ধর্ষকের সঙ্গেই ধর্ষিতার বিয়ে: পৌন:পুনিক ধর্ষণের একটি সামাজিক স্বীকৃতি

ধর্ষণ! চরম অমানবিক এই প্রপঞ্চটি কেমন যেন বিপন্ন করে দেয় আমাদেরকে। শুধু ধর্ষিত নয়, একইসঙ্গে তার পরিবার, প্রতিবেশ, পরিবেশও হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত। তবু এই অপরাধ তো কমছে না, বাড়ছে। দেশে দেশে, এবং বাংলাদেশে। কেন? যথার্থ প্রতিবাদ এবং কার্যকর প্রতিরোধ নেই বলে? না-কি ধর্ষণকে অপরাধ হিসাবে না দেখে কেবল স্খলন হিসাবে দেখা হচ্ছে বলে!? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আসলে খুব জরুরি।


ধর্ষণ! চরম অমানবিক এই প্রপঞ্চটি কেমন যেন বিপন্ন করে দেয় আমাদেরকে। শুধু ধর্ষিত নয়, একইসঙ্গে তার পরিবার, প্রতিবেশ, পরিবেশও হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত। তবু এই অপরাধ তো কমছে না, বাড়ছে। দেশে দেশে, এবং বাংলাদেশে। কেন? যথার্থ প্রতিবাদ এবং কার্যকর প্রতিরোধ নেই বলে? না-কি ধর্ষণকে অপরাধ হিসাবে না দেখে কেবল স্খলন হিসাবে দেখা হচ্ছে বলে!? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আসলে খুব জরুরি।

তবে ধর্ষণের মূল কার্যকারণটা কি আমরা নিশ্চিত করে জানি? প্রাণীজগতে আর কোন প্রজাতির ভেতরে এই অশুভ প্রবৃত্তি তো নেই। এখনো মানুষের পৃথিবীতেও এমন অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী আছে যাদের ভাষায়, অভিধানে ‘ধর্ষণ’ বলে কোন শব্দই নেই। তাহলে? ধর্ষণ কি তবে সভ্যতার অপরিণত এবং ভ্রান্ত বিকাশের এক দুঃখজনক প্রতিক্রিয়া? না-কি ব্যাক্তি সম্পত্তির মতাদর্শগত অধিপত্যবাদের এক করুণ ধারাবাহিকতার নৃশংস ফলাফল? অবশ্য চারপাশে একধরণের অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক ধারণা দেওয়ার প্রবণতা আছে যে, তাৎক্ষণিক চারিত্রিক স্খলন কিংবা রিপুর তাড়ণায় এই ধর্ষণের ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। তবে এই প্রচারণা যে উদ্দেশ্যমূলক এবং এই চূড়ান্ত অমানবিক অপরাধটিকে সরলীকৃত করার পুরুষতান্ত্রিক এক বিকৃতি সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না এই প্রসঙ্গে আজ পর্যন্ত যত গবেষনা হয়েছে তার ফলাফল কিংবা সারবস্তু পর্যবেণ করলে। নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়নে আমরা দেখতে পাচ্ছি আদিম সমাজে ‘ধর্ষণ’ বলতে তেমন কোন প্রবৃত্তি বা অপরাধমূলক কর্মকান্ড ছিল না। সভ্যতার বিকাশের সূচনাপর্বে মাতৃতান্ত্রিক জীবন কিংবা সমাজব্যবস্থার বিলুপ্তির ফলশ্রুতিতে যখন পিতৃতান্ত্রিক/পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উদ্ভব, সেই শ্রেনীবিভক্ত সামাজিক বাস্তবতায় ‘ধর্ষণ’-র উৎপত্তি, বিকাশ এবং প্রসার। তাই ধর্ষণের একটা কার্যকারণ অবশ্যই নারীর মর্যাদাহীনতা। আসলে যর্থাথ নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি নারীর মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নারীর সেই মর্যাদা নেই বলে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে ওরা, হচ্ছে রক্তাক্ত। আরেকটা কারণ হতে পারে মনোবৈকলিক। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে যা হচ্ছে ‘Libido’ – অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো বিকৃত যৌনপ্রবৃত্তির রুপ ধরে বিস্ফোরিত হওয়া। সেই দিক্ থেকে দেখতে গেলে পুরো ব্যাপারটাই সামাজিক সমস্যাই বটে, কোনভাবেই প্রাকৃতিক নয়। ধর্ষণ বিষয়ক গ্রহনযোগ্য সকল আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও স্পষ্ট হয়েছে যে, ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে পরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা; এবং এর প্রায় প্রত্যেকটা ঘটনার পেছনে ধর্ষণকারী ইতরগুলোর থাকে একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং জঘন্য পরিকল্পনা। এইসব গবেষণায় নিশ্চিতভাবেই প্রমান হয় যে, ধর্ষণের ব্যাপারটি কোনভাবেই রিপুর তাড়নাজনিত তাৎক্ষনিক কোন স্খলনের বিষয় নয়, অন্য যেকোন অপরাধের মতই এটি একটি সংগঠিত কর্মকান্ড; যা অপরাধী মুহূর্তের দূর্বলতায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক বিকৃত, নৃশংস অপরাধপ্রবণতা থেকে করে থাকে।

এই কথাগুলো বলার কারণ, এখনো পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের মত বাংলাদেশের সামাজিক-সাংষ্কৃতিক বাস্তবতায়ও ধর্ষণকে প্রায়শই একটি গুরুতর অপরাধ হিসাবে না দেখে কেবলমাত্র নৈতিক স্খলনজনিত একটি কর্মকান্ড হিসাবে বিবেচনা করার দুঃখজনক ভ্রান্ত প্রবণতা জারি আছে। যার ফলে এই বিকলাঙ্গ সমাজে ধর্ষণের মত চরম অন্যায় একটি অপরাধ করেও সেই ধর্ষক বুক ফুলিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলে-ফিরে, অথচ ধ র্ষিত হয়ে পড়ে কোণঠাসা; সব স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে সে হয়ে যায় অনেকটা জীবন্মৃত; যেন-বা অশুচি, অস্পৃশ্য, অপাঙতেয়, অবাঞ্ছিত, পরিতাজ্য! আর কেনই বা হবে না অমনটা? বোধোদয়ের মুহূর্তে স্বাধীন দৃষ্টি মেলে চাইবার অনেক আগেই পুরুষানুক্রমে অর্জিত নিখুঁত চাতুর্যে সমাজ আমাদের চোখ পরিয়ে দিয়েছে এক অলৌকিক মায়াবী তকমা, যুগ-যুগান্তরের ব্যবহারজনিত মলিনতা যাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে আছে যে – স্বপ্ন থেকে সত্যকে, তেল থেকে জলকে, আঁধার থেকে আলোকে আলাদা করে দেখবার জন্য আমাদের আশ্রয় করতে হয় সেই অন্ধের ষষ্ঠি-দন্ডকেই, যার নাম প্রথা, যার নাম ধর্ম, লোকাচার, পুরুষতন্ত্র। এরই ধারাবাহিকতায় সতীত্ব, ইজ্জত, সম্ভ্রম, শ্লীলতা এবং এইরকম আরো কিছু শব্দ, চিত্র,রুপকল্প, উপাদান, প্রপঞ্চ-র মিথ সিন্দাবাদের ভুতের মত চেপে বসেছে আমাদের দূর্বল কাঁধে। আর তাই তো একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সেই ধর্ষক ইতরটিকে চরম শাস্তি দেবার বদলে সমাজের রক্ষাকর্তারা ওই ধর্ষকটির সঙ্গেই ধর্ষিতার বিয়ে দেবার সর্ব্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান; কেননা ধর্ষণের কারণে ওই মেয়েটার জীবন ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে, ওকে তো আর কেউ ‘গ্রহণ’ করবে না; অতএব একটাই সমাধান – ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ে! ‘শুভাকাঙ্খী’দের এই ধরণের ‘শুভ’ কর্মপ্রচেষ্টা আসলে পৌন:পুনিক ধর্ষণের একটি সামাজিক স্বীকৃতি। নারীর বিরুদ্ধে প্রথা ও প্রতিষ্ঠানের এ এক চিরকালীন ষড়যন্ত্রই বটে।

এই রকম একটা ঘটনারই বিবরণ আমরা পাই ‘সমকাল’র ২০১২-র ১০ সেপ্টেম্বর ১৭ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি সংবাদে – ‘ভেড়ামারায় বাড়িতে আটকে রেখে কিশোরী ধর্ষণ।’ এই খবরটার সারবস্তু হচ্ছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের মির্জাপুর মেহেরের মোড় গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব মদন মন্ডল নামের এক ইতর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এক কিশোরীকে ছয় মাস আগে ধর্ষণ করে। এরপর খুন করার ভয় দেখালে ওই কিশোরী এলাকার কারও কাছে এ বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। এই সুযোগে ওই অমানুষটি ছয়মাস ওকে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে। এর মধ্যে সে অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গর্ভপাত ঘটানোর জন্য কয়েকদফা ওষুধ খাওয়ানো হয়। কিন্তু তাতে গর্ভপাত না ঘটায় এখন সে ৫ মাসের অন্ত:সত্ত্বা। বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গোপনে মীমাংসা করতে গেলে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়; তখন স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে পুলিশ খবর পেয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। ওই সময় হাউমাউ করে কেঁদে মেয়েটি আকুতি জানায়, ‘ওই শয়তার আমার বোনকে মেরে ফেলেছে। আমারেও মেরে ফেলবে। আমি বাঁচতে চাই, আমারে বাঁচান।’……. হ্যাঁ, এই ইতর মদন মন্ডল ১২ বছর আগে এই ধর্ষিতার বড় বোনকেও ধর্ষণ করেছিল। সে-ও অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে গ্রামবাসী মদন মন্ডলের সঙ্গে তার বিয়ে দিলেও ওই অমানুষ তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি। এরপর সন্তান প্রসবের সময় মেয়েটি মারা যায়।

তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে ? ১২ বছর আগে সংঘটিত একটি জঘন্য অপরাধের যথাযথ বিচার না করে এই সমাজ এই রকমের আরেকটি, কিংবা হয়তো অনেকগুলো, অপরাধকে অনিবার্য করে তুলেছে। অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে তাকে বরং পুন:পুন: অপরাধ করার এক অলিখিত বৈধতাই দেয়া হয়েছে। হচ্ছে। তাই বড় বোনের করুণ পরিণতির মত ছোট বোনটাও শিকার হল একইরকম দুর্বিষহতার, অমানবিকতার – এক যুগ পর। হু, যুগে যুগে এই তো হয়ে আসছে। একটি ফৌজদারী অপরাধকে সামান্য বিচ্যুতি বলে লঘু করে ফেলা কিংবা এড়িয়ে চলা – এইরকম নির্লজ্জ পৃষ্ঠপোষকতার ভেতর দিয়ে আস্ত সমাজটাই আসলে ধর্ষকে পরিণত হয়।

তাহলে কী করে মুক্ত করা যাবে নারীকে? প্রথম প্রয়োজন তাকে পুরুষের সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া, যাতে ‘নারী’ – শুধু এই পরিচয়ের দরুণ কেউ বঞ্চিত না হয়।অধিকার ও সুযোগ দিয়ে তাকে মুক্ত করা চাই অর্থনৈতিকভাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তিই যথেষ্ট নয়। কেননা নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের মূল ক্ষেত্রটা অর্থনৈতিক হলেও, আর্দশগত পীড়ণটাও বড় কম নয়। আদর্শগতভাবে তো মূলত নারীকে অধঃস্তন মনে করা হয়। অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই যে আর্দশিক ভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে তা নয়, সেখানে পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজন হবে সাংষ্কৃকৃতিক কাজের। আসলে যে ব্যবস্থার খাদ্যরসে পুষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে পুরুষতান্ত্রিক বিকৃত মনোভঙ্গি আর ঘৃণ্য আচরণগুলো, ওই অমানবিক, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাটিকে সমূলে উৎপাটন করার মাধ্যমেই কেবল নিশ্চিত করা যাবে নারীর যথার্থ মুক্তি, সেইসঙ্গে মানবমুক্তিও। মনে রাখতে হবে, দুঃসহ বোঝার মত চেপে বসা অমানবিক বিধিব্যবস্থাকে পাল্টানো না গেলে কি নারী কি পুরুষ কারোরই মনুষত্ব্য নিরাপদ থাকবে না। যেমন আজকে নেই।

অনেকের অবশ্য ধারণা, নারীর প্রতি এই নিপীড়ণটা মূলত অশিতি, দরিদ্র, গ্রামীন মেয়েদের সমস্যা; শহরে-নগরের শিক্ষিত, সচ্ছল, নাগরিক মেয়েরা এইসব নিপীড়ণ থেকে মুক্ত। তাই কি? নিপীড়ণ বরং নাগরিক জীবনে আরও ভয়াবহ, বিকৃত এবং সূক্ষ্ণ; তার প্রভাবও তাই অনেক গভীর। কারণ ওই একটাই, বৈষম্য এবং মর্যাদাহীনতা। সমান মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্ন একজন পুরুষ ও নারীর সামগ্রিক অবস্থানের তুলনা করুন, সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়বে সত্যটা। বলা বাহুল্য, তুলনা হবে একই শ্রেনীস্তরের মানুষদের মধ্যে। দেখতে হবে সেই স্তরে পুরুষ ও নারীতে বৈষম্য ঘটছে কি-না। দেখা যাবে, ঘটছে। কেবল ঘটছে না, বাড়ছেও। আর তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অপ্রতিহতভাবে বেড়ে চলেছে নিপীড়ন, নির্যাতন, অবমাননা, অবিচার, অশুভের পৃষ্ঠপোষকতা।

কিন্তু এ-ই কি সব? শেষ!? নিশ্চয়ই না। সমাজ নিশ্চয়ই বদলাবে। বদলাবে মানুষও। রুশ মনো-সমাজবিজ্ঞানী পাভলভ্ যেমন দেখিয়েছেন, মানুষের মন একটি জৈব-সামাজিক সত্তা, যার সুস্থ ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুস্থ সামাজিক পরিবেশও একান্ত আবশ্যক। হু, চাই নতুন সমাজ। যে সমাজে মেয়েরা পরিণত হবে না পণ্যে, শিকার হবে না ভোগ ও লালসার। শ্রদ্ধা থাকবে পারষ্পরিক, সমান মানুষ হিসাবে। সুযোগ, অধিকার ও দায়িত্বের সাম্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের বিকাশকে করবে সুষম। সমাজের এই মৌলিক পরিবর্তনের সংগ্রামটুকুই আসলে আমাদেরকে করতে হবে – অবিরাম, অবিরল, অবিশ্রান্ত। এর বাইরে সবকিছুই তো অর্থহীন; যা আমরা করছি এবং যা করে আসলে কিছুই করতে পারছি না!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 10 = 16