালী। মহাখালী এসে দেখি বাস কাউন্টার প্রায় ফাঁকা, শুক্রবারতো, তাই ভিড় কম, সবাই ছুটি কাটাচ্ছে। টিকেট নিয়ে বাসে উঠলাম, সাথে সাথেই নাদিমের ফোন। ফোন রিসিভ করতেই জিগাইলো-“কাকা, তুমি কই?” “বাড়িত যাইতাছি”-উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই শালা কয়-“আমিও তো বাড়িত আইছি। তুই বাস থেইকা নাইমাই আমার বাসায় আয়।” আমি কইলাম-“ঠিক আছে, ওস্তাদ।” মনটা সাথে সাথে প্রচন্ড ভাল হয়ে গেল। কতদিন পরে দেখা হইব, প্রায় দুই মাস। এর মাঝে ফোনেও কথা হয়নি। অথচ একসময় দিনে তিন-চারবার ওর সাথে কথা না হইলে পেটের ভাত চাল হয়া যাইত। আর এখন দিনের পর দিন ওর সাথে কথা হয়না-ভাবতেই অবাক লাগে। সময় সর্বগ্রাসী।

বাসে উঠেই কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। এর একটা উপকারিতা আছে, বাসে যেসব রং-তামশা হয় তার অত্যাচার থেকে বাঁচা যায়। দুনিয়ায় যে কত আজব কিসিমের মানুষ আছে বাসে উঠলে বোঝা যায়। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি, ঘুম ভাঙতে দেখি গাড়ি গাজীপুর ছাড়িয়ে এসে রাজেন্দ্রপুর পড়েছে। দুইপাশের শালবন দেখতে লাগলাম প্রাণভরে, কিন্তু ৭-৮ বছর আগে যেরকম ঘন জঙ্গল ছিল এখন আর তেমন নেই। ক্ষমতাসীনরা ও গাছ চোরেরা মিলে বনটাকে উজাড় করে দিচ্ছে। কে বাধা দিবে এদেরকে, যেখানে রক্ষকই ভক্ষক আর আমরা দর্শক! গাড়ি কাপাসিয়া পার হতেই চারদিক্র গ্রামীণ পরিবেশ আরো প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। রাস্তার দু’পাশে ঘন ভাঁটফুলের জঙ্গল থেকে ভুর ভুর করে ভাঁটফুলের গন্ধ আসতে লাগল। ছোটবেলায় এই ভাঁটফুলের জঙ্গলে অনেক লুকোচুরি খেলেছি। ভাঁট নিয়ে ছোটবেলার একটা মজার স্মৃতি আছে। ছোট থাকতে আমি হাতের আঙ্গুল চুষতাম, সারাদিনই মুখের ভেতরে আঙ্গুল দিয়ে রাখতাম। আমার আঙ্গুল চোষা বন্ধ করার জন্য বড় ভাইরা আমার আঙ্গুলে ভাঁট পাতা ঘষে দিত। যখন মুখে আঙ্গুল দিয়ে টের পেতাম তিতা লাগছে তখন মাটিতে গড়াগড়ি যা কান্দা দিতাম তা আর বলার মত না। এখনো মাঝে মাঝে মনে হয় আঙ্গুল চোষার স্বাদটা খারাপ ছিল না। ভাঁটফুলের গন্ধ নিতে নিতে আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে শুনতে সাড়ে তিনটায় মনোহরদী এসে পৌঁছলাম। বাড়িতে না গিয়ে ব্যাগ কাঁধে সরাসরি নাদিমদের বাসায় হাজির।

দেখা হতেই নাদিম জিঞ্জেস করল-“ঢাকা থেকে তো ডিরেক্ট আয়া পড়লি, খাইছস কিছু?” ভালই বিপদে পড়লাম আন্টি যদি শুনতে পারেন কিছুই খাই নাই তাইলে এলাহী কান্ড করে খাওয়াতে বসাবেন। তাই আমতা আমতা করে বললাম-“না খাইয়া কেউ থাকে নাকি?”(সমস্যা হইল শালার লগে কিছুতেই মিছা কথা কইতে পারি না, আর যদি কইয়্যাও ফালাই তাইলে কেমনে কেমনে জানি শালায় ধইরা ফালায়, ওর মা, মানে আন্টির লগেও একই সমস্যা)। শালায় কিছু কইলো না কিন্তু সন্দেহের নজরে তাকায়া থাকল। মনে মনে কইলাম-যাক এই যাত্রায় বাঁচলাম। কিন্তু একটু পরেই ধরা খায়া গেলাম। আন্টি যখন জিগাইলো-“খাইয়া আসছ?” তখন ভুং-ভাং কইরা পার পাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু কাজ হইল না, আন্টি ধইরা ফালাইলেন। সাথে সাথে খাইতে বসায়া দিলেন-মেন্যু ছিল মিষ্টি, পোলাও, মুরগী, ডাল আর আচার। মনে মনে কইলাম-‘যাক বাবা অল্পের উপর দিয়াই গেলো, এই যাত্রায় বাঁইচা গেলাম।’

খাওয়া শেষ করে শাতিলরে ফোন দিলাম, ও আসার পর তিনজনে বের হলাম। এরপর দিলাম এক ননস্টপ হাঁটা-যে হাঁটার কোন মা-বাপ নাই। আমাদের হাঁটার অভ্যাসটা অনেক পুরনো। হাঁটার জন্য নবেল থাকলে নিঃসন্দেহে আমরাই প্রাইজটা পেতাম। আগে সকালে পাঁচটায় উঠে দল বেঁধে হাঁটতে বেরোতাম। তিন ঘন্টারও বেশি হাঁটতাম। আবার বিকেলে আরেক চোট হাঁটা তো ছিলই। যাহোক, আজকেও আমরা আড়াই ঘন্টার মত হাঁতলাম। ওরা তো আমার স্ট্যামিনা দেখে অবাক, নাদিম বলল-‘তোর তো হেব্বি এনার্জি! তিন ঘন্টা জার্নির পরে আড়াই ঘন্টা হাঁটা দিলি; এত্ত স্ট্যামিনা কইত্তে পাস?’ জবাবে আমি কিছু কইলাম না, খালি মিচকা একটা হাসি দিলাম যার অর্থ হইতে পারে-‘তোরা লগে থাকলে আড়াই ঘন্টা ক্যান, জনম জনম একটানা হাঁটতে পারব।’ আড়াই ঘন্টা টানা হাঁটার পর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে স্কুল মাঠে এসে বসলাম। এই সেই স্কুল যেখানে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও আনন্দময় ছয়-ছয়টি স্বর্ণালী বছর কাটিয়েছি। কত আনন্দ-বেদনার কাব্যের সাথে স্মৃতি হয়ে জড়িয়ে আছে এই স্কুলের নাম-সেসব ভাবতে গিয়ে দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছি তিন বছর হয়ে গেছে অথচ এখনো মনে হয় এইতো সেদিনও এই স্কুলের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করে বেড়িয়েছি, দাপিয়ে বেড়িয়েছি স্কুল মাঠ। বড্ড মিস করি স্কুল লাইফটাকে। সবসম্যেই মনে হয় ইশ! আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই সব দিনগুলোতে। স্কুলমাঠে আধা ঘন্টা বসে বসে স্মৃতির জাবর কাটলাম, এরপর উঠলাম। যে যার বাড়ির পথ ধরলাম। রাত মাত্র সোয়া আটটা বাজে, অথচ এখনই রাস্তা ফাঁকা, কোন সিএনজি পেলাম না। তাই আবার আধা ঘন্টার হাঁটা দিতে হল। অবশ্য হাঁটাটা দারুণ উপভোগ করলাম। জনমানবশূন্য অন্ধকার রাস্তায় আমি একা হাঁটছি-ব্যপারটা সবসময়ই আমার কাছে দারুণ লাগে। নিজেকে এসময় উপলব্ধি করা যায়, অনুভব করা যায়। নির্জন অন্ধকার রাস্তায় হাঁটার অনুভূতি যে কতটা দুর্দান্ত সেটা শুধুমাত্র যারা হেঁটেছে তারাই বলতে পারবে। আমি বেশিরভাগ সময়ই রাতে হেঁটে বাড়ি ফিরি শুধুমাত্র এ অনুভূতিটা পাওয়ার জন্য। এমনও হয়েছে কোন কোন দিন রাত বারটা-একটার

সময় নিজের হাত দেখা যায় না এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরেছি।

বাড়িতে এসে দেখি ঘরে তালা তালা দিয়ে আম্মা পাশের বাড়ি গেছেন, আব্বা বাজারে। আমি তালা খুলে ঘরে ঢুকলাম। অবশেষে বাড়িতে আসলাম-“হোম, হোম, মাই সুইট হোম।” আম্মা বাড়ি এসে আমাকে দেখে বললেন-‘বাড়িতে আইবি, একটা ফোন দিতে পারলি না?’ জবাবে কিছু না বলে মুচকি হাসি দিলাম। রাতে আর খেলাম না। কালই তো আবার ছুটতে হবে দূষিত, পূঁতি গন্ধময় ঢাকা শহরে। তার আগে একটা দুর্দান্ত ঘুম দিয়ে শরীরটাকে যতটা পারা যায় রিচার্জ করে নিতে হবে। ঘুমানোর মনে হচ্ছে-জীবনটা তো মন্দ না। বরং অনেক সুন্দর, যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর!

(১৫ মার্চ, ২০১৩)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “জার্নি টু সুইট হোম

  1. ঘুমানোর মনে হচ্ছে-জীবনটা তো
    ঘুমানোর মনে হচ্ছে-জীবনটা তো মন্দ না। বরং অনেক সুন্দর, যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর!

    :মুগ্ধৈছি:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

58 − 49 =