রাজাকারের পোলা

রাজাকার শব্দের সাথে নিজামের পরিচয় যখন সে ক্লাশ থ্রীতে উঠেছে। তখন গ্রামে থাকত নিজামরা। গ্রামেরর স্কুলে এক সদ্য নিয়োগ পাওয়া শিক্ষিকা বাবার খুব ভক্ত ছিল। কি যে ভাল লাগত সেই শিক্ষিকাকে !! তাদের বাড়িতে টিফিনের সময় ম্যাডামটি আসতেন দুপুরেরে খাবার খাবার খাওয়ার জন্য। তাকেও আদর করে খাওয়াতেন। একদিন শুনে ম্যাডামের নাকি কি হয়েছে, নিজাম দৌড়ে গেল স্কুলে, কিন্তু সে তেমন কিছুই বুঝেনি কি হয়েছে, শুধু “রাজাকারের বাড়িতে আপনার কি” কথা তার মনে গেথেছে। বাড়িতে মাকে গিয়ে বলল মা রাজাকার কি? বাবা কি রাজাকার? মা তাকে আঙ্গুলে ইশারা করে চুপ থাকতে বলেছিলেন, আর বলেছিলেন রাজাকারেরা ইসলামের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু নিজাম কোনভাবেই বুঝেনি তাহলে চুপ করে থাকতে হবে কেন? আরেকবার রাজাকার শব্দটি পায় তাদের স্কুলের স্বাধীনতা দিবসের দিন। সেদিন স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে নির্ধারিত বক্তৃতায় প্রথম হয়েছিল। বক্তৃতার বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সে জেনেছে রাজাকারেরা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি। তখন যদিও স্বাধীনতা তা এতটা বুঝতনা তবে এটা বুঝেছিল তার বাবা ছাড়া রাজাকাররা অবশ্যই ভাল মানুষ না। বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিজাম যে উত্তর পেয়েছিল তার জন্যই আজ সে নাস্তিক। সেদিন বাবা বলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ আসলে দেশের জন্য হয়নি হয়েছিল ধর্ম রক্ষার জন্য। ধর্মই বা কি সে কি তখন জানত? আর এই ধর্মের অনুসন্ধান করতে করতে আজ সে নাস্তিক হয়ে গেছে। অবশ্য নাস্তিক হওয়ার জন্য পরে আরো অনেক কারন কাজ করেছে।

নিজাম হাটছে, দোকান লাগিয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু বাড়ি ফিরতে ভয় লাগে। ঠিক ভয়ও না, একটা শংকা কাজ করে। কখন জানি বাবার সামনে পড়ে যায়। তার বাবা জামাতের একজন বড়মাপের নেতা। আর সে কি না শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের সাথে একাত্ত হয়ে আন্দোলন করছে। যদি কোন সময় বাবা চোখে চোখে বলে উঠেন ফাসি চাস তো ঘর থেকেই শুরু কর তোর ঘরেই তো রাজাকার। তবে আশার কথা হচ্ছে তাদের এখানকার মঞ্চে গোপনে যে কয়েকদিন গিয়েছে তার খবর এখনও ঘরে আসেনি। হয়ত তার বাবার মত জামাত শিবিরেরা গা ঢাকা দিয়েছে বলেই নিজাম তাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু কতক্ষন বা কতদিন প্রজন্ম চত্বর আন্দোলনে তার একাত্বতা চাপা থাকবে?। কি বলবে তখন? তাই নিত্য তার দেরি করে বাড়ি ফেরা।মাসুম বলেছিল কি বলিস তোর বাবা জামাতি হয়েছে বলেই কি তুই লুকিয়ে লুকিয়ে দেশের কথা বলবি? তাকে কি বুঝানো যায় ঠিক কি কারনে বাবাকে তার এত ভয়। বাবার মত এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ নিজামের চোখে খুবই কম পরেছে। অগাধ ধৈর্য তো আর এখন তেমন চোখে পরেনা। বাবার যে বিষয়টা তাকে বেশি ভাবায় তা হল অগাধ নির্লিপ্ততা। এমন ভাবলেশহীন মানুষ এখন পাওয়া ভার। বাবার একটা অভ্যাস নিজাম নিজে আয়ত্ব করেছে, তা হল বই পড়া। জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখে আসছে বাবা মানেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়া একটা মানুষ। সেই বই পড়ার অভ্যাস নিজাম পেয়েছে। তবে পার্থক্য বাবা পড়ে সব জামাতী বই আর নিজাম সবকিছু। একবার জাহানারা ইমামের ” মূল ধারায় চলছি ” বইটা নিজাম বাড়িতে এনেছিল পড়ার জন্য, তখন খুব সম্ভবত ক্লাস নাইনে বা টেনে পড়ে, আরো বছর দশেক আগের কথা। বাবা বলেছিলেন এসব বই পড়েনা, এগুলু কমুনিস্টরা মানুষের মেধাকে বাজে কাজে লাগানোর জন্য লিখে। এদের বই মানুষকে ভ্রান্ত করে। টেনে পড়া নিজাম কোনভাবেই বুঝেনি যদি ভ্রান্তই করে তবে বাজারে এসব বইয়ের ছড়াছড়ি কেন? অথচ জামার শিবিরের বই কোন লাইব্রেরীতে বিক্রি হয়না, এগুলু শুধু তাদের অফিসেই পাওয়া যায়। আর বই পড়ে পড়ে সে আজ দেশের জন্য কাদে, কি অদ্ভুত মানুষের জীবন। একজন বই পড়ে জামাতি হয় আরেকজন হয় দেশপ্রেমিক !!! বাড়ির কাছে আসতেই তার শংকাটা আরো বেড়ে যায়, বাবার রুমে লাইট জালানো কেন? কিছু কি হয়েছে? দরজায় কড়া নাড়তেই মায়ের কন্ঠ ,

— কিরে তোদের কি বাড়িঘর নাই? ভাল মানুষের পোলারা, ভাল মানুষেরা বাইরে থাকে?
— না মা কাজ ছিল দোকানে।

— নিরবে আয় শব্দ করিস না তোর বাবা ঘুমিয়েছে, উঠলে তোর খবর আছে।

— কেন মা কি হয়ছে?

শংকাটা আরো বেশি হয়ে যায় এ মুহুর্তে।

— আবার কেন বলিস? বাবার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিস? আস্তে আস্তে আয়। তোকে নিয়ে আমি তো আর পারলাম না।
— জেনে যখন গেছই তাহলে আর কথা বলে কি লাভ? আমি আমার মত থাকি তোমরা তোমাদের মত থাক। আমি কথা দিচ্ছি আমি তোমাদের কখনও ছুট করে কারো কাছে বলব না আমি রাজাকারের পোলা হয়েও ফাসি চাই। আমি শুধু আমার মত করে অনলাইনে কাজ করব।

— এই তোর অনলাইন? তুই দোকানের কথা বলে ঢাকা গেলি, অথচ গেলি শাহবাগ!! এই তোর অনলাইন?

— মা, সে তুমি বুঝবেনা। তোমারা তোমাদের মত থাক আমি আমার বাংলাদেশ নিয়ে থাকি।

— আচ্ছা, ঘরে আয়।

— মা, তুমিও তো জামাত কর। তুমি আমাকে ঘরে আসতে বলতে পার, বাবা পারবেনা কেন?

— সে তুই বুঝবিনা। মায়ের কাছে সন্তানের আলাদা পরিচয় থাকেনা।

নিজামের মাও জামাতের একজন মহিলা নেত্রী। কিন্তু মায়ের কাছে অনেকটা নিরাপদ, তার বইগুলু মা লুকিয়ে রাখতেন যেন বাবা না দেখে। তাই বলে নিজাম কোনদিন বলেনি সে রাজাকারদের ঘৃনা করে। খেয়ে দেয়ে নিজাম ঘুমিয়ে পড়ে।

নামাজের জন্য ডাকাডাকির কারনে নিজামের সকালে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠেই সে বাবাকে লুকিয়ে মায়ের কাছে নাস্তা করে দোকানে চলে যায়। আজ বের হওয়ার সময় মা বললেন।

— ফজরের নামজের সময় মামুন আর জুবায়ের এসেছিল, তোর বাবার সাথে অনেকক্ষন কি সব কথা বলল। সব্ধানে থাকিস।

— কি বল?

— মামুনই তোর বাবাকে ফেইসবুকের আইডি দেখিয়েছে,আমি দেখিনি। বাবা সাবধানে থাকিস।

— আমি থাকব সাবধানে? ছেলের জন্যও তোমাদের মায়া নেই?

মায়ের চোখ ছল ছল করছে দেখে নিজাম চলে আসে দোকানে, তার নিচু হওয়া মুখের দিকে নিজাম তাকায়নি।

আজ দোকান লাগানোর পর কোথায় যাবে বুঝতে পারছেনা নিজাম। একটু ভয়ও কি লাগছে? জামাত শিবির তো আর কম দেখেনি। তবে আশা আছে সে তো নেতার ছেলে, তাকে যা বলার বাবাই বলবেন। তাকে কেউ কিছু বলার সাহস পাবেনা। বাবা কি আর তাকে মারার হুকুম দিতে পারেন? হয়ত শাসিয়ে যেতে পারে। কিন্ত হিসাব মিলেনা, মা যে সাবধানে থাকতে বললেন? ধুর এসবের কিছুই হবেনা ভেবে নিজাম বাড়ির দিকেই হাটা দেয়। আজ না হয় হয়ে যাবে বাবার সাথে একচুট। নিজাম দোকান থেকে একট দুর আসার পর খেয়াল করল মামুন আরেকটা ছেলে মটরসাইকেলে যাচ্ছে। তারদিকে কি একটু তাকিয়েছেও? এটা খেয়াল করেনি। হাটতে থাকে, মিনিটখানেক পর দেখে একটি মাইক্রোবাস তার দিকে আসছে। মাইক্রোটি দেখে ভয় পায় নিজাম, শিবিরের কেউ নাতো? তাকে অভয় দিয়ে মাইক্রোটি চলে যায়। হাটতে থাকে নিজাম। এবার পেছন দিক থেকে আরেকটি মাইক্রো আসছে। নিজাম চট করে সিদ্ধান্ত নিল মাইক্রোতে লিফট নিবে। হাত তুলে দাড় করায়। মাইক্রো তার পাশে থেমে গেলে সে অবাক হয়, এ যে সামাদুল। তার ক্লাশমেট, শিবির করে। কলেজে শিবির করতনা বলে নিজামকে শাসিয়েছিল একদিন। বাবা জামাত থাকায় সে কিছুই করতে পারেনি। সামাদুল চিতকার করে উঠে নিজামকে

— কিরে শয়তান, কত টাকা পাস তুই মাসে মাসে? বাবার বিরুদ্ধে লাগছস?

— আমি –আমি।

নিজাম ভেবে পায়না কি করবে, ঝাড়া দৈড় দেবে? নাকি দাড়িয়ে থাকবে?
সামাদুল সহ আরো চারজন ততক্ষনে নিজামকে ঘিরে ধরেছে। সামাদুল বলল, সব সব রেডি? উত্তর আসে, জ্বী মুহতারাম। দুজন দুটি হাত ধরে ফেলে নিজামের, চোখে ঝাপসা দেখে নিজাম, সে কি হার্টফেল করল? আবছাভাবে শুনতে পায়, আল্লাহু আকবার। এরপর, একটা তীব্র কিছু তার ঘারের কাছ দিয়ে চলে যায়, চোখে একটা আলোর ঝলকানি তারপর পৃথিবী দুলতে থাকে একটা কিছুতে সে হোচট খায়, একদম আস্তে আস্তে শুনতে পায়,

— রফিক লিফলেটটা ফেলে রাখ শয়তানের লাশের কাছে, কাল খবর হউক ” জামাত নেতার ছেলেকে হত্যার মধ্য দিয়ে জনতার প্রতিশোধ শুরু হল”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “রাজাকারের পোলা

  1. বানান খেয়াল করা দরকার।
    বানান খেয়াল করা দরকার। সম্পাদনা করলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর আবেগ নিয়ে আরো খেলা যায়। যদিও মৃত্যুর চেয়ে বড় আবেগ হতে পারে না। খুবই গুরুত্তপুর্ণ ঘটনা। ব্যাখ্যাটা আরো ধীরে ধীরে সময় নিয়ে করলেও সমস্যা হত না। পড়তে ভালই লাগত। একটু সময় লাগতো, লাগুক। কিন্তু বুকে আরো ভেতরে ঢুকে যেত।
    আপনার গল্পের নায়ক একজন নাস্তিক, যিনি শাহবাগ আন্দোলনে যুক্ত। লুকিয়ে।
    আপনার অনুভূতির জায়গাটা আমি বুঝতে পারছি। নাস্তিকতা একটা খুব বড় বিষয়। কিন্তু এই বিষয়টির পেছনের কারণগুলো নিয়ে গল্প হতে পারে।
    প্রশ্ন আসতে পারে এটা তো কোন অপরাধ না, বা মাথা ঘামানোর বিষয় না যে এটাতে গুরুত্ব দিতে হবে।
    কিন্তু এর উপর ভর করেই শাহবাগ আন্দোলনের সাথে মফস্বলের মানুষদের বিচ্ছিন্নতা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলত এর গুরুত্ব অনেক খানেই।
    আর আপনার গল্পও কিন্তু কোন একজনের স্থানে প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠছে। তাই বিশ্লেষণ দরকার পড়ে।

    1. ধন্যবাদ দাদা, জীবনে
      ধন্যবাদ দাদা, জীবনে দ্বিতীয়বার গল্প লিখার চেষ্টা করেছি।
      ভুলত্রুটি শুধরে নিতে হবে।
      আরো বেশি বেশি পরামর্শ দিলে ভাল করার আশা করি।

  2. সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে লেখার
    সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে লেখার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু কাহিনী কেমন যেন আরোপিত মনে হোল। যদিও জামাতিদের কৌশল ঠিক এমনই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − 11 =