পলাশীর পতন ও বাঙালী মানস

[নোট : হরিপদ দত্ত লিখিত এ প্রবন্ধটি আমার কাছে মনে হয়েছে আলোচনায় আসা উচিত। সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, এই নিয়ে কাজ করেন, গবেষণা করেন, কথা বলেন, তাদের এ লেখাটির দিকে নজর দেয়া দরকার।]

পলাশীর তথাকথিত যুদ্ধ এবং নবাব সিরাজের পতনকাল থেকে আজকের সমকালের দৈর্ঘ হচ্ছে আড়াইশ’ বছর৷ এই আড়াই শতাব্দীর ইতিহাসের দিকে তাকালে বাঙালীর মানস বৈশিষ্ট্য যেমনি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি এই জনপদের রাজনৈতিক বাস্তব চিত্রও উন্মোচিত হয়৷ পলাশীর পতন কালে বাংলার রাষ্ট্রশক্তির অভ্যন্তরভাগের যে অবস্থা ছিল আজকের বাস্তবতার সঙ্গে তার আশ্চর্য মিলটাও দেখা যায়৷ রাষ্ট্রশক্তির বিবেচনার পূর্বে আমরা তাকাতে চাই বাঙালী জাতিসত্তার দিকে৷ বিষয়টি খুবই জরুরী৷

বাঙালী জাতির উদ্ভব-ইতিহাস যতটা কৌতূহলোদ্দীপক ততটাই নির্মম৷ নৃ-তাত্ত্বিক বিবর্তন, গঠন-পুনর্গঠনের ভিতর দিয়ে আফ্রো-এশীয় কিংবা ইঙ্গ-ইউরোপীয় জাতিসমূহের উদ্ভব প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক জটিল বাঙালীর উদ্ভব৷ ইতিহাসের এই হেঁয়ালি-প্রহেলিকার বৈশিষ্ট্য এবং জাতিটির ভাব আর আচরণের দিকে তাকিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা বাঙালী মুসলমানদের প্রতি যেমনি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, ঠিক একই ধারণা বাঙালী হিন্দুর প্রতি ভারতীয় হিন্দিবলয়ের আর্য্য-রক্তের দাবীদার হিন্দুদের৷ ধর্মগ্রন্থ বেদ তো নয় কেবল, মহাকাব্য মহাভারতও বাঙালী নিন্দায় ভরপুর৷

একথা মিথ্যা নয় যে, বাঙালী একটি সংকরজাতি৷ হাজার হাজার বছরের নানা রকম বিপরীত-বিরুদ্ধমুখী ঘাত-অভিঘাতের ফলে কখনো শুদ্ধ কখনো বা অশুদ্ধ মিশ্রণ-অভিমিশ্রণে ইতিহাসের নানা ভাঙনের ভেতর দিয়েই বাঙালীর উদ্ভব৷ জাতিটির সংকর রক্তে নয় কেবল, তার সংস্কৃতিতে, বিশ্বাসবোধ আর চিন্তা-চেতনা-আচার-আচরণে পরস্পর বিরুদ্ধ মত ও পথের মিশ্রণ ঘটেছে বলেই সে এক সংকর সংস্কৃতিরও বাহক-ধারক৷

এমনি এক জাতির সামনেই পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন ভবিষ্যতের জন্য যে ইঙ্গিত দিয়ে যায় তা মোটেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি জাতিটির সামনে৷ ইতিহাসের ওই মহা বিপর্যয়কে বাঙালী দেখেছিল উদাস বাউলের চোখে, বোধবুদ্ধিশূন্য চেতনায়৷ সিরাজের পরাজয় যে মুসলমানের পরাজয় নয় কেবল, হিন্দুরও বিপর্যয় তা তৎকালের হিন্দু সমাজও বুঝতে চায় নি৷ যে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ এগিয়ে এসেছে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাঙনের ভিতর দিয়ে, তার ইতিহাস তো পলাশীর প্রান্তরেই লেখা হয়ে যায় সিরাজের রক্তে৷ সেই রক্তপাতকে তৎকালের বাঙালী হিন্দু যদি বুঝত তবে ঘটনাটিকে মুসলমানের পরাজয় বলে নির্বোধের তৃপ্তি পেত না৷ বাংলা বিভক্তির বীজ তো ইংরেজ রোপন করে দেয় পলাশীর প্রান্তরেই৷

তৎকালের মুর্শিদাবাদের, বর্তমানে নদীয়া জেলার প্রান্ত থানা পলাশীর পথ কেটে আমরা ইতিহাসের কার্যকারণের আরো গভীরে যেতে চাই৷ মিথপ্রিয় বাঙালীর মিথ ছেড়ে ঘটনার অভ্যন্তরে তাকানোই যুক্তিযুক্ত৷ নবাব সিরাজ বা পলাশীর পতনের কারণ যে কেবল ব্যক্তি বিশেষের ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতা নয়, অতিরিক্ত কিছু, তাও ভাবতে হবে৷ ব্যক্তি এখানে উপলক্ষ, আসল ব্যাপার হচ্ছে বহুমাত্রিক দূরগামী কার্য-কারণ৷ বুঝতে হবে, ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতা এবং ষড়যন্ত্র কখন সফল হয়৷ নিশ্চয়ই এসবের ক্ষেত্র পূর্বেই তৈরি হয়ে থাকে৷ ষড়যন্ত্রের কারণ তো রাজশক্তির ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ভিতে গভীর থেকে অদৃশ্য-গোপন খাদ তৈরী করে রাখে, ঝাঁকুনি খেলেই তা ধসে পড়ে৷

আমরা দেখতে পাব অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, ইংরেজদের কারণে যুদ্ধ ব্যয়বৃদ্ধি এবং নানা অপচয়ে ঋণগ্রস্ত নবাব আপন অমাত্য সুদব্যবসায়ী অবাঙালী জৈন ধর্মাবলম্বী জগৎ শেঠের কাছে হাত পাতছেন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারকে কর দেওয়ার টাকার জন্য৷ সঙ্গত কারণে প্রথম অসফল ষড়যন্ত্রের সময় হাতে-নাতে ধরা পড়লেও নবাব শেঠজিকে পদচ্যুত করতে সক্ষম হন নি৷ অন্যদিকে ব্যবসায়িক কর নিয়ে নবাবের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সংঘাত যখন চলছিল, দিল্লির মুঘল সম্রাট তখন তাদের বাংলায় বিনা করে ব্যবসার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন৷ কেন্দ্রের এই হঠকারী নীতি পলাশীর বিপর্যয়ের আর একটি কারণ৷ দিল্লির মুঘলেরা নিজেদের দুর্বলতা আর চরম অবক্ষয়ের ভিতর দিয়ে বাংলা-ভারতে ইংরেজ বিজয়ের বীজ বপন করে দেয়৷

প্রকৃতপক্ষে পতনের পূর্বে নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা চারপাশ থেকেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন৷ দিল্লির মুঘলদের ভ্রান্ত আচরণ, বাংলার রাজপাটে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অভ্যন্তর ভাগে ভাঙন-ফাটল এবং নবাবের প্রজাবিচ্ছিন্নতা কোনটাই মিথ্যা নয়৷ নবাব সিরাজ বয়সে তরুণ হলেও তাঁর মাতামহ আলীওয়ার্দীর চেয়ে যে রাজ্যপাট পরিচালনায় অদক্ষ, অদূরদর্শী ছিলেন, এমন মনে করা নিরর্থক৷ বরং মৃত্যুর পূর্বে আলীওয়ার্দীর তৈরি বাংলার মসনদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আগুনের ভেতরে পা ফেলেই, মাতামহ কৃত সংকটের দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে সিরাজকে নবাব হতে হয়৷ সিরাজের ব্যক্তিগত শৌর্য-সাহসের যে অভাব ছিল না তার প্রমাণ মেলে বেশ ক’টি যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করায়৷ নবাবের দুর্ভাগ্য এই যে, মাতামহ তাঁকে এমন এক জনগোষ্ঠীর শাসক করে গেলেন যারা চরিত্র বলে অদৃঢ়, আত্মকেন্দ্রিক, সংসার-উদাসীন এবং রক্তধারায় বহন করছে পরস্পরবিরোধী কৌমচেতনার অনৈক্য বৈশিষ্ট্য৷

নবাবের সেনাবাহিনীতে ভীতু, যুদ্ধে অনাসক্ত ভাবুক বাঙালীরা স্থান পায় নি৷ সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বাঙালীর সুসম্পর্ক বা যোগাযোগও গড়ে ওঠে নি৷ নবাবের অবাঙালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যদি স্থানীয় প্রজা বাঙালীর যোগাযোগ স্থাপিত হতো তবে বাংলার ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো৷ অবাঙালী পাঠান, জাট, মারাঠী, রাজপুত ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর হিন্দু-মুসলমান সৈনিকেরা বাঙালী প্রজার কাছে ছিল দূরের মানুষ, অনাত্মীয়৷ তাছাড়া বৃদ্ধ-প্রাচীন মন্ত্রণাদাতা অমাত্যগণ তথা রাজকীয় আমলাতন্ত্র ছিল নবাব আলীওয়ার্দী যুগের৷ তরুণ নবাব সিরাজের সঙ্গে তাদের মতান্তর ছিল অনিবার্য৷ মাতামহের রেখে-যাওয়া প্রশাসনিক এই প্রবীণ আমলাতন্ত্রই ছিল সিরাজের সবচেয়ে বড় শত্রু৷ বেনিয়া ইংরেজকে, আলীওয়ার্দী যতটা বুঝতে পেরেছিলেন তার চেয়েও স্পষ্ট বুঝেছিলেন নবাব সিরাজ৷ মাতামহের জীবদ্দশাতেই যে ওই ঔপনিবেশিক শক্তি বেনিয়া ছদ্মবেশে জাল বিছিয়ে বাংলাকে ঘিরে ফেলেছে, তা ছিল সিরাজের কাছে পরিষ্কার৷ এটাও তিনি বুঝতে পারেন যে, উপনিবেশবাদ অমাত্যদের মাধ্যমে তাঁর ঘরে ঢুকে গেছে৷ কিন্তু তাঁর কিছুই করার ছিল না৷ একদিকে দিল্লির অপদার্থ কেন্দ্রীয় শক্তি, অন্যদিকে আলীওয়ার্দীর রেখে-যাওয়া চতুর স্বার্থবাদী ইংরেজের দালাল আমলারা তরুণ নবাবকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷

একথাও পরম সত্য যে, উচ্চবর্গের হিন্দু সমাজের যেমনি, ঠিক তেমনি উচ্চশ্রেণীর মুসলমান সমাজের প্রভাব ছিল নবাব দরবারে৷ কিন্তু বৃহৎ বাঙালী সমাজের হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে নবাব সিরাজের সম্পর্ক ছিল কর দাতা আর গ্রহীতার, এর বাইরে নয়৷ কেবল হিন্দু নয়, মুসলমান কৃষক-প্রজা সমাজও নবাবকে আপন ভাবতে পারে নি৷ বাঙালী প্রজারা তো চিরকালই রাজশক্তি সম্পর্কে ছিল নিরাসক্ত৷ রাজার ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে তারা ভাবিত ছিল না৷ কে রাজা, সেই পরিচয়ের বাইরে বর্ণবিভক্ত বাঙালী হিন্দু সমাজে রাজা বা শাসক হচ্ছেন ঈশ্বরের অবতার৷ বখতিয়ার খিলজিকেও ভাবা হতো জগতের শেষ অবতার, কল্কি অবতার রূপে৷ রাজার ওপর ঐশী শক্তি বা দেবত্ব আরোপ করেই তারা প্রশান্তি খুঁজতো৷ এই বিশ্বাসেই শাসককে শাসিতগণ অনাত্মীয় করে দূরে সরিয়ে রেখেছিল৷ অন্যদিকে মুসলমান প্রজারাও বিশ্বাস করতো শাসক বা আমীর হচ্ছেন খোদা কর্তৃক মোমেনদের জন্য নির্বাচিত৷ তাই তিনি শ্রদ্ধার বটে, কিন্তু দূরের অনাত্মীয়৷

এই বাংলায় অতীতে রাজা-প্রজা তথা শাসক আর শাসিতের বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি করার প্ররোচনা দেয় ভাষার অনৈক্য৷ পলাশীর সহজ পতন এবং পরবর্তীতে গণ বা প্রজাপ্রতিরোধ সংগঠিত না হবার পেছনে রাজা-প্রজার এই ভাষা পার্থক্যেরও বেশ কার্যকর ভূমিকা ছিল৷ প্রজার ভাষা বাংলা, নবাবের ভাষা ফারসী, অমাত্যদেরও তাই৷ নবাবের সৈন্যদের ভাষাও ফারসী কিংবা বিকাশমান হিন্দি-উর্দু৷ নবাবের প্রশাসনিক মণ্ডলিতে যে অভিজাত হিন্দু-মুসলমানেরা ছিল তারা তাঁর কথা বুঝলেও জনগণ ছিল সে-ভাষায় অজ্ঞ৷ ভাষার এই অনাত্মীয়তা শাসক থেকে শাসিতকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে৷ পলাশফুল গাছে আচ্ছাদিত পলাশীর আমবাগানে শিবির স্থাপন-করা ইংরেজ সৈন্যদের ভাষার মতোই নবাবের সেপাইদের ভাষাও অবোধ্য ছিল স্থানীয় বাঙালীর কাছে৷

অন্যদিকে বিষয়টিকে দেখতে হবে এভাবেও যে, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হোক চাই না হোক, এ কথা মিথ্যে নয়, ইংরেজের অস্ত্র ছিল আধুনিক৷ কামান, গোলা, বারুদ, বন্দুক নবাবেরও ছিল, অথচ নবাব নিজে ছিলেন তরবারিধারী, যা তাঁর যুদ্ধের পোশাকের সঙ্গেই মানায়, যুদ্ধের সঙ্গে নয়৷ দেশীয় কর্মকারদের তৈরী কামান যে ইংরেজের কামানের চেয়ে শক্তিশালী ছিল না, এ তো বাস্তব সত্য৷ তাছাড়া নবাবের যৎসামান্য বন্দুকও ফরাসীদের কাছ থেকে কেনা৷ এই বাস্তবতার পরও যুদ্ধটা যদি প্রকৃতই হতো তাহলো নবাববাহিনীর সংখ্যাধিক্যের কারণে ইংরেজের পরাজয় ছিল অনিবার্য৷

পলাশীর বিপর্যয়ের ভিতর দিয়ে বাংলার অবৈধ শাসনের বৈধ শাসন-সনদ তো ইংরেজেরা লাভ করে মুঘলদের হাত থেকেই, পরাজিত বাঙালীর হাত থেকে নয়৷ বিদেশী ইংরেজ শক্তি দ্বারা বাংলা যখন আক্রান্ত এবং বিপর্যস্ত হল, তখন দিল্লির মসনদে বসে মুঘলেরা কি করছিল? সংবাদ পেয়েও তারা কেন সৈন্য পাঠাল না ইংরেজ প্রতিরোধে? বিদ্রোহ দমনের নামে তারা যদি ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনীসহ মানসিংহকে পাঠাতে পারে তবে সিরাজের পক্ষে পাঠাল না কেন?

বাঙালী তখন কি করছিল? স্বাধীনতা হারিয়ে গেল, কিন্তু ভাবের জগতে ডুবে আত্মভোলা বাঙালী গাইছে পদাবলী কীর্তন, রাধার বিরহে ফেলছে চোখের জল৷ রাম প্রসাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গঙ্গা-ভাগিরথীর বটের তলায় বসে গাইছে তারা শ্যামা সঙ্গীত; ‘চাই না মা রাজা হতে…’৷ ইংরেজের হাতে যখন বাংলার রাজা আর রাজ্য চলে গেল তখন অন্যদল বাউলের ভাবের জগতে ডুবে অনুসন্ধান করছে; ‘মারফতের ভেদ জানি না মাওলা, শরিয়ত খুঁজে মরি…’৷ অথচ কি মহাবিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে রাষ্ট্রজীবনে, বাঙালী টেরও পেল না৷ এ জনগোষ্ঠী তো অনুগত প্রজা হয়েই শান্তিতে, নির্বিরোধে, নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে বাঁচতে চায়৷ মাতৃভূমি স্বাধীন কি পরাধীন, রাজা হিন্দু না মুসলমান, সাদা না কালো, ইংরেজ না পর্তুগীজ, সেই বোধ তো ডুবে ছিল সংসার নিরাসক্তির অন্ধকারে৷ কখনো যদি নিরুপায় হয়ে আত্মরক্ষার কথা ভাবতো তবে তারা আশ্রয় নিতো যন্ত্রের বদলে তন্ত্র-মন্ত্রে৷ মন্ত্রের ‘বাণ’ মেরে শত্রু নিধনের ব্যর্থ চেষ্টা করে যেতো৷ আরেক দল আশ্রয় নিত কুফরী কালামে, শয়তানকে বশীভূত করে কার্যসাধনে৷

ওই যে ইতিহাসের খলনায়ক, পলাশীর অভিনেতাগণ, তারা কি ছিল বাঙালীর আত্মার আত্মীয়? অবাঙালী শিয়া মুসলমান মীর জাফর, অবাঙালী জৈনধর্মী জগৎ শেঠ এবং অবাঙালী হিন্দু রাজবল্লভ কোন দোষে ভাবতে যাবে বাঙালীর সুখ-দুঃখের কথা? ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে সমষ্টিগত স্বার্থকে ওরা চেনে না৷ তাদেরই তো উত্তরসূরী আজকের বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর রাজনীতিক এবং প্রশাসনিক আমলার দল, যারা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে চায় তেল-গ্যাসসহ সামুদ্রিক বন্দর৷ সেদিন যেমনি ছিল সামনে ক্লাইভ আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, পেছনে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, আজকেও তেল-গ্যাস প্রশ্নে সামনে বিদেশী ব্যবসায়ীশ্রেণী, পেছনে-আড়ালে রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ৷

একাত্তরের যুদ্ধ, এত বড় জাতীয় বিপর্যয়, দুঃখ-কষ্ট, তারপরও যদি জাতীয় দায়িত্ব সম্পর্কে বাঙালী এতটা উদাসীন হয়ে থাকল, তবে তার ভবিষ্যৎ কি? পলাশী যুগের আমলাতন্ত্র আর আজকের আমলাতন্ত্রের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ কি কোন পার্থক্য খুঁজে পায়? পায় না৷ সেদিনের বাংলার মসনদের পাশে যে মীর জাফর আর জগৎ শেঠেরা ছিল, আজও তো তারাই আছে৷ সেই আমলাতন্ত্র তথা অমাত্যশ্রেণীকে সাম্রাজ্যবাদ ভাল করেই চেনে-জানে৷ বাঙালী সম্পর্কেও তাদের জানাজানি বাকি থাকে নি৷ সেদিন বাংলার ঘাটে ঘাটে বাণিজ্যতরী ভিড়িয়ে নগরে-বন্দরে গাঁয়ে-গঞ্জে বাণিজ্য করতে গিয়ে বাঙালীর দুর্বলতার জায়গাটি তারা জেনে যায়৷ ইংরেজ বণিকেরা দেখতে পায় বাঙালী কূপমণ্ডূক এক জাতি৷ আপন গ্রামের বাইরের জগৎ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না৷ গ্রামান্তরেও যায় না৷ চেনে না সমুদ্র, জানে না জাহাজ কি বস্তু, তার আছে কাঠের ডিঙি নৌকা, তালগাছের ভেলা৷ ওরা চেনে কেবল কৃষিভূমি আর ফসল৷

বিস্মিত ইংরেজ বণিকেরা দেখেছে বাঙালী কেবল ক্রেতা৷ ব্যবসায়ী নয়৷ ব্যবসা জগৎ শেঠদের হাতে৷ বাঙালীর প্রাচীন বন্দরে যারা বাণিজ্য করেছে ওরা অবাঙালী, বাঙালী কেবল কাঁচামাল বা কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী৷ ইংরেজেরা দেখেছে তাদের বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত জাহাজ যখন বাণিজ্য পণ্য নিয়ে নদীর ঘাটে ভিড়েছে কিংবা সদ্যতৈরী রেল লাইন ধরে স্টেশনে থেমেছে বাষ্পচালিত গাড়ি, ন্যাংটো আধা-ন্যাংটো বাঙালী তখন নিরাপদ দূরে দাঁড়িয়ে গাছের আড়াল থেকে ঈশ্বরের অলৌকিক মহিমার কথা ভেবে হাত জোড় করে জানাচ্ছে প্রণাম৷ নিশ্চয়ই তখন ভয়ার্ত-বিস্মিত বাঙালীর চোখের ভেতর, স্বপ্নের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছিল স্বর্গীয় অলৌকিক পঙ্খীরাজ ঘোড়া কিংবা বোররাখ৷

এই বাঙালী আবার বড় রসিক৷ লজ্জার কথা ভুলে নিজেরাই নিজেদের নিয়ে প্রবাদ-প্রবচন তৈরি করে৷ প্রাচীন সেইসব প্রবাদ আজো টিকে আছে৷ ‘ব্যাঙ যেমনি পাল্লায় তুলে একত্র করে মাপা যায় না, বাঙালীকেও ঐক্যবদ্ধ রাখা যায় না’৷ নিশ্চয়ই এই প্রবাদটি আঞ্চলিক ভাষায় তৈরি হয়েছিল, আধুনিক ভদ্রলোক বাঙালী এর ভাষাটা বদলে দিয়েছে৷ কেন এমন বৈশিষ্ট্য হলো জাতিটির? হয়তো এর মূলে রয়েছে তাদের প্রাচীন আঞ্চলিক কৌম বা গোষ্ঠী চেতনা৷ বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের বিচিত্র নানা কৌম-গোষ্ঠীর বংশানুক্রমিক জিন বৈশিষ্ট্য তাদের চরিত্র বা মননকে নিয়ন্ত্রণ করে৷ এই অনৈক্য বা বিচ্ছিন্নতা কেবল যে রাষ্ট্র বা সমাজ জীবনে, এমন নয়৷ ব্যক্তি জীবনেও৷ এমন আত্ম-বিচ্ছিন্ন নরগোষ্ঠী দুষ্প্রাপ্য৷ যুক্তির খাতিরে বলতে হয়, যে জাতি ধর্মের প্রশ্নে ’৪৭ এর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সে জাতিই ভাষার প্রশ্নে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়৷ ’৭১-এ আত্মরক্ষার্থে মাত্র ক’মাসের জন্য বাঙালী ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল৷ ক্ষণস্থায়ী হলেও ঐক্যের ব্যাপারে এমন ঘটনা জাতিটির হাজার বছরের ঠিকুজিতে নেই৷ ’৭০ এর নির্বাচনে যে ঐক্যটা দেখতে পাই তা অংকের হিসেবে শতকরা ৬০/৭০ জনমতের ঐক্য৷ ’৭১-এ ঐক্যের পারদ ওঠে যায় শতকরা ৯০’এ৷ পুনরায় ’৭৪-এ ঐক্যের পারদটাই মনে হলো অদৃশ্য হয়ে গেছে৷

ওই অনৈক্যটা আসে স্বাধীনতার নামে লুণ্ঠন করতে গিয়ে৷ এই রাষ্ট্র-লুণ্ঠনস্পৃহাতো বাঙালী লাভ করেছে তার প্রাক্তন শাসক ব্রিটিশ উপনিবেশিক এবং পরে পাকিস্তানী আঞ্চলিক লুণ্ঠনকারীদের দেখে শুনে৷ কিন্তু বিদেশীরা বাঙালীদের সম্পদ লুণ্ঠন করলেও স্বাধীনতাউত্তর বাঙালী নিজেই নিজের জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করতে শুরু করে৷ জাতিটির তো আর উপনিবেশ নাই যেখানে সে তা করতে পারে৷ দেখে শুনে মনে হয়, বাঙালীর যদি ঔপনিবেশিক শক্তি হিসাবে আবির্ভাব ঘটতো, তবে সে আজ বিশ্ব-লুটেরা হিসেবে পরিচিত হতো৷ আজকের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা তো তা-ই বলে৷

তবে কি বাঙালীর অনৈক্যের বৈশিষ্ট্য নৃ-তাত্ত্বিক সূত্রে আবদ্ধ? এই জাতির প্রাচীন ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিম ভূসীমানা অর্থাৎ গৌড়, পুন্ড্র, রাঢ় জনপদগুলোর গঠন বা ঐতিহাসিক উপাদান এক নয়৷ তাই ইতিহাসের বিশেষ আবর্তে বিশেষ উদ্দেশ্যে বিচ্ছিন্ন জনপদগুলো শাসক নৃপতিদের তরবারীর দাপটে একত্রিত হয়ে বৃহৎ রাজ্যে রূপ নিলেও, আজো বাঙালী আপন আঞ্চলিক সত্তাকে বৃহৎসত্তায় বিলীন করে দিতে নারাজ৷ এই আঞ্চলিক সত্তার বিচ্ছিন্নতাই বাঙালীর অনৈক্যের মূলে৷ দৃশ্য-অদৃশ্য অন্তর্বিরোধ চলছে হাজার হাজার বছর ধরে আজো৷ রাষ্ট্রনায়কেরা বা জাতির মেধা-মনন-প্রজ্ঞার নায়কেরা যতই স্বপ্ন দেখুন বৃহৎ জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ঐক্যের, তা অর্জিত হচ্ছে না৷ আঞ্চলিক জাতিসত্তার কথা বাদই দিলাম, এই বাংলাদেশে কত প্রকার আঞ্চলিক বাংলা, উচ্চারণরীতি, আঞ্চলিক শব্দ রয়েছে? বহু থেকে বহুতর৷ যদি বলা যায়, ভাষা কেন, আচার, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, কৃষি, শিল্প এবং সাংস্কৃতিক আচরণ অনুষ্ঠান কি এক? সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর খুলনার মানুষ কি আপন আঞ্চলিক সত্তাকে বিসর্জন দেবে? আঞ্চলিক এই চেতনা তো রাজনীতিতেও বর্তমান৷ নেতা বা প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীর জন্মস্থানের জনগণ কেন আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিকেই বড় মনে করে? আঞ্চলিকতা কি শুনতে চায় রাজনীতির বড় বড় বুলি?

বাঙালী একান্তভাবেই কৃষি বা ভূমি নির্ভর জাতি৷ কৃষিভূমির অভাব, উদ্বৃত্ত শ্রম, বেকারত্ব গ্রামীণ মানুষকে বাঁচার তাগিদে গ্রাম পরিত্যাগ করে শহর কিংবা দূর প্রবাসজীবনের প্রতি আকৃষ্ট করছে৷ কিন্তু ভূমির প্রতি আকর্ষণ শিথিল হয় না৷ তাই তো নাগরিক বিত্ত-অর্থের গ্রামযাত্রা আজো কমে নি৷ বাঙালীর ভিতর যে হতাশা আর আত্মবিচ্ছিন্নতা দেখা যায় তার সূত্রপাত প্রাচীনকালের সেই ভূমিহীন অবস্থা বা ভূমিবিচ্ছিন্নতা৷ আধুনিক বাঙালীর নেতাভক্তি ও ব্যক্তিশাসকের প্রতি বিশ্বাস-শ্রদ্ধা-আনুগত্য-বশ্যতা প্রাচীন গোত্রতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্রের স্মৃতিবাহী৷ ওই যে দস্যু-ডাকাত-নির্দয়-নিষ্ঠুর-স্বজাতি-বিজাতি-যে-ই হোক, রাজার প্রতি আনুগত্য তো ধর্মের মতোই পবিত্র কর্তব্য৷ এই দুর্বলতা অর্থাৎ প্রাচীনকালের রাজা বা সামন্ত প্রভুর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের আধুনিক রূপান্তর হচ্ছে আঞ্চলিক বা জাতীয় নির্বাচনে অঞ্চলসীমানার ভেতর থেকে দস্যুকে জননায়ক হিসেবে নির্বাচিত করা৷ কৌম চেতনার এই জটিল বন্ধন কি কোন কালে ছিন্ন হবে?

কূপমণ্ডূকতা এবং ভোগবাদ চিরকালই বাঙালীর বড় আশ্রয়৷ একান্ত কৃষিনির্ভরতাই এর প্রধান কারণ৷ কৃষিনির্ভর, জীবনযুদ্ধে পরাজিত, ভাগ্যনির্ভর, ঈশ্বর-শাসনে ভীত এই জাতির সবটুকু দুর্বলতাই জেনে যায় ইংরেজেরা৷ এই আধুনিক যুগে আজো সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর কাছে মাটি আর ফসল ছাড়া আত্মরক্ষা আর আত্মপ্রতিষ্ঠার অন্যপথ অজ্ঞাত৷ জীবন যেখানে মাটিসংলগ্ন সেখানে আত্মকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি পাবেই, নিঃশেষ হবে না ভাগ্যনির্ভরতা৷ আত্মশক্তি বা উদ্যম তো দূর স্বপ্নলোকের৷ সীমাহীন দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অকাল মৃত্যু আর ঈশ্বর ছাড়া যার চিন্তা ও অভিজ্ঞতার জগৎ শূন্য, তার তো দ্বিতীয় বা বিকল্প আশ্রয়ের সংবাদ জানার কথা নয়৷ তাই যাকে কর হিসেবে শস্য বা পণ্য দান করতে বাধ্য ছিল অতীতে এই জনগোষ্ঠী, সেই শাসকের জাত-ধর্ম-ভাষা বা নৈতিক চরিত্র নিয়ে কোন ভাবনাই ছিল না বাঙালীর৷ যে বাঙালী আপন ভিটের বাইরে গ্রামান্তরে যায় নি, রাজনগরের পথ ছিল যার অজানা, সে যখন শুনল সাত সমুদ্দুর তের নদী পেরিয়ে সাদা বর্ণের এক মানব জাতি এসেছে এই ভূমিতে, যার মুখের বুলি মানুষের নয়, স্বর্গের ঈশ্বরের মতো, সে তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ল৷ দুশমন ভেবে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা৷ তারা তাই সেই সাদা বর্ণের মানুষগুলোর উপর দেবত্ব, প্রভুত্ব, আনুগত্য আরোপ করতে দেরি করে নি৷

এই বাঙালী তাদের রাজা (নবাব) সিরাজের ভাষা বুঝতে না পারলেও, নবাব যে প্রজার ভাষা বুঝতেন না এমন নয়৷ না-বুঝলে কেমন করে তিনি সাধক কবি রামপ্রসাদের গানের কথা ও সুরে মুগ্ধ হয়েছিলেন? একান্ত কাছে পাবার জন্য মুর্শিদাবাদের রাজনগরেই সাধকের জন্য কালী মন্দির তৈরী করে দিতে রাজি ছিলেন তিনি৷ গঙ্গায় বজরায় ভ্রমণের সময় ঘাটে স্নানরত রামপ্রসাদের কণ্ঠে শ্যামা সংগীত শুনে যে নবাব বিমুগ্ধ হয়েছিলেন, তিনি যে বাংলাভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এ তো মিথ্যে নয়৷ যার দরবার পূর্ণ ছিল হিন্দু অমাত্যে, তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ উদার মনোভাবের পরিচয়ের জন্য ইতিহাস ঘাঁটতে হবে কি? অথচ জীবন নিরাসক্ত, সংসারযোগী বাঙালী চেয়ে চেয়ে দেখল তাদের নবাবকে হত্যা করে, হাতির পিঠে লাশ ঝুলিয়ে ধীর, অতি ধীর গতিতে নগর প্রদক্ষিণ করানো হচ্ছে৷ না, বাঙালীর কোন প্রতিক্রিয়াই হলো না৷ সিরাজের রক্তের প্রতি যে বাঙালী কাপুরুষ আর অপৌরুষ, গোলামী আর নিষ্ক্রিয়তার দৃষ্টান্ত রাখল, তার ভাবীকাল তো অতীতের ইতিহাসেই লেখা রয়েছে৷ তা না হলে কেন বারবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে আজো?

মনে করা হয়েছিল ইসলামের আগমনের ভিতর দিয়ে এই বাংলায় এমন এক সংস্কৃতিমনস্ক জাতির আবির্ভাব ঘটবে যে পাল্টে দেবে হাজার বছরের সব জীর্ণতা৷ অথচ তা ঘটল না৷ ইসলাম এমন এক বাঙালী নৃ-গোষ্ঠীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, যারা জীবন সম্পর্কে উদাসীন, একান্তই গৃহাশ্রয়ী এবং দুঃখবিলাসী৷ অথচ এরাই ইন্দ্রিয় আসক্ত সংকীর্ণ ভোগকাতর৷ বর্ণবাদে শতধা বিভক্ত৷ ধর্ম-বদলের পরেও বর্ণাশ্রয়ীই থেকে যায়৷ ইসলাম গ্রহণ করল বটে, ছাড়ল না বর্ণবিশ্বাস, আশরাফ আর আতরাফের প্রশ্ন৷ তথাকথিত আরব আভিজাত্য, গোত্র শ্রেষ্ঠত্ব যা মহানবী (সাঃ) তাঁর শেষ হজের দিন আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে বাতিল বলে ঘোষণা করে সাম্যের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তাঁর পরবর্তীতে যা পুনরায় ফিরে আসে, তারই ধারাবাহিকতা বাংলায় মুসলিম বর্ণবাদ৷

হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালীর যে জৈববৈশিষ্ট্য, তা হচ্ছে জীবন উদাসীনতা, পিতৃতান্ত্রিকতা, এবং নারীর প্রতি আসক্তি৷ এই ইন্দ্রিয় আসক্তির প্রাচীন নিদর্শন হচ্ছে ধর্ম আর আধ্যাত্মবাদের নামে কায়াসাধন, তন্ত্রসাধন৷ উদ্দেশ্য দুঃখ থেকে মুক্তিলাভ৷ ওই সাধন-মুক্তির নামে নারীর প্রতি আসক্তি মধ্যযুগে বাউল বা সহজিয়া নানা মতের সাধন পদ্ধতিতে স্পষ্ট৷ সব সাধন প্রক্রিয়ায়ই নারী হয়ে ওঠে সাধন-সঙ্গিনী৷ বিবাহ কিংবা বিবাহবহির্ভূত এই তান্ত্রিক সম্পর্কে নারী কখনো পুরুষ সাধকের মায়ের স্থান দখল করে, কখনো দেবীর স্থান, কিন্তু যৌনতাই প্রধান৷

সম্ভোগের ভেতর এই যে মুক্তি লাভের কুহক, তা থেকে বাঙালী আজো মুক্তি পায় নি৷ আত্মবৈরাগ্য বিলাসী এই জাতি কিন্তু সংসারবৈরাগ্য গ্রহণে অনিচ্ছুক৷ যে ধর্ম-দর্শন মানবজীবনকে সর্বদুঃখের হেতু এবং অন্ধমায়া মনে করে সংসার জীবনকে ঘৃণা এবং অস্বীকার করে পরিত্যাগ করেছে, সেই আত্মনিগ্রহের জৈন এবং বৌদ্ধধর্ম কিন্তু গ্রহণ করলো না বাঙালী৷ গৌতম বুদ্ধের মহানির্বাণ তাই বাঙালী চিত্তে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও গ্রহণে আগ্রহ জাগায় নি৷

প্রচণ্ড হৃদয়াবেগ এবং ইন্দ্রিয় আসক্তিতে ডুবন্ত এই জাতি ব্রাহ্মণ্যবাদের নির্দয় বর্ণবাদী অপমানকর জীবনে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজেছে ইন্দ্রিয়ভোগের সামাজিক আর পারিবারিক অধিকারে৷ ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুষ্যত্ববিরোধী বর্ণাশ্রমশ্রেণীর ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তির জন্য বাঙালীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটি মাত্র সত্য৷ অপর সত্যটি হচ্ছে ইসলামের বৈরাগ্যবিরোধিতা এবং পরকালের পাশাপাশি ইহকালের স্বীকৃতি৷ ইসলামের ইহকালবাদ, তথাকথিত মুক্তির নামে আত্মনিগ্রহের বৈরাগ্যের প্রতি অনাস্থা, সংসার বন্ধন এবং ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মধ্য দিয়ে ধর্মসাধন পদ্ধতি বর্ণবাদে নিষ্পেষিত বাঙালীর একাংশকে আকৃষ্ট করেছে৷ ওদিকে বৈষ্ণবের রাধাকৃষ্ণের দেহলীলা, বাউলের দেহাশ্রয়ী সাধন পদ্ধতি আজো বাঙালীকে আকর্ষণ করে৷ এসব তো এমন এক ধর্ম পদ্ধতি যা জীবনকে দেয় ইন্দ্রিয় সুখভোগের অধিকার, কিন্তু উদাসীন করে রাখে এবং অমনোযোগী হতে উৎসাহ যোগায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে৷

উনিশ শতকে কলকাতা-কেন্দ্রিক বাঙালীর জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল উচ্চবর্গের হিন্দুশ্রেণীর ভেতর৷ এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিচু বা মধ্যমবর্গ হিন্দুরা যেমন, তেমনি বঞ্চিত ছিল মুসলমান সমাজ, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মুসলমান৷ অর্থনৈতিক কারণ তো বটেই, তার উপর আশরাফ মুসলিমের ইংরেজী ভাষাবিদ্বেষও এর জন্য দায়ী৷ আরো একটি বাস্তব সত্য হচ্ছে জাতিবৈরী হিন্দু মানসিকতা৷ উচ্চ বর্গের হিন্দু সম্প্রদায় দখল করেছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো৷ সেই সমাজ নিচুবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমানদের শিক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করে৷ মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুর শিক্ষার কৌতূহল এবং প্রত্যাশার প্রতি বিদ্রূপ করে তৎকালে উচুবর্ণের শিক্ষিত হিন্দুরা যেসব প্রবচন ও ছড়া তৈরি করেছিল, তা আজো প্রবীনদের অনেকেরই স্মরণে আছে৷ এমন একটি প্রবচন; ‘হ্যাক আর চাড়ালের পুতে শিলট হাতে ইসকুলে যায়/ বামুন আর কায়েতের ক্ষেতের ধান ছাগলে খায়’৷

মূলত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই এই অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ কিন্তু এই শিক্ষার চালিকা শক্তি সম্পূর্ণই দখলে ছিল বিভাগপূর্ব মুসলমান শিক্ষিত বিত্তবান গোষ্ঠীর হাতে৷ প্রকৃত অর্থে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি শিক্ষা এগিয়ে আসে একাত্তরের পর৷ একাত্তরের যুদ্ধটা শিক্ষার পুরাতন বৃত্তকে ভেঙে দেয়৷ স্বাধীনতার পরপর রাতারাতি যত্রতত্র অবিশ্বাস্য গতিতে স্কুল-কলেজ গড়ে উঠতে থাকে৷ কিন্তু অচিরেই স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের ভিতর দিয়ে চরায় এসে আটকে যায় স্বপ্নের ভাঙা তরী৷ সেই শূন্যতা ঝড়ো গতিতে পূর্ণ করে মাদ্রাসা শিক্ষা৷ শিক্ষা দখলে চলে যায় ধর্মের৷

একাত্তরের যুদ্ধের অন্যতম প্রতিক্রিয়াটি হচ্ছে শ্রেণীবিবর্তন৷ একদল লোক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত রেখে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত থেকে ধনীতে পরিণত হলো৷ অন্যদিকে উদ্ভব ঘটল বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার একটি নতুন শ্রেণীর৷ জ্ঞান চর্চা, শিল্প-সাহিত্য অনুশীলন তথা মেধা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হলেও বাস্তবে তার অপচয়ই ঘটছে৷ স্বাধীনতার ভিতর দিয়ে যতটা এগিয়ে যাবার কথা ছিল বাঙালীর, তা আর হল না৷ সৃষ্টিশীল সাধনায় দীপ্তিময় হবার পরিবর্তে ইন্দ্রিয় তাড়না তথা আত্মপ্রতিষ্ঠার লোভ, খ্যাতির মোহ, ক্ষমতার প্রতি লিপ্সা বাঙালীকে আচ্ছন্ন করে দেয়৷ সৃষ্টিশীল কর্মে যুক্তি, বুদ্ধি এবং প্রাণশক্তি যতটা ব্যয় হবার কথা, প্রাণধর্মের দুর্বলতার কারণে তা অনার্জিতই থেকে গেল৷ প্রাচীন বাঙালী রাষ্ট্র আর সমাজ সম্পর্কে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদাসীন বৈরাগ্য মনের চর্চা করতো, আজকের বাঙালীও তাই করে৷ বাঙালীর রাজনীতি চর্চা মোটেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নয়, বরং আত্মকেন্দ্রিক অর্থাৎ আত্মপ্রতিষ্ঠামুখী৷ যে প্রাণধর্ম জাতিটির শক্তির উর্বর ভূমি হবার কথা ছিল, তা আদর্শিক দুর্বলতায় মুখ থুবড়ে পড়ে৷

শত শত বছরের উত্থান-পতন, অর্জন-বিসর্জনের ভিতর দিয়ে যে জাতির নব রূপান্তর ঘটে, বাঙালীর তা ঘটল না৷ তাদের পূর্বপুরুষ যেমনি জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ আর অনুভবকে, হৃদয়াবেগকে প্রতিস্থাপন করতো পদাবলী গানে, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালীর মায়াবী সুর ও কথায়, কিংবা গীতি কবিতায় এবং রূপকথার কুহকে, তেমনি অনার্জিতই থেকে গেল উত্তরপুরুষের হাতে মহাকাব্য আর বিশ্বমানের সাহিত্য৷ সাংসারিক জীবনের সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের পথে নেমে যাবার দরুন পারল না মননের গভীরতায় পৌঁছাতে৷ দু’চোখে শস্যের স্বপ্ন নিয়ে ঋতুর আবর্তে বিমোহিত হয়ে রইল যে, সে তো ভীরু মন নিয়ে গেল না রাজ্যবিজয়ে, ভাবল না দিগ্বিজয়ের কথা৷ যে জাতি শাসক হিসেবে বরণ করে নেয় বারে বারে বহিরাগত রাজ্যলিপ্সুকে, তার কাছে তো মহাকাব্য-মহাকবি স্বপ্নেরও অতীত৷ অথচ সে কেবল সংকীর্ণ সংসারের সুখ-দুঃখের গান গাইল৷ আপন ঘরে ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর অন্তহীন শোকের ভেতর রূপকথার রাজপুত্র আর রাজকন্যার দুঃখে ফেলল চোখের জল, সাধন-ভজন সংগীতের কুহকে রইল ডুবে৷

এত দারিদ্র্য, এত দুঃখ, এত কষ্ট তবু বাঙালী ইন্দ্রিয়কাতরতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজল না৷ যে জাতি মহাকাব্য রচনা করতে পারল না, সে জাতিই কিন্তু হাস্যরস কৌতুক, রঙ্গরস, রগড় করে সৃষ্টি করলো হাজার লক্ষ অশ্লীল ছড়া, প্রবাদ, গান এবং কাহিনী৷ হাজার বছরের প্রাচীন সেসব সৃষ্টি বাঙালী আজো স্মৃতি এবং জনশ্রুতিতে টিকিয়ে রেখেছে৷ সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করলে লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা ভরে যাবে৷ সে সৃষ্টি আজো চলছে প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে৷ আড্ডায়, পারিবারিক-গার্হস্থ্য পরিবেশে সেসবের চর্চা চলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার মধ্যেই৷ বাঙালীর অপভাষা, অশ্লীল শব্দ সংগ্রহ করলে হাজার বিশ্বকোষ পূর্ণ হয়ে যাবে৷ এতে বিস্ময়ের কিছু আছে কি?

একথা ঠিক নয় যে, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু, পললভূমির সহজ কৃষি-উৎপাদন বাঙালীকে অলস আত্মকেন্দ্রিক করে রেখেছে৷ পৃথিবীর বহু দেশ আছে যেখানে পলল ভূমির অভাব নেই, কৃষিও ক্লেশকর নয়৷ জলবায়ুও অপূর্ব, চিরবসন্ত৷ সেসব দেশের জনগোষ্ঠী তো বাঙালীর মতো অলস কামকাতর নয়? তাদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং রাষ্ট্রভাবনা ব্যক্তিসংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন নয়৷ অথচ বাঙালীর রাষ্ট্রভাবনা তার সংকীর্ণ ব্যক্তিভাবনাকে ডিঙিয়ে যেতে পারে না৷ যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি অনীহা অনিচ্ছুক এই জাতিকে ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্ন কোন কোন সময় বাধ্য করেছে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে৷ অবশ্যই সেসব অগ্নিবলয়ের সঙ্গে তুলণীয় নয়, তারা বরং ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী স্ফুলিঙ্গ-ফুলকির মতো৷

পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের বাহিনীতে কেবল ইংরেজ সৈন্যই ছিল না, কিছুসংখ্যক অবাঙালী ভারতীয় বিভিন্ন যোদ্ধাজাতির ভাড়াটে সৈন্যও ছিল৷ ওরা ধর্মে হিন্দু-মুসলমান উভয়ই ছিল একথা মিথ্যে নয়৷ আশ্চর্য এই, বাংলার নবাবের বাহিনীতে কোন বাঙালী সেপাই ছিল না৷ অধিক বিস্ময় এই, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ-দেখা কিংবা কামানের শব্দে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে-যাওয়া, স্মৃতি ও শ্রুতিতে ধারণ করা অলস ভীতু ইন্দ্রিয়পরবশ অথচ করুণরসের মহারসিক বাঙালী নবাব সিরাজের বীরত্ব-সাহস নিয়ে লিখল না ইতিহাস, নাটক কিংবা মহাকাব্য; বীররসের৷ বাঙালী লিখল নবাবের পতনের কল্পকথার করুণ রসের সাহিত্য এবং যুগ যুগ ধরে পলাশীর করুণরসে সিক্ত করল নিজেদের অন্তর৷ সেই করুণরসই যেন বাঙালীর আশ্রয় এবং বিলাসী দুঃখবাদী সুখ-প্রশান্তি৷ অথচ যুদ্ধশেষে পলাতক নবাব এবং তাঁর অনুগত সৈন্যদের ইংরেজের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে গুপ্তচরের মতো বাঙালীরাই৷ কী ভয়ংকর দ্বিচারিতা!

এই বাংলায় প্রথম যিনি নবাব সিরাজের শৌর্যে-বীর্যে, পতনে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, সেই সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতাজী’ পদবী দিয়ে যেন ইয়ার্কী করলো বাঙালী৷ সুভাষ প্রবর্তিত ২৩ জুন ‘পলাশী দিবস’কেও জাতীয় দিবস হিসেবে তারা গ্রহণ করল না৷ বাঙালীর কলংক এই যে, যেদিন ইংরেজ-শাসিত ভারতবর্ষে নেতাজী সুভাষচন্দ্র মিছিল নিয়ে ইংরেজ বিজয়ের স্মারক কলকাতার মনুমেন্ট ভাঙতে গেলেন কুড়াল কাঁধে তুলে, সেদিন বাংলার প্রাদেশিক সরকারের পুলিশ দেশপ্রেমিক জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল৷ তখন মুখ্য মন্ত্রী ছিলেন ফজলুল হক, বাংলার কি হিন্দু কি মুসলমান, কেউ আস্থা স্থাপন করতে পারে নি তাঁর নেতৃত্বে৷ গান্ধী-মুগ্ধ আর মোহাচ্ছন্ন বাঙালী হিন্দুর কেউ সুভাষচন্দ্রের সার্বক্ষণিক যুদ্ধসঙ্গী হবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি, তাই সুভাষকে যুদ্ধসঙ্গী করতে হয় অবাঙালী মুসলমানকে৷ অস্ত্র আর রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য সুভাষচন্দ্রকে যখন আত্মগোপন করে এশিয়া-ইউরোপ ছুটে বেড়াতে হয়, তখনো তাঁর সঙ্গী ছিলেন অবাঙালী মুসলমান৷ বাঙালী হিন্দু-মুসলমান কেউ নয়৷ তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর পূর্বেও এই ছিল বাস্তব সত্য৷ তাঁর ফৌজে কত শতাংশ বাঙালী সৈন্য ছিল?

বাঙালীর সবচেয়ে বড় কীর্তি হল তার উত্তরাধিকারবোধ৷ সেই প্রাচীনকালেই সে ভূমির উত্তরাধিকারকে নিশ্চিত করে নিয়েছে৷ উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরে বাঙালীর বড় স্বস্তি৷ মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি প্রাপ্তির প্রত্যাশা রক্তে যেন প্রশান্তির জোয়ার আনে৷ কোন কারণে যদি সেই ‘হক’ অন্যকে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে হয়, তখন বাঙালী ভাবে তার এই আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত বুঝি ধরাধামে নেই৷ একবারও ভাবে না, যে ‘হক’ সে ত্যাগ করল তা তার নিজের শ্রমে, ঘামে, মেধায় অর্জিত নয়৷ নিছক পরের ধন৷ পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মেধাশক্তির দ্বারা আপন অর্জিত সম্পদের বদলে পরার্জিত সম্পদের প্রতি বাঙালীর উত্তরাধিকারিক লোভ, এ যেন তার ঐতিহ্যেরই অংশ৷ এই জনজাতি মূলত কৃষিনির্ভর, সে তো বাড়ি-ঘর আর ফসলভূমি লাভ করে উত্তরাধিকার সূত্রে৷ তাই এই প্রাপ্তির ঐতিহ্যের প্রতি এত দুর্বল সে৷ বাঙালীর সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতি অনাগ্রহ মূলত এই ভূমির উত্তরাধিকার প্রাপ্তির সম্ভাবনা না-থাকার কারণে৷ সমাজতন্ত্র প্রতিহতের জন্য সুকৌশলে ধর্মকে সে সামনে আনে, আড়াল করে সম্পত্তির লালসাকে৷

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই জনজাতির বড় পছন্দ সেই উত্তরাধিকার৷ এই আধুনিক যুগে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হয়েও বাঙালীর উত্তরাধিকারী শাসকের প্রতি রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং আনুগত্য৷ মৃত কিংবা নিহত রাষ্ট্র শাসকের উত্তরাধিকারী যোগ্য কি অযোগ্য তা তাদের বিবেচ্য নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভূমির উর্বরতা কিংবা অনুর্বরতা যেমনটা বিবেচনায় আসে না৷ জাতিটির এই দুর্বলতা সাম্রাজ্যবাদীরা জানে বলেই এ ধরনের নেতৃত্বের প্রতি তাদের সমর্থন থাকে৷

এই উত্তরাধিকারের মায়াবী বন্ধন, তা ছিন্ন হলেই বুঝি বাঙালী হয়ে পড়ে ছিন্নমূল কিংবা সর্বহারা৷ প্রগতিশীলতার প্রতি অনীহা তথা প্রতিক্রিয়াশীলতা, ধর্মভীরুতা, ধর্মান্ধতা, বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ, বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধের প্রতি অমনোযোগিতার মনোভূমি তো বাঙালী লাভ করেছে উত্তরাধিকার সূত্রের সেই কৃষিব্যবস্থা থেকেই৷

বাংলাদেশের রাষ্ট্র সীমানার ভেতর বাঙালী আজ তার জাতীয় ঐক্যকেও করেছে লণ্ডভণ্ড৷ তার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির কাঠামোও ভেঙে পড়েছে৷ সে ভাবিত নয় কোন কোন দুর্বলতার কারণে পলাশীর পরাজয়টা অনিবার্য হয়ে পড়ে তা নিয়ে৷ নিজেদের অপদার্থতা এবং সাম্রাজ্যবাদকে সুকৌশলে আড়াল করার জন্য সব দোষ মুসলমান বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর এবং জৈন জগৎ শেঠ, হিন্দু রাজবল্লভের ষড়যন্ত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে ইতিহাস বিকৃতি করা যায়, কিন্তু তাতে রাষ্ট্র ও জনগণের মঙ্গল হয় না৷

তাই তো আড়াই শ’ বছরের পুরাতন স্মৃতির ভেতর ডুবে গেলে চোখের ভেতর স্পষ্ট ভাসে একাত্তরের স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে বাঙালীর রাজপাটে যারা বসে আছে তাদের ছবি! ওই তো মীর জাফর, ওপাশে কে? জগৎ শেঠ নয় কি? ওদের পায়ের তলায় একাত্তরের সিরাজ-উদ-দৌলার রক্ত স্রোত৷ ওপাশে মোহম্মদী বেগ৷ আড়ালে হাসছে সাম্রাজ্যবাদ৷ ওই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কে গাইছে আত্মভোলা বাউলের সংসার নিরাসক্তের গান? হ্যাঁ, সে-ই তো উদাসী বাউল৷ বাঙালী পুরুষ, কাম আর নারী যার ধর্ম এবং সংসারের সাধনসঙ্গী৷

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “পলাশীর পতন ও বাঙালী মানস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2